বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

গল্প

বৃষ্টির শব্দ

বৃষ্টির শব্দ
হেনা সুলতানা

হাতে গুণে বলার মতো দিন আর ক‘টাই বা আছে!

তিনি কখনো কবিতা লেখেননি। কবিতা কী করে লিখতে হয় সে কৌশলও তার জানা নেই। কিন্তু এখন কবিতার মতো সেই শব্দগুলোই তিনি লিখে ফেলেছেন। শব্দগুলো মারবেলের মতো গড়িয়ে বেড়াচ্ছে সাদা জমিনের ওপর। বারবার তাতে চোখ বুলাচ্ছেন। চোখের দৃষ্টি স্থির করা যাচ্ছে না। প্রতিটি শব্দের ওপর থেকে দৃষ্টি পিছলে যাচ্ছে।

সকালে উঠে বাজার ফর্দ করতে বসে ছিলেন আসিফ। ছেলেরা তাদের বৌ ছেলে- মেয়ে নিয়ে বেড়াতে আসছে। বছরান্তে তারা একবার ক'টা দিনের জন্য বাবা-মাকে দেখতে আসে। বাবা-মাকে দেখতে আসে না ঢাকা শহরের জঞ্জাল থেকে মুক্তি পাবার জন্য নিরিবিলিতে এসে ক'টা দিন হাফ ছাড়া! আনেকটাই রথ দেখতে এসে কলা বেচার মতোই ব্যাপার- তা বেশ বুঝতে পারেন তিনি।

সকাল থেকে ঝুল বারান্দায় বেতের চেয়ারটাতে বসে আছেন আসিফ। বুলবুলি চা দিয়ে গেছে গরম গরম। সেও ঠাণ্ডা হয়েছে। ধোঁয়া উঠছিল কাপ থেকে, বাতাসে মিলিয়ে গেছে। চায়ের কাপে কেমন যেন একটা মরা সর পড়ে আছে। গরুর ঘন দুধের চা পছন্দ করেন তিনি। পছন্দের চা ভরা কাপ অভিমানে ভরে আছে। দ্বিতীয়বার চা চাইতে গেলে পাওয়া যাবে ঠিকই কিন্তু খেসারত দিতে হবে দু'চারটে কথার টিপ্পনি। যা একেবারেই পছন্দ নয় আসিফের। সেদিকেও তার কোন খেয়াল নেই। কবিতার মতো বাজার ফর্দের খাতায় লেখা শব্দগুলো কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আটকে ফেলেছে তাকে। বাজার ফর্দ করতে বসেছিলেন। কিন্তু তিনি তো এ কাজটি একা করেননি কোনদিন। কাকলী বলেন আর তিনি লেখেন। ঘরে বসে বসে চাল, ডাল, চিনি-বাতাসা কার কি দাম সব জানা আছে তার। এখনো ঘুম ভাঙেনি কাকলীর। তাই চায়ের টেবিলে দেখা যাচ্ছে না তাকে। দোতলার এই বারান্দায় বসে দু'জনে চা খায় আর বাজার ফর্দ করেন, চলে সংসারের টুকিটাকি কথাবার্তা। আজ কাকলীর আসতে দেরি হচ্ছে।

মাঝারি সাইজের একটা ফ্রিজ আছে বটে কিন্তু কাকলী কখনো ফ্রিজে রাখা খাবার দাবার খেতে পারে না। তার প্রতিদিন টাটকা বাজার চাই। সেই বাজার শিল পাটায় বাটা মশলায় রান্না করবেন। কতোদিন আসিফ কাকলীকে বলেছেন, ফ্রিজটা আছে কী জন্যে, প্রতিদিন প্রতিবেলা রান্না ঘরে যাবার দরকার কি? তার চাইতে আসো না সুখ-দুখের গল্প করি দুজনে! এ আকুতি তার কানে পৌঁছায় কি না কে জানে। তবে কাকলী রেগে যায় এ কথা শুনে। বলে, এই তো মোটে তিন জন মানুষ তার রান্না করে ফ্রিজে রেখে দেব? তারপর সারাটা দিন করবোটা কী? এই কথা লতিয়ে আরো দশ কথা, বিশ কথা, একশ কথা হবে। কানটা ঝালাপালা করে তুলবে। তখন বাড়িটা ঝন ঝন করতে থাকবে।

ঠিকই তো এবাড়িতে রান্না বান্না ছাড়া সারাদিন করবার মতো কাজ কি-ই বা আছে। কাজ তো সব কাজের লোকেই করে। কাকলী তদারক করেন। দাপুটে গলা। গত বর্ষায় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে পায়ে জোর ব্যথা পেয়েছিলেন। প্লাস্টার বেঁধে তিন মাস বিছানায়। সেই ভাঙা পা আর ভাল হয়নি। সেই ভাঙা পা নিয়ে সেই যে হুইল চেয়ারে উঠে বসেছিলেন তিনি আর নামতে পারেননি। তাছাড়া বহুদিন ধরে ডায়াবেটিসের সঙ্গে মেলবন্ধনের কারণে আনুসাঙ্গিক রোগ ব্যাধির সঙ্গেও আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে। সকাল সন্ধ্যা নিয়ম করে গুচ্ছের ঔষুধ খেতে হয় তাকে। মাঝে-মধ্যে এই এখন তখন অবস্থা। তার ওপর আছে শ্বাস কষ্টের শাসানী। হলে কী হবে তবু তার সব দিকে নজর। খবরদারিতে কম যান না। বাড়ির কাজের লোকগুলেকে তটস্ত করে রাখবে। তার খবরদারিটা যদি একটু কম থাকতো তাহলে বাড়িতে একটু শান্তি বজিয়ে থাকতো বলে আসিফের মনে হয়। হৈচৈ তার একদম পছন্দ নয়।

খবরের কাগজ রেখে গেছে বুলবুলি। সে দিকেও হাত বাড়াতে ইচ্ছে করে না আসিফের। হাতে গুণে বলার মতো দিন আর কটাই বা আছে! শব্দগুলো তার চোখ দখল করে আছে। আসলে বয়স হয়েছে। কতো হলো? কোন দিন জন্মদিন পালন করা হয়নি তবু হিসেব আছে। ষাট পেরিয়েছে বছর দুই হলো। এতোটা বয়স হলে কতোটা বুড়ো দেখায় আসিফ তা কখনো ভেবে দেখেননি। ঘরে একটা ড্রেসিং টেবিল আছে বটে কিন্তু আয়না দেখার বাতিক তার খুব একটা নেই। সরকারের উচ্চ পদে কাজ করতেন। এখন অখণ্ড অবসর। এই বয়সটা তো ভাল নয়। এই বয়সে কতো কি যে চিন্তা আসে। সব চাইতে বড় চিন্তা দিন ফুরিয়ে আসছে। আসুক না, তাতে কি? টাকা খরচের মতো দিন তো ফুরোবেই। কিন্তু এতোদিন কখনোই এই হাতে গোনা টাকা খরচের মতাে জীবনের গোনা দিনগুলো ফুরিয়ে আসছে এমন চিন্তা আসিফকে ধরতে পারেনি। ধরবেই বা কি করে। চিরদিনের নিঝঞ্ঝাটে মানুষ। তেমন কোন চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়নি। জীবনটা ছকে কাটা মানুষের যেমন হয় ঠিক তেমনি। চিরদিন ভাল ছাত্র ছিলেন। স্কলারশিপ পেয়ে লেখাপড়া করেছেন। যেটুকু সংগ্রাম তা সেই ছেলেবেলায়। সে সব মনে করে সুখের দিনগুলোকে কখনো ম্লান করেননি।

কাল হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে তার মাথার ভেতর বসে গেছে চিন্তাটা। হাতে গুণে বলার মতো দিন আর ক’টাই বা আছে! মানে মৃত্যু চিন্তা। প্রশ্নটা রাত থেকে কতোভাবে যে তাকে তাড়া করে ফিরছে তার হিসেব নেই।

হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ারে শুয়ে আছে ছোট ভাই জামিল। নানারকম যন্ত্রপাতি লাগানো তার শরীরে। মুখের ওপর অক্সিজেনের মাক্স। দেখলে ভয় লাগে। জামিল তার চেয়ে বছর তিনেকের ছোট। পিঠা-পিঠি চার ভাই বোনের মধ্যে তারা দুই বেঁচে আছে। বোন দুটোা ছোট বয়েসে মারা গেছে। বাবা-মাও যথা সময়ে তাদের মানুষ করে ঘর সংসার গুছিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছে।

বারবার দৃশ্যটা আসিফের চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মৃত্যু কষ্ট কী যে মারাত্মক! জামিল ঘোরের মধ্যে পড়ে আছে, কোন চেতনা নেই, হাত পা নড়ছে কি নড়ছে না। বুকের ছাতিটা কি ওঠা নামা করছে, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। চোখ দুটো বন্ধ। অনেক দিন আগের বৃষ্টিজল জমে থাকার মতো চোখের কোটওে খানিকটা ঘোলাটে জল জমে আছে। সে হয়তো মৃত্যু কষ্ট আর সহ্য করতে পারছে না। অথবা সে কষ্ট তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে অথবা কোন কষ্টই হচ্ছে না তার। এরকম দৃশ্য আসিফ কাছ থেকে কখনো দেখেনি। থেকে থেকে তার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে।

ক্লিনিক জুড়ে আত্মীয়-স্বজনের ভিড়। কে যেন তাকে জাপটে ধরে ক্লিনিকের বাইরে নিয়ে এলো। তিনি চোখের ভেতর কেবলই ধুসর রাস্তা দেখতে পাচ্ছেন- কুল কিনারাহীন রাস্তা। এই সব রাস্তায় কী গাড়ি-ঘোড়া চলে? হয়তো চলে। হয়তো চলে না। বৃিষ্ট হবার আগে দূর থেকে মৃদু মেঘ ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেই শব্দের সাথে মিলেমিশে একটি যান্ত্রিক কন্ঠ ভেসে আসছে।

-আসলে ক্লিনিকাল ডেড বলতে যা বোঝায় তা দুদিন আগেই কমপ্লিট হয়ে গেছে। এটা জাস্ট ওই আর কি। টাকা আছে, এই সব যন্ত্রপাতি লাগিয়ে বেঁচে থাকার নামান্তর আর কি। এছাড়া আর কিছু নয়।

পাখিরা ডানা ঝাপটিয়ে দূরে কোথাও উড়ে যাওয়ার মতো ভেসে ভেসে বেড়াছে কথাগুলো। ভেসে বেড়ালেও ঘুরতে ঘুরতে দলবাধা কবুতরের মধ্যে কিছু কিছু কবুতর যেমন ঝুপ ঝুপ কওে বসে পড়তো ছেলেবেলার সেই রূপপানা টিনের চালের উপরে। কিছুতেই উঠতে চাইতো না। কি যেন হতো তাদের। সকালের কথাগুলো মনের মধ্যে স্থির হয়ে বসে আছে কবুতরগুলোর মতো আর ক’টা দিনই বা আছে!

গ্রামে তখন আক্কাস ওঝার বাড়িতে প্রথম টিনের ঘর উঠলো। আক্কাস ইলেকশন করলো সে বছর। বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান হয়ে গেল। নামের শেষে ওঝা উঠে গিয়ে চেয়ারম্যান বসল। কি আশ্চর্য, তারপর থেকে লোকজন আক্কাস ওঝার চাইতে আক্কাস চেয়ারম্যান বলতে যেমন বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করতো তেমনি সাচ্ছন্দ্যে তার উঠোন বাড়ি ঘিরে টিনের আটচালা বাড়ি উঠলো। সেই বাড়ির চালের মাথায় টিন কেটে এক বাহারি ময়ূরপঙ্খি বসিয়ে দেয়া হলো। বিকেলে ডাকাতের বিলে মানুষ হাওয় খেতে এসে অবাক চোখে সেই বাহারি বাড়ি দেখতো। আক্কাস চেয়ারম্যানের বিদ্যা ছিল না, ছিল মাথা ভরা বুদ্ধি। বুদ্ধির জোরে টাকা-পয়সা রাখার জায়গা হতো না বাড়িতে। শহরে যেত ব্যাংকে রাখতে। টাকার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বভাব-চরিত্রেরও পরিবর্তন হলো। এই আক্কাস চেয়ারম্যনের কাছ থেকে তাকে অনেকবার চারিত্রিক সার্টিফিকেট নিতে হয়েছে।

তো সে বছরই স্কুল পাশ করেন আসিফ। বিরাট ঝড়-বন্যা হলো। বাড়ি ঘর ভেসে গেল। লাশ ভাসলো কচুরিপানার মধ্যে। তার স্কুল মাস্টার বাবার একমুঠো জমির আধা-মুঠো ধানও ভেসে গেছে সেই ঝড়-বন্যায়। বাবা তাকে আক্কাস চেয়ারম্যানের কাছ থেকে টাকা ধার কওর গঞ্জের কলেজে ভর্তি করে দেয়। জামির তখন ক্লাস এইটে। মাত্র চারজন মানুষের সংসার, তারপরও টানাটানি যায় না। বাবার সামান্য বেতনের চাকরিতে তাদের লেখাপড়া। অভাবের অজুহাতে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেলেও কিছু বলার ছিল না। কিন্তু বাবা তা কখনো করেনি বলেই এই বয়স পর্যন্ত আসিফ প্রাণ ভরে কৃতজ্ঞতা জানায় মৃত বাবাকে। তো সেই চকচকে টিনের চালের বাড়িটা ঠিক যেন রূপোর একখানা টোপর। সেখানে একটু বেলা হলে খৈ ফোটানো রোদ্দুর পড়ে ভারি একটা দেখবার জিনিস হতো বটে। চালের উপর বসে থাকতো সার বাধা কবুতর। হাত তালি দিলে ডিগবাজি খেতে খেতে একেবারে আকাশের দেশে। প্রথম প্রথম ক’দিন ঘটা করে অনেকেই দেখেছে। জামিলের স্কুলে যেতে দেরি হতো সে দৃশ্য দেখতে গিয়ে। বাবা একদিন জানতে পেরে এমন নির্মমভাবে মেরেছিল যে সেই রূপোপানা বাড়ির দিকে ঘাড় বাঁকা করতেও সে সাহস পেতো না। জামিল তার এই শেষ সময়ে কী সেই বাড়িটা দেখতে চাইবে শেষ ইচ্ছে হিসেবে? আসিফ দিব্বি দেখতে পাচ্ছেন, মধুপুর গ্রাম শহর থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার দুরে এক নিভৃত অঞ্চলে তার ছোট্ট বাংলো প্যার্টানের বাড়ির ব্যালকনিতে বসে। এইতো সেদিনের ঘটনা। সেই ঘটনা দেখতে দেখতে তার আবার মনে হয় ক’টা দিনই বা আছে! দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যাবে। ক্লিনিক বের করে আসিফকে বাড়ি পৌঁছে দিল তার এক বন্ধু। বাড়িতে পা দিয়েই তার সব কিছু শূন্য মনে হতে লাগলো তার। দৌড়ঝাঁপ যা করার দূর সম্পর্কেও এক ভাই করছে। সাথে জামিলের বন্ধু-বান্ধবই কি কম আছে?

জামিলের সংসার বলতে এমন কিছু নেই যে তার অবর্তমানে সেই সংসারের ভার বহন করতে হবে তাকে। বাড়িতে ঢুকেই মুখোমুখি হলেন কাকলীর। তার চেহারা দেখে কাকলী রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলেন। বোটা থেকে ফুল ছিঁড়ে নেয়ার মতো মৃত্যু যখন কোন আপনজনকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় সে চেহারা দেখে বোধহয় অভ্যস্ত নয় কাকলী। তুমি এতো ভেঙ্গে পড়েছ কেনো। আল্লার রহমতে জামিল আবার সুস্থ হয়ে উঠবে।

আসিফ জানেন জামিল যে পথে যাত্রা শুরু করেছে সে পথে কেবল যাওয়া আছে, ফেরা নেই। পথটির রঙ ধুসর। ছেলেবেলায় একবার সাঁতার শিখতে গিয়ে প্রায় ডুবেই গিয়ে ছিল জামিল। পানি টানি খেয়ে একেবাওে মরমর অবস্থা। দেখতে পেয়ে তিনি তাকে পুকুর থেকে তুলে এনেছিলেন। সেদিনও সে এমনি ঘোরের মধ্যে। তার অতি নিবিড় ¯েœহ সেই ঘোরের মধ্যেও জীবনকে জড়িয়ে রেখে ছিল। আজ আবার তেমনি করে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল তার ছোট ভাইটিকে। আজ প্রায় তিন মাস জামিল হাসপাতালের বিছানায়। বড় ভয়ঙ্কও দু:সময় তার। কষ্ট হচ্ছে তার। অথবা কোন কষ্টই অনুভব করতে পারছে না । যারা দেখছে সে কষ্ট দেখে অবুঝের মতোচোখে জল ফেলছে। মৃত্যু যন্ত্রণার মধ্যে ঢুকতে না পারলে কেউ বোঝে না কী এর ভাষা, কী ভাবে সে ভাষা বদলায়। প্রতিনিয়ত জীবন যাপনের যে সুখ সে কি মৃত্যুর মধ্যেও থাকে? না, তিনি জানেন না। মৃত্যুর এই অবচতন অন্ধকাওে কোন নীলাভ ভ’খন্ডের স্বপ্নে ভাইটি তার বিভোর হয়ে আছে কিনা তিনি তা ভাবতে চেষ্টা করেন।

কে যেন বলছিল- বলছিল মুখে পানি দেয়া হয়েছে? অনন্তকে খবর দেয়া হয়েছে? আরো কি সব নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। সেসব কথা কে শুনছে না শুনছে কারো যেন খেয়াল করার কোন প্রয়োজন নেই। যন্ত্রের মতো দু’জন নার্স এসে দক্ষ হাতে শরীর থেকে সমস্ত যন্ত্রপাতি খুলে নিল। তারপর সাদা চাদওে মুখ ঢেকে দিয়ে তারা চলে গেল। মুখে কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করলো না। এও একরকম ভাষা। মৃত্যুও মত এতা বড় ব্যাপার জানানোর জন্য কোন ভাষা খোঁজার দরকার হলো না, শুধু একটা সাদা পর্দা টেনে দেয়া - যেন মঞ্চের নাটক শেষ হলো এই মাত্র।

না, শেষ দৃশ্য বলতে যা বুঝায় আসিফ তা দেখেন নি। তার আগেই তাকে বের করে আনা হয়েছিল। দুরের কাছের বহু আত্মীয় স্বজন ভিড় করে ছিল কিন্তু তিনি ঠিক কাউকে চিনতে পারছিলেন না। তার ভেতরেই চকিতে একটা মুখ হঠাৎ করে কো¬জ শটে ঢুকতে না ঢুকতেই স্লিপ কেটে বেরিয়ে গেল। অবশ্য তার শরীরটা যেন কার পায়ের উপর ভর করে হাঁটছিল। সেই হাঁটা পথ আসিফ আবিষ্কার করলেন পাকা সড়ক পার হয়ে গাছপালা, ধানক্ষেত পার হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে- দিগন্তে। সেই ধান ক্ষেতের প্রান্তে যখন তিনি এসে দাঁড়ান তখন তাকে দল ছুট এক বিপন্ন সোনালি চিলের মতো মনে হয়। সেখান থেকেই তিনি যে কাকে খোঁজেন! মধুপুর গ্রামের ভেতরে এসে মহেশপাড়ার কাছে এসে জেলা বোর্ডের কাঁচা রাস্তা ছেড়ে তিনি ধান ক্ষেতে নেমে আল পথ ধরেন তখন সোনালি চিল ধীওে ধীওে লম্বা এক মানুষের মতো হাঁটতে থাকেন। সেই পথটা ধরে তিনি একাই চলছেন একাকিত্বের নদীতে ডুব সাঁতার কাটতে কাটতে। নিজের এই ডুব সাঁতারের মধ্যেই আবার সেই মুখটি তিনি দেখতে পেলেন। শ্যামলা রঙের মেয়ে। চেখে আশ্চর্য ধার আর মুখানি ভারি মিষ্টি।

তার স্মৃতি তাকে পীড়া দিতে থাকলো। মেয়েটিকে একবার কোথায় যেন দেখেছিন আসিফ। খুব সম্ভব জামিলের সাথে। হ্যাঁ জামিলের সাথেই তো, গুলশানের একটি অভিজাত মার্কেটে। মেয়েটি জামিলের একেবারে গায়ের সাথে মিসে হাঁটছিল। কত আর বয়স হবে। বড়জোর কুড়ি থেকে বাইশ পঁচিশের মধ্যে। ছোটভায়ের সাথে দেখা না হয়ে যায় সে জন্যে নিজেই একটু আড়ালে থেকে গেছেন। আটান্ন বছরের জামিলকে দেখে মনে হচ্ছে সবে ত্রিশের ঘর পেরিয়ে চল্লিশের দিকে হাঁটছে। ওর শরীরের গঠনটাই একটু বয়স চোরা। স্মার্ট, দৃঢ় পদক্ষেপে লম্বা লম্বা পা ফেলে ইংরেজি ছবির নায়কদের মতো মার্কেট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল। পাশে মেয়েটি। হবে হয়তো বিদেশী মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির মর্যাদা সম্পন্ন পদটি তাকে এমন স্বভাবের আর আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে। তিনি নিজে ওরকম কিছু হতে পারেন নি। না পারলেও ভাইটিকে দেখে তার খুব ভাল লাগে। অবশ্য ও ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম।

ছেলেবেলায় বাবার সাথে পালা করে তারা রেশনের দোকানের সামনে দাঁড়াতেন। খুব ভোরে আজানের পর ফজরের নামাজ পড়ে বাবা বের হতেন কোন সপ্তাহে তাকে নিয়ে আবার কোন সপ্তাহে জামিলকে সঙ্গে নিয়ে। ছেলেকে রেশনের দোকানে দাঁড় করিয়ে তিনি বাজারে যেতেন। কিছু কাঁকর মেশানো মোটা চাল-ডাল, গম, চিনি, মাঝে মধ্যে খানিকটা ভোজ্য তেলের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকা। এ সব যে বাজারে পাওয়া যায় না তা নয়। তবে যে বাজারে পাওয়া যায় তার নাম কলো বাজার। সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। চারিদিকে শুধু নাই নাই। রিলিফ, রেশন, কালো বাজার শব্দগুলো শুনতে শুনতে তারা একরকম ঝানু হয়ে উঠেছিল। রেশনে অল্প দামে পাওয়া সেটুকুই ছিল মহার্ঘ। সে একটা সময় গেছে বটে। তো যেদিন আসিফ লাইনে দাঁড়াতেন সেদিন নিজেকে বড় অসহায় লাগতো। বড় কাঙালের মতো মনে হতো নিজেকে। অথচ তিনি লক্ষ্য করে দেখেছেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা জামিলের অসহায় লাগা তো দুরের থাকুক তাকে রীতিমতো অন্যরকম লাগতো যেন সবকিছু জয় করবার জন্যই সে ওখানে দাঁড়িয়েছে। কি ভাবে যেন সময়ের অনেক আগেই সে রেশন নিয়ে বাড়ি ফিরতো। এসব কারণে ছোট ভাইটিকে কারণে অকারণে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিতেন।

একই শহরে থাকেন কিন্তু ইদানিং তাদের মধ্যে দেখা হয় কম। সামাজিক পারিবারিক অনুষ্ঠান ছাড়া দেখা হয়না বললেই চলে। অথচ ছেলেবেলায় বড় ভাইয়ের উপর খুব নির্ভরশীল ছিল জামিল। লেখাপড়া থেকে শুরু করে সবকিছুতে সাহায্য পেত বলেই বড় ভাকে খুব মান্য করতো সে। খাবার টেবিলে আসিফ কাকলীর কাছে কথাটা তুললেন খুব ক্যাজুয়ালি। এমন ভাবে কথাটা তুললেন যাতে তার ভেতরের কৌতুহল বেরিয়ে না আসে।

কথাটা শুনে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন খানিক্ষণ। সংসারের কোন কথা তো কখনো জানতে চান না আসিফ। বলতে চাইলেও শুনতে চান না গভীর ভাবে। এই এতো বছরের সংসার জীবনে তিনি কেবল দেখে এসেছেন তার স্বামীর গন্ডি অফিস আর বাড়ি। বইপত্র, খবরের কাগজ এসবই মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। আজ জামিল সম্পর্কে নিজেই কথা তোলাতে কাকলী খুব অবাক হলেন। পাপড়ি আর জামিলের সংসারে ফাটল ধরেছে সেতো আজ কম দিন হলো না। জামিল তো খুব চালাক চতুর - সে ফাটল দিয়ে যে জল ঢুকবে তার কোনো সুযোগ রাখেনি।

ক্লাসের বন্ধু পাপড়িকে বিয়ে করে জামিল বেশ সুখেই ছিল। তাদের দুই ছেলেমেয়ে। সবাই বড়ই হয়ে গেছে প্রায়। কিন্তু পাপড়ির শরীরে আগের সেই জৌলুস নেই। মেদবহুল শরীর এখন অনেক দুর্বল। কি কি সব অসুখ ধরেছে। তার উপরে প্রেসার। মেজাজটা তার বরাবরই তুঙ্গে। বয়সও হয়েছে। ঘর-সংসার ছেলেমেয়ে নিয়েই ব্যস্ত থাকে সে বেশি। জামিলের প্রতি মনোযোগ দেয়া হয়ে ওঠে না। পাপড়ি মনে করে এই বয়সে আর কি। তাই বিছানাও আলাদ। যদিও জামিল প্রতিদিনই নিয়ম করে বাড়ি ফেরে। তাই তাকে নিয়ে কখনো কোনো সন্দেহের কারণ খোঁজেনি পাপড়ি।

-ইদানিং অনন্ত নাকি বাড়ি এসে প্রায় তার মাকে কি সব বলতো।

-অনন্তটা কে?

-হায় আল্লাহ! কোন জগতে থাকো? জামিলের ছেলে অনন্ত। এতো ভাল ছেলে, ঢাকা ইউনিভার্সিতে চান্স পেল না। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়ে।

-ও হ্যা, হ্যা মনে পড়েছে। আজকাল এতো কিছু মনে রাখতে পারি না।

-কবেই-বা তুমি কী মনে রেখেছ? আমি না থাকলে তোমার সংসার ভেসে যেতো।

-তা ঠিক। আসিফ সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমর্পণ করে ফেলে। নইলে কথার মোড় ঘুরে যেতো। শুরু হতো আর এক কাহিনী।

- ওই ছেলেই তো সব উদ্ধার করলো।

-উদ্ধার করলো মানে? কী উদ্ধার করলো? চিরকালের নির্লিপ্ত আসিফের ভেতরে কে জানে কেন একটা অজানা তোলপাড় উঠলো। কৌতূহলটা দমন করতে পারে না।

-সব কথা শুনলে তুমি সহ্য করতে পারবে না। তোমাকে তো কিছু বলিনি তোমার শরীরের কথা ভেবে। তা ঠিক আর যাই করুক তার শরীরে প্রতি কাকলীর খুব নজর। ছোট খাটো একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে। তার নজরদারিতে ছিলেন বলেই তিনি আবার চলে ফিরে বেড়াচ্ছেন। নইলে এতাদিনে তাকেও বিছানা নিতে হতো।

-অনন্ত নাকি প্রায়ই দেখে গুলশানের এক ফ্ল্যাট তার বাবাকে যাতায়াত করতে। খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছে তার বাবা চারবছর ধরে একটি মেয়েকে বিয়ে করে সেই ফ্ল্যাটে রেখেছে। সব শুনে পাপড়ি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনি। তাই সে নিজে সেই বাড়িতে গিয়েছে।

উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে আসিফ প্রায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে, পাপড়ি গিয়ে কী দেখলো।

-কী আর দেখবে? যা দেখার তাই দেখলো। পাপড়িকে তো চেনোই। সেই মূহুর্তে হুড়হুড় করে টেনে ওদের মিরপুরের বাড়িতে নিয়ে এলো জামিলকে। তারপর কত কাণ্ড! ছেলেমেয়েরা একরকম জোর করেই সমস্ত কিছু লিখিয়ে নিয়েছে পাপড়ির নামে। বৌ ছেলেমেয়ের চাপে, লোকচক্ষুর ভয়ে জামিল ওই পথ থেকে ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু এরপর থেকেই তো অসুস্থ হয়ে পড়ল। এক ছাদের নিচে ছিল ঠিকই কিন্তু দুজন দুজনকে অবিশ্বাস করা ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না। এই অসুস্থতার মধ্যে জামিলের দিকে ফিরেও তাকাতো না পাপড়ি। চাকর বাকর দিয়ে ঘরে খাবার পাঠিয়ে দিত। ছেলে-মেয়েরাও কেউ কাছে যেত না তেমন।

কাকলীর মুখে এইসব শুনতে শুনতে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠে আসিফ। এতোকিছু হয়ে গেছে, অথচ তিনি কিছুই জানেন না। তিনি শুনেছিলেন ওদের বাড়িতে কি সব ঝামেলা চলছে। ছেলে-মেয়েরা জায়গা জমি নিয়ে ভাগ-বাটোয়রা করে নিজেদের নামে লিখে নিতে চায়। এই সময় ভাইটি তার অসুস্থ হয়ে পড়ে। ও বাড়ি থেকে ক্লিনিকে কেউ তেমন একটা যেতো না। যা কিছু দেখাশোনা জামিলের বন্ধু-বান্ধবরাই করেছে। আজকাল এমন বন্ধুবান্ধব বড় একটা দেখা যায় না। সারাক্ষণ ভিড় করে থাকতো তার বন্ধুরা। এইসব ভিড়ের ভেতরে ক্লিনিকে জামিলের কেবিনের বাইরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতো একটি অল্প বয়সরে মেয়ে। শ্যামলা মায়াময় মুখটা। দুটো চোখে বেদনার জল টলমল করছে। জামিলের কাছে তার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু কিসের টানে সে ক্লিনিকে যায়?

দোতলা ফ্লাটবাড়ি, ফুলের বাগান, সাজানো ঘর-দোর গোছানো সংসার তো সব শেষ হয়ে গেছে তার এই লোকটির জন্য। কিন্তু তবু ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। তবু আসে ফিরে ফিরে। জামিলের জন্য তার মায়া হয়। সেও তো একরকম নিঃস্ব। একজন সর্বহারা মানুষ আর একজন সর্বহারা মানুষকে সমবেদনা জানাতে আসে। জামিলের শেষ মুহূর্তে ক্লিনিকের দরজায় দাঁড়িয়ে এই মেয়েটিই একমাত্র ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। সে শব্দ বাতাসে মিশে একটা শোকের আবহ তৈরী করে ছিল। আসিফ সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে মানুষের ভিড়ে মেয়েটিকে দেখার চেষ্ট করে ছিল। জামিলের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা কাউকে নয়। সেই মায়া মাখানো মুখটা ভিড়ের ভিতরে এক ঝলক ভেসে উঠেছিল। ওদের কারো আসার সময় হয়নি জামিলকে শেষ বিদায় জানাতে। নিয়ম করে ক্লিনিকে গিয়ে তিনি ভাইকে দেখে আসতেন। সে সময় দেখতেন মেয়েটি একটা জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো দাাঁড়িয়ে আছে দূরে যেন একটা ছায়া। কখনো কোন কথা হয়নি। নীরবে তাকিয়ে থাকতো কেবল।

কাকলী এসে বসে চায়ের টেবেিল। বেতের আরাম কেদারা টাইপের সোফায় হেলান দেয় আসিফের চেহারাটা দেখে তার বড় মায়া হয়। ঠাণ্ডা চায়ের কাপের সামনে বসে আছে দীর্ঘকায় ফর্সা মানুষটি। মাথার চুলে কাশফুল উড়ছে। বুলবুলিকে ডেকে আবার চা দিতে বলেন কাকলী। চা এলে দুজনে চুপচাপ চায়ে মনোযোগ দেয়। আজ আর কোন কথা বলার ইচ্ছে কওে না তাদের। কী এক বিষন্নতায় ছেয়ে আছে দুজনকে। সামনেই বসে আছে কাকলী তবু মুখের দিকে তাকাতে সাহস পান না আসিফ। এই বয়সেও তার বুকের ভিতরটা এক অজানা আশঙ্কায় তির তির কওে কাঁপতে থাকে।

কাকরী জিজ্ঞেস করেন, কী এতো ভাবছ?

-কই না, কিছু নাতো। আসিফের ভেতরে ভেতরে একটা অজানা ভয় ছটফট করতে থাকে।

ছেলে মেয়ে নাতি নাতনিরা অনেক দিন পর আসছে বলে বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে চুনকাম চলছে। বেলা বেড়েছে অনেকটা। লোকজন ডাকাডকি করছে। কাজকর্ম কাজের লোকে করলেও কাকলী হুইল চেয়ারে বসে নিজেই দেখাশোনা করে। তার শরীরের কথা চিন্তা করে আজ নিশ্চয়ই অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেবে কাকলী সেই আয়োজনই চলছে।

আসিফ হাফ ছেড়ে বাঁচে। তিনি আবার ডুবে যান ক্লিনিকের সেইসব ভিড়ের মধ্যে। ভিড়ের মধ্যে ভেসে ওঠা সেই নিষ্পাপ মুখটি। হবে হয়তো কোন অসহায় পরিবারের মেয়ে। যেভাবেই হোক একটা সংসার তো পেয়েছিল মেয়েটি। লেখাপড়া যাই থাকুক না কেন এ সমাজে একটা মেয়ের জন্যে সংসারের আশ্রয়ই হচ্ছে শেষ আশ্রয়। এই মুহূর্তে তার মনে হয় তাকে খুঁজে দুটো কথা বলতে পারলে সে বোধহয় একটু সান্ত্বনা পেত। ওকে দেখেই কেন তার বয়স ফুরিয়ে যাওয়ার কথা মনে হল? আসলে তা নয়। তিনি এলোমেলো চিন্তা করছেন। সে সব চিন্তার একটাই সূত্র, দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। বয়স চলে যাচ্ছে। বয়স কোথায় যাচ্ছে? মৃত্যুর দিকে। সেই মৃত্যুর দিকেই ছুটছে সবাই। এ মনিতেই বয়স যত বাড়ছে ততোই ঘুমহীন একটা বাজে অসুখের শিকার হচ্ছেন তিনি। ডাক্তারের কথা মত ঘুমের অসুধ খান বটে তবে গভীর ঘুম তার কখনোই হয় না। হালকা ঘুমের মধ্যে তিনি অদ্ভুত আর বিদঘুটে স্বপ্ন দেখেন। চোখের সামনে সারা রাত একমাত্র ভাইয়ের মৃত্যু দৃশ্য ভেসে গেল। কখনও মায়ের মুখ, কখন বাবার মুখ বা কখনও আরও একটি মুখ ভেসে ওঠে তার ভারি চোখের পাতায়, যে মুখটি এদের কেউ নয়। তার সাথে আসিফের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এসর্ম্পকের কাছে তিনি নিজেকে সর্ম্পন করেছেন। এই সম্পর্কেও কাছে এলে তিনি ভুলে যান জীবন, সমাজএমন কি কাকলীর কথা। জীবনে যে যায়গা থেকে তার যতো অতৃপ্তি তা যেন পূরণ হয়ে যায় এসম্পর্কটির কাছে এল। তখন। তিনি একটা ঘোরের মধ্যে থাকেন। এভাবে কতগুল বছর কেটেছে তিনি জানেন না। বছরের পর বছর তিনি নিভৃতে ঢুকেছেন এক নিদ্রহীন জগতে। বিছানায় যেতে ভয় করে। লোকজন, আত্মীয়, বন্ধু পরিবেশষ্টিত হয়ে আসিফ নির্জন হয়ে যান।

বড় ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে আসিফের। ছেলেবেলার কথা মনে হলেই তার অন্নকল্পের কথা মনে পড়ে। আষাঢ় শ্রাবণে বৃষ্টির দিনে গোলপাতার ঘরের বারান্দায় তারা চার ভাই বোন চাল ভাজা খাচ্ছে। মা এক বাটি বক ফুল ভেজে তাদের থালার সামনে ধরতো। তাই দিয়ে তাদেও ভাত খাওয়া হতো মহা আনন্দে। সে আনন্দ আসিফ সারা জীবন খুঁজে বেড়িয়েছেন। ইদানিং এই সম্পর্কেও কাছেই তিনি সেই আনন্দ খুজে পেয়েছেন। কারো কাছে বলা যায় না এসব কথা। এই বয়সে সমাজ সংসার স্ত্রী পুত্র কন্যা সবার কাছে এমন বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন যে এ সব প্রকাশ পাওয়াও অন্যায়। শুধু অন্যায় নয়, ঘোরতর অন্যায়। তবু এই সম্পর্কের কাছেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সুস্থ বোধ করেন। অথচ কোন গোপন অসুখ ঢেকে রাখবার মতো তাকে লুকিয়ে রাখতে হয় বুকের ভেতর অতি যতেœ। নইলে যে সমাজ টেকে না। ঘর টেকে না। কী আশ্চর্য এর নাম কী সংসার? এই কঠিন প্রশ্ন তাকে ক্লান্ত করে তোলে।

একই বিছানায় ঘুমান কাকলী আর আসিফ। কাকলী মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি নিজেই সেবা করেন তার। একান্ত নির্ভতায় কাকলী তার বাহুর উপওে ক্লন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। তখন ছেলে মেয়েরা আসে। শত কাজ ফেলে ছেলের বৌরা আসে, আসে নাতি নাতনিরা। খালি বাড়িটা ভরে ওঠে। কাকলীকে ঘিরে চলে নানা হৈচৈ, আনন্দ। কেননা তখন কাকলী সবাইকে দেখে দেখে সুস্থ হয়ে য়ায়। আসিফ তখন একা হয়ে যান। মেয়েরা মাকে ঘিরে থাকে। বাবার কাছে বড় একটা আসেনা। না আসলেই ভাল । তাদের শাড়ি গহনা আর সিরিয়ালের গল্প আরও কি সব জাগতিক শুনে শুনে তিনি ক্লান্ত হয়ে যান। দোতলার ঝুল বারান্দায় বসে থাকেন একা। ঠিক সেই সময়টাতে প্রাণ ব্যাকুল হয়ে ওঠে সেই সম্পর্কেটির জন্য। অথচ কেউ কিছু যানতে পারেনা। ভাগ্য ভাল বুকের ভিতর কি হয় তা কেউ দেখতে পায় না। দেখতে পেলে কি সব যে আনাসৃষ্ট হতো তার ঠিক নেই। না, কোথাও তিনি কো অনা সৃষ্টি করেননি। দক্ষ শিল্পীর মতো আসিফ সংসার তৈরি করেছেন। সবাইকে নিয়ে জড়িয়ে আছেন। সেখানে কোন খুঁত রাখেননি। সবই কে পথ দেখিয়েছেন। এই সময় তার কেন যানি মনে হয় তিনিই কেবল রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন। একমাত্র ভায়ের মৃত্যু দৃশ্য তার দিন রাত্রি পাল্টে দিয়েছে। সবাইকে অপরিচিত মনে হয়। মনে হয় স¦ার্থপর। সংসারে যাদের সাথে আসিফের রক্তের সম্পর্ক তাদেও কাউকেই তিনি চিনতে পারছেন না। কোন বীজ রোপনের সাক্ষ্য নেই সবাই নিজস্ব গতিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কেবল যে সম্পর্কটি তার রক্তের নয়, আইওে নয়, দৃশ্যমানও নয় তাই তাকে নাড়ি ধওে টানছে। এর কি ব্যাখ্যা তিনি ভেবে পান না।

হাতে গোনা দিন আর কটাই বা আছে? সেই যে সকালে বাজার ফর্দের খাতায় লেখা শব্দগুলো- সেই শব্দগুলোর ভেতর আসিফ আবার ডুবে যান। ডুবতে ডুততে ক্রমশ্য তলিয়ে যাচ্ছেন। তারপর নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম। এভাবে কতক্ষণ যে কেটে গেছে তা তিনি নিজেই জানেন না। চোখের পাতা দুটো পড়ে আছে নির্লিপ্ত।

-এই, এই শুনছো, এমন করছো কেন তুমি? কী হয়েছে তোমার?

আসিফ চোখ খুলে দেখেন কাকলী ঝুঁকে আছেন তার মুখের উপর।

-কই কিছু না তো।

-চোখ বন্ধ করে কী করছিলে?

-দেখছিলাম।

-চোখ বন্ধ করে দেখছিলে? আশ্চর্য! কী দেখছিলে?

-দেখছিলাম হাতে গোনা দিন আর কটা আছে!

-মানে কী?

-মানে হচ্ছে সব ছেড়ে ছুড়ে তো একদিন চলে যেতে হবে।

-কী বলছো এসব? তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেল? আমাকে একা ফেলে তুমি কোথায় চলে যেতে চাও? বলতে বলতে অত্যন্ত ছেলেমানুষের মতো কেদে ফেলে কাকলী। কেঁদে কেঁদে ছেলে মেয়েদেও টেলিফোন করতে শুরু করেন। তা দেখে হো হো করে হাসতে শুরু করেন। ওই হাসতে হাসতেই ব্যাপারটা ঘটে গেল।

হাসপাতাল ভর্তি লোকের অনেক উৎসুক চোখের সামনে জ্ঞান ফিরল আসিফের। দম বন্ধ অবস্থায় আসিফ কার সাথে কথা বলছিলেন? সেই জন্মের থেকে তিনি এই জীবটার সাথে আছেন। কত দিনের সখা। এই জীবনটাকে তার ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের মতো মনে হয়। চাঁদটারই বা দোষ কী! তবে কি তিনি সেই ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের সাথে কথা বলছিলেন? আর কটা দিন! ঘোরের মধ্যে যোগ বিয়োগ করছিলেন আসিফ। সেই ঘোরের মধ্যে শুনতে পান দূরে থেকে ভেসে আসা একটা কন্ঠস্বর। আসিফের মাথায় হাত রেখে বসে আছেন কাকলী। কিন্তু তিনি তার অস্তিত্বও টের পান না। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে তৈরি হয় এক স্বপ্নবৎ দৃশ্য। তিনি ভারি আরাম বোধ করেন। গোপনে বেড়ে ওঠা সম্পর্কটি যেন তরল হতে হতে তার রক্ত কণায় মিশে যেতে থাকে। সেখানে তৈরি হয় এক নৈস্বর্গিক বাগান। ফুলের বাগান। ফুলে ফুলে প্রজাপতি উড়ছে। ভোরের রেললইনে ঝুমঝুম করে গাড়ি চলে যাচ্ছে দুরে বহু দুরে। দূর থেকে কিছু মেঘ এসে ঢেকে দিয়ে যায় চাঁদ, আকাশ। বরফের গুঁড়োর মতো বৃষ্টি ঝরতে থাকে। সেই বৃষ্টির শব্দে তার শরীর আবার সতেজ হয়ে ওঠে। অন্য জগতে বেঁচে থাকার অনন্ত ইচ্ছেরা তার সমস্ত শরীর জুড়ে প্রবল ঝাঁকুনি দিতে থাকে।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত