ধারাবাহিক থ্রিলার

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১৪)

পর্ব ১৪
সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১৪)
সাইকোপ্যাথ

দশ.

ইন্সপেক্টর গ্রোভারের চেম্বার, বেলফিল্ড রোড, হাইডেলবার্গ।

প্রফেসর কিম, উর্বী ও প্রাইভেট ডিটেকটিভ অলোকেশ টেবিলের এপারে বসে আছেন। ওপাশে চেয়ারে বসে ঢুলছেন গ্রোভার হুক। তার চোখ নিমীলিত, বুকের ভেতর অবিরাম ধুকপুকানি। কারণ কমিশনার অ্যাশটন তাকে মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছেন। এর মধ্যেই বিটকেল খুনির কিছু একটা হদিস তাকে দিতেই হবে।

কিছুক্ষণ পর ইন্সপেক্টর হুক আচমকা বললেন, আমাদের একটা লাশ চাই, বুঝলেন অলোকেশ, জ্যান্ত লাশ!

হোয়াট! জ্যান্ত লাশ! তার মানে হেঁটে চলে বেড়ায় যে ডেডবডি! হুকের কথা শুনে প্রায় মূর্ছা যান প্রফেসর কিম। ব্যাটা বলেটা কী! লাশ নাকি আবার জীবন্ত হয়! চিফ কমিশনারের কড়কড়া ঝাড় খেয়ে ইন্সপেক্টর নিজেই বোধ হয় খেপাটে রোগী হয়ে গেছেন।

অলোক একদম চুপ। তিনি মিস্টার হুকের মনের অবস্থা বুঝতে পারছেন। মেলবোর্নের মতো শান্তিপূর্ণ শহরে একের পর এক অপঘাত! কারো নাক কাটা যায় তো কেউ পাগল হয়। আবার কারো নাক ও প্রাণ দুটোই খোয়া যায়। প্রাণ গেলে অবশ্য নাক থাকা না-থাকা একই কথা। লাশের নাক না থাকলেও আপত্তি নেই। কারণ নাক এমন কোনো অঙ্গ নয়, যা কিনা অন্যের দেহে প্রতিস্থাপনযোগ্য!

আচ্ছা মিস্টার হুক, এক কাজ করলে হয় না? অলোকেশ বললেন।

কী কাজ ডিটেকটিভ? রিভলবিং চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন গ্রোভার। এতদিনে তিনি বুঝে গেছেন, একমাত্র ভিনদেশি গোয়েন্দা অলোকই তাকে বাঁচাতে পারেন, আর কেউ নয়। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বস চামস হুগো তাকে বেশ মানেন ও ‘লাইক’ করেন।

আসুন, আমরা তিনটা কেসের মধ্যে একটা অ্যানালজি বা তুলনামূলক স্টাডি শুরু করি।

কীরকম শুনি? আগ্রহ নিয়ে অলোকের দিকে তাকান প্রফেসর কিম।

মিলিয়ে দেখতে হবে, কেসগুলোতে ‘কমন’ কোনো ফ্যাক্টর আছে কিনা। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, যেকোনো অপরাধের কিনারা করতে গেলে ক্রাইমের পেছনে থাকা মোটিভ ও অপরাধের ধরন বা মোডাস অপারেন্ডি খুঁজে দেখতে হয়। একটু ভেবে দেখুন, খুনি কারো নাক কাটবে কেন? কেন সে কান কাটছে না বা চোখ ওপড়াচ্ছে না!

কেন বলুন তো? নাক কাটে কেন! ইন্সপেক্টর হুক টেবিলের উপর দিয়ে অলোকের দিকে ঝুঁকে বসেন। তখন তাকে দেখতে অনেকটা উর্দিপরা গরিলার মতো মনে হয়!

কথায় বলে না, অপমানে আমার নাক কাটা গেল! শুনেছেন কখনও? অলোকেশ বললেন।

উর্বী মনে মনে হাসে। এরা কি বাংলা ব্যাকরণের বাগবিধি পড়েছে যে জানবে!

শুনুন তবে। নাক কাটা মানে কাউকে চরম অপমান করা। খুব রাগ বা ক্রোধান্বিত হলে কেউ এমনটা করতে পারে।

তার মানে? গ্রোভার হুক মিটমিট করে অলোককে দেখছেন। দিকদিশে না পেয়ে তিনি সমানে মানে মানে করে যাচ্ছেন। কারো দুধালো গরু হারালে লোকে বুঝি এমনটাই করে!

অর্থাত্ খুনি এমনি এমনি এসব করেনি। কিছু একটা মোটিভ আছে। আমাদের সেটা খুঁজে বের করতে হবে।

কফি এলো একটু পরে। আর এলো একজন, রিনি সেন। দ্য এইজ পত্রিকার রিপোর্টার। সে ক্রাইম নিয়ে কাজ করে।

রিনিকে দেখে ইন্সপেক্টর হুক খুব একটা খুশি হননি। কী জানি, এদের মধ্যে হয়তো কোনো ব্যাপারে রশি টানাটানি চলছে! নাকি হুক লোকটা নারীবিদ্বেষী!

তবে রিনি এসে পড়ায় অলোকের বেশ উপকারই হয়েছে। ওর হিসাবমতে এই শহরে প্রথম নাককাটা লাশ পাওয়া যায় মাস দুয়েক আগে ৩ এপ্রিল, ২০১৯। লোকটার নাম জানা যায়নি, তবে একজন বলেছে সে নাকি অনেক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতো। যাকে বলে ‘ইলিসিট লাভ’! অনেককে সে নাকি ঠকিয়েছেও। অর্থাত্ লোকটা পেশাদার ফ্রড ছিল।

ওর বক্তব্যের সপক্ষে রিনি একটা পেপার কাটিংও দাখিল করলো। রিপোর্ট অবশ্য তার নিজের করা নয়, তার এক সহকর্মী লিখেছিলেন। মোলবোর্ন হেরাল্ড পত্রিকায়।

গুড গুড! খুব ভালো পর্যবেক্ষণ। বাহবা দেন প্রফেসর কিম। তিনি অল্প অল্প করে কফি খান। গরম কফি তার পেটে সয় না। খেলেই নাকি বাথরুম পায়, আর তার পেটের ভিতর গুড়ুগুড় শব্দ হয়, যেনো আশ্বিনী মেঘ ডাকছে।

তারপর টনির কেসটা দেখুন। রিনি বলল। লুসি কাবেরি নিজেই জানালো যে টনি তাকে ঠকিয়েছে। বিয়ে তো করেইনি, তারপর আবার বাজে ব্যবহার করে তাকে রাস্তায় ছুড়ে দিয়েছে। হতে পারে, খুনি এই কারণে টনিকে টার্গেট করেছিল।

বুঝলাম। কিন্তু কমেডিয়ান আইজ্যাক রিও ওরফে জ্যাকি বা রিও’র কেসটা কী হল! হুড়কো দেন ইন্সপেক্টর হুক। একেই বলে প্রফেশনাল রাইভালির। সাংবাদিক আর পুলিশ কখনও ভায়রা ভাই হয় না।

এখনও ঠিক জানি না, বাট আমি লোক লাগিয়েছি রিও’র কোনো বাজে অতীত আছে কিনা আমাদের জানতে হবে। বেশ প্রত্যয়ী ঢঙে রিনি সেন বলল। মেয়েটার সাহস আছে বলতে হবে, নইলে ভারতীয় অরিজিন হয়েও সে এখানে বেশ দাপটের সঙ্গে করে খাচ্ছে!

অলোক ভেবে দেখলেন রিনির কথাটা একেবারে ফেলনা নয়। এটা একটা অ্যাঙ্গেল হতে পারে। কী জানি, খুনি হয়তো খেপাটে, তবে লোক মন্দ নয়। আবার এমনও হতে পারে, যাদের নাক কাটা গেছে বা খুন হয়েছে, এরা প্রত্যেকই হয়তো না জেনেশুনে খুনির মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে!

অলোকের কথা শুনে নিমরাজিভাবে মাথা নাড়লেন প্রফেসর কিম। হুকও।

কিন্তু মিস্টার রয়, রিও তো স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান, সে শহরে ঘুরে ঘুরে কমিকস দেখায়। তার আবার কীসের শত্রুতা! হুক একটা বোকার মতো কথা বললেন। যেনো কমেডিয়ানদের জীবনে প্রেম আসে না। কোনো মেয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হতে পারবে না!

বেবুনিয়াদ কথার জবাব দিতে নেই, অলোকেশ তাই চুপ করে রইলেন। রিনিকে বললেন তুমি বরং এক কাজ করো রিপোর্টার। এই রিও’র ব্যাপারে আমাকে কিছু তথ্য দাও। দেখি, তোমার যুক্তিটা কাজে খাটে কিনা।

সাগ্রহে রাজি হয় রিনি সেন। অলোকের জন্যে কিছু করতে পারলে সে বরং খুশিই হয়। এক্ষেত্রে তার উত্সাহের যেনো কমতি নেই। আর এটাই ঠিক পছন্দ নয় উর্বীর। বেচারি অস্ট্রেলিয়া বেড়াতে এসে না আবার অলোককে হারায়! হাতের মোয়া চিলে ঠুকরে খায়!

অলোকের কাছ থেকে অ্যাসাইনমেন্ট পেয়ে কাজে নেমে পড়লো রিনি সেন। ইন্সপেক্টর হুকও তার নিজের মতো করে মেলবোর্নের উপকণ্ঠে একের পর এক ঘটে যাওয়া নাককাটা কেসের তদন্ত করছেন। প্রফেসর রিচার্ড কিম ক্রিমিনোলজি বিষয়ক সেমিনার নিয়ে ব্যস্ত। তাকে শুধু টনি বা কমেডিয়ান রিওকে নিয়ে ভাবলে হবে না। যা গেছে সে তো গেছেই। আর যাতে এমন কা্ল না ঘটে তাই নিয়ে সবাই খুব ভাবছেন। চিফ কমিশনার বা পুলিশপ্রধান হিসেবে গ্রাহাম অ্যাশটন তোপের মুখে আছেন। তার এখন ত্রিশঙ্কু অবস্থা। নাককাটা কেসের রহস্য উদ্ধার করো, নইলে বদনাম নিয়ে সটকে পড়ো।

এর মাঝেই অলোক আরেকটা কাজ সেরে নিলেন। তিনি বললেন, মিস্টার হুক, মে উই ডু সামথিং?

কী করতে চান ডিটেকটিভ?

না মানে আমরা নাককাটার সর্বশেষ শিকার কমেডিয়ান রিও’র বাসাটা একবার দেখতে চাই। যেহেতু সে আর বেঁচে নেই, তাই তার ঘর তল্লাশি করতে নিশ্চয়ই সার্চ ওয়ারেন্ট লাগবে না!

মুচকি হাসলেন হুক। তিনি বুঝতে পারছেন অলোক আসলে মেলবোর্নের আইনি বাড়াবাড়ির বিষয়ে ইংগিত করছেন। বললেন, চলুন তবে যাওয়া যাক। রিও’র বাসা খুব দূরে নয়। সিবিডি থেকে মিনিট দশেকের পথ। কলিন্স রোড।

খুশি হন অলোকেশ। তিনি ভেবেছিলেন যে, হুক সহজে রাজি হবেন না। কারণ পুলিশ কোনো দেশেই প্রাইভেট গোয়েন্দাদের ঠিক মানতে চায় না। ক্লাসওয়াইজ ইনফিরিয়র মনে করে। অবশ্য ফেলুদার কথা আলাদা। সত্যজিত্ মানেই স্পেশাল কিছু। তাই তার ফেলুদাও বিগবস। সঙ্গে জটায়ুর মজাদার বকবকম ফেলুদার কাহিনিকে আরো চিত্তাকর্ষক করে তোলে।

হুকের গাড়ি করেই কলিন্স রোডে যান অলোকেশ। ঘরটা তালাবদ্ধ পড়ে আছে। রিও’র নাককাটা কেসের তদন্ত পুরো না হওয়া অব্দি এই ঘর এভাবেই থাকবে। লোকাল কাউন্সিলকে বুঝিয়ে দেয়া হবে না।

ইন্সপেক্টর হুক ফোনে কাকে যেন ডাকলেন। অমনি দারোয়ান গোছের ফ্রেঞ্চকাট দাড়িঅলা একজন এসে ঘরের তালা খুলে দেয়। হুক নিজেই বাতির সুইচ অন করলেন। তিন রুমের অ্যাপার্টমেন্ট। ধেড়ে ইঁদুরের মতো খুঁজতে লেগে যান অলোকেশ। কী খুঁজছেন তিনি! রিও’র নাক? নাক কি আর আছে! লাশ পাওয়া গেছে নদীর ধারে! নাক নিশ্চয়ই পানির তোড়ে ভেসে গেছে। ইন্সপেক্টর হুক সোফায় বসে পা নাচাচ্ছেন। তার খোঁজাখুঁজিতে মন নেই। তিনি বড় সৌখিন পুলিশ অফিসার।

প্রায় আধা ঘণ্টা খুঁজে একখানা ডায়েরি পেলেন অলোকেশ। হিজিবিজি কী সব লেখা। আবার কিছু ছবি আঁঁকার চেষ্টা। স্কেচ আর কি! তিনি জানেন, মানুষ অনেক সময় বিপদের আঁচ পেলে বা জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেললে ডায়েরি লেখার চেষ্টা করে। যেসব কথা মানুষ অন্যকে শেয়ার করতে পারে না, তাই সে মূলত তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখে রাখে। ব্যস্ত ও বন্ধুবত্সল মানুষ ডায়েরি লেখে কম। প্রথমত তার সময় নেই, তাছাড়া বন্ধুরাই তার মনের খবর জেনে নেয় ও তাকে মাতিয়ে রাখে।

ডায়েরি নিয়ে বেরিয়ে এলেন অলোকেশ। মিস্টার হুক, আমি রিও’র ডায়েরিটা একটু পড়ে দেখতে চাই। দিন কয়েক এটা আমার কাছে থাক!

সানন্দে রাজি হলেন গ্রোভার হুক। তিনি শুধু এই কেসের সফল রহস্যোদ্ধার চান। ডায়েরিতে তার কী দরকার!

বিকেলের একটু পরে। উর্বীর কিছু পোশাকাদি কিনতে হবে। বলল, অলোক, যাবে নাকি?

কোথায়?

কফি খেতে? উর্বী বলল। সে জানে, কী কথা বললে অলোকেশ কখনোই না-সূচক মাথা নাড়বে না। সানন্দে রাজি হবে।

কফি! সে তো ঘরেই বানানো যায়। নিমরাজি হন অলোকেশ।

সে তো নিত্যই খাও। চলো, আজ একটা বিশেষ জায়গায় যাই। সাগ্রহে বলল উর্বী। যেমন করে হোক, অলোককে সে রাজি করিয়েই তবে ছাড়বে। সে কী ভেবছে! উর্বী সবসময় লেজের মতো তার সঙ্গে সঙ্গে টিং টিং করে ঘুরবে! উর্বীর কথা সে একটাও শুনবে না! বিয়ের আগেই একরকমটা হলে পরে না জানি আরো কী হয়! অলোকেশ তাকে লাট্টু বানিয়ে ছাড়বে!

বাইরে ঝকঝকে রোদ। এর নাম ‘মেলবোর্ন স্পাইসি সান’। সিডনিতেও সূর্য নাকি খুব উদারভাবে রশ্মি ছড়ায়। ওদের ইচ্ছে ছিল সিডনি বা ক্যানবেরাতেও একপাক বেড়িয়ে আসবে। কিন্তু এই নাককাটার কেসটা সবাইকে খুব নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছে। প্রফেসর কিমের অনুরোধ, যেমন করে হোক ভায়া, কেসটা একটু উদ্ধার করে দাও। বুঝতেই পারছো মিস্টার রয়, কমিশনার অ্যাশটন তোমার উপরে খুব আস্থা রেখে বসে আছেন। তাকে নিরাশ করাটা কি ঠিক হবে!

চেরি স্ট্রিট থেকে একটুখানি এগিয়ে ওরা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করে। হঠাত্ দেখতে পায় সেই পিটার, নাককাটা টনির বন্ধু। একটা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মেয়েকে বগলদাবা করে এদিকেই আসছে।

অলোকেশ সোত্সাহে বললেন, হাই পিটার, হাউ আর ইউ?

কিন্তু পিটার কোনো জবাব দিলো না। তবে কি সে শুনতে পায়নি! এবার উর্বী বলল, হাই পিটার, হাউ’জ ইওর ডেজ?

নো জবাব।

ব্যাটা দেখেশুনে ওদের এড়িয়ে গেল। কেন বলো তো অলোক! সামথিং ইজ ভেরি ফিশি, নয় কি! উর্বী বলল।

মে বি। তবে কেউ যদি তোমার কথার জবাব দিতে না চায়, তুমি তাকে জোর করতে পারো না। চলো, আমরা যাই।

ট্রেনে ছেড়ে গেলো সেন্ট্রাল বিজনেস সেন্টার অর্থাত্ মেলবোর্ন সিবিডি’র উদ্দেশ্যে। মেলবোর্ন মানেই বিজনেস সেন্টার। আমাদের যেমন জিপিও, লন্ডনে ওয়েস্টমিন্স্টার, ওদের তেমনি সিবিডি। ফ্লিন্ডার্স স্ট্রিটের দুই ধারে বেশ কিছু বিপণি-বিতান রয়েছে। আরো আছে সিটি টাউন হল, ফেডারেশন স্কয়ার, ইয়ারা নদী, ইউরেকা সেন্টার ইত্যাদি।

ওরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে অ্যালটোনা নর্থ রোড চলে গেলো। নরম মিষ্টি রোদ, শীতের কামড়ে এখন বিষ কম। কনকনে ঠান্ডা যেনো এখন জলঢোঁড়া। অ্যালটোনার দুপাশে দুটো ক্যাফে। একটার নাম ক্যাফে কিনফোক, অন্যটা থার্ডওয়েভ ক্যাফে এন্ড বিস্ট্রো।

বলো অলোক, কোন্টায় ঢুকবে? কিনফোক, নাকি থার্ডওয়েভ!

অলোকেশ চুপ। তিনি রয়্যাল এগজিবিশন সেন্টারের চাকচিক্য দেখছেন। উর্বী বলল, দাঁড়াও টস করি।

উর্বীর এ এক মজার খেলা। কোনো বিষয়ে মন ঠিক করতে না পারলেই সে মনে মনে টস করে। নো কয়েন, নাথিং। কেমনে সে টস করে সে-ই জানে!

কিছুক্ষণ পর উর্বী বলল, হুঁ! চলো, থার্ডওয়েভ যাই। ওখানে বসার চেয়ারগুলো ভালো, গদিআঁঁটা। ভিতরে না ঢুকেই বলে দেয় সে।

অলোকেশ হাসলেন। উর্বীর এই ছেলেমানুষি তার ভালো লাগে। মেয়েটা খুব প্যাশনেট আর মায়বী। মোটেও চালিয়াত বা খ্যারখেরে বাস্তববাদী নয়। যেসব মেয়েরা অতিচালাক টাইপ, ছেলেরা তাদের দেখতে পারে না। বুদ্ধিমতী হও নো প্রবেলম, তবে চালাক নয়। কাকের মতো।

থার্ডওয়েভে ঢুকেই ওরা জব্বর এক ধাক্কা খেলো। উর্বী চোখ নাচিয়ে বলল, দেখো অলোকেশ, ওই কে!

কে?

আরে তাকাও না। উর্বী বলল। ততক্ষণে দুপাটি দাঁত কেলিয়ে বাঞ্ছারামের মতোন হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো একটি মেয়ে। কে সে! লুসি কাবেরি। লুসি কি তবে মিথ্যে বলল! সে তো মেডিসিন স্পেশালিস্ট কেইন স্টুয়ার্টের চেম্বারে কাজ করে। লুসি তাহলে এখানে কী করে এলো!

কেনো, পার্ট-টাইম জব হতে পারে না বুঝি! যুক্তি দেন অলোকেশ।

তা অবশ্য পারে। ওরা দুজন একটা টেবিল দখল করে বসলো। লুসি এসে বলল, গুড আফটারনুন স্যার! বলুন কী খাবেন? কফি ওনলি, অর সাম স্ন্যাকস?

অন্যমনস্কভাবে মেনুতে চোখ বোলান অলোকেশ। তিনি আসলে লুসিকে পরখ করে দেখছেন। মেয়েটা নেহাতই সহজ সরল, নাকি ...! ভুলে গেলে চলবে না, লুসির সঙ্গে নাককাটা টনির একসময় বিশেষ সম্বন্ধ ছিল।

পুলিপিঠার মতোন দেখতে একরকম আইটেম আছে। বাইরে ময়দার খোলস, ভিতরে মাংসের কিমা। খাবে নাকি? উর্বী বলল।

নো নো, হালকা কিছু চাই। তিনি বললেন।

লুসি পরে নিজেই চয়েস করে কিছু ‘পাই’ আনলো। বলল, চেখে দেখুন, ভালো লাগবে। ভাববেন না, একদম লো-ক্যালরি ফুড। গ্লুটেন ফ্রি। যাদের আটা, ময়দা বা মল্টে অ্যালার্জি, তারা গ্লুটেনসমৃদ্ধ খাবার খেতে পারে না। খেলেই চুলকোয়, যেনো বিষবিছুটি লেগেছে।

উর্বী একফাঁকে বলল, টনিকে দেখতে গেছিলে, লুসি? সে অস্টিন হাসপাতালে আছে!

কেন বলো তো! সে আমার কে? ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল লুসি কাবেরি। ওর মতো ফেরেব্বাজকে আমার দরকার নেই। সে আমার অতীত। বলতে পারো নাইটমেয়ার। নিছক দুঃস্বপ্ন। একাই আমি ভালো আছি উর্বী।

এই নিয়ে আর কথা বাড়ায় না উর্বী। বেশ বোঝা যায়, টনিকে লুসি হয়তো ভালোবেসেছিল। কিন্তু মেছো ছুঁচোটা তার মর্যাদা রাখতে পারলো না। টনি শুধু ইয়ারা নদীর মাছ চিনেছে, কিন্তু লুসির নিটোল নিষ্পাপ মনটাকে সে ছুঁতে পারেনি। লুসিকে উর্বী স্ন্যাক্স অফার করলো, কিন্তু সে খেলো না। বলল, আই’ম অন ডিউটি নাউ। এখন আমি কিচ্ছু খাবো না। তাহলে নিয়মের ব্যত্যয় হবে। মালিক কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবেন।

কিন্তু তুমি না ডক্টর কেইন স্টু’র ওখানে কাজ করো। আবার এখানে কেন?

সপ্তায় দুদিন ছুটি পাই উর্বী। মিছে বসে না থেকে কাজ করি। তাছাড়া এতখানি অবকাশ আমার দরকার নেই। খারাপ লাগে। অলস বসে থাকলেই পুরোনো সব স্মৃতিরা এসে ভর করে। মায়ের কথা মনে পড়ে। বাবাকে ভুলতে পারি না। ওহ্ আমার শৈশব! কত সুন্দর ছিল সময়টা! এখন আমি একা, বড্ড একা! লুসি বলল। বলতে বলতে ওর চোখের কোণ ভিজে যায়, চিকচিক করে জলকণা। বৃষ্টির ঘ্রাণ টের পায় উর্বী।

উর্বী বুঝলো, অকারণ একাকী অবকাশ যাপনও ভালো নয়। অবসরেও সঙ্গী চাই। নইলে মনখারাপ হয়। তাই কাজ চাই, কাজ। স্মৃতিকাতর না হতে, নিজেকে দুঃখ থেকে দূরে রাখতে। আহা জীবন! আহারে জীবন!

(চলবে)

লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত