ধারাবাহিক থ্রিলার

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১৩)

পর্ব ১৩
সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১৩)
সাইকোপ্যাথ

নয়.

সাতসকালে পরপর দুটো ফোন এলো অলোকেশের কাছে।

বেলফিল্ড থানার ইন্সপেক্টর গ্রোভার হুক, আর দ্বিতীয় ফোনটা করেছেন সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রিচার্ড কিম। ফোনের বক্তব্য মোটামুটি একই, এই শহরে আরো একটা লাশ পাওয়া গেছে। তাকে এক্ষুণি একবার অস্টিন হাসপাতালে যেতে হবে।

কোথায় লাশ পাওয়া গেল? অলোকেশ শুধু একবার জানতে চান।

ইয়ারা নদীর কূলে। মেলবার্ন শহরের একেবারে মধ্যিখানে। জানালেন ইন্সপেক্টর হুক।

এখানে বলে রাখা ভালো, ইয়ারা রিভার মেলবোর্ন শহরটাকে বলতে গেলে উত্তর-দক্ষিণে দুভাগ করেছে। অনেক পুরনো নদী। এই শহরের গোড়াপত্তনেরও আগে অর্থাত্ ১৮৩৫ সালে এখানে নদী ছিল। নদীর নাব্যতা এখনও আগের মতোই আছে। একইরকম ডগডগে ও সোমত্ত নদী। অস্ট্রেলিয়বাসী আমাদের মতো মোটেও বোকা নয়। আমাদের গঙ্গা নদী কুড়িতেই বুড়ি হয়ে গেলেও লন্ডনের টেমস (দৈর্ঘ্য ৩৪৬ কিমি), প্যারিসের শীন (৭৭৭ কিমি) বা মেলবোর্নের ইয়ারা (২৪২ কিমি) এখনও যুবতী।

গ্রোভার হুক আরও বললেন, লাশটা যেখানে পাওয়া গেছে তার কাছেই পোর্ট ফিলিপ আইল্যান্ড। প্রায় হাজার দুয়েক বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপে প্রচুর পর্যটক আসে। এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। তার মধ্যে ফ্ল্যাটহেড, হোয়াইটিং, ব্রিম, স্ন্যাপার, স্কুইড ও গারফিস উল্লেখযোগ্য। বিচিত্র জাতের ও আকারের হাঙরও ধরা পড়ে পোর্ট ফিলিপ আইল্যান্ড বেসিনে।

প্যাটারসন আর ইয়ারা নদীর সঙ্গমস্থলের পাথুরে চড়ায় লাশ পড়েছিল। এখনও অব্দি লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। যে-কারণে অলোকের ডাক পড়লো তা হল, এই লাশের যথারীতি নাক নেই।

উর্বীকে ফোন করলেন অলোকেশ। চেরি স্ট্রিটে পাশাপাশি লাগোয়া বাড়ি ওদের, তবে মালিকানা ভিন্ন। উর্বীর বাড়িওলার নাম ড্যারেন, আর অলোকেশের বাড়িওলা

এক সিপ্রয়েট বুড়ি, লরা টিউন। এই বুড়ির পূর্বপুরুষ সাইপ্রাসের নাগরিক।

যাবে নাকি উর্বী? অস্টিন হাসপাতাল! নতুন একটা লাশ পাওয়া গেছে। সেই লাশেরও নাক নেই।

ওয়েট, আসছি বলে ফোন রেখে দেয় উর্বী। ঝটপট তৈরি হয়ে নিয়ে অলোকের দরজায় কড়া নাড়ে।

চলো, যাওয়া যাক।

ওরা রাস্তায় নেমে দেখে একটা ঝা চকচকে অডি ব্র্যান্ড গাড়ি থেকে একজন উর্দিপরা ড্রাইভার ওদের দিকে হাত নাড়ছে। যেনো বলতে চাইছে, মঁসিয়ে, উঠে আসুন। জলদি।

উর্বী খুব অবাক হয়। মেলবোর্নে তাদের এত সম্মান! ইন্সপেক্টর গ্রোভার ওদের জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। সরকারি পেট্রল কার। কিন্তু পুলিশ-ড্রাইভার ওদের চিনল কী করে!

খুব সহজ, উর্বী। ইন্সপেক্টর গ্রোভার হুক শুধু দুটো কথা বলেছেন। এক, আমরা এশিয়ান, আর দুই নম্বর হল স্বামী-স্ত্রীর মতোন দেখতো দুজন ইয়াং চ্যাপ। ভেরি স্মার্ট অ্যান্ড গুড লুকিং। মওকা পেয়ে নিজেই নিজের অ্যাডমায়রার বনে গেলেন অলোকেশ।

কী বললে অলোক! স্বামী-স্ত্রী। হেসে ফেলল উর্বী। সেই সঙ্গে রিপোর্টার রিনি সেনকে নিয়ে ওর মনে যে সন্দেহের মেঘ জমেছিল, তাও শরতের আকাশের মতো নিমিষে ফকফকা হয়ে গেল। এইজন্যেই স্বামী-স্ত্রীতে মাঝেমাঝে ঝগড়া হওয়া ভালো। তাতে মনের মেঘ কাটে, ভালোলাগা ভালোবাসা ভালো ফোটে।

ওরা দুজন অস্টিনের মরচুয়ারিতে গিয়ে দেখে, ইন্সপেক্টর হুক অচেনা অজানা এক নাককাটা লোকের লাশ আগলে বসে আছেন। একটু পরে এলেন প্রফেসর কিম। যেন তিনি ইন্সপেক্টর হুকের সাক্ষাত লেঙ্গুড়। যেখানে হুক, সেখানেই মিস্টার কিম। লাশের প্রায় উদোম গা। শরীরের কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, শুধু নাকটা ছেঁটে দিয়েছে কেউ। ইনি কিন্তু লুসির বয়ফ্রেন্ড টনির মতো টুনটুনিটাইপ ছোটোখাটো কেউ নয়, দশাসই চেহারা এর। শ্বেতাঙ্গ, এবং সম্ভবত ব্রিটিশ অরিজিন।

কেসটা কী স্যার! বললেন অলোকেশ।

‘সেভারিং অফ নোজ’। বললেন প্রফেসর কিম। অলোক জানেন, ‘সেভার’ মানে ধারালো কিছু দিয়ে কুচুত করে একপোচে কেটে নেয়া। ভেরি শার্প এন্ড কুইক মুভমেন্ট অফ দ্য উয়েপন।

টনিও তো তাও বেঁচে ছিল। কিন্তু এই নাককাটা লাশ! লাশ তো কখনও কথা বলে না। মনে মনে বললেন অলোকেশ।

লাশের পোস্টমর্টেম করেছেন একজন সিনিয়র ডক্টর। তার নাম পুশ-কী। না না, পুশকিন নয়। তিনি অ্যালেকজান্ডারের রিলেটিভও নন।

কী বুঝছেন ডক্টর, কেসটা কী? নাক কেটেই কি একে মারা হয়েছে?

উঁহু। মোটেই তা নয়। পুশ-কী ডলপুতুলের মতো মাথা নাড়লেন। তবে যে-ই খুনটা করে থাকুক, লোকটা নিশ্চয়ই মানসিক বিকারগ্রস্ত। বললেন ডক্টর পুশ-কী।

কীভাবে বুঝলেন? চোখ নাচান ইন্সপেক্টর হুক।

কারণ, নাকটা কাটা হয়েছে জীবিত অবস্থায়, তারপর নেশাজাতীয় কিছু ওর শিরায় ইনজেক্ট করা হয়েছে, এবং সবশেষে খুনি ওর গলা টিপেছেন। সবিস্তারে বললেন ডক্টর পুশ।

দয়া করে একটু টেস্ট করে বলবেন, সেই নেশাজাতীয় বস্তুটি কী? প্রোজ্যাক নাকি? প্রফেসর কিম বললেন। অলোক আপাতত চুপ। তিনি তার মগজে তথ্য লোড করে নিচ্ছেন। পরে কগনিটিভ ডিডাকশন করবেন।

জাস্ট অ্যা মিনিট। বললেন পুশ-কী। তারপর একটা মেয়েকে ডেকে বললেন, লিজা, কাজটা করে দাও। ডু ইট ফাস্ট। এমনভাবে বললেন, বেশ মেজাজি ডাক্তার, বোঝা যায়।

নেশার রিপোর্ট যাই আসুক, এটা যে সেই সাইকোপ্যাথের কাজ, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। এই নিয়ে তিন। মনে মনে বললেন অলোকেশ। রিনির কথামতো আগেও একটা লাশ পাওয়া গেছে, যার নাক কাটা ছিল। টনির নাক কাটা গেছে, তবে তার বরাত ভালো তাই সে বেঁচে আছে।

একইরকম তিনটা কেস আবিষ্কৃত হল। অর্থাত্ ভিকটিমের নাক ছেঁটে ফেলা সেই জঘন্য খুনির ‘সিগনেচার ক্রাইম’ বলা যায়। মার্কিন সিরিয়াল কিলার টেড বান্ডির চেয়ে ব্যাটা কিছু কম জানোয়ার নয়!

এবার কিন্তু ইন্সপেক্টর হুক পত্রিকার রিপোর্টের জন্যে অপেক্ষা করেননি। তিনি স্বউদ্যোগে মিডিয়া ডাকলেন। মেলবোর্ন শহরে রেডিও-টিভি মিলে মোট পঁয়ত্রিশটি চ্যানেল আছে। কিছু ফ্রি চ্যানেল, আবার কিছু পে-অফ। অর্থাত্ টাকা দিলেই কেবল কানেকশন পাওয়া যায়।

ঘটনার পরপরই এবিসি টিভি চ্যানেল ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোকটার ছবি প্রচার করতে থাকে। ফক্সটেলও একই কাজ করে। হাই ডেফিনিশিন চ্যানেল, তাই নাক না থাকলেও লাশের ঝকঝকে ছবি দেখা যায়। ফল ফলে যায় খুব দ্রুতই। দুপুরের মধ্যে অন্তত দশজন এসে লোকটিকে আইডেন্টিফাই করে।

লাশের নাম আইজ্যাক রিও ওরফে জ্যাকি। সে ছিল অস্ট্রেলিয়ার একজন উঠতি কমেডিয়ান। যাকে বলে স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান। মঞ্চে উঠে লাইভ অডিয়েন্সের সামনে দাঁড়িয়ে নানারকম ফন্দি-ফিকির আর ভাঁড়ামি অভিনয় করে তাদের মন জয় করে। ক্লাউনও বলতে পারেন।

অবশেষে কমেডিয়ান জ্যাকির নাক কাটা গেল, এবং বিষয়টি নিয়ে তামাম ভিক্টোরিয়া স্টেটজুড়ে রীতিমতো বিক্ষোভের ঝড় বয়ে গেল। অনেকেই মেলবোর্ন পুলিশের নামে দুয়ো দিতে থাকে। পুলিশ নাকি কোনো কাজের না, বিশেষ করে চিফ কমিশনার গ্রাহাম অ্যাশটনকে পারলে সবাই ধুয়ে দেয় আর কি! ব্যাটা অকম্মার ধাড়ি!

অনেকেই ভেবেছিল এবারের মেলবোর্ন কমেডি ফেস্টিভালে রিও জ্যাকি বেস্ট অ্যাওয়ার্ড পাবে। ওর মূকাভিনয় একেবারে যাকে বলে সুপার্ব। প্রতিবছর মাসব্যাপী এই উত্সব হয়, তাতে সারা দেশ থেকে অন্তত হাজার খানেক কমেডিয়ান পারফর্ম করে। সচরাচর মার্চে এই অনুষ্ঠান হলেও এবার উন্নয়ন কাজের জন্য তিন মাস পিছিয়ে গেছে। আসছে সপ্তায় কমেডি ফেস্টিভাল বসবে মেলবোর্ন টাউন হলে। আর তখনই ঘটলো এই অঘটন। মানে হয়!

কমেডিয়ান জ্যাকির নাককাটা ও খুনের পরে মেলবোর্ন পুলিশভবনে জরুরি সভা ডাকা হল। সেখানে ভিক্টোরিয়ার স্টেট ডিপার্টমেন্টের উচ্চতর কর্মকর্তা চাম্স হুগো ছাড়াও আরো উপস্থিত আছেন চিফ কমিশনার গ্রাহাম অ্যাশটন, ডিসিপি কারনেলসহ অন্যরা। প্রফেসর কিমের সুপারিশে অলোকেশ আর উর্বীও সেখানে হাজির থাকার সুযোগ পেলেন।

কিন্তু দ্য এইজ পত্রিকার রিপোর্টার রিনি সেন আসতে পারেনি, কারণ এটা একটা গুপ্তসভা বলা যায়। সেখানে কোনো রিপোর্টারকে অ্যালাউ করা হয়নি। তাতে অবশ্য মন খারাপ করেনি রিনি। কারণ এটা একটা রীতি। মিছে নিজেকে খাটো ভাবা বা অফেন্ডেড ফিল করার কিছু নেই।

মেলবোর্ন পুলিশের একটা মজার বিষয় এই, এখানে কিন্তু পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট পদটি সহকারী কমিশনারের নিচে। বরং পুলিশ সুপারের উপরে আছেন কমান্ডার, তারপর এসিপি, ডিসিপি, জুনিয়র কমিশনার, কমিশনার, ও সবশেষে চিফ কমিশনারের পদ। ‘চিফ’ হতে হতে মাথার চুল সব পড়ে যায়, দাড়িতে পাক ধরে, আর শরীর অনেকটাই থলথলে হয়ে যায়। পলিটিক্যাল ইশারা-ইঙ্গিত বা জোর তদবির নয়, বরং যোগ্যতাই এখানে পদোন্নতির একমাত্র মাপকাঠি। উচ্চতর পদ একটা ঝামেলাজনক কাজ, তাই এই পদে আসীন হতে কেউ খুব একটা আগ্রহী হন না। এতো ক্ষমতার লোভ মেলবোর্নবাসীর নেই। তারা শান্তি চান, স্রেফ পিসফুল লাইফ।

সভার শুরুতে ভদ্র ভাষায় চিফ কমিশনার অ্যাশটনকে একহাত নেন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। চাম্স হুগো কড়া ভাষায় বললেন, বলুন মিস্টার কমিশনার, এসব হচ্ছেটা কী! একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছে, কেউ স্মৃতিশক্তি হারাচ্ছে, আর শুধু কি মার্ডার, মারার আগে খুনি তাদের নাক কেটে নিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তিটা কী দাঁড়াবে আপনি বুঝতে পারছেন? একটা নাককাটা জাতি হিসেবে আমরা সবার কাছে পরিচিতি পাবো।

ইয়েস মিস্টার হুগো, আমি জানি এটা খুব খারাপ কাজ হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন মিস্টার চামস, আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। প্রতিটি লাশের সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হচ্ছে, ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট তন্ন তন্ন করে ক্লু খুঁজছে। কিন্তু স্যার, খুনি খুব চালাক, সে কোনোরকম আলামত রাখছে না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছি, সে একটা বাজে লোক। খুব নিষ্ঠুর, আর মানসিক বিকারগ্রস্ত।

ব্যস, এটুকুই! বিস্ময় প্রকাশ করেন চামস হুগো। আপনি তো শুধু সমস্যার কথা বললেন মিস্টার কমিশনার, কিন্তু এর সমাধান কী একটু বলবেন।

অ্যাশটন সাহেব চুপ। ঘামছেন তিনি। চোখদুটো তার রেড ডালিয়ার মতোন লাল টকটকে। এতগুলো মানুষের সামনে তাকে এভাবে অপদস্থ করা হচ্ছে। চাকরি দিয়ে আর হবে কী!

তিনি বললেন, দেখুন মিস্টার হুগো, আমি কথা দিচ্ছি, দু’সপ্তার মধ্যে খুনির হদিস দিতে না পারলে আমি চাকরি ছেড়ে দেবো শুধু নয়, এযাবত যত ডলার বেতন নিয়েছি, সব আমি স্টেট ডিপার্টমেন্টকে বুঝিয়ে দেবো। নিজের কাছে না থাকলে আমি শ্বশুরবাড়ি থেকে ধার নেবো, তাও কোনো বকেয়া রাখবো না।

রিয়েলি? হুগো এমনভাবে বললেন, যেন তিনি খুব মজা পাচ্ছেন। বিশেষ করে শ্বশুরবাড়ির কথায় উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।

ইয়েস, আই প্রমিস। আমি জানি, ডেথ ইজ প্রিফারেবল টু ডিজঅনার। আমি যা বলছি ঠিক তাই করবো।

অ্যাশনের অবস্থা দেখে উর্বী ও অলোকেশের খুব মায়া হল। বয়স্ক টেকো লোকটা নেহাতই ভালোমানুষ। কিন্তু সিরিয়াল কিলার যারা, তাদের ধরাটা কি এতো সহজ হবে!

উস্কুস করেন অলোকেশ। সেটা লক্ষ্য করে চাম্স হুগো বললেন, মিস্টার রয়, এ ব্যাপারে আপনি কি কিছু বলতে চান? আমি আপনার প্রোফাইল চেক করেছি। ভেরি ইমপ্রেসিভ। তাছাড়া প্রফেসর কিম বললেন ইউ আর অ্যা জিনিয়াস। কিছু বলার থাকলে দয়া করে বলুন রয়সাহেব।

অলোকেশ বললেন, মিস্টার চামস, প্রথম কথা হল কেসটা বেশ জটিল। যে এই কাজ করেছে সে নিঃসন্দেহে একজন সাইকোপ্যাথ। টেড বান্ডি, চার্লস শোবরাজ, আন্দ্রেই চিকাটিলো বা ডক্টর ডেথ- এদের মতোই খুনি একজন ভয়ংকর লোক। বলতে গেলে সে হাওয়ায় মিশে থাকে, আবার এমনও হতে পারে, হয়তো সে কোথাও লুকিয়ে নেই। আমাদের আশেপাশে কোথাও আছে, অথচ আমরা তাকে দেখছি না।

হুম। বুঝলাম। কিন্তু মিস্টার রয়, জটিল কেস বলে কিছু নেই। পুলিশকে এই খুনিকে ধরতেই হবে। নইলে পুরো শহরজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হবে। মানুষ রাস্তায় বেরোতে ভয় পাবে, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। এটা তো আমরা হতে দিতে পারি না। ভারী গলায় হুগো বললেন।

জটিল কেন বলছি তাহলে শুনুন। আবার বললেন অলোকেশ। ইন মাই সেন্স, এই খুনির কোনো সাগরেদ বা সহযোগী নেই। ‘লোন উল্ফ’ পদ্ধতিতে সে কাজ করে যাচ্ছে। মানে নিঃসঙ্গ বা একাকী জীবনযাপন করে খুনি। এসব লোককে ঠেকানো খুব কঠিন। আর যারা একাকীত্বে ভোগে তারা সচরাচর বিকারগ্রস্তই হয়। কারণ আমরা মানুষ, গাছ বা দ্বীপ নই। একা থাকাটা আমাদের মানায় না।

অলোকের কথা শুনে প্রশংসাসূচক টেবিল চাপড়ান প্রফেসর কিম। তার দেখাদেখি পুরো হলঘর করতালিতে ফেটে পড়লো।

ইয়েস অলোকেশ, ইউ আর রাইট। একজন বললেন। খুনের পেছনে এই মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আমি জানতাম না। ইউ আর গ্রেট মিস্টার রয়। আই অ্যাডমায়ার ইউ।

চিফ কমিশনার অ্যাশটন কৃতজ্ঞ চোখে অলোককে দেখছেন। তার কারণেই মূলত কমিশনার আজ অল্পের উপর দিয়ে বেঁচে গেলেন।

স্টেট হেড চামস হুগো সতেজ গলায় বললেন, এবার বলুন মিস্টার রয়, কীভাবে আমরা সেই ভয়ংকর খুনিকে ধরতে পারি! প্লিজ সাজেস্ট!

কিছুক্ষণ ভাবলেন অলোকেশ। উর্বী মুগ্ধ চোখে তার হবুটিকে দেখছে। ভাগ্যিস আজ এখানে রিনি সেন নেই। থাকলে সে এই মুহূর্তে অলোককে হয়তো প্রোপোজ করেই বসতো। উর্বী জানে, মেয়েরা মেধাবী পুরুষদের খুব পছন্দ করে, ভালোবাসে। বোকা আর নিষ্কর্মাদের নারীহূদয়ে কোনো স্থান নেই। টাকাকড়ি হয়তো সাময়িক তৃপ্তি দেয়, কিন্তু ভালোবাসার সঙ্গে তার কোনো যোগ নেই। ওটা স্রেফ লোভ আর স্বার্থপরতা। বেশির ভাগ মেয়েই নিরেট গর্দভের টাকা চায় না, তারা চেষ্টা করে একজন প্রকৃত যোগ্য পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে। টাকা তো কুলি-চাপরাশদেরও থাকে। টাকা দিয়ে কি ভালোবাসা কেনা যায়!

বলুন মিস্টার রয়, আমরা আপনার মুখ থেকে আরো কিছু শুনতে চাই।

দেখুন হুগোসাহেব, এই মুহূর্তে আপনাকে আমি খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারছি না। কারণ এই খুনির খুনের ধরনটা বড্ড বাজে। ভিকটিমের সে শুধু নাকই কাটে না, প্রোজ্যাক (একরকম নারকোটিক্স) পুশ করে তার ব্রেনটাকেও এলোমেলো করে দেয়। টনির কথাই ধরুন, সে আগেকার কথা কিছু মনে করতে পারছে না। ফলে তার মুখ থেকে আমরা খুনির বিষয়ে কোনো তথ্য বা আইডিয়া পাইনি।

তাহলে? এবার কী উপায় হবে! বেচারা চামস হুগোকে খুব হতাশ মনে হয়। তবে কি এই পাগলা-খুনির হাত থেকে কারো নিস্তার নেই!

আছে মিস্টার হুগো। আমরা সবাই মিলে কাজ করলে নিশ্চয়ই কিছু করতে পারবো। কারণ আপনি জানেন, ‘পারফেক্ট ক্রাইম’ বলে কিছু নেই। খুনি কিছু না কিছু ক্লু ফেলে যাবেই। হয়তো আমরা এখনও সেই আলামত খুঁজে পাইনি, তবে পাবো নিশ্চয়ই।

অলোকের এই আশাবাদ প্রকাশের পর সভা আর বেশি এগোল না। সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভা শেষ করলেন চামস হুগো।

হলঘর থেকে বেরিয়ে চিফ কমিশনার গ্রাহাম অ্যাশটন বললেন, তুমি আমাকে বাঁচালে ভাই, অলোকেশ। চাকরি নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে সবার সামনে হুগো যদি আমাকে আরো কিছু বলতো! লোকটা একটা দুর্মুখ, তুমি জানো। ওর মুখে কিচ্ছু আটকায় না। হুগো খুব সত্ কিনা। সত্ লোকেরা একটু বেশি মিসবিহেভ করে থাকে। অথচ ওরা জানে না, অন্যের সঙ্গে বাজে আচরণ করাটাও একরকম অসততা। অপরকে কষ্ট দিলে স্রষ্টা ওদের ক্ষমা করবেন না।

(চলবে)

লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত