স্মরণ

রবীন্দ্রনাথ: আপন মহিমানিলয়ে

রবীন্দ্রনাথ: আপন মহিমানিলয়ে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রাচ্য জীবনাদর্শ, সাহিত্য ও দর্শনের প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ঊনিশ শতকের রোমান্টিক জীবনাদর্শের ভাবধারায় যে আনন্দবাদ, অনন্তবাদ ও বিশ্বমানবতাবাদের পরিস্ফুটন ঘটিয়েছেন তাঁর জীবনায়ন, জীবনভাবনা, সাধনা ও আরাধনার মাধ্যমে; তার মূল সূত্র নিহিত ভারতবর্ষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মবোধের গভীরেই। উপনিষদের নান্দনিকতার সঙ্গে মিল-বেন্থামের উপযোগবাদী দর্শন আর ব্যক্তিস্বাধীনতা তত্ত্বের সংমিশ্রণে তাঁর চেতনাদর্শ ও ভাবপ্রবাহ সঞ্চারিত হয়েছে রূপ থেকে রূপান্তরে, বিমূর্ত ভাবনা থেকে মূর্ত মানববিশ্বে, কল্পনা থেকে যুক্তিবাদী ব্যাখ্যানে, অসীম-সসীমের যৌথ সংবেদে। কিশোর রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে হিমালয়ে যেতেন, সেখানে পিতার সাধনা, মৌনব্রতী পর্বতের বিশালতা, গাম্ভীর্য, উপনিষদের সূক্ষ্ম তত্ত্ব তাঁকে নিমজ্জিত করে ধ্যানের এক শূন্য অস্তিত্বের গভীরে, যাকে পূর্ণ সত্যে বিকশিত করতে তাঁকে শরণাপন্ন হতে হয়েছে জীবনদেবতা, চিরসখা আর চিরনাথের ভাবলোকে ও সজ্ঞাময়ী (intuition) পুনরুত্থানে। কবি যা বলতে চান, অথচ বলতে পারছেন না, তাই যেন তাঁকে দিয়ে বলাতে চেয়েছেন সেই কৌতুকময়ী, প্রেরণাদাত্রী (the spirit of muse)

'অন্তরমাঝে বসি অহরহ

মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ,

মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ

মিশায়ে আপন সুরে।

কী বলিতে চাই সব ভুলে যাই,

তুমি যা বলাও আমি বলি তাই,

সংগীতস্রোতে কূল নাহি পাই,

কোথা ভেসে যাই দূরে।'

এ যেন কবির সেই দ্বৈতসত্তা যাকে কার্ল গুস্তাভ ইয়ুঙের ভাষায় 'অ্যানিমাস সত্তা' বলা যায়, যেখানে কবির পুরুষচিত্তে একটি আবেগময় সৃজনশীল নারীসত্তা রয়েছে, যে তাঁর শিল্পরচনার অধিষ্ঠাত্রী, যা তাঁর জৈবিক জন্মের পর সৃষ্টিশীল সত্তারূপে পুনর্জন্ম ঘটায়। রবীন্দ্রনাথের সেই দার্শনিক অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তাঁকে। প্রথম দিনের সূর্যের কাছে যেমন 'কে তুমি' -এই প্রশ্নের উত্তর পাননি, দিবসের শেষ সূর্যের কাছেও এর উত্তর থেকে যায় অব্যাখ্যাত। এক উত্তরবিহীন নিরন্তর শূন্যতায় অস্তিত্ব ও সত্তা– কোনটারই মীমাংসা ঘটে না শেষ পর্যন্ত। এ যেন জাঁ পল সার্ত্রের 'Being and nothingness' তত্ত্বেরই নব-দার্শনিক প্রতীকায়ন। কিন্তু ব্রহ্মবাদী রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই জীবনদেবতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন একক সর্বব্যাপী প্রচ্ছন্ন নৈর্ব্যক্তিক শক্তিতে–

'এই বিশ্বসত্তার পরশ,

স্থলে জলে তলে তলে এই গূঢ় প্রাণের হরষ

তুলি লব অন্তরে অন্তরে–

সর্বদেহে, রক্তস্রোতে, চোখের দৃষ্টিতে, কণ্ঠস্বরে,

জাগরণে, ধেয়ানে, তন্দ্রায়,

বিরামসমুদ্রতটে জীবনের পরমসন্ধ্যায়।'

রবীন্দ্রনাথের এই ব্রহ্মদর্শন তাঁর মননেরই অংশ, যা আরও বিশদভাবে বলতে গেলে বস্তুজীবনের বিকাশ, বৃদ্ধি ও উত্তরণের সঙ্গে সংযুক্ত। যে অর্থে বিশ্বের সকল জ্ঞানের সর্বোচ্চ অবস্থানরূপে ব্রহ্মজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করা হয়ে থাকে; রবীন্দ্রনাথের ধর্মবোধ ও অধ্যাত্মজ্ঞানের মনন যেভাবে বিকশিত ও বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে উত্তরোত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে, সে জ্ঞানটিকে 'ব্রহ্ম' বলা যায়। শত সংঘাতেও মানুষের উপর বিশ্বাস হারাননি যে কবি, তাঁকে ঈশ্বর নিরপেক্ষ বলা যায় না। কেননা তাঁর ঈশ্বরানুভূতি মহামানবের মূর্তিতেই বিরাজমান, শেষ পর্যন্ত কবি সেখানেই আশ্রয়প্রার্থী–

'জীবন আর মৃত্যু, পাওয়া আর হারানোর মাঝখানে

যেখানে আছে অক্ষুব্ধ শান্তি

সেই সৃষ্টি-হোমাগ্নিশিখার অন্তরতম

স্তিমিত নিভৃতে

দাও আমাকে আশ্রয়।

সেই অন্ধকারকে সাধনা করি

যার মধ্যে স্তব্ধ বসে আছেন

বিশ্বচিত্রের রূপকার, যিনি নামের অতীত,

প্রকাশিত যিনি আনন্দে।'

যান্ত্রিক সভ্যতার দ্রুত ক্রমবিকাশ, বিশ্বযুদ্ধের দুন্দুভিনিনাদে হিউম্যানিজম যখন আক্রান্ত, রবীন্দ্রনাথ তখন তাঁর ইতি ও শুভবুদ্ধির নিষ্কাম সাধনার উপর সংশয়ী হলেও দিনশেষে আস্থা রেখেছিলেন আনন্দের সঞ্চিত ওই সম্বলের ওপর। তাঁর বিশ্বাসই তাঁকে উচ্চারণ করিয়েছে– 'এককে জানো, সর্বব্যাপী আত্মাকে জানো, আত্মন্যের আপন আত্মাতেই। প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠানে নয়, মানবপ্রেমে, শুভকর্মে; বিষয়বুদ্ধিতে নয়, আত্মার প্রেরণায়।' রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই পরমসত্তার স্বরূপ সন্ধান করেছেন মৌন নিবিড় অনুভবের নিঃসীমতার মাঝেই; যে ছিল সীমার মাঝেও অসীম, রূপের মাঝেও অরূপ, অব্যক্ত।

ব্রহ্মজ্ঞানের যে চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে সজ্ঞার স্তরে উত্তীর্ণ হতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন আত্মনিমগ্ন ধ্যান, ঋগ্বেদের ঋষিদের মতো রবীন্দ্রনাথের জীবনেও ঘটেছে সেই Epiphany বা দৈবমুহূর্তের মতো উত্তরণ, যা তার সত্তা ও সৃষ্টির পরম শক্তিকেই চিহ্ণিত করে, গতির সঙ্গে স্থিতির গুরুত্বও সমান্তরালে ব্যাখ্যা করে। 'বাতায়নিকের পত্র' প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন– 'কিন্তু এই-যে বস্ততান্ত্রিক বিশ্ব, এই-যে শক্তির ক্ষেত্র, এর আয়তনের অঙ্কগুলো যোগ দিতে দিতে হঠাৎ এক জায়গায় দেখি তেরিজটা একটানা বেড়ে চলবার দিকেই ছুটছে না। বেড়ে চলবার তত্ত্বের মধ্যে হঠাৎ উচোট খেয়ে দেখা যায় সুষমার তত্ত্ব পথ আগলে। দেখি কেবলই গতি নয়, যতিও আছে।'

'বলাকা' কাব্যে হেনরি বার্গসঁ-এর যে গতিতত্ত্বে ব্যাখ্যা ও বিশ্ব-মানব-প্রাণে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বযুদ্ধে আক্রান্ত পৃথিবী আর অন্তে বিলীন হওয়া মানুষের মানবতা দেখে রবীন্দ্রনাথের সংবেদনশীল চিত্ত বারবার সেই প্রাচ্য দর্শনের কাছেই ফিরে এসেছে। কেবল গতির উচ্ছ্বাসে ছুটে চলাই মানবজীবনের ধর্ম নয়, চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে মানুষকে জানতে হয়– কোথায় তার থামা প্রয়োজন, কোথায় প্রয়োজন তার স্থিরতার। 'গোরা' উপন্যাসের বিশ্বমানবাত্মার সন্ধানই রবীন্দ্রনাথকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বমানব, বিশ্বকবিতে রূপান্তরিত করেছে।

রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বজনীনতা ও বিশ্বমানবতা তাঁর সজ্ঞালব্ধ সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের সমন্বয়; যা পূর্ণতাবাদী দার্শনিক হেগেলের ব্যক্ত সেই যথার্থ আত্মোপলব্ধিকেই চিহ্ণিত করে; অর্থাৎ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই ঘটাতে হয় পরম সত্য ও মঙ্গলের উপলব্ধি। রবীন্দ্রদর্শনের এই তিনের সমন্বয় যথার্থরূপে মানবিক এবং একান্তভাবেই ব্যক্তি ও সমাজসাপেক্ষ। ফলে এটি শেষ অবধি ঐক্য বা ইউনিটির আদর্শতেই প্রতিফলিত হয়। দার্শনিক কান্ট বলেছিলেন– 'স্বার্থমুক্ত তৃপ্তিই হলো সৌন্দর্য।' রবীন্দ্রনাথের নিষ্কাম প্রেম ও কর্মের মধ্য দিয়েই বিশ্বমানবিকতার উদ্বোধন ঘটে, যা ভারতীয় দার্শনিক গৌতম বুদ্ধের 'মৈত্রী'র ধারণাকেই নির্দেশ করে। এই মৈত্রী কেবল মানুষের মাঝেই নয়, সমগ্র সৃষ্টিতেই সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করে, মানুষের অন্তরের 'সুষম শক্তি'কেই অস্তিত্বশীল করে, যা তার মঙ্গলাদর্শ ও আন্তরসৌন্দর্যের যৌথ মিথস্ক্রিয়া।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত