গৌতম চৌধুরীর পরিযায়ী কবিতাগুচ্ছ

গৌতম চৌধুরীর পরিযায়ী কবিতাগুচ্ছ
গৌতম চৌধুরীর পরিযায়ী কবিতাগুচ্ছ

১.

রোজ যে পা-চালিয়েই এগনো যাবে,এমন কোনও মাথার দিব্যি নেই। পথ কি সব জায়গায় একরকম!ভাঙাচোরা খানাখন্দ চড়াই-উতরাই,সামনে কখন যে কী পড়বে,আন্দাজ লাগানোই মুশকিল। কোথাও একটু নিচু হয়ে,কোথাও লাফিয়ে, কোথাও আবার হামাগুড়ি দিয়ে– চলার নানান ভঙ্গি রপ্ত ক’রে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এমন কি বুকে হেঁটেও পেরতে হতে পারে কোথাও। আর,যেখানে কোনও রাস্তাই নেই? এই প্রশ্ন ট্যাঁকে গুঁজেই তো পথে নামা। যে চলে,সে কি শুধু হাঁটে? সে পথও বানায়।

২৯-০৫-২০

২.

বট অশথ মহানিম– সব কবেই কেটে ফর্সা ক’রে দেওয়া হয়েছে। যদি মনে মনে সাধও জাগে,মানুষ আর ধ্যানে বসবে কোথায়!অবশ্য ধ্যানে বসলেই যে সিদ্ধিলাভ হবে,এমন কোনও মাথার দিব্যি নেই। তার চেয়ে,সিদ্ধি ভাঙ খেয়ে দিব্যি ফুর্তিতে কাটিয়ে দেওয়া যায় জীবন। এই তুরীয় আনন্দের স্বাদ কজন পায়? কিন্তু ঘোর কেটে যাওয়ার পর যে মহা ফ্যাসাদ!ঘোর অন্ধকার আবর্তে কে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। উপড়ে নিচ্ছে জিভ। খুবলে নিচ্ছে চোখ। শূন্যে তুলে ঘোরাতে ঘোরাতে কে যেন ছুঁড়ে দিল রসাতলে। তখন আবার ছোটো শরবতের খোঁজে। এমনই কোনও না কোনও লিপ্ততা নিয়ে মানুষ কাটিয়ে দিতে চেয়েছে জীবন। চলাও একটা লিপ্ততা। একটা ধ্যান। কিন্তু তা সিদ্ধি বা ভাঙ– কিছুই চায় না। শুধু চলতেই চায়।

২৯-০৫-২০

৩.

রাত্রির আকাশে অনেক সৌন্দর্য। রাত্রির আকাশে অনেক ভয়। সুন্দরের ভেতরে কি সবসময়ই খানিকটা ভয় মিশে থাকে না? প্রসন্নতার আড়ালে যেন ধকধক করছে সেই ভয়াল চক্ষু যার জ্বলন্ত জিভ এসে লেহন ক’রে দিয়ে যেতে পারে যেকোনও মুগ্ধ দৃষ্টি। লুব্ধতার বুকে হাসতে হাসতে বসিয়ে দিতে পারে অব্যর্থ ট্যাটা। দিনের আকাশে এত রহস্য নেই,যেমন দিগন্ত অবধি পরিব্যপ্ত হয়ে থাকে এই নৈশ আসমান। তারাদের ফোঁটা ফোঁটা আলো আর শূন্যের ঝিরি ঝিরি অন্ধকার মিলে সে– আকাশ থেকে যে– অপ্রাকৃত আভা ঠিকরে পড়ে,চোখ তো তার দিকে যাবেই। সারা শরীরই চাইবে স্নান করতে। সমস্ত দিনের চলা যেন এই একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পেল। অমনি থমথম ক’রে বেজে উঠবে ভয়। মহাশূন্যের নির্জনতার মধ্যে যেন একটা মুহূর্ত, গগনবিদারী কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে হাজির।

৩০-০৫-২০

৪.

ছায়া সরে গেলে,প্রাণপণ ছুট লাগালেও তাকে আর ধরা যায় না। কিন্তু এত ছুটোছুটির দরকারটা যে কী? কী এমন মায়া রয়েছে ওই ছায়ায়!সে কি শুধু ঠাঠা রোদ্দুর থেকে একটা পরিত্রাণ,একটা চলমান আচ্ছাদন? না কি বৃষ্টির আভার মতো কোনও কোমল অশরীরী স্পর্শ? একটা শুভকামনা? চলতে যদি হয়,যে কোনও পরিস্থিতির জন্যই তৈরি থাকা ভালো। দেখা যাবে,রোদ্দুরেরও একটা নেশা আছে। আছে লবণগন্ধের আদিমতা। তার তীব্রতা তার স্বভাব মাত্র। শুভাশুভের ফলকের বাইরে একটা নিরুপায়তা। চলাও কি তাই নয়!

০১-০৬-২০

৫.

লুকোচুরি খেলার জন্যও একটা বোঝাপড়া দরকার। অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার জন্য তো কেউ লুকায় না,লুকায় খুঁজে পাওয়া যাবে বলেই। তাই খুঁজে না-পাওয়া আর পাওয়া, দুটোতেই সমান মজা। কিন্তু যদি কেউ আসলেই লুকিয়ে পড়ে,লুকিয়ে থাকতে থাকতে হারিয়ে যায়– তখনও কি তাকে খুঁজে যেতে হবে? খেলায় থাকতে চাইলে,খোঁজা তো আর থামানো যায় না। সেইজন্যই তো চলা। দিনের পর দিন,মাসের পর মাস,খুঁজে চলা। লুকিয়ে– থাকা মানুষটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার দিশাহারা সাথী। খুঁজতে খুঁজতে পথ কেবলই লম্বা হচ্ছে। খেলা ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্ত অবধি।

০১-০৬-২০

লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত