গল্প

কালা মিয়ার অন্তর্ধান

কালা মিয়ার অন্তর্ধান
অলঙ্করণ: আল নোমান

ঘড়ির কাটায় সকাল নয়টা। বই গুছিয়ে লুঙ্গি আর জামা পরে বোর্ড স্কুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সওদাগর বাড়ির রাস্তা ধরে হাঁটছি। একটু দূরে মন্তাজ মিয়ার বাড়ি। রাস্তা ঘেঁষে বাড়ির অবস্হান। বাড়ির মুখটি পেরুতে কান্নার রোল থেমে থেমে কানে আসছে। এইদিকে স্কুল বসার সময় হয়ে যাচ্ছে। দপ্তরী আলাউদ্দিন চাচার ঘন্টা এই বুঝি পড়ল! না, কৌতুহলি মন মানল না। বাড়ির ভেতরে উঁকি মারতে দেখি বারান্দায় মানুষের জটলা। সামনে এগুতে দেখি, চটের বস্তা গায়ে একজন শুয়ে আছে। ঘরের ভেতর থেকে থেমে থেমে কান্নার রোল আসছে।

জোৎস্নার কান্নার আওয়াজে বুঝলাম, তার পিতা হয়ত পৃথিবীতে নেই। কিন্তু কেন, কীভাবে মারা গেলেন, তা পুরোপুরি বুঝাও যাচ্ছে না। একজন পাশ থেকে বলল, গভীর রাতে দক্ষিণ চরদরবেশ থেকে এসেছিল। মাঘের শীতের রাত ছিল বলে গায়ে চটের বস্তা জড়িয়ে এক দুবাই প্রবাসীর বাড়িতে গিয়েছিল কিছু সাহায্যের আশায়। অনেক রাতে ফিরেছিল। এর মধ্যেই মেয়েটি বিলাপ করে বলছে, বাপে আমায় বলল, পাতিলে পান্তা ভাত থাকলে কটা দে। না থাকলে তোর চাচীর কাছে দেখ, ভাত আছে কিনা। লবণ মেখে খেয়ে চরদরবেশ যাব। আমার মামাত ভাই দুবাই থেকে এসেছে। তার সাথে দেখা করব, যদি কিছু টাকা, কাপড় পাই। আগেরবার আমাকে ৫০ টাকার নতুন নোট আর একখান জামার কাপড় দিয়েছিল। লবণ- মরিচ মেখে কটা পান্তা ভাত খেয়ে বাপজান চলে গেছে। অনেক রাত অপেক্ষা করে দুইটা আটারুটি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। মা আমাকে বলল, আমার শরীরটা ভালা না, তোর বাবা এলে দুয়ার খুলে দিস।

কালা মিয়া কত রাতে ফিরেছিল কেউ জানে না। দুবাই প্রবাসী তাকে টাকা কিংবা জামা দিয়েছিল কিনা কেউ বলতে পারল না। মেয়েটির বিলাপের মাঝে বলছে, আমি কয়বার ডাক পেয়েছি, জোৎস্না উঠ,দুয়ার খুলে দে। কয়েক বার দরজায় আওয়াজও হয়েছিল। শীতের রাত। গভীর ঘুমে আছন্ন ছিল বলে বাপের ডাকে সাড়া দিতে পারে নাই। অগত্যা হয়ত কালা মিয়া এই কনকন শীতের মধ্যে বস্তা গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়ে।

এরমধ্যে সমাজ দরদী এক দাড়িগোঁফহীন লোক চিৎকার করে বলল, হয়েছে, অনেক হয়েছে। এত কেঁদে লাভ নেই। বুড়া বাপকে দরজা খুলে দিতে পারিস নি।এই কনকনে শীতে লোকটা মারাই গেল। দেখ, ঘরে টাকা পয়সা কিছু আছে কিনা, না হয় সমাজ ফান্ড থেকে টাকা দিয়ে মুর্দার কাপড় কিনতে হবে। মেয়েটির বিলাপ করে বলল, গত কয়দিন বাপ চাল আটা কিছুই আনতে পারেন নাই।পাশের বাড়ির আছিয়ার মা থেকে আধা সের আটা ধার এনেছে মা।বাবার পেটে ভাত জুটে নি তিন দিন ধরে। টাকা পয়সা বাবা কিছুই রেখে যাননি।

পাশের ঘরের সুলতান মিয়া বলল, তোর মায়ের নাকফুল আছে, সেটা তো আর পরতে পারবে না। ওটা বিক্রয় করেও তো মুর্দার কাপড় কেনা যায়। পাশ থেকে আবদুর রব বলল, চলেন বাজারে যাই, টাকা উঠিয়ে কবরের ব্যবস্হা করি। এই বলে কয়েকজন বেরিয়ে পড়ল কারামতিয়া বাজারের উদ্দেশ্যে।

ইতিমধ্যে দপ্তরীর চূড়ান্ত ঘন্টা ধ্বনি দূর থেকে ভেসে আসল। স্কুল বসে গেছে। আমার স্কুলে আর যাওয়া হলো না। কালা মিযার ধোয়ানোর কাজ শুরু হয়েছে। সাদা কাপড়ের ঘেরাও থেকে এসে বলি মিয়া বলল, দেখেন, জামার ভেতর দুই টাকার নোট আর অর্ধেক পাউরুটি। একজন আহাজারি করে বলল, আহারে! যেখানে টাকার জন্য গিয়েছিল, টাকা পায় নাই।উপবাস থেকে হেটে হেটে আট মাইল পথ পেরিয়ে এই ঠান্ডার মধ্যে বাড়ি এসেছে। শীতে আর পেটের ক্ষুধায় লোকটা মারা গেল।

কালা মিয়ার লাশ দাফন করে ফেরার পথে বারেক মুন্সি ছোনা মিয়াকে দাড় করিয়ে বলল, কাল রাতে আট নম্বর স্লুইসে আমার সাথে হয়েছিল। যে প্রবাসীর কাছে গিয়েছিল, অনেক রাত পর্যন্ত বাড়ির পথে অপেক্ষা করে তার দেখা না পেয়ে ফিরে আসে। নবি উল্লাহর দোকানে আমি এক কাপ চা আর পাউরুটি খেতে দিলাম। চা খেল আর পাউরুটি পকেটে ঘুছিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। কাল আবার আসবে, তাও বলে গেল।

একবার শীতে আলপথ দিয়ে বাজারে যাচ্ছি। মুখভর্তি কালো দাড়িওয়ালা ডান হাত বাড়িয়ে বলল, থাকলে দুই টাকা দাও। দুভাগ্যক্রমে সেদিন আমার পকেট ছিল ফাঁকা।বললাম, আজ নয়, অন্য সময় নিও বলে বিদায়নিলাম।কালা মিয়ার হাসিটুকু ছিল সম্বল। কারও সাথে কোন কালে কোন বিষয়ে উচ্চবাক্য হয়েছে, এমন নজীর নেই।উল্টো মানুষের উপহাস, পাওনাদারের বকুনি, এমনি একশ পাথর ওজন গালি নীরবে সহ্য করে হাসি দিয়ে বিদায় হয়েছেন।

প্রকৃতি বদলে নিজকে আর মানুষকে। দিনে দিনে দক্ষিণের চর মানুষের আনাগোনায় ভরপুর হলো। ছোট ফেনি নদী তার গতিপথ হারাল। দাস পাড়ায় আর মধ্য রাতে শিয়ালের ডাক শুনা বন্ধ হলো।ডাহুকের ডাক বন থেকে আর ভেসে আসে না। বিজন রাতে নুরু মিয়ার বাঁশি আর সুর তুলে না।

ছাব্বিশ মাঘের শীত পেরিয়ে আজ শ্রাবণের কালশে মেঘের খানিক আলোতে বিকেল বেলা দক্ষিণ দিকে রওয়ানা হলাম। হালের সওদাগর বাড়ির দ্বিতল দালান আর পাকা রাস্তা পার হচ্ছি।মন্তাজ মিয়ার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছি। বাড়ির ঢোকার রাস্তায় চোখ পড়ল। পা দুটো হঠাৎ স্হির। চোখ মনে হলো কালা মিয়ার সেই জীর্ণ বিছালির ঘর খুঁজতে চাইল। এমন সময় কাচা পাকা দাড়িওয়ালা এক লোক বের হচ্ছে। জিজ্ঞাসমাত্র তিনি জানালেন, বার বছর আগে তারা ভিটেমাটি বিক্রি করে চলে গেছে দক্ষিণের চরে। কালা মিয়ার সেই বাড়িতে এখন সুরম্য ইটের দালান। কিছুটা ফিকে লাল চোখ নিয়ে বোর্ড স্কুলের দিকে যাত্রা করলাম ।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত