বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

শ্রদ্ধা

আলম তালুকদার: যার ছড়া পড়লে ঘুমেও হাসতে হতো

আলম তালুকদার: যার ছড়া পড়লে ঘুমেও হাসতে হতো
আলম তালুকদার, ১ জানুয়ারি ১৯৫৬-৮ জুলাই ২০২০

সুকুমার রায়ের হাসির ছড়া বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ সম্পদ। বয়স নির্বিশেষে সবাই তার হাস্যরস ছড়ার ভক্ত। তার ছড়া পড়লে ঠিক বোঝা যাবে সুকুমার রায় সম্ভবত উঠতে বসতে ছড়া কাটতেন। আর তাতে নানারকমের ব্যঙ্গ ভঙ্গি যোগ করে হাসাতেন তার পাঠকদের। এটি ছড়াকার সুকুমার রায়ের এক অতুলনীয় গুণ। আমাদের ছড়াসাহিত্যে এই ধারার উপস্থিতি খুব কম। এই অনুপস্থিতির মধ্যেও আমরা একজন ছড়াকারকে পাই কথায় কথায় ছড়া কাটতে। ছড়ায় ছড়ায় হাসাতে। ছড়ায় রঙ্গব্যঙ্গ ছড়াতে। আর কে এই ছড়াকার। আলম তালুকদার। তাঁর নামের সঙ্গে ছড়াকার শব্দের চমৎকার অন্ত্যমিল কাজ করে। তিনি নিজেও অন্ত্যমিলের মানুষ। অন্ত্যমিল ছাড়া কথা বলতে চান না তিনি। সভায়, আড্ডায়, কথাবার্তায়, বাক্য বিনিময়ে অন্ত্যমিল দিয়ে কথা বলেন একনাগাড়ে। আর এই কথাগুলো সরল, সহজবোধ্য, অর্থবহ হাস্যরস মিশ্রিত। আলম তালুকদারের এই পরিচিতির প্রতিফলন ঘটেছে তার বিশাল ভাণ্ডারের ছড়াগ্রন্থে।

হঠাৎ করেই এই ছড়াকার আমাদের কাঁদালেন। কান্নার ছড়া লিখে নয়। কান্নার ছন্দ দিয়ে নয়। কোনো দুঃখের গল্প করে নয়। একবারে নিজে চিরদিনের জন্য পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে। তিনি কাঁদালেন কিন্তু তিনি দেখতে পেলেন না তাঁর পাঠক-শ্রোতারা কাঁদছে। যারা তাঁর সান্নিধ্যে এসে শুধু হাসতে অভ্যস্ত ছিল। ছড়া দিয়ে নয়, ছড়াকার বিদায়ে হাত নাড়িয়ে তার পাঠকদের কাঁদালেন। মনে হয় এটি একবারই ঘটল। আমরা কখনো যাঁকে বেজার মুখে দেখিনি। তাঁকে কখনো হাসিমুখ ছাড়া দেখিনি। আমরা প্রতিনিয়ত তাঁকে দেখেছি ফান করতে। কৌতুক করতে। ছন্দে ছন্দে হাসি ফোটাতে। আমাদের শিশুসাহিত্যে, ছড়াসাহিত্যে আলম তালুকদারের এই চলে যাওয়া অপূরণীয় একটি ছন্দপতন।

আলম তালুকদার ছড়া এমনকি গদ্যচর্চায় যে ধারাটি তৈরি করেছিলেন, সেটি খুবই প্রত্যাশিত। বিশেষ করে ছোটদের জন্য লেখায়। তাঁর প্রথম গ্রন্থ থেকেই সেটি দেখতে পাই। শতাধিক গ্রন্থের প্রণেতা আলম তালুকদারের প্রথম বই ‘ঘুম তাড়ানো ছড়া’। শুধু হাসি-তামাশা দিয়ে নয়, ছন্দ দিয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়াদের জাগিয়েও তোলার চেষ্টা করেছেন সেই প্রথম থেকে। এই গ্রন্থের নামে আমরা দেখতে পাচ্ছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষকে জাগিয়ে তোলার মন্ত্র, অলসতা পরিহারের আহ্বান, আপসকামিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার উচ্চারণসহ তাঁর সাহিত্যে সেই শুরু থেকেই মানুষকে দেশের জন্য এগিয়ে যাবার উদাত্ত আহ্বান। আর সেটি হবেই বা না কেন, আলম তালুকদার যে ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা।

ছড়াগ্রন্থ ‘আবার আবোল-তাবোল’-এর মধ্যে যদি যদি প্রবেশ করি, আমরা দেখব সেই ধারা। সুকুমার রায়ের আজগুবি ও উদ্ভট ছড়ার সংকলন হচ্ছে ‘আবোল তাবোল’। এই পৃথিবীতে যা কিছু সম্ভব নয়, সুকুমার রায় তাই করেছেন এই ছড়াগ্রন্থে। এ কারণেই রসবোধে ভরে উঠেছে প্রতিটি ছড়া সুকুমার রায়ের ‘আবোল-তবোল’ ছড়াগ্রন্থে। সুকুমার রায়ের এই ধারাটি নিজের মতো করে আবিষ্কার করলেন আলম তালুকদার তাঁর ‘আবার আবোল-তাবোল’ গ্রন্থে। একইরকম রসবাধ সৃষ্টিতে আলম তালুকদার এখানে নানা আজগুবি এবং অবাস্তব ঘটনার অবতারণা করেছেন। সুকুমার তাঁর ‘খিচুড়ি’ ছড়ায় বলেছেন, ‘হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না)/হয়ে গেল ‘হাসজারু’ কেমনে তা জানি না। আর আলম তালুকদার তাঁর ‘ব্যাকরণ মানিব’ ছড়ায় বলেছেন, ‘হাঁস ভালো সাঁতারু (ব্যাকরণ মানিব)/হতে পারে হাসাহাসি (কেমনে তা জানিব)’। কিছু বিখ্যাত ছড়ার কাঠামো অনুকরণ করে তিনি তাঁর মতো তাতে অর্থ ও রঙ্গ সন্নিবেশ করেছেনÑযেমন ‘বাসনা চুরি ছড়ায়’Ñ‘আর নয় নাই ভয় আরে বেটা আস না/হাওয়া হয়ে উড়ে যাবি বিশ্বাস পাস না?’ আবার কল্পনার রাজ্যেও ভ্রমণ করেছেন আলম তালুকদার তাঁর কিছু কিছু ছড়ায়। যেমন: চাঁদের ফালি দুলছে ছড়ায়, ফুলবাগানে কদম আলী/দেখতে পেল চাঁদের ফালি/ফুলের সাথে দুলছে/ফুলের সাথে ভুল না করে/চাঁদের ফালি তুলছে।

রসাত্মক ছড়াগুলোর মধ্যে আছে, আ বলো তা বলো, মাত্র কত বার, হ য ব র ল, খিচুড়ি, মশা মাছি দ্বীপান্তর, মাথায় যত প্রশ্ন আসে, ভয় পাচ্ছি গুঁতুকে, সুমেরু কুমেরু, গোঁফ রাখা খুব সোজা না, গোবর গনেশ, দুই কদমে চলি নাই। ছড়ার এরকম নাম শুনলেই বোঝা যায় এতে হাসি আছে।

আলম তালুকদারের ‘আবার আবোল তাবোল’ বইটি পড়ে অবশ্যই হাসতে হবে। আর ছড়ার রস এমন করে কাতুকুতু দেবে যে ঘুমের ঘোরেও হাসতে হবে। এ নিয়ে কিন্তু কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। কারণ আলম তালুকদার তাঁর ‘প্রমাণ দাও’ ছড়াতে বলেছেন, ‘মাথায় যদি এমন প্রশ্ন আসতে পারে, ঘুমিয়ে গেলে কারা বলো হাসতে পারে?’ আলম তালুকদারের ছড়া পড়লে ঘুমেও হাসতে হবে।

তাঁর ছড়া কতটা কৌতুকধর্মী সেটি ছড়াগ্রন্থের নামেও প্রতিফিলিত। কয়েকটি গ্রন্থের নাম দেখলেই সেটি বোঝা যাবে। যেমন: খোঁচান ক্যান, ঐ রাজাকার, বাচ্চা ছড়া কাচ্চা ছড়া, ছড়ায় ছড়ায় টক্কর, প্যাচাল না আলাপ, শিষ্টামি, ছড়া পড়লে চুল পাকে না।

ছড়াসহ আমাদের শিশুসাহিত্যে এরকম একটি হাসি-ঠাট্টা-কৌতুকের মতো যে জগৎ তৈরি করে যাচ্ছিলেন ছড়াকার আলম তালুকদার, সেটি থেমে গেল হঠাৎ। আর আলম তালুকদার এসে বলবেন না, লেখালেখির বিষয় নিয়ে লেখক এখন চিন্তিত/সরকার যদি বিনামূল্যে কাগজ কলম পিন দিত/লেখালেখির লেখক কভু/হতো না আর নিন্দিত।

পরকালে ভালো থাকুন ছড়াকার আলম তালুকদার।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত