ধারাবাহিক থ্রিলার

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১২)

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১২)
সাইকোপ্যাথ

তুমি থাকো কোথায় লুসি? কেন, স্টু’র বাড়িতে। আমার বস ডা. কেইন স্টুয়ার্ট। ওর কমিউনিটি ক্লিনিক আর বাড়ি একখানেই। সেটা কোথায়? একের পর এক প্রশ্ন করে রিনি সেন। একজন ভালো রিপোর্টারের সঙ্গে প্রাইভেট ডিটেকটিভের এখানেই মিল। তারা স্পটে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে তারপর রিপোর্ট বানান বা সন্দেহভাজনের বিষয়ে ডিডাকশনে আসেন। আর যারা ঘরে বসে রিপোর্ট লেখেন তারা তো হলুদ সাংবাদিক। তারা রিপোর্ট নয় বরং গল্প লেখেন। কথাসাহিত্যিক যাকে বলে। ইগলমন্ট মিউনিসিপালিটির বেল রোডে ডা. কেইন স্টুয়ার্টের ক্লিনিক। পাশেই বেলফিল্ড পুলিশ স্টেশন, ইন্সপেক্টর গ্রোভার হুকের ডেরা। কথা প্রসঙ্গে উর্বী বলল, লুসি, তোমার বস কি খুব খারাপ মানুষ? আমি মিন বদরাগী? অমনি হেসে ফেলল লুসি কাবেরি। আরে না না, অত খারাপ হলে কি সেখানে থাকতে পারতাম! তবে স্টু লোকটা আমার মতো নিঃসঙ্গ। তার বউ নাকি তাকে ছেড়ে গেছে। ছেলেপুলে নেই, একাই একটা ক্লিনিক চালান আর টাকার পাহাড় গড়েন। এই টাকা খেয়েও মরতে পারবেন না স্টু। তার অত খিদে নেই। ফিক করে হাসলেন অলোকেশ। বলে কি লুসি! ডা. কেইন স্টুয়ার্টের অত খিদে নেই। মানুষ কি পশু নাকি যে শুধু খিদে পেলেই খায়! মানুষ খিদে না পেলেও যেমন খায়, তেমন টাকার দরকার না থাকলেও অন্যকে ঠকিয়ে অকারণ টাকা কামায়। যেন টাকার বালিশে মাথা দিয়ে শুলে ঘুম ভালো হয়। ঠিক তার উল্টো। রিনি আর উর্বী সমস্বরে বলল। যার টাকা বেশি তার সুখ কম। কারণ কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার বিলিবন্দেজের চিন্তায় তাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। চেরি স্ট্রিট থেকে বেল রোড খুব দূরে নয়। চাইলে আজ সন্ধ্যায় লুসির বসের ক্লিনিকে এক পাক ঘুরে আসা যায়। কিন্তু অলোকেশ মিছে সময় নষ্ট করতে রাজি নন। ক্রিমিনাল সাইকোলজির ওপরে পেপারটা তাকে প্রস্তুত করতে হবে। নেক্সট উইকে তার উপস্থাপনা। ইউনিভার্সিটি অব সুইনবার্ন। প্রফেসর কিম তাকে প্রতিদিন তাড়া দিচ্ছেন। ডা. কেইন স্টুয়ার্টের বউ নেই, সে ভেগে গেছে, এটা আদতে কোনো খবর নয়। কারণ এসব দেশে অনেকেই একা থাকেন। বিয়ের ঝামেলায় জড়াতে চান না। নিত্য দিন খালি ‘নাই আর আনো’র বায়না শুনতে কোন পুরুষের ভালো লাগে বলো! তাই বলে কারো বউ নিজের থেকে ভেগে যাবে! পুরুষ হিসেবে তার আঁতে লাগবে না! তাই বুঝি ডা. কেইন স্টুয়ার্ট মন খারাপ করে আছেন! সত্যি বলতে কি, একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতা মানুষের সবচে বড়ো অসুখ। সরাসরি বুকের গহিনে গিয়ে লাগে, আর কোনো ওষুধে এই রোগ সারে না। অলোকেশ কেজো গলায় বললেন, তুমি কি কাউকে সন্দেহ করো লুসি? টনির নাক কাটার ব্যাপারে? উন্না! উঁহু! পরপর দুটো নাসিক্য ধ্বনি করল লুসি। তবে টনির মতো মানুষের শত্রু থাকাটা অসম্ভব কিছু নয়। লুসির সোজাসাপটা অভিমত। ও একটা বাজে লোক। লোভী ও স্বার্থপর। ইশারা করলেন অলোকেশ। অর্থাৎ রিনি এবার ওঠা যাক। লুসির কাছ থেকে আপাতত জানবার আর কিছু নেই। টনিকে সে মন থেকে মুছে ফেলতে চায়। টনি তার কাছে একটা নাইটমেয়ার মাত্র। অর্থাৎ দুঃস্বপ্ন। তাহলে চলি লুসি। উর্বী বলল। রিনি ওর কাঁধে হাত রাখল। আবার কখনো দেখা হবে লুসি। লেটস গো নাউ। লুসিকে গুডবাই জানিয়ে ওরা তিন জন ‘ক্যাফে হট এন কোল্ড মোক্কা’ থেকে পায়ে হেঁটে ফেডারেশন স্কয়ারে এল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পথঘাট। অকারণ কেউ এখানে থুতু ফেলে না বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মুলতানি ষাঁড়ের মতো গুলতানি মারে না। অলোকেশ বুঝলেন যে শুধু আইন পাস করে শহর পরিচ্ছন্ন রাখা যায় না। যারা থাকছে তাদেরও সিভিক সেন্স থাকতে হয়। কেউ যদি ভাবে, আমি যা খুশি তা-ই করব, একেই স্বাধীনতা বলে, তবে তার চেয়ে গোঁয়ার আর কেউ হতে পারে না। হাঁটতে হাঁটতে অলোকেশ বললেন, কী বুঝলে? মেয়েটা কেমন? লুসি কাবেরি! একেবারে গেঁয়ো যাকে বলে। ইন অ্যা সেন্স, শি’জ সো ইনোসেন্ট! রিনি সেন বলল। উর্বী রিনিকে সমর্থন দেয়। বলে, আমারও ঠিক তা-ই মনে হয়। লুসির মনটা চক পাউডারের মতোন একেবারেই সাদা, তাই ওর এত কষ্ট। অলোকেশ অবশ্য এখানে নারীবাদের গন্ধ পান। মেয়েরা যদিও মেয়েদের সঙ্গে শত্রুতা বেশি করে, তারপরও জেন্ডার-বায়াস বলে একটা কথা আছে। কখনো কখনো মেয়েরা মেয়েদের হয়ে লড়ছেও। অবশ্য সেটা যদি ‘কমন ইন্টারেস্ট’ হয়, তবেই। উর্বী হালকা চালে বলল, রিনি, তুমি তো এই শহরে অনেকদিন আছো। মেলবোর্নের কোন জিনিসটা তোমার সবচে বেশি পছন্দ? রিনি একটুও না ভেবে বলল, মানুষ এখানে অনেক বেশি স্বাধীন ও সচেতন। স্বাধীন মানে নিজের বিবেকের অধীন, যথেচ্ছাচার নয়। কেউ কারো ব্যাপারে অকারণ নাক গলায় না। ওয়েদার বেশ ঠান্ডা, তাই লোকে মাথাও গরম করে কম। অলোক ও উর্বী বুঝতে পারে, পরের কথাটুকু সে জাস্ট মজা করার জন্য বলেছে। কারণ যার মাথা গরম, সে অ্যান্টার্কটিকা গিয়েও হুটহাট মেজাজ দেখাবে। কিন্তু রিনি, এই যে মানুষ কারো ব্যাপারে ইন্টারফেয়ার করে না, আমি যদি বলি মানুষ খুব স্বার্থপর, তাই! কাউকে নিয়ে ভাববার মতোন সময়ও কারো নেই! পিপল ইন মেলবোর্ন ইজ সো সেলফ-সেন্টারড। অমনি তক্কো জুড়ে দেয় উর্বী। কিন্তু রিনি বিবাদ করার মতো মেয়েই নয়। সে ‘দ্য এইজ’ পত্রিকার একজন নামি রিপোর্টার। তাকে চটানো অত সহজ নয়। মেয়েটাকে বেশ লাগে অলোকের। সেটা আবার উর্বীর ঠিক পছন্দ নয়। মেয়েরা কি তবে কিছু টের পায়! তাদের ইনটুইশন খুব পাওয়ারফুল। বিশেষ করে সেটা যদি হয় কারো খুব ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয়! রিনি বলল, তা কেন হবে উর্বী! তোমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কেউ পলিটিক্স করলে কি তোমার ভালো লাগবে? মানুষ এখানে নিজের মতো করে থাকে, হেল্প দরকার হলে তার জন্য ৯১১ আছে। চাই কি তুমি লোকাল কাউন্সিলের কাছে যেতে পারো। তারপরও বন্ধুত্ব হয়, এই যে দূরত্ব রাখার স্বাভাবিক রীতি, তারও যে কখানো কখনো ব্যত্যয় ঘটে না এমন নয়। মানুষ তো আর যন্ত্র না। ভালো করে বুঝিয়ে বলল ক্রাইম রিপোর্টার রিনি সেন। মেয়েটা সত্যি ইন্টেলিজেন্ট। কেমন সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে! এমন মেয়ের একা থাকাটা ঠিক মানায় না। ডিটেকটিভ অলোকেশ ভাবছেন। তার অনুসন্ধানী মন কিছু একটা জানতে চায়। কিন্তু উর্বীর ভয়ে মুখ ফুটে কথাটা তিনি বলতে পারেন না।

(চলবে)

লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত