অন্তরঙ্গ আলোকে চন্দন আনোয়ার

অন্তরঙ্গ আলোকে চন্দন আনোয়ার
চন্দন আনোয়ার ও বিভূতিভূষণ মণ্ডল।

গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সম্পাদক চন্দন আনোয়ার। সময়ের অন্যতম এই কথা সাহিত্যিকের জীবন ও কর্মের উপর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন বিভূতিভূষণ মণ্ডল। দৈনিক ইত্তেফাকের পাঠকদের জন্য পুরো সাক্ষাৎকারটি ‍তুলে দেওয়া হলো।

বিভূতিভূষণ মণ্ডল : চন্দন আনোয়ার, আপনাকে স্বাগত এবং শুভেচ্ছা। বিশ্বব্যাপী এই করোনাকালীন দুর্যোগের মধ্যে আপনি কেমন আছেন? এখন কী পড়ছেন এবং কী লিখছেন?

চন্দন আনোয়ার : আপনাকেও স্বাগতম এবং শুভেচ্ছা। এই মুহূর্তটি পর্যন্ত সুস্থ আছি। এমন এক সর্বগ্রাসী জীবাণুর ফাঁদে মানুষের পৃথিবী পড়েছে, বলা সত্যিই কঠিন, কতোক্ষণ সুস্থ আছি। যুদ্ধের মাঠে, যুদ্ধ আবার পরাক্রমালী অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে, যার বিরুদ্ধে লড়াই করার কোনো অস্ত্র-ই নেই মানুষের হাতে। এবং এই অসম যুদ্ধ কতোদিন স্থায়ী হবে তারও কোনো সদুত্তর নেই। এতো মানুষের মৃত্যু এবং প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল দেখে নিজের প্রতিদিনের বেঁচে থাকাটাও উপভোগ করা যায় না। তারপরেও যতোক্ষণ শ্বাস আছে, বেঁচে থাকার শর্তাবলী অবশ্যই পূরণ করে যেতে হবে। কিন্তু এই বেঁচে থাকা এক প্রকার মৃত্যুর ছায়ার উপরে বিছানা পেতে শুয়ে থাকা। যা হোক, লেখা ও পড়ার জন্য শরীর মন সময় চিন্তার যে নির্মল স্বাধীনতা প্রয়োজন, তা স্বভাবতই এই পেনিক ,বাস্তবতায় নেই। লেখা এবং পড়া দুটোকেই যেহেতু বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত হিসেবে গ্রহণ করেছি, তাই পড়ছি এবং লিখছি তো বটেই। কিন্তু সবকিছুই বাতাসে কেঁপে ওঠা বিদ্যুতের তারের মতো কেঁপে কেঁপে উঠছে। পৃথিবীর সব মানুষ একসঙ্গে ইতোপূর্বে কোনো শত্রুর কাছে এতোটা অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে বলে মনে হয় না। আপাত একটি উপন্যাস লেখার মধ্যেই আছি। ফাঁকে অবশ্য গল্পও লিখছি।

বি.ভূ.ম: আমরা একটু গোড়া থেকেই শুরু করতে চাই। আপনার শিক্ষাজীবন কোথায় কোথায় কেটেছে? আপনার শিক্ষাজীবনের সাথে বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীদের মৌলিক কী কী পার্থক্য বা পরিবর্তন আপনি লক্ষ্য করেন?

চ. আ : আমার শিক্ষাজীবন বৈচিত্র্যে ভরা। একেবারে হাতেখড়ি আমারই ছোট চাচা আবুল কাশেম ভুঁইয়ার হাতে। তিনি তখন হাইস্কুলের অষ্টম কি নবম শ্রেণির ছাত্র। তারপর আমার শৈশবের লেখাপড়ার বড় অংশ জুড়ে ছিলেন বাড়ির লজিং মাস্টার। অন্তত তিনজন লজিং মাস্টারের স্মৃতি মনে পড়ে, যারা সবাই ছিলেন মাদ্রাসার ছাত্র। এঁদের একজন ছিলেন হাফেজিয়া মাদরাসার ছাত্র। আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল বহু দূরে ছিল বলে সবাই প্রথমে মাদরাসায় পড়েছে, তারপর স্কুলে ভর্তি হয়েছে। আমার ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। আমার শিক্ষাজীবন বলতে আশি ও নব্বই দশক, অর্থাৎ সনাতন শিক্ষাব্যবস্থার শেষ প্রজন্ম আমি। আজকে যে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার; মোবাইল ল্যাপটপ, ইন্টারনেট নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, এসব আমরা পাইনি। দিনের পর দিন লাইব্রেরিতে বসে লিখে খাতা ভরেছি। আজকের দিনে একটি ছেলে সেই কাজ পাঁচ মিনিটেই করে ফেলে। মোবাইলে ছবি তুলে বা স্ক্যান করে ফেলে। আর গুগুল তো খাজাবাবার দরবার হয়ে উঠেছে, যা চাই তাই-ই পাই। যা কিছুই লিখে সার্চ দিই না কেন, হতাশ হই না। পার্থক্য তো ঘটেছে-ই।

বি.ভূ.ম : আমরা জানি যে, যে-কোনো মানুষের মানসগঠনে তার পারিবারিক পরিম-ল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে- ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় অর্থেই। এই নিরিখে আপনার জীবনে আপনার পরিবারের কী ভূমিকা রয়েছে?

চ. আ : খুব বড়ো একটি গেরস্থবাড়িতে আমার জন্ম। একদা বিপুল ভূসম্পত্তির অধিকারী থাকায় আমাদের বংশীয় উপাধি হয়েছিল ভূঁইয়া। ইতিহাসের বারো ভূঁইয়ার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। নিতান্তই প্রভূত ভূসম্পত্তির মালিকানা থাকায় এই উপাধি। কিন্তু এই সবই আমার জন্মের আগের ঘটনা। আমার ছেলেবেলায় তবু ক্ষয়িষ্ণু একটি রূপ দেখেছি, আজ যা প্রায় নিঃশেষিত। বাড়িতে বেশ ক’জন বছরি মুনিষ থাকার পাশাপাশি রোজ মুনিষ ছিল প্রচুর। বাড়ির বাইরের উঠোনে বিরাট একটি জাম গাছ ছিল। তার নিচে একটি বাঁশের মাচা পাতা ছিল। এবং পাশাপাশি বাংলাঘর বলে বড় আলাদা একটি ঘর ছিল। মাচা বা বাংলাঘরে মুনিষরা গ্রীষ্মের দুপুরে বিশ্রাম নিত, বর্ষার দিনগুলোয় গল্প-আড্ডার আসর জমত। সন্ধ্যা হলেই মানুষে ভরে যেত বাড়ির বাইরের উঠোন। কতো রকমের যে গল্প, আর গান তার হিসাব নেই। রাজ্জাক-কবরী-শাবানা-আলমগীর এই সব নায়কেরা তখন স্বপ্নপুরুষ। মুনিষরা সিনেমা দেখে এসে এদের গল্পই করত। ধানকাটার মৌসুমে কুষ্টিয়া থেকে মহিষের গাড়ি নিয়ে গাড়য়ানরা আসতেন।

দাদা এবং নানা দুই তরফেই আমি বড় নাতি এবং দীর্ঘদিন আমিই একমাত্র বড় নাতি। ফলে আদরের ঘাটতি ছিল না। আমাদের পরিবারের বৈশিষ্ট্যই ছিল, বাড়ির কাজের মানুষদের সমান চোখে দেখা। বাড়ির কাজের ছেলেমেয়েরাই ছিল আমার খেলার সাথী। আমাদের প্রিয় একটি কাজ ছিল বাড়ির কাজের লোকদের সাথে মাঠে খাবার খাওয়া। স্কুল ছুটির দিনগুলোয় দেখা যায়, আমি বিলে চলে যাচ্ছি মুনিষদের সাথে খাবার খেতে। আবার বাড়ির কাজের মুনিষদের প্রায় সবাই সকলের হয় কিসসা-বলার না হয় গানের ন্যাচারাল প্রতিভা ছিল। গান বা কিসসা শোনা আমার খুব প্রিয় ছিল। প্রকৃতির মধ্যে অবাধ বিচরণে পরিবারের পক্ষ থেকে কখনো বাধা ছিল না। আশির দশক পর্যন্ত গ্রামবাংলায় মোটামুটি প্রাচীন ঐতিহ্যগুলো টিকে ছিল। তখনো রাস্তা-ঘাট-পাকা হয়নি, বিদ্যুত আসেনি, ব্যাটারিচালিত সাদা-কালো টেলিভিশন পাঁচগ্রাম মিলে একটি ছিল। স্বচ্ছল পরিবারের একটি রেডিও থাকত। আমাদের বাড়িতেও একটি রেডিও ছিল। সন্ধ্যা হলে সবাই দল বেঁধে রেডিও শুনত। বললে দীর্ঘ দীর্ঘ সময় ধরে বলতে হবে। আমাদের কাল পর্যন্ত একটি স্বাধীন শৈশব কৈশোর পেয়েছিলাম।

বি.ভূ.ম : রাজশাহীতে আপনার জন্ম এবং আপনি দীর্ঘকাল এই শহরের অধিবাসী। বর্তমান রাজশাহী সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

চ.আ : খুব ছোট্ট একটি শহর রাজশাহী, দারুণ শান্ত আর নিরিবিলি। দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহর, এমনকি অনেক জেলা শহরের তুলনায় লোকবসতি কম। রাস্তায় বেরুলে ঘিন্জি নেই, খুব স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করা যায়। নাগরিক জীবনের প্রাণসংহারী ব্যস্ততা ও প্রতিযোগিতা নেই এই শহরে। শিল্প-কারখানা নেই, বর্জ্য-দূষণ খুবই সামান্য, শহরের ভেতরে বাস-ট্রাকের চলাচল নেই, প্রাইভেট কার এখনো হাতেগোনা, রিক্সা-অটোরিক্সাই শহরের বাহন। বিপরীতে আছে পদ্মার নির্মল বাতাস-পানি। এই শহর মায়ার শহর। একবার এলে কেউ ফিরে যেতে চায় না। আমার জন্ম বৃহৎ রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমায়। ১৯৮৪ সালে নাটোর স্বতন্ত্র জেলা হয়। তবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন-গতির সবকিছুই রাজশাহী কেন্দ্রিক। ২০০৫ সালে রাজশাহী কলেজে অধ্যাপনার চাকরি নিয়ে আসার পরে থেকে এই ১৫ বছর ধরে রাজশাহী শহরেই আছি। এক ঘণ্টার মধ্যেই শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ঘুরে ফেলা যায়। পায়ে হেঁটে চলাই আনন্দ বেশি। রাস্তাগুলো প্রশস্ত, আর ঝকঝকে। কোনো কোনো রাস্তা এতোটাই প্রশস্ত, নিরিবিল আর পরিচ্ছন্ন, হাঁটলে সন্দেহ হবে, এ কী বাংলাদেশের কোন শহরে হাঁটছি? আপনি জানেন কী না, শিক্ষা শান্তি আর পরিচ্ছন্নতার জন্য রাজশাহী মহানগরীর খুব সুনাম আছে।

বি.ভূ.ম: আপনার একটি স্মরণীয় কিংবা অবিস্মরণীয় কীর্তি হলো ‘গল্পকথা’ নামক অসাধারণ একটি পত্রিকা সম্পাদনা। পত্রিকাটির অনেকগুলো মূল্যবান সংখ্যা করেছেন হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, মাহমুদুল হক, আব্দুস শাকুর, সেলিনা হোসেন, রিজিয়া রহমান প্রমুখকে নিয়ে। দু’পার বাংলাতেই এত সংখ্যক পত্র-পত্রিকা থাকা সত্ত্বেও আপনি আরেকটি নতুন পত্রিকা সম্পাদনার কথা ভাবলেন কেন?

চ. আ : পত্রিকা করার ইচ্ছেটা বহুদিনের, কিন্তু করে ফেলার ঘটনাটা আকস্মিক ঘটেছিল। আমি তখন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করি, তিন বছরের ছুটি নিয়ে পিএইচডি গবেষণায় আছি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মোজাফ্ফর হোসেন নামে এক তরুণ গল্পকার-সম্পাদকের সাথে পরিচয় হয়েছিল লেখালেখির সূত্রেই। পরিচয়টা পরে নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় রূপ নিয়েছে এবং প্রায় সন্ধ্যায় আমরা চা-আড্ডায় বসতাম। ওঁর সম্পাদিত ‘শাশ্বতিকী’ পত্রিকা দেখে আমি রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিলাম, এই বয়সে লেখাপড়ার খরচ বাঁচিয়ে এই রকম একটি সাহিত্যপত্রিকা করে কী করে? বড়ো বড়ো লেখকরা লিখছেন। একটি সমৃদ্ধ পত্রিকা ছিল। লেখাগুলো ছিল অত্যন্ত মানসম্মত। মোজাফ্ফর হোসেনের পাঠ-পরিধি, লেখার হাত, যোগাযোগ সবই আমাকে মুগ্ধ করেছিল। একদিন নিউমার্কেটের আজহার ভাইয়ের আড্ডায় মোজাফফর আমাকে পত্রিকা করার প্রস্তাব দিল এবং লেখা-সংগ্রহ থেকে শুরু করে পত্রিকার যাবতীয় কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাসও দিল। ওঁর আশ্বাসেই সেদিন সন্ধ্যায় আমি পত্রিকা করার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শুরুতে তেমন কোনো লক্ষ্যই ছিল না। দুটো সাধারণ সংখ্যা করার পরেই পত্রিকার চরিত্র পরিবর্তন করে ফেলি। কোনো একজন কথাসাহিত্যিকের সামগ্রিক কর্মের উপরে মূল্যায়নধর্মী বিশেষ সংখ্যা করতে শুরু করি। অবিশ্বাস্য রকম ফল পাই। প্রতিটি সংখ্যা-ই পাঠক-গকেষকরা বিপুলভাবে গ্রহণ করেছে। বেশ কয়েকটি সংখ্যা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়ক। দুটো সংখ্যা বই আকারে বেরিয়েছে, বাকিগুলোও ধারাবাহিকভাবে বেরুবার পথে।

বি.ভূ.ম : দু’পার বাংলাতেই সাহিত্য সমালোচনামূলক পত্রিকার ইতিহাসে ‘গল্পকথা’ একটি মাইলফলক হয়ে আছে। যেসব লেখককে নিয়ে ‘গল্পকথা’র সংখ্যাগুলো করেছেন, তাদেরকে নিয়ে যে-ই গবেষণা করুন না কেন তাকে ‘গল্পকথা’র সাহায্য নিতেই হবে। তো এমন অসামান্য একটি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব থেকে আপনি অব্যাহতি নিলেন কেন?

চ. আ : বিশেষ সংখ্যা হওয়ায় লেখকের প্রত্যেকটি বইয়ের উপরে আলোচনা থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। দুই বাংলার শতাধিক লেখকের কাছে বই পাঠিয়ে নিরন্তর লেখার তাড়া দিয়ে লেখা সংগ্রহ করে সেই লেখা পত্রিকাস্থ করতে পূর্ণ এক বছরের কঠিন খাটুনি। পত্রিকা বেরুবার পরে বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার সর্বত্র পাঠানোও কঠিন কাজ। কোনোপ্রকার বিজ্ঞাপন না নিয়ে একান্তই ব্যক্তিগত টাকায় করেছি। পত্রিকা বেরুবার পরে টানা একমাস নিজেই মাথায় করে নিয়ে কুরিয়ার করেছি। যাই হোক, সব মিলিয়ে একক হাতে কাজটি করা কঠিনতর হয়ে ওঠায় সমাপ্তির কথা ভেবেছি। এছাড়া সবকিছুরই তো শেষ আছে। একটা সময় থেমে যেতে হয়। প্রায় এক যুগ ধরে তো করেছি।

বি.ভূ.ম : আপনি পিএইচডি করেছেন সমকালীন বাংলাসাহিত্যের এক দিকপাল লেখক হাসান আজিজুল হককে নিয়ে। কোন বিশেষ কারণে আপনি এই লেখককে নিয়ে গবেষণা করার কথা ভেবেছেন?

চ. আ : হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যকর্ম নিয়ে পিএইচডি করার পূর্বেই তাঁর সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়। তার উপরে বেশ কিছু লেখাও প্রকাশিত হয়েছিল। গভীর ভালোলাগার জায়গা তো আছেই, প্রধান যে বিষয়টি বিবেচ্য হয়েছে তা হল, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের এই শীর্ষ লেখকদের একজন হওয়ার পরেও তাঁর কথাসাহিত্যের উপরে পূর্ণাঙ্গ কোনো গবেষণাকর্ম হয়নি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলার প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়েই অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে হাসান আজিজুল হকের গল্প পাঠ্য। অথচ, এই লেখকের কথাসাহিত্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো গবেষণা হয়নি, এই বিবেচনা প্রধান হয়ে উঠেছিল। এছাড়া আমার যিনি গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন, খ্যাতিমান গবেষক, অভিধানপ্রণেতা প্রফেসর স্বরোচিষ সরকার, তিনি আমার আগ্রহের জায়গাটিকে খুব গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করেছিলেন। জীবিত লেখককে নিয়ে গবেষণা করার সুবিধা ও প্রতিবন্ধকতা দুই-ই আছে। তিনি জীবিত আছেন, তাঁর লেখার ভুল ব্যাখ্যা বা তথ্য-বিভ্রাট ঘটার সম্ভাবনা থাকলে সরাসরি আলোচনা করা যায়। আবার, এক ধরনের ভয় ও সম্মোহন তো থাকেই, কারণ, লেখক জীবিত, তার প্রতিক্রিয়া জানানোর বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ আছে। হাসান আজিজুল হকের সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অবশ্য আমি এসব কিছুই ভাবিনি। তথ্য বা বইয়ের জন্য তার শরণাপন্ন হয়েছি। গবেষণার ব্যাপারে তাঁর সাথে খুব বেশি আলাপ হয়নি।

বি.ভূ.ম: ব্যক্তিমানুষ হাসান আজিজুল হক সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ণ কী?

চ. আ : বহু জায়গায় লিখেছি এবং বলেছি যে, আমার বিরল সৌভাগ্য যে, হাসান আজিজুল হক আর আমি একই শহরের অধিবাসী। এই সৌভাগ্য আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন তাঁর সাথে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। অবশ্যই লেখালেখির সূত্রেই পরিচয় এবং নিয়মিত বাসায় যাতায়াত। তাঁর সান্নিধ্য যারা পেয়েছেন, তারা জানেন, কী অসীম মায়া মানুষটির। মুখোমুখি বসলেই আশ্চর্য এক মায়ার বন্ধনে বেঁধে ফেলেন। বয়সের পার্থক্য, অবস্থানের পার্থক্য, ছোট-বড় লেখক-অলেখক সবকিছু তুচ্ছ, মুহূর্তের মধ্যে আড্ডা আতিথেয়তায় মজে যান। জীবনে যে মানুষটি প্রথমবার এসেছে এবং পূর্বের কোনো পরিচয় ছিল না, সেই মানুষটিও মুহূর্তের মধ্যে ভুলে যায় যে, সে এই প্রথম এসেছে এবং অপরিচিতের মুখোমুখি। বহুকালের চেনা বন্ধুর মতোই গল্পে মজে যান। আড্ডা-গল্পই হাসান আজিজুল হকের প্রাণ। মানুষ ছাড়া খুব কম সময় থেকেছেন। আমার সাথে এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, পঞ্চাশ বছরের অধিক লেখকজীবনে মাত্র ষাট কি বাষট্টিটি গল্প লেখার কারণ এই আড্ডা। মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। যে কোনে ন্যায়-ভিত্তিক আন্দোলনে রাজপথে পর্যন্ত দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে লেখা চার শতাধিক পত্র নিয়ে এ বছরই অর্থাৎ ২০২০ সালেই ‘হাসান আজিজুল হক সমীপেষু’ নামে একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছি। তার প্রতিটি চিঠিই সাক্ষ্য, এই মানুষ কী পরিমাণ বন্ধুবৎসল আর অতিথিপরায়ণ, আড্ডাবাজ আর শিল্প-সাহিত্যের জন্য উৎসর্গীত প্রাণ।

বি.ভূ.ম : আপনি একসময় সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। এখন আপনি নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং চেয়ারম্যান। তো এই দুই স্তরের শিক্ষাকতা সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা এবং মূল্যায়ন কী?

চ. আ : দুই স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার যে চিত্র বলতে গেলে প্রায় একই। সরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স পড়ানো হয় সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। আশির দশকের আগে পর্যন্ত সরকারি কলেজ উচ্চশিক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। রাজশাহী কলেজ, বিএল কলেজ, ঢাকা কলেজ এরকম কলেজগুলোর শিক্ষার মান ছিল অনেক উর্ধ্বে। আমাদের দেশের বড়ো বড়ো লেখক দার্শনিক বিজ্ঞানীরা যাঁরা তাদের সিংহভাগই সরকারি কলেজে পড়েছেন এবং অধ্যাপনা করেছেন। কিন্তু আজকে আর সেই বাস্তবতা নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নামক উদরসর্বস্ব একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে ব্যাঙাচির মতো যত্রতত্র অনার্স-মাস্টার্স খোলার ফলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ভয়ংঙ্কর ধ্বসের মুখোমুখি পড়েছে। ক্লাস রুম নেই, ল্যাব-লাইব্রেরি নেই, শিক্ষক নেই, এমনকি শিক্ষকদের বসার জায়গাটি পর্যন্ত নেই, অথচ অনার্স মাস্টার্সে দুশো আড়াইশো করে ছাত্র ভর্তি করে। বাজারের গাইড বই আছে। এক বছরের জন্য একটি গাইড বই কিনলেই বৈতরণী পার। এক যুগের অধিক সরকারি কলেজের শিক্ষকতায় মনঃপীড়ায় ভুগেছি উচ্চশিক্ষার বৈকল্য ও প্রহসন দেখে। বিগত কয়েক বছর ধরে ক্র্যাশ প্রোগ্রামের নামে যা হয়েছে তা শিক্ষাব্যবস্থাকে রীতিমতো আইসিইউতে নিয়ে ছেড়েছে। ক্লাসের বালাই নেই, এদিকে পরীক্ষার উৎসব লেগেই আছে। শিক্ষক নেই পাঁচজনও, অথচ অনার্সে ছাত্র ভর্তি করা হয় দেড় শ দুশো। উচ্চমাধ্যমিকে হাজার পার হয়। আবার ডিগ্রিও আছে। বিভাগীয় ও জেলা শহরে বড় কলেজেগুলোয় তবু শিক্ষক আছে, কিন্তু উপজেলা বা প্রত্যন্ত অ লের কলেজগুলোয় হাতে গোনা শিক্ষক থাকেন, যাদের তদবির শক্তি খুবই দুর্বল। লাখ লাখ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে একজন মেধাবী শিক্ষাক্যাডারে প্রবেশ করেন, কিন্তু তার সম্মান ও প্রাপ্য মর্যাদার ব্যাপারে সরকার ও সমাজের ভয়ানক উদাসিনতা, আর অবিশ্বাস্য অবহেলা রীতিমতো লজ্জা-অপমানের। একজন শিক্ষক ১৫/১৬ বছর প্রভাষকই থেকে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে ক্যাডারে প্রবেশ করে প্রশাসন পুলিশ বা অন্যান্যরা যে সুযোগ-সুবিধা পান তার ধারকাছেও শিক্ষাক্যাডার নেই। তার উপরে আত্মীকৃত শিক্ষকের ব্যাপারটা তো আছে। বিপরীতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে আমি সন্তুষ্ট তা নয়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সরকারি কলেজের শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। শিক্ষকরা ঠিক সময় প্রমোশন পান, কারিকুলাম প্রণয়ন, ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণ, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা প্রদানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথেষ্ট স্বাধীনতা আছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আনুপাতিক হারও কম হয়। ল্যাব-লাইব্রেরি-বিস্তৃত ক্যাম্পাসে অবাধ বিচরণের সুবিধা একজন ছাত্রকে বড় স্বপ্ন দেখায়। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির সাথে ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ শব্দটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বহুলভাবে চর্চিত হয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়মিত গবেষণা করবেন, তার নির্দিষ্ট ফিল্ডে তিনিই হবেন দেশের সেরাদের একজন, তাঁর গবেষণায় শুধু শিক্ষার্থী নয়, দেশ সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নব্বই ভাগ শিক্ষকই এটাকে ¯্রফে চাকরি হিসেবে গ্রহণ করেছেন, টাকা উপার্জনের ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেছেন, ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেননি। প্রমোশনের জন্য যে কয়টি গবেষণা আর্টিকেল প্রয়োজন সেই কয়টি কোনোপ্রকারে জোড়াতালি করে এবং একটি পিএইচডি ডিগ্রি করে হাত-পা গুটিয়ে নেয়। অথচ তারাই একটা দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রধান ফসল, সর্বোচ্চ মেধাবী। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, হাতেগোনা কয়েকজন বাদে প্রায় সকল শিক্ষকই নীল সাদা সবুজ হলুদ অর্থাৎ যে কোনো একটি রঙের পোশাক শরীরের চাদরের মতো জড়িয়ে নেন। তখন তাঁর সকল চিন্তাটা আর মুক্ত থাকে না, নীল সাদা হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যায়ের মেধাবী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতির অসুস্থ চর্চা ঢুকে পড়ায় জাতির বড় ক্ষতি হয়ে গেল! এখন আর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ জন শিক্ষকও পাবেন না, যাদের কর্মের গুণে তাদের নাম দেশের অন্তত শিক্ষিত সমাজ জানে।

বি.ভূ.ম: এবার আপনার লেখালেখির প্রসঙ্গে আসি। অধিকাংশ লেখকই তার লেখক জীবন শুরু করেন মূলত কবিতা দিয়ে। আপনার ক্ষেত্রেও কি তাই ঘটেছিল? গল্প লেখা শুরু করেছেন কবে? গল্প লেখার কথা মনে এলো কেন এবং সেটা কীভাবে?

চ. আ : বাড়ির মুনিষদের কাছে কিসসা শোনা আমার একটি প্রিয় বিনোদন ছিল। কিসসাগুলোর চরিত্ররা সাধরণতই রূপকথার মানুষ, যাদের বিচরণ স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালব্যাপী। এছাড়া মনু মিয়া নামে আমার একজন ফুফা আছেন। তিনি এমন সব কিসসা বলতেন, আমার স্বপ্নের জগৎ জাগিয়ে তুলতেন। তার পেট-বানানো সেই সব কিসসার একটি বাক্যও অবিশ্বাস্য মনে হয়নি আমার শিশু মনে। ঘুমের ভেতরে প্রায়ই রূপসী পরীর দেশে ঘোরাফেরা করেছি। সেইসব রাজকুমারী বা পরীরা একদিন এসে আমাকে নিয়ে যাবে এ বিশ্বাস আমার দৃঢ় ছিল। আমার চাচা মকবুল ডাক্তার শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের মাতাল-ভক্ত ছিলেন। নাটোরে গেলেই শরৎচন্দ্রের একটা না একটা বই আনবেন-ই। আর সেই বই পড়ে অভিনয় করে শোনাতেণ। আরেকটু বড় হবার পরে, বালক বয়সেই শরৎচন্দ্রের প্রায় সব উপন্যাস আমি পড়ে শেষ করি। আমার খাওয়া-গোসল এসবের কোনো ঠিক ঠিকানা ছিল না। দৌড়, গোল্লাছুট, মার্বেল, দাড়িয়াবান্ধা খেলা, বিলে পুকুরে সাঁতার কাটা, মাটিতে ঘর এঁকে ১৬ কুটি, ৩২ কুটি খেলা, বনে-বাঁদাড়ে ঘুরে ঘুরে বন্য-ফল খাওয়া, ঘুঘুর ফাঁদ পেতে ঘুঘু ধরা, গাছের বাকল কেটে হাঁড়ি টাঙিয়ে রাখা এসব কী যে বিচিত্র রকমের কাজ করে দিন কেটেছে, আজকের শিশুরা তা কল্পনাও করতে পারবে না। প্রকৃতিতে অবাধ বিচরণের স্বাধীনতা অন্তর্রাজ্যকে গল্পপ্রবণ করে তুলেছিল। বড় একজন কিসসা-কথক হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল শিশু-মনে। এ কারণেই বোধহয়, কবিতার লেখার দিকে ঝুঁকিনি। গল্প দিয়েই আমার লেখালেখি শুরু।

বি.ভূ.ম: গল্প লিখতে লিখতে আপনি উপন্যাস লেখার কথা ভাবলেন কেন?

চ. আ : উপন্যাস লেখার কথা আলাদাভাবে ভাবিনি। উপন্যাস লেখার প্রতি-ই ঝোঁক বেশি ছিল আগাগোড়া। গল্প লেখা শুরুর কিছুকাল পরেই আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করি। নব্বই দশকের শেষার্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে আমি অনেকগুলো গল্প এবং একই সঙ্গে দুটি কি তিনটি উপন্যাসও লিখেছি। কিন্তু একটি উপন্যাসও শেষ হয়নি। তখন তো প্রকাশ করার কথা ভাবিনি, সুযোগও ছিল না। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার লেখার সেই সব খাতা কোথায় হারিয়ে ফেলেছি আজ আর খুঁজে পাইনি। কাকতালীয়ভাবে, দুটি গল্প পেয়েছি। সেই সব গল্প দুটো আমার ‘ইচ্ছামৃত্যুর ইশতেহার’ গল্পগ্রন্থের শেষে জুড়ে দিয়েছি।

বি.ভূ.ম: আপনার একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক সমস্যার উপন্যাস, আপনার প্রথম উপন্যাসও ‘শাপিতপুরুষ’। নামটিও অভিনব। রীতিমতো মনোবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভিজ্ঞতা নিয়েই আপনি উপন্যাসটি লিখেছেন বলে মনে হয়। এমন একটি উপন্যাস লেখার কথা আপনার কেন মনে এলো? এর পেছনে কি বিশেষ কোনো প্রণোদনা কাজ করেছিল?

চ. আ : ‘শাপিতপুরুষ’ উপন্যাসটির মূল-কাঠামোটা লিখেছি দুই হাজার এক কি দুই সালে। পরে এর সাথে প্রফেসর ইয়াজুউদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সেই সময়ের রাজনৈতিক কিছু বিষয় সংযুক্ত করেছি। যে ব্যাখ্যায়-ই বলি না কেন, আমাদের সমাজ, জীবনবিন্যাস এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা সবকিছুই ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। প্রতিটি মানুষের আত্মপরিচয়ের সাথে ধর্ম ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে। ধরুন, একজন মানুষের নাম আনোয়ার হোসেন অথবা নারায়ণ ভট্টাচার্য অথবা সুব্রত গোমেজ। এই মানুষটি ধর্মকে অস্বীকার করতেই পারে, কিন্তু তার নামটি? নামটি কী ফেলে দেবে? তার বাবা-মার বিয়ে কী অস্বীকার করবে? তাহলে তার জন্ম-পরিচয় তো কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়বে। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানাদি সর্বত্রই ধর্মের একটি স্পষ্ট অবস্থান আছে। আলো-বাতাসকে অস্বীকার করেও যেমন তার মধ্যেই আমাকে থাকতে হবে, ধর্মের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। সক্রেটিসের ভাষ্যে, ধর্মই জ্ঞান। ধর্মের সাথে জ্ঞানের যোগ হলেই মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়। ধর্ম কল্যাণের জন্য এবং সকল ধর্মই মানুষের জীবনকে উন্নত করে। বিবাহ এবং তার সাথে জড়িত সন্তানের পরিচয় যেহেতু ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং এই প্রতিষ্ঠা মানব-সভ্যতার প্রায় শুরু থেকে বহমান, তাকে অস্বীকার করা সহজ নয়। করলেও চারদিকে যে ধর্মের আবহ তৈরি হয়ে আছে, তাকে সে অস্বীকার করবে কী করে? মানুষ তো সামাজিক জীব, একা বাঁচতে পারে না। তাকে মানুষের কাছে যেতেই হয়। তখন-ই সংঘাতটি শুরু হয়। এই সংঘাত যে কী ভয়ানক হয়, পরিণত বয়সে পৌঁছে তারা বুঝতে পারে। যতোই অস্বীকার করুক, কিন্তু তার সন্তানকে একটি পরিচয়ে বড় করতে হবে, বিয়ে-সংসার এসব আছে। ঠিকই বলেছেন, এই উপন্যাসটি লেখার পূর্বে বেশ কিছু মনোবিজ্ঞানের বই পড়েছি। আর প্রেরণার কথা বলছেন? প্রেরণা নয়, একটি বেদনাবোধ থেকেই উপন্যাসের থিমটি মাথায় এসেছিল ছাত্রজীবনেই। এই ধরনের বিয়ে সাধারণত প্রেমের ও জানাশোনার বিয়েই হয়। ধর্ম তো বটেই, পরিবার, সমাজ সবকিছুর সাথে সম্পর্কচ্যুতি ঘটায় ভেতরে ভেতরে মানুষগুলো একা ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। নিতান্তই তরুণ বয়সে বিরল সাহসের মানুষরা এই রকম দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ইউরোপের মতো অবারিত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের দেশেও এই ধরনের যুগল খুব বেশি পাবেন না। আমার জানাশোনা একজনকে হঠাৎ করে আমার এক নির্বোধ বন্ধু প্রশ্ন করে বসেছিল, আচ্ছা, আপনি তো মুসলমান হয়ে হিন্দুকে বিয়ে করলেন, আপনার সন্তানের পরিচয় কী হবে? সেই মানুষটি কী যে অসহায় আর অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেল, ভাবা-ই যায় না? হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছে, কেন? মানুষ, মানুষ পরিচয়ে বড় হবে, বলে একপ্রকার দৌড়ে স্থান ত্যাগ করল। সেদিন-ই উপন্যাসের থিমটি মাথায় এসেছিল। মানুষ হওয়ার জন্য যে আলো-বাতাসের প্রয়োজন হবে, তা সে কোথায় কী ভাবে পাবে? বিষয়টি যে এতো সোজা নয়, সেও জানে। তারপর এই ধরনের কয়েকটি পরিবারের নিবিড়-সান্নিধ্যে এসেছি এবং অন্তর্গত বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি।

বি.ভূ.ম : আমার মনে হয়, আপনার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ‘অর্পিত জীবন’। যে বিষয় নিয়ে আপনি এই উপন্যাসটি লিখেছেন সেটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক এমনকী রাষ্ট্রীয় বিবেচনায়ও একটি ভয়ঙ্কর স্পর্শকাতর বিষয়। এবং এই বিষয়টি নিয়ে লেখা, আমার যতদূর মনে হয়, এটিই এখন পর্যন্ত প্রথম এবং একমাত্র পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। এই উপন্যাসটি রচনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে যদি একটু বিস্তারিতভাবে বলেন-

চ. আ : ‘অর্পিত জীবন’ উপন্যাসটি লেখার ইচ্ছে আমার বেশ কয়েক বছর আগের, একটি দৈনিকের নিউজ পড়ে। আমি জানতাম না যে, শত্রু সম্পত্তি আইন, যা অর্পিত সম্পত্তি আইন নামে প্রতিষ্ঠিত, এরকম একটি আইন করেছিল পাকিস্তান সরকার। ‘শত্রু’ শব্দটি আমাকে ভীষণভাবে ভাবায়। কে শত্রু? কার শত্রু? কেন শত্রু? একটি রাষ্ট্র নিজেই তার দেশের নাগরিককে শত্রু বলে চিহ্নিত করে আইন করছে। হাজার হাজার বছরে ধরে যে জাতি-গোষ্ঠী এই জনপদের অধিবাসী, হঠাৎ করে রাষ্ট্র তাদের শত্রু এবং তাদের সম্পত্তিকে শত্রুর সম্পত্তি ঘোষণা করে এবং তার মর্মান্তিক পরিণতি আমাকে ভীষণ আলোড়িত করে। করছে কারা আবার? যে শাসক করছে, সে আবার বাঙালি তো নয়-ই, বরং বাঙালি বিদ্বেষী, বাংলা বিদ্বেষী। দেশ তো মা। মা কখনো তার সন্তানকে শত্রু বলতে পারে? কোনো বিচারেই পারে না। এক মুহূর্তের মধ্যে মানুষগুলো জেনে গেল, তারা দেশের শত্রু, তার কোনো দেশ নেই, তার বাপ-দাদার চৌদ্দ পুরুষের বাস্তুভিটা এবং যেখানে তাঁরও জন্ম, বেড়ে ওঠা, তার সেই বাস্তুভিটার উপরে আর কোনো অধিকার নেই, একবার ভেবে দেখেুন, কী করুণ বাস্তবতার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে সেই মানুষগুলোকে। আমি মর্মাহত হয়েছি এই কথা ভেবে, স্বাধীনতার এতো বছর পরেও আইনটি বলবৎ আছে। শুধু ‘শত্রু’ শব্দটির স্থলে ‘অর্পিত’ শব্দটি যোগ করে ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’ নাম দিয়ে বিভিন্ন প্রকারের ধারা-উপধারার সংযুক্তি ঘটিয়ে আইনটি আরও শক্তশালী করা হয়েছে। ২০১২ সালে, গল্পকথা’র পত্রিকায় লেখার সূত্রে আমার পরিচয় ঘটে পশ্চিম বাংলা খ্যাতিমান লেখক ও সম্পাদক সৌমিত্র লাহিড়ীর সঙ্গে। এই পরিচয়ের পর্বে আমি জানতে পারি, তাঁর পৈতৃক বাড়ি-ভিটা ছিল রাজশাহী তাহেরপুরে এবং তাঁর পিতা স্বর্গীয় ভবেশচন্দ্র লাহিড়ী (যাঁকে বইটি উৎসর্গ করেছি) ছিলেন তাহেরপুর স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। শুধু তাই নয়, তাঁর পরিবারের বিপুল পরিমাণের জমি এখনো রয়েছে। অবশ্যই তাদের দখলে নেই। এবং এতো বছর পরে পাবার আশাও করেন না। এতো বড় প্রতিষ্ঠিত মানুষ এবং এতো ভূ-সম্পত্তির অধিকারী মানুষটি দেশত্যাগ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে যে লড়াই করেছেন, সেই লড়াইয়ের গল্প আমি সৌমিত্র লাহিড়ীর কাছে শুনেছি। সৌমিত্র লাহিড়ীর অস্তিত্বের সর্বাংশ জুড়ে তাঁর চৌদ্দ পুরুষের জন্মভূমির স্মৃতি ও অধিকার জ্যান্ত রয়েছে। সৌমিত্র লাহিড়ী আমাকে ভ্রাতৃতুল্য ¯েœহের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছেন। আমি দাদা বলে ডাকি। এই ন’বছর ধরে আমার লেখকজীবন তো বটেই, ব্যক্তিজীবনেরও খুুঁটিনাটি বিষয়ে দাদার পরামর্শ ও অনুপ্রেরণা নিয়ে পথ চলছি। আমি ভেবেছি, লাহিড়ী পরিবারের মতো স্বচ্ছল অবস্থাবান একটি পরিবারের পরিণত যদি হয় এই, তবে তুলনায় কম স্বচ্ছল এবং সহায়হীন মানুষদের কী করুণ পরিণতি নেমে এসেছিল? কয়েক বছর আগে, সৌমিত্রদার বড় দিদি এসেছিলেন পৈতৃকভিটা এবং তাঁর নিজের জন্মভিটা দেখতে। তাঁর ভেতরে আবেগ আর আর্তনাদ দেখেছি, আমার অন্তরকে ভীষণভাবে কাঁদিয়েছে। এই মানুষটি একটি ইট নিয়ে গিয়েছেন তাঁর পৈতৃকভিটা থেকে। ভাবুন, কতোটা গভীরে স্থান করে আছে এই পৈতৃকভিটা। জীবন-সায়াহ্নে পৌঁছে একটি মুহূর্তের জন্যও ভুলেননি পৈতৃক ভিটাকে, দেশকে, মাটিকে। এই দীর্ঘ গভীর বেদনার দায় কার? আমি তো বলি, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ফলে দুটি দেশের জন্ম হয়নি, দুটি বিষবৃক্ষের জন্ম হয়েছে। এই বিষবৃক্ষের মরণ নেই। কতো হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকবে কে জানে।

বি.ভূ.ম : লেখকের কাজই কি কেবল সমাজের সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা নাকি সমস্যার সমাধানও নির্দেশ করা?

চ. আ : লেখক কিন্তু রাষ্ট্রের বেতনভোগী কোন কর্মচারী নন, রাষ্ট্রের পরিচালনার কোনো দায়িত্বের সাথেই তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পূর্ণ স্বাধীন এই শ্রেণির মানুষরা সাধারণত সমাজ-রাষ্ট্রের বিরোধী চিন্তার মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত হয়। সমাজ-রাষ্ট্র তো নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, তার বাইরে গেলেই আর মেনে নিতে চায় না। সম্পূর্ণ স্বাধীন অবস্থানে থেকে নির্মোহ চোখে তাকান বলে লেখকরা দেখতে পারেন সমাজদেহের কোথায় ঘা হয়েছে, পঁচন ধরেছে। আমি মনে করি, লেখকের কাজ ঘা-টা দেখিয়ে দেয়া, পঁচনটা ধরিয়ে দেয়া, ক্ষতের স্থানটা চিহ্নিত করা, সেই ঘা-পচন বা ক্ষত সারিয়ে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব দেশ পরিচালনা করেন যারা তাদের। সমাজকর্মী, রাজনৈতিকবিদ, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক প্রমুখ শ্রেণি পেশার যারা আছেন।

বি.ভূ.ম : ‘অর্পিত জীবন’ উপন্যাসে আপনি যে সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন তার কোনো সমাধান আছে বলে আপনি মনে করেন?

চ. আ : এক গবেষণায় দেখেছি, প্রায় এক কোটি হিন্দু জনগোষ্ঠী দেশ ছেড়েছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ‘শত্রু’ অর্থাৎ ‘অর্পিত’ সম্পত্তির আইনের ফাঁদে পড়ে কিংবা অভিঘাতে। এবং এই মুহূর্ত পর্যন্ত দেশ ছাড়া অব্যাহত আছে। যারা আছেন তাদের অধিকাংশ কম-বেশি আক্রান্ত। স্বাধীনতার পরে এত বছরেও কোন সরকার-ই এই জায়গাটিতে হাত দেয়নি অথবা দিতে সাহস পায়নি। কারণ, সব রাজনৈতিক দলের মানুষ-ই এই অর্পিত সম্পত্তি দখলের সাথে জড়িয়ে আছে। এই একটি জায়গায় সবাই ঐক্যবদ্ধ। সমস্যার সমাধান হবে কিনা, আমি হয়তো বলতে পারব না। কিন্তু আমি স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখি, এমন নৃশংস একটি অন্যায়ের প্রতিকার একদিন হবেই। আমি আমার প্রত্যাখ্যান আর প্রতিবাদটা জানিয়ে রাখলাম। আমি আর কী করতে পারি বলুন।

বি.ভূ.ম: মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আপনার জন্ম। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আপনার নেই। তারপরও দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রচিত আপনার গল্পগুলো ভীষণ জীবন্ত এবং বাস্তবানুগ। এই অসম্ভবকে আপনি কীভাবে সম্ভব করেছেন?

চ. আ : প্রথমেই আমি বলি, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সরাসরি আমার কোনো গল্প বা উপন্যাস নেই। আমি লিখতে চেয়েছি মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতি, ত্যাগ ও প্রত্যাশার বিপরীতে আমাদের অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকৃত বাস্তবতা কী? হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাস্তবতাকে তুলে ধরতে গিয়ে প্রাসঙ্গিক হিসেবে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের মতো বিরাট একটি ঘটনা, এত বড় এবং ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যে দেশটির জন্ম হয়েছে, সেই দেশের পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে আমার যে প্রত্যাশা ও স্বপ্ন সেই জায়গাটি মারাত্মকভাবে ক্ষত-বিক্ষত-জরা-জীর্ণ। দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের কোনো একটি পর্যায়ে একবারের জন্যও কী কেউ ভেবেছিল, কোনো একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি শহিদ হয়েছেন অথবা বেঁচে আছেন, তাঁদের মনে একবারের জন্যও কী এই প্রশ্ন জন্মেছিল, যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তারা লড়াই করছেন, জীবন উৎসর্গ করছেন, সেই দেশ এমন এক দেশ হবে, যে দেশের স্বপ্নদ্রষ্টা নায়ককে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে, সেই দেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে, সেই দেশে যুদ্ধবিরোধী শক্তিই ক্ষমতার অধিকারী হবে, এমপি মন্ত্রী হবে, স্বাধীন দেশের পতাকা উড়বে তাদের গাড়িতে, গণতন্ত্রকে সেনাবাহিনীর ট্যাংকের নিচে ফেলে থেতলে হত্যা করা হবে রাজপথ পার হতে যাওয়া পথের শেয়াল-কুকুরের মতো; সংবিধানকে এতোটাই খেলু করা হবে যে, যখন ইচ্ছা তার উপরে কাঁচি চালাবে, শিশুর হাতে কাঠি লজেন্সের মতো জনগণের ভোটের অধিকার হবে, যখন ইচ্ছে দেবে, যখন ইচ্ছে হয় কেড়ে নেবে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তর প্রজন্ম হিসেবে আমার প্রত্যাশার জায়গায়টিকেই আমি তুলে ধরতে চেয়েছি, আর কিছুই নয়।

বি.ভূ.ম : ‘অসংখ্য চিৎকার’, ‘পোড়োবাড়ি ও মৃত্যুচিহ্নিত কণ্ঠস্বর’, ‘কবি ও কাপালিক’, ‘পালিয়ে বেড়ায় বিজয়’, ‘একটি পুকুর মরে যাচ্ছে’, ‘মাটি খেকো’, ‘ইদুঁর নিধন প্রকল্প’ প্রভৃতি গল্পে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থান ও পুনর্বাসন একটি বিশেষ মাত্রা নিয়ে উপস্থিত এবং উপস্থাপিত হয়েছে। গল্পগুলো লেখার প্রেক্ষিত তুলে ধরে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের উত্থানের পেছনে আমাদের রাষ্ট্র এবং রাজনীতির ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

চ. আ : স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সব দেশ স্বাধীন হয়েছে সেসব দেশে এত বড় প্রহসন, এত বড় আত্মখ-ন, এত বড় আত্মঘাতী ঘটনা ঘটেছে কি না আমার জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধে যারা সরাসরি শত্রুপক্ষ, বিরোধিতা করেছে, অস্ত্র হাতে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, এদেশের মানুষের বাড়িঘর ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, নারীদের বলাৎকার করেছে; শুধু বলাৎকারই নয়, প্রচ- ঘৃণার প্রকাশ স্বরূপ নারীদের গোপনাঙ্গ কেটে ক্ষত-বিক্ষত করেছে, সেই নরপিশাচরা স্বাধীন দেশে রাজনীতি করবে, ক্ষমতায় যাবে, দেশ চালাবে, সম্পদ-সমাজের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে, এ কী মানা যায়? এ কী বিশ্বাস করা যায়? অথচ এই বাংলাদেশে আমার চোখের সামনে তা ঘটেছে। দীর্ঘকাল ধরে মুক্তিযোদ্ধারাই ছিল এদেশের শত্রু, নির্যাতিত। বুক উঁচিয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াত রাজাকার আলবদররা, আর পালিয়ে বেড়াত মুক্তিযোদ্ধারা। পাকিস্তানি ঐতিহ্য ও চেতনার রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা ছিল অর্থই হচ্ছে তারা বাংলাদেশকে ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান-ই মনে করেছে। এক সেনাশাসক তো সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের ধর্ম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একবারের জন্যও ভাবলেন না, এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। ভাববেন কী করে, তিনি নিজেই যে পাকিস্তানি ঐতিহ্যের রাজনীতিকে হাতিয়ার করে প্রায় এক দশক রাষ্ট্রকে খেলার পুতুল বানিয়েছিলেন, নাচের পুতুলের মতো জনগণকে নিজের ইচ্ছেমতো নাচিয়েছেন। কারণ, জনগণের ভোটের প্রয়োজন ছিল না তাঁর। আশির দশকে আমি স্কুলের ছাত্র। তখন আমাদের গ্রামে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। স্কুলে যেতে আসতে একটি চায়ের দোকানে তাকে প্রায় দেখতাম। বিধ্বস্ত পরাজিত হতাশাক্রান্ত মানুষের মতো মাথাটা নিচু হয়ে আসতে দেখেছি। কী যে কষ্ট হতো দেখে, এই মানুষ মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে, তার স্বপ্ন-শ্রমের দেশে তার মাথা কেবলি নিচের দিকে নেমে আসছে। ‘পালিয়ে বেড়ায় বিজয়’ গল্পটি লেখার প্রেক্ষাপটে এই মুক্তিযোদ্ধা আছেন। আপনাকে স্মরণ রাখতে হবে, ইয়াহিয়া খান, লিয়াকত আলী খান, আইয়ুব খান, ভুট্টোদের চেয়েও আর চালাক, ধূর্ত এবং ষড়যন্ত্রকারী এদেশীয় পাকিস্তানি আদর্শের শাসক ও রাজনৈকি দলের নেতৃত্ববৃন্দ। পাকিস্তানিরা যা করতে পারেনি, হয়তো ভাবেনিও, তাদের অনুসারীগণ তাই করে ছাড়ল। উস্তাদের চেয়ে শিষ্য বড় হলে যা হয়। যাদের মন-শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাকিস্তানি আদর্শ রক্তের মতো প্রবহমান, যাদের দেশের প্রতি বিন্দু পরিমাণ ভালোবাসা নেই, দেশপ্রেম নেই, নিজের স্বার্থই বড়, দেশের মানুষের অধিকার ও সম্পদ লুঠ করে হাঙরের মতো যতোটা সম্ভব পেট বড় করার প্রতিযোগিতায় নেমে আছে যারা, তারা যে দলেই করুক, তাদের কাছে আপনি কী আশা করতে পারেন? হুমায়ুন আজাদের মতো যশস্বী লেখক ও ব্যতিক্রম চিন্তার মানুষদের তারা কেন বাঁচিয়ে রাখবে? ‘কবি ও কাপালিক’ গল্পে আমি চেষ্টা করেছি তুলে ধরতে এসব।

বি.ভূ.ম : আপনার ‘ইদুঁর নিধন প্রকল্প’, ‘অসংখ্য চিৎকার’ প্রভৃতি গল্পে যুদ্ধপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু ও বাস্তবায়নের পক্ষে জনমত গঠনের চিত্র পরিলক্ষিত হয়। দীর্ঘকাল যুদ্ধপরাধীদের বিচারকার্য সম্পন্ন করতে না পারার পেছনে আমাদের রাজনীতি ও সমাজ বাস্তবতা কি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল? যদি করে থাকে তবে সেটা কীভাবে?

চ. আ : ধরুন, আপনার সারা শরীরে একটি রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, রক্তকণিকায় ছড়িয়ে পড়েছে, হাড়-মাংস, ফুসফুস, মস্তিষ্ক কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সেই রোগ নিধন করতে হলে তো সর্বশরীরের চিকিৎসা করতে হবে। দু’চার জন প্রধান যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে কী হবে? একটি বড় গাছ আপনি উপড়ে ফেললেন, কিন্তু সেই গাছটি যে চল্লিশ বছর ধরে শেকড়-বাকড় বিস্তৃত করেছে, সেখান থেকে তো প্রতি মুহূর্তে জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন গাছ। তাই আমি বিশ্বাস করি, যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুধুমাত্র আইন-আদালতের বিষয় নয়, দু’চার জন যুদ্ধাপরাধীকে শাস্তি দিলে ফাঁসি দিলে যুদ্ধাপরাধী বিচার সম্পূর্ণ হবে না। যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তারা তো একটা চেতনা বা বিশ্বাসের উপরে আস্থা রেখে করেছে। সেই বিশ্বাস বা চেতনাটাই আসল, ব্যক্তিটা আশ্রয় মাত্র। ব্যক্তির ফাঁসি দিলে কী হবে, চেতনাটি যদি বিষবৃক্ষ হয়ে বেঁচে থাকে, সেখান থেকে নিত্যনতুন যুদ্ধারাপরাধীর জন্ম হবে। ধরুন, আমি নামাজ-রোজা সবই করি, কিন্তু আল্লাহকে বিশ্বাস করি না, তাহলে কী আমি মুসলমান থাকব? একটা মানুষ নিজেকে বাংলাদেশি বলে, বাঙালি বলে, বাংলা ভাষায় কথা বলে, চাকরি-বাকরি সবই করে কিন্তু যে চেতনার উপরে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত, সেই চেতনাকে অর্থাৎ বাংলাদেশকে বিশ্বাস করে না, তাহলে কী দাঁড়ালো? সত্য হলো, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির রাজনৈতিক চেতনাটি পরিপূর্ণভাবে বেঁচে আছে। শুধু বেঁচে আছে কেন বলছি, তারা এদেশের ক্ষমতায় ছিল, হয়তো ক্ষমতায় আসবেও। যদি যুদ্ধাপরাধীর বিচার বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীর শক্তির বিকাশ ঠেকাতে চান তাহলে প্রথম মুক্তিযুদ্ধের সময় সমগ্র জনগণ যেভাবে জেগে উঠেছিল, ‘জয় বাংলা’ বলে অসংখ্য কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনিতে বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রকম্পন উঠেছিল, সেই রকম অসংখ্য কণ্ঠের চিৎকার প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেমন ধরুন, যে ছেলেটির বয়স এখন ২০, অথচ চিন্তায় চেতনায় শিক্ষায় জীবনধারণে সাম্প্রদায়িক, এবং পাকিস্তানি ঐতিহ্যের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত তাকে কীভাবে সংশোধন করবেন। তাকে তো আর ফাঁসি দেয়া যায় না। তার মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রয়োজন। বাংলাদেশের চেতনার প্রতি তার আনুগত্য আনতে হলে প্রথমে তার শিক্ষাকে অসাম্প্রদায়িক করতে হবে। বহু কৌণিক জিজ্ঞাসা ও প্রশ্ন আছে। রাষ্ট্রের সংবিধান থেকে শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থব্যবস্থা সবকিছুই নতুনভাবে ঢেলে না সাজালে, যুদ্ধাপারাধী বা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চেতনার বিকাশ ঠেকানো সম্ভব নয়।

বি.ভূ.ম : শাহবাগ আন্দোলনের গণ-জাগরণের পূর্বেই আপনি লিখেছেন ‘অসংখ্য চিৎকার’ নামে গল্প। যেখানে দেখিয়েছেন, একজন গ্রাম্য যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রসঙ্গ আছে। সমগ্র গ্রামবাসীকে জাগিয়ে তোলার ব্যাপার আছে।

চ.আ : শুনুন, শাহবাগ আন্দোলনের সাথে আমি বরাবরই একাত্ম প্রকাশ করেছি। আমি বিশ্বাস করি, যুদ্ধাপরাধীর পরিপূর্ণতা বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার জন্য আমজনতার জনগণের বিকল্প নেই। এবং ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের শক্তির উত্থান না ঘটে তার জন্য দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যেভাবে জেগে উঠেছিল ভাষা আন্দোলনে, যেভাবে জেগে উঠেছিল উনসত্তরে গণঅভ্যুত্থানে, যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ঐক্যবদ্ধ শক্তির জাগরণ ব্যতীত যুদ্ধাপারাধী চেতনা তথা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীচেতনা সর্বোপরি বাংলাদেশ বিরোধী চেতনাকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। ভোট ও ক্ষমতার মুখাপেক্ষী রাজনৈতিক দল বা আইন-আদালত দিয়ে নির্মূল হবে না।

বি.ভূ.ম : আপনার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গল্পগুলো কেবল নেতিবাচক বা হতাশার কথাই বলেনা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথাও বলে। এই স্বপ্ন ও সম্ভাবনাময় চেতনাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেবার জন্য একজন লেখকের কী ভূমিকা রয়েছে?

চ. আ : নেতিবাচক বা হতাশার মধ্যে আমি কেন যাব? আড়াই হাজার বছরের মধ্যে আমি তো সেই বাঙালি যে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক, তার ভাষা রাষ্ট্রভাষা। আমার ক্রোধ আছে, জিজ্ঞাসা আছে। এত বড় মুক্তিযুদ্ধ, এত মানুষের জীবনের ক্ষয়, এত নারীর সম্ভ্রমহানি, এত বিপুল সম্পদ বিনষ্টির মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হলো, সেই রাষ্ট্রে পুরনো শকুৃনেরা কী করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে? এ কার বা কাদের ভুলে? আমরা যে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যার জন্যে মুষ্টিমেয় মীর জাফরের বংশধর ছাড়া দেশের প্রায় সব মানুষ মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, সেই স্বপ্নের স্বাধীন দেশ কী আজকের বাংলাদেশ? একজন মানুষ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিমুক্ত দেশ। বরং উল্টো বাস্তবতায় খাবি খাচ্ছে জাতি। প্রায় অর্ধ-শতাব্দীর কাছাকাছি পৌঁছার পরেও একটি স্বাধীন দেশের মুক্তিকামী মানুষকে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সাথে লড়াই করতে হচ্ছে, এর চেয়ে বড়ো ট্রাজেডি আর কী হতে পারে! আমি আশাবাদী মানুষ, বিশ্বাস করি, অপশক্তির পরাজয় নিশ্চয় একদিন হবে। হয়তো আমার জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব না, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি বাঙালির জয় হবে। এই বিশ্বাসটুকু বেঁচে আছে বলেই তো লিখছি। তা না হলে কার জন্যে লিখব?

বি.ভূ.ম : যৌনচেতনা এবং যৌনভাবনা সুস্থ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তারপরও মানুষ এই বিষয়গুলোকে আড়াল করে রাখতে চায়। কোনো কোনো লেখকের মধ্যেও যৌনতা নিয়ে এক ধরনের গোপনীয়তা এবং সংস্কার লক্ষ করা যায়। এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

চ. আ : যৌনচেতনা এবং যৌনভাবনার সাথে সমাজ ধর্ম সংস্কার লিঙ্গ পরিচয় ইত্যাদি জড়িয়ে আছে। একই সমাজের মধ্যেও শ্রেণি-ভিত্তিক যৌনচেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। একজন বস্তির মানুষ যেভাবে খোলামেলা কিংবা উচ্চবিত্তরা বা ক্ষমতাশালীরা যেভাবে যৌনতাকে প্রকাশ করতে পারে, একজন মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। আবার, ধর্মীয় অনুশাসন পালন করে যে মানুষ, তার ভাবনাটাকে যেভাবে দেখে মানুষ, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সেভাবে দেখে না। যিনি লেখক, তিনি তো মানুষের জীবনের প্রকৃত বাস্তবতাটাকে তুলে ধরবেন। যে সমাজ বা শ্রেণির চরিত্র নির্মাণ করবেন, সেই সমাজ বা শ্রেণির যৌন-বাস্তবতার দিকে তার তীক্ষè দৃষ্টি ফেলতে হবে। লেখক যদি সত্য বা বাস্তবচিত্র গোপন করে সামান্য ফাঁক-ফাঁকিও তৈরি করেন, মনে রাখবেন, সেই লেখক গড় পাঠকের কাছে ধরা না খেলেও বিদগ্ধ পাঠকের কাছে ঠিকই ধরা খাবেন।

বি.ভূ.ম : আপনার কয়েকটি গল্প, যেমন- ‘গিরগিটি ও একটি মেয়ে’, ‘রুগ্নতার গলি ঘুপচি’, ‘বাড়ন্ত বালিকার ঘর-সংসার’, ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ১৪২২’, ‘রক্তখেকো সাপ ও আমাদের নপুংসকত্ব’, ‘রাত পোহালে অন্ধকার’, ‘একটি শবদেশের সৎকার’, সাঁওতাল মেয়ের ঈশ্বও, প্রভৃতিতে নরনারীর মনোসমীক্ষা এবং যৌনভাবনার বিচিত্র প্রকাশ ঘটেছে। এইসব গল্পে কি আপনি মূলত যৌনভাবনার বিশেষ কোনো তত্ত্বদর্শনের কথা বলতে চেয়েছেন নাকি প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক যৌনচেতনার কথাই বলতে চেয়েছেন?

চ. আ : নর-নারীর যৌনভাবনা বা যৌনমনস্তত্ত্ব নিয়ে আমি কোনোপ্রকার পরীক্ষার-নিরীক্ষার মধ্যে যাইনি। যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা হতে পারে ভেবেছি, তাই লিখেছি। আপনার উল্লেখিত সব কটি গল্পেরই বাস্তব-ভিত্তি আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে ছাত্রনেতাদের দ্বারা ধর্ষিতা মেয়ের গল্প ‘গিরগিটি ও একজন মেয়ে’, টিএসসিতে থার্টি ফাস্ট নাইটে বা বাংলা নববর্ষে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে মেয়েদের শ্লীতাহানির ঘটনা নিয়ে লেখা গল্প ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ১৪২২’ এরকম প্রত্যেকটি গল্প-ই কোনো না কোনোটি ঘটনার প্রেক্ষিতে লেখা, যে ঘটনাটি আমাকে ভীষণভাবে আহত ও আলোড়িত করেছে। এত তো বলা সময় নেই, শুধু ‘বাড়ন্ত বালিকার ঘর-সংসার’, গল্পটির প্রেক্ষাপটই বলি। আমার বয়স তখন নয় কি দশ বছর। আমার বন্ধুর বোনের বিয়ে, যার বয়স বন্ধুর চেয়ে এক কি দু’ বছরের বড় অর্থাৎ ১১ কি ১২। বিয়ে হয়েছে যে পুরুষটির সঙ্গে তার বয়স ২৬/২৭ হবে, হৃষ্টপুষ্ট শরীর, মহিষের মতো কালো ঘাড়মোটা, বুক চওড়া। বিয়ের কার্যাদি শেষে বরের বাড়ি পৌঁছতে রাত ১১ টা। আমি, আমার বন্ধু আর আমার বন্ধুর দাদি কনের সাথে গেলাম বরের বাড়ি। আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ১টার দিকে সবাই শুয়ে পড়েছে। বরের ঘরের দুই ঘর পরের ঘরে আমাদের তিনজনের থাকার ব্যবস্থা। ক্লান্ত, ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই লাফিয়ে ওঠি। বন্ধুর বোনের সে কী আর্তনাদ! বাঁচাও বাঁচাও বলে। কিন্তু কেউ ঘরের দরজা খোলেনি। আমি আর বন্ধু দু’জনেই দাদিকে ডেকে তুলি, দাদি, বুবুকে তো মহিষের মতো লোকটা মেরে ফেলল। বুবু কী করেছে? বুবুকে মারছে কেন? দাদি তখন জেগেই ছিল, তোরা বুঝবি না, তোরা ঘুমা। দীর্ঘক্ষণ চিৎকার শুনেছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে বুবুর ঘরে গিয়ে দেখি, রক্তের উপরে শুয়ে আছে, সম্পূর্ণ অচেতন, চোখ দুটো বন্ধ, লাশের উপরে কাপড় বিছিয়ে দেবার মতো বুবুর উপরে বিয়ের শাড়িটা বিছিয়ে দেয়া। বরের মা দাদির কাছে সে কী রাগ, হ্যাঁ, মেয়েকে কী শিক্ষা দিয়েছেন? এত বড় মাইয়া! এই ঘটনা আজও আমি ভুলতে পারি না। নারীর জীবনে এই রকম করুণ বাস্তবতার অভাব নেই। এরকম প্রত্যেকটি গল্পের প্রেক্ষাপট আছে, যেগুলো আমার অক্ষয় স্মৃতির অংশ। ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনাকে গল্পের বিষয় করলে লেখককে দুটি দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সমসাময়িক বাস্তবতার তথা সময়ের দায় রক্ষা করতে হয়, আবার সময়ের পাক থেকে বেরিয়ে এসে চিরকালীনতাকে স্পর্শ করতে হয়।

বি.ভূ.ম : বলা হয়ে থাকে যে, বাংলাসাহিত্যে শরৎচন্দ্রই সবচেয়ে নারীদরদী লেখক। নারীর বেদনা তাঁর মতো করে আর কেউ উপলদ্ধি ও চিত্রিত করতে পারেন নি। আপনি যখন আপনার কোনো গল্প বা উপন্যাসে একটি নারীচরিত্র অংকন করেন তখন নারী সম্পর্কে আপনার কোন কোন ভাবনা আগে মনে আসে?

চ. আ : শুনুন, আমার বেশির ভাগ গল্পে এবং এ পর্যন্ত প্রকাশিত দুটো উপন্যাসে নারী-চরিত্র যথেষ্ট প্রাধান্য পেয়েছে। তারা নারী হিসেবে কিন্তু আমার অনুকম্পা বা প্রাধান্য পায়নি। তাদেরকে দেখেছি মানুষ এবং নির্যাতিত ও পিছিয়ে পড়া বলেই আমার দৃষ্টি বেশি পড়েছে। যে ব্যাখ্যা-ই বলুন, নারীর প্রতি বৈষম্য, নারী নির্যাতন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার চালু সংস্কার, ধর্ম-ব্যবস্থা সর্বক্ষেত্রেই পার্থক্যের দেয়াল তুলে দেয়া আছে। একটা সময় আমার বিশ্বাস ছিল, নারী উচ্চশিক্ষিত হলে, আর অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হলে সে স্বাধীন ও স্বাবলম্বী হবে। বাস্তবে দেখা কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে এই বিশ্বাস থেকে আমি সরে এসেছি। বড় পদ আর অর্থ-স্বাচ্ছন্দ্য নারীকে স্বাধীনতা দেয় না, যতোক্ষণ নারী নিজে স্বাধীন হতে চায়। বাঙালি নারীদের সমাজবাস্তবতা আর মনোজগতের গড়ন এমনি যে, সে শেষ পর্যন্ত স্বামী ভাই বা সন্তানের আশ্রয়ছাড়া নিজের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব কল্পনা করতে পারে না।

বি.ভূ.ম: আপনার গল্পে নারী স্বাধীনতার স্বপ্ন, নারীর জীবনসংগ্রাম, নারীর স্বাবলম্বী হবার প্রয়াস-প্রভৃতি বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘আমি কেউ নই’, ‘পাঁচশ টাকার নোট’ প্রভৃতি গল্পের কথা এই প্রসঙ্গে মনে আসে। একজন নারী লেখকের চোখে নারী এবং একজন পুরুষ লেখকের চোখে নারী-এই দেখার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা কোথায়?

চ. আ : প্রথমত, আপনাকে বলি, নারী লেখক পুরুষ লেখক এই পার্থক্যটি আমি মানতে রাজি নই। যিনি লেখক তিনি লেখক-ই। নারী কী আর পুরুষ কী। যিনি লিখতে বসেছেন, তিনি এই চিন্তা মাথায় নিয়ে যদি বসেন, তাহলে তার লেখাটা একদিকে ঝুলে পড়বে। আবার, নারী-পুরুষের জৈবিক পার্থক্যের জায়গাটি অস্বীকার করা যায় না। নারীর সৌন্দর্য নারীত্বে, পুরুষের সৌন্দর্য পৌরুষত্বে। এখানে ছোট-বড় পার্থক্যের কোনো বিষয় নয়। কতগুলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আর জৈবিক অনুভূতির পার্থক্য ছাড়া নারী-পুরুষের পার্থক্য নেই। সুতরাং যিনিই লিখবেন, চরিত্র নির্মাণ করবেন, তিনি নারী হোক আর পুরুষ হোক, তাকে নোম্যান্স ল্যান্ডে এসে দাঁড়াতেই হবে। মানুষ তার অভিজ্ঞতার বাইরে যেতে পারে না। শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটি লেখক নিজকেই নির্মাণ-বিনির্মাণ করেন তার অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে। নির্মিত প্রতিটি চরিত্রই লেখকের সাথে একটি গভীর বন্ধনে জড়িয়ে থাকে। নারী বা পুরুষ লেখক বলে নয়, প্রত্যেক লেখকেরই দেখার স্বতন্ত্র এবং মৌলিক পার্থক্য আছে।

বি.ভূ.ম: দেশভাগ এবং দেশভাগের ফলে উদ্বুত সমস্যাবলি নিয়ে ‘অনিরুদ্ধ টান’, ‘ইচ্ছামৃত্যু’. ‘ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ’ প্রভৃতি গল্প লিখেছেন। এমনকী আপনার ‘অর্পিত জীবন’ উপন্যাসেও দেশভাগের প্রসঙ্গ এসেছে। দেশভাগের প্রসঙ্গে উর্দুসাহিত্য যতখানি সরব বাংলাসাহিত্য ততটা সরব নয়। আবার পশ্চিম বাংলার সাহিত্য যতটা মুখর বাংলাদেশের সাহিত্য অপেক্ষাকৃত নীরব। এই কারণগুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন?

চ. আ : সত্তরের দশকে আমার জন্ম অর্থাৎ দেশভাগের বহুকাল পরে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, দেশভাগ নিয়ে কেন আমি লিখছি? কী অভিজ্ঞতা আমার আছে? আমি আসলে দেশভাগের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখছি না, আমি লিখছি দেশভাগের অভিঘাত নিয়ে, যে অভিঘাতের ভেতর দিয়ে আজও আমরা যাচ্ছি। আমি পূর্বেই বলেছি, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ফলে দুটো দেশের জন্ম হয়নি, দুটো বিষবৃক্ষের জন্ম হয়েছে, যে বিষবৃক্ষের মরণ নেই। এই বিষবৃক্ষের বিষ যে কতো ভয়ঙ্কর আমরা বাঙালিরাই সবচেয়ে বেশি টের পেয়েছি। দীর্ঘ তেইশ বছরের স্বাধিকার লড়াই, ভাষার লড়াই, শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, সম্ভ্রম, সম্পদ বিসর্জনের ভেতর দিয়ে বিষবৃক্ষের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছি। স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু আপনি আমাকে বলুন তো, ‘পাকিস্তান’ নামক বিষবৃক্ষের ছায়া থেকে আমরা কী সত্যিই বেরিয়ে আসতে পেরেছি? তাহলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শুধু নয়, সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে এদেশের মানুষ হত্যা করেছে, সম্পদ লুট করেছে, নারীর সম্ভ্রম ছিনিয়েছে, তারা কী করে স্বাধীন দেশে পুনর্বাসিত হয়? যুদ্ধাপরাধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কী করে স্বীকৃতি পায়? পুনর্গঠিত হয়, ক্ষমতায় যায়? পাকিস্তানি বিষবৃক্ষের ছায়া নেই বাংলাদেশের এমন এক খ- ভূমি আমাকে দেখাতে পারবেন? তাহলে কী করে ভুলব আমি ধর্মের নামে দেশভাগের সেই রাজনৈতিক প্রহসনকে? লজ্জায় ঘৃণায় অপমানে নত হয়ে আসে আমার মাথা, যখন ভাবি, আমার জন্মভূমি আমার বাংলা ভুখ-কে তারা পূর্ব পাকিস্তান নাম দিয়েছিল। পবিত্র বানাতে চেয়েছে বাংলাকে অর্থাৎ বাংলা অপবিত্র স্থান, বাঙালি অপবিত্র জাতি। ভারত-পাকিস্তান নামের দুই বিষবৃক্ষের সম্পর্কটা দেখেন। পরস্পরের দিকে পরস্পর খুনির চোখে তাকিয়ে থাকে। সুযোগ পেলেই ট্যাংক গোলা বারুদ নিয়ে এগিয়ে আসে একে অপরকে হত্যা করার জন্য। পৃথিবীর ইতিহাসের দেশভাগের মতো এতো বড় ট্রাজেডি আর ঘটেনি, এ আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি। আড়াই হাজার বছরের অধিককাল ধরে গড়ে ওঠা একটি জাতিকে রাতারাতি দুখ- করে দুটি বিষবৃক্ষের ঢাল করে দিল, চিরদিনের জন্য একই ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির একটি সুগঠিত জাতিকে শুধু ধর্মের নামে এভাবে আলাদা করে ফেলল, এর চেয়ে ভয়ঙ্কর পাপ আর কী হতে পারে। এই পাপ আমি করিনি, এই পাপের সাথে আমার পূর্ব পুরুষের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমাকে, আমার পূর্ব পুরুষকে এবং আমার পরবর্তী প্রজন্মকে করে যেতে হবে। আমি সম্প্রতি পশ্চিম বাংলায় গিয়েছিলাম। আমার চোখ কখনোই শুকায়নি, বুকের ভেতরে হাহাকার করে উঠেছে। আমি বাংলাদেশি ওরা ভারতীয়, পার্থক্য কোথায়? বিন্দু পরিমাণ পার্থক্য নেই। আমার দেশের সাহিত্য নিয়ে বক্তৃতা করছি, সবাই শুনছে। তারা একবারও ভাবেনি হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক এঁরা পশ্চিম বাংলার সাহিত্যিক নন। আবার শঙ্খ ঘোষ, দেবেশ রায়, মহাশ্বেতা দেবী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সাধন চট্টোপাধ্যায়, শচীন দাশ, অমর মিত্র, সৌমিত্র লাহিড়ীদের নিয়ে যখন বক্তৃতা করছি, তখন একবারের জন্যও আমার মনে হয়নি, তারা পশ্চিম বাংলার লেখক। দেশভাগ করলেন, বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথকে ভাগ করতে পারলেন? নজরুল-সুকান্ত-মানিক-তারাশঙ্করকে ভাগ করতে পারলেন? বাঙালির সাংস্কৃতিক বন্ধনটাকে ছিঁড়তে পারলেন? পশ্চিম বাংলাকে কেন আমার কাছে বিদেশ মনে হয় না, এই ব্যাখ্যা কে দেবে আমাকে? আমি খুব কষ্ট পাই, যখন দেখি, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের প্রাণকেন্দ্র কলকাতার বুকে লাখ লাখ বাঙালির সামনে বক্তৃতা করছে ুহিন্দিতে, যেখানে একজনও হিন্দিভাষী লোক নেই। আমি হিন্দি ভাষার বিপক্ষে নই, কোনো ভাষারই বিপক্ষে নই, কিন্তু একবার ভাবুন, হিন্দির তুলনায় বাংলা ভাষার ঐতিহ্য, প্রাচীনত্ব, গৌরবের বিষয়টি। ভারতেরর দিল্লি গুজরাট মহরাষ্ট্রের কোনো জনসভায় বাঙালি নেতা কী এভাবে বুক উঁচিয়ে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করতে পারবেন? বলুন পারবে? একসময় বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষাই শাসন করেছে। লতা মঙ্গেশকর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর আমলে শিল্পী হতে হলে তাকে আগে ভালোভাবে বাংলা ভাষা ও গানকে শিখতে হতো। আর আজকের বাস্তবতা কোথায় দাঁড়িয়েছে? একটি বাক্যও বাংলা না বলে, শুধু হিন্দি ভাষা দিয়ে কলকাতা শহরে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারবেন। দেশভাগ এই বাস্তবতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের। এই বেদনা কী আমার নয়? আমি দেশভাগকে আমার সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ শক্তির জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যান করি, এ আমার ধৃষ্টিতা নয়, এ আমার অধিকার ও কর্তব্য; কারণ, দেশভাগের অভিঘাতের ভেতর দিয়ে আমাকে যেতে হচ্ছে, যা আমি কোনোদিনই মানতে পারি না। যদি পাকিস্তানের লেজুড় হিসেবে বাংলার একাংশ জুড়ে না দেওয়া হতো তাহলে এতো বড় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতেনাা বাঙালিকে, ভাষার জন্য জীবন দিতে হতো না।

বি.ভূ.ম : দেশভাগ নিয়ে বাংলাসাহিত্যে বেশকিছু ছোটগল্প, কবিতা এবং উপন্যাস লেখা তো হয়েছে। দেশভাগের এতগুলো বছর পরে আপনি নতুন করে আবার কেন দেশভাগ নিয়ে গল্প লেখার প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করেছেন?

চ. আ : এই যে বললাম, আমি আমার সামর্থ্যরে চূড়ান্ত জায়গা থেকে দেশভাগকে প্রত্যাখ্যান করি। দেশভাগের অভিঘাতে মধ্যে দিয়ে আমি আপনি সবই যাচ্ছি। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের কারণে বাঙালি জাতি দ্বিখ-িত আজ। অন্নদাশঙ্কর রায়ের সাথে আলাপচারিতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাঙালি এক হলে কী না করতে পারত। তারা জগৎ জয় করতে পারত। আমিও তাই বিশ্বাস করি। পশ্চিম বাংলার একুশ শতক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আমার তিরিশটি গল্পের সংকলন ‘নির্বাচিত ৩০’ এর ভূমিকাপত্রে লিখেছিলাম, ‘হয়তো আমি দেখে যেতে পারব না, এমনকি আমার পরের কয়েক প্রজন্মও না দেখে যেতে পারে, আমার স্বপ্ন যদিও দুর্নিরীক্ষ্য, তবু আমি বিশ্বাস করি, বাংলা ভাষা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত বন্ধন-শক্তির জোরেই কালপ্রবাহের কোনো এক সময় বাঙালির একটি অভিন্ন জীবনধারা বিনির্মিত হবে।’

বি.ভু.ম : আপনার গল্পগুলো সমসাময়িক যুগযন্ত্রণার বাস্তব এবং শিল্পিত কথাচিত্র। মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি ও সমাজবাস্তবতা, নারী-পুরুষের মনস্তত্ব, পুঁজিবাদ, বিশ্বায়ন প্রভৃতি বিচিত্র বিষয় আপনার গল্পের জমিনকে সমৃদ্ধ করেছে। এতসব বিভিন্নমুখী বিষয়কে আপনি পারস্পরিক সূত্রে গ্রোথিত করলেন কীভাবে?

চ. আ : ছোটগল্পের ধারণা ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে। একটা সময় ছোটগল্পকে সংজ্ঞায় ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজে সংজ্ঞা দিয়ে সেই সংজ্ঞা আবার নিজেই ভেঙে গেছেন। ছোট প্রাণ আর ছোট ব্যথা নিয়ে একটি নির্দিষ্ট কোনো বিষয় বা অনুভূতি নিয়ে ছোটগল্প হবে, এই ধারণা থেকে ছোটগল্প বেরিয়ে এসেছে। আসলে ছোটগল্প এমন এক শিল্পমাধ্যম, তাকে কোনোমতেই কোনো সংজ্ঞা দিয়েই বেঁধে রাখা সম্ভব না। লেখক মানেই তো জীবনের বহুমুখী অনুবাদক। একটি জীবনের সাথে রাজনীতি অর্থনীতি সমাজ যৌনতা মনস্তত্ত্ব সবকিছুই জড়িয়ে থাকে। কান টানলে মাথা আসার মতো একটি ধরলে আরেকটি এমনিতেই চলে আসে। ইচ্ছে করে সবক্ষেত্রে যে ঘটে তা নয়। বহুমুখী বিষয় স্রোতের মতো সহজাতভাবেই চলে আসে।

বি.ভূ.ম: আপনি সময়, সমকাল ও রাজনীতি-সচেতন লেখক, সেকথা আগেই বলেছি। আপনার ’আমাদের যুবকনেতা’ সহ আরও কোনো কোনো গল্পে উক্ত প্রসঙ্গের উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে। ‘একজন লেখকের চোখে রাজনীতি’-এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

চ. আ : লেখকরা সাধারণত সরসারি রাজনীতিবিদ নন, কিন্তু রাজনীতি সচেতন অবশ্যই। রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। আধুনিক কালে তো রাজনীতি আরও জটিল হয়ে গেছে। শুধু দেশের রাজনীতি সচেতন হলেই হবে না, আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। টুইন টাওয়ার ভেঙে যায়, আর কর্মী ছাটাই হয় আমাদের দেশের পোশাক কারাখানায়, আমাদের অর্থনীতির ধ্বস নামে, অর্থ কী দাঁড়াল? সাইকেলের চেইনের মতো দুনিয়াটা একটি চেইনের মধ্যে বন্দি। করোনা ভাইরাস এসে তো জানিয়ে দিল, পৃথিবীটার আসলে একটিই দেহ, একই প্রকৃতির বা সত্তার অধীনে। যতোই আমরা দেশ জাতি ধর্ম ভাষা সংস্কৃতির সীমানা রেখা টানি না কেন, পৃথিবী নামক গ্রহে কেউ কারো থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, কাউকে অবহেলা করার নয়। শরীরের কোন একটি অংশকে যেমন অবহেলা করা যায় না।

বি.ভূ.ম: ‘কাফন চোর’, ‘অন্তর্গত শূণ্যতা’, ‘বারবণিতা এসোসিয়েশন’ প্রভৃতি গল্পে সমাজের অবহেলিত এবং ঘৃণিত তিনটি নিম্নবর্গের মানুষ-চোর, হিজড়া এবং পতিতাদের জীবনযন্ত্রণার হাহাকার, দারিদ্য্র, অপ্রাপ্তি, ব নার চিত্র বিধৃত হয়েছে। আপনি এদের অনুভূতিকে কীভাবে স্পর্শ করলেন?

চ. আ : অনুভূতিগুলো কীভাবে যে এসে যায়, আমি বহুক্ষেত্রেই বলতে পারি না। কোনো একটি অনুভূতি বা ঘটনা যখন মনের মধ্যে স্পর্শ করে, আলোড়ন তৈরি করে, তখনি গল্পে রূপ দেবার ইচ্ছে জাগে। সবই যে পারি তা কিন্তু নয়। বিশেষ কোনো অনুভূতি বা ঘটনা হয়তো আমি দীর্ঘকাল ধরে মনের মধ্যে পুষে রাখছি। কিছুতেই ধরে উঠতে পারছি না কীভাবে গল্পের আখ্যানটি সাজাবো? কীভাবে শুরুটা হবে? গল্পটির মধ্য দিয়ে কী অভিঘাত তৈরি করতে পারব? ইত্যাদি। হঠাৎ দেখা গেল, একদিন প্রথম দুটি লাইন অথবা শেষের দুটো লাইন মাথায় এসে গেল। এরপর আর অপেক্ষা করি না। ‘অন্তর্গত শূন্যতা’ গল্পটি ট্রেনে ঈশ্বরদী যাবার পথে দেখা একটি ঘটনা। এই পথের ট্রেনে হিজড়ারা টাকা তুলে বেড়ায়। একদিন এক ভদ্রলোকের সাথে বিরাট ফ্যাসাদ, কারণ ভদ্রলোক এক হিজড়ার শরীর নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছেন। কিছুতেই ভদ্রলোককে ছাড়ে না, প্যান্ট খুলে ন্যাংটো করেই ছাড়বে। শেষে ক্ষমা চেয়ে মুক্তি মেলে। ‘বারবণিতা এসোসিয়েশন’ গল্পটি মূলত একটি রাজনৈতিক গল্প। আপনি জানেন, মধ্যযুগের রাজা-বাদশাহর আমলে বাঈজী-পতিতরা এলিটশ্রেণির মর্যাদা পেতো। বিশাল ক্ষমতা ছিল তাদের। আধুনিককালের পতিতরা সমাজের পতিত শ্রেণি। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার লাইনগুলো আমার স্মৃতিতে ছিল, বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করার চলে/রাজনীতিকের ধমনী শিরায় শিরায় সুবিধাবাদের পাপ।/বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে/বুদ্ধিজীবীর রক্ত স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ।’ আর ‘কাফর চোর’ গল্পটি ছেলেবেলায় শোনা নানা ভৌতিক গল্প-কিচ্ছার স্মৃতি থেকে লেখা।

বি.ভূ.ম: প্রতিটি মানুষের মধ্যেই মৃত্যুভাবনা কাজ করে। তবে গড়পড়তা আয়ুর হিসেবে জীবনের একটি নির্দিষ্ট পর্বে এসে এই ভাবনা তীব্র হয়ে ওঠে। আপনার ‘স্বাইপে ও দুটি মৃত্যুমুখ’, ‘মৃত্যুবিষয়ক কবিতাপ্রেমী’, ‘সিদ্ধিকাব্য’ প্রভৃতি গল্পে আপনি মৃত্যুকে নানাভাবে দেখতে চেয়েছেন। মৃত্যুর মতো এমন নিঃষ্ঠুর এবং হতাশাব্যঞ্জক একটি বিষয় নিয়ে আপনি এখনই এতটা ভাবিত হলেন কেন?

চ. আ : মৃত্যুচিন্তা আমার জীবনের শৈশব থেকেই ধরেছে। যেহেতু মক্তবে লেখাপড়া দিয়ে শুরু, কবর, বেহেস্ত, দোজখ এই বিষয়গুলো নিয়ে খুব আলোচনা হতো। জলসা হতো আমাদের বাড়িতে। বাড়ি থেকে হাফ-কিলোমিটার দূরের আলিয়া মাদরাসায় তিনদিনব্যাপী ধর্মীয় মাহফিল হতো। সর্বত্রই মৃত্যু বিষয় আলোচনা, মৃত্যুর পরে কবরের আযাব, দোজখের আযাব ইত্যাদি বিষয়গুলো শিশুমনেই ভীষণ প্রভাব ফেলেছিল। মৃত্যুচিন্তা ও মৃত্যুভয় ভীষণভাবে তাড়া করেছে। ছেলেবেলা খাবার প্লেট থেকে একটি ভাত পড়লেই দাদি বা নানি বলতো, একটি ভাত সত্তরটি সাপ হয়ে কবরে ছোবল দেবে, এই ভয়ে সর্বদাই শঙ্কিত থেকেছি। পরিণত বয়সেও মৃত্যুচিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। অবশ্যই এখন অনেকটাই মৃত্যুচিন্তাকে নিজের বশে এনেছি। জেনে গেছি, মৃত্যু আমার জীবনে, জীবজগতের প্রতিটি প্রাণির জীবনেই অমোঘ নিয়তি। মৃত্যু আমার কন্যার মতো। যে কোন মূহূর্তে আমাকে ধরতে পারে। বয়স যতো বাড়ছে, মনে হয়, মৃত্যু খুব কাছেই আছে, একেবারে নিশ্বাসের নাগালে, যে কোনো মুহূর্তে তাঁর হাতের মুঠোয় বন্দি হওয়াই আমার মানবজীবনের নিয়তি। আমার গল্প-উপন্যাসে মৃত্যু একটি বেশিই এসেছে। অবশ্য মৃত্যুগুলো এসেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে। আমি প্রচ- রকমের জীবনবাদী মানুষ। মৃত্যুকে নিয়ে এখন আর ভাবি না। কারণ, আমি ভেবে কিছুই করতে পারব না। নৈঃসঙ্গ্য ও মৃত্যুচেতনা আমার অনেক গল্পেই এসেছে।

বি.ভূ.ম : প্রত্যেক লেখকই সূচনাপর্বে একজন পূর্বসূরি লেখক দ্বারা প্রভাবিত এবং অনুপ্রাণিত হন। পরে স্বমহিমায় আত্মপ্রকাশ করেন। আপনার ক্ষেত্রেও কি এমন কিছু ঘটেছে?

চ. আ : পূর্বসূরী সকল লেখকের ঋণই আমি স্বীকার করি। কিন্তু সচেতনভাবে আমি কোনো লেখকের দ্বারা প্রভাবিত হইনি। অবচেতনভাবে তো হতেই পারে, হয়তো হয়েছেও। আমার লেখায় যদি পূর্বসূরীর কোন একজন বা একাধিক লেখকের প্রতিধ্বনি শোনা যায় বা প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, তাহলে আমি অখুশি হবো না। কারণ, আমি আকাশ থেকে নেমে আসিনি, সকলের লেখা পড়েই বড় হয়েছি, লেখকসত্তা গড়ে উঠেছে। তবে এটা সত্য, আমার লেখকসত্তায় প্রথম যে প্রভাব সবচেয়ে সক্রিয় এবং আজ পর্যন্ত আমাকে ধাবিত করে সেই দিকে তা হলো আমার শৈশবে বাড়ির রাখাল-গাড়োয়ান-মনিষদের কাছে শোনা কিসসা-কাহিনি।

বি.ভূ.ম: বিশেষ কোনো মতবাদ বা সাহিত্য আন্দোলন কী আপনাকে প্রভাবিত করেছে?

চ. আ : আমি যেখানে লেখক সেখানে ইজম বা মতবাদ অথবা সাহিত্যের কোন আন্দোলন অর্থহীন। এসবের দিকে তাকিয়ে লিখতে হলে নিজের লেখা হবে না। কামারশালায় গিয়ে কেউ যদি একটি কাস্তে দেখিয়ে বলে ঠিক একই রকম একই মাপজোখের একই ধারের একটি কাস্তে বানিয়ে দাও তো, তাহলে কী দাঁড়াবে? কামারের কিছুই করার নেই। ভাবার নেই। সব কিছু করে রেখেছে, ভেবে রেখেছে যিনি প্রথম কাস্তেটি বানিয়েছেন তিনি। একইভাবে কোনো বিশেষ ইজম বা মতবাদের দিকে তাকিয়ে কিছু লিখলে শেষ পর্যন্ত লেখকের নিজের বলে কিছুই থাকবে না। যদি কোন লেখা কোন ইজম বা মতবাদের ব্যাখ্যায় চলে আসে, তাহলে তা সম্পূর্ণ আমার নিজের অজান্তেই ঘটে থাকবে। পশ্চিম বাংলার বিখ্যাত কথাশিল্পী সাধন চট্টোপাধ্যায় আমার গল্পের উপরে বড় একটি আলোচনা লিখেছিলেন। সেখানে ‘কাফন চোর’ গল্পটি সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘ ‘শিল্পের সুনিয়ন্ত্রণে ‘কাফন চোর’ গল্পে যাদুবাস্তবতাকে যে-ভাবে প্রয়োগ করেছে, মনে হবে বাংলার কোনো রূপকথা পড়ছি। লাতিন আমেরিকার ধার করা কিছু নয়।’ আমি প্রথমে বিস্মিতই হয়েছি। গল্পটি যে যাদুবাস্তবতার ধারনায় ফেলা যায়, আমি ভাবিনি কখনো। লেখার সময় তো অবশ্যই না।

বি.ভূ.ম : আপনি যে সমালোচনাটির প্রসঙ্গ তুলেছেন সেখানেই সাধন চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন ‘চন্দন আনোয়ার প্রায় সকল গল্পের শুরু থেকেই আখ্যানে চাপা একটি টেনশন তৈরি করেন। কাহিনির কোন ঘনঘটা থাকে না। পাঠক টেনশনের সুতো ধরে ক্রমশ কৌতূহলকে মেলতে মেলতে, শরীরের সম্প্রসারিত অংশ নিয়ে ক্রমশ দেশ হয়ে ওঠে।’ এই সম্পর্কে আপনার কী অভিমত? আপনার আখ্যান নির্মান কৌশল যদি বলতেন?

চ. অ : বাংলা সাহিত্যে জীবিত বর্ষীয়ান যশস্বী লেখকদের মধ্যে সাধন চট্টোপাধ্যায় একজন। তিনি আমার গল্পের উপরে বড় একটি প্রবন্ধ লিখেছেন, এই আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের। তাঁর মন্তব্যকে আমি খ-ন করছি না, বরং সমর্থনই করি। তবে প্রতিটি আখ্যান নির্মাণের পূর্বে আঘাতের একটি লক্ষ্যবিন্দু স্থির করি। তারপর সেদিকে এগিয়ে যাই। গল্পটি পড়া শেষে পাঠক যেন একটু ভাবে, তার মনোজগতে সামান্য হলেও আলোড়ন ওঠে, ক্রোধ-অসন্তুষ্টি জন্মে, এই প্রচেষ্টা থাকে।

বি.ভূ.ম : প্রত্যেক প্রতিশ্রুতিশীল লেখকেরই সাহিত্য সাধনার একটি উদ্দেশ্য থাকে। অর্থাৎ সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি বিশেষ কোনো বার্তা বা মেসেজ পৌঁছে দিতে চান। আপনার সাহিত্য চর্চার পেছনে সেই বিশেষ লক্ষ্যটি কী?

চ. আ : শুনুন, আমি দুটো কাজ করি। একটি শিক্ষকতা আর একটি এই সামান্য লেখালেখি। দুটো কাজের ক্ষেত্রেই আমি সক্রেটিসের কথাগুলো মানি। সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘আমি আমার মাতার ব্যবসা অবলম্বন করেছি।’ কথাটির অর্থ হলো, নারীর গর্ভে সন্তান আছে, নারীর রক্ত-মাংসেই সন্তান বেড়ে ওঠে পেটে, কিন্তু প্রসূতি নারী কী নিজেই তাঁর সন্তান পৃথিবীর আলোতে আনতে পারে। একজন ধাত্রীর প্রয়োজন হয়। সক্রেটিস নিজেকে পুরুষধাত্রী বলেছেন, তার দায়িত্ব জ্ঞান-শিশুর জন্ম দেয়া, কাউকে জ্ঞানী করা নয়। বরং ঐ শিশুটি প্রকৃতি রাজ্যে জন্ম নিয়েছে যে অপরিমেয় শক্তি ও সম্ভাবনা নিয়ে, তার যেন পূর্ণ বিকাশ ঘটে, তার দিকে ধাক্কা মেরে লেলিয়ে দেয়া। আমিও শিক্ষকতা ও লেখালেখিকে এই অর্থে গ্রহণ করেছি। কাউকে জ্ঞানী করা বা কাউকে মহৎ মানুষ করার উদ্দেশ্যে আমি শিক্ষকতাও করি না, লিখিও না।

বি.ভূ.ম: আপনার গল্প-উপন্যাস আ লিক ভাষার ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। অ লভেদেও আ লিক ভাষার পার্থক্য রয়েছে। কথাসাহিত্যে আ লিক ভাষার প্রয়োগ সম্পর্কে আপনার নিজস্ব মূল্যায়ন কী?

চ. আ : সাহিত্যের আ লিক ভাষা একার্থে লেখকের স্বনির্মিত ভাষা। আমি বলি ফিল্টার করা ভাষা। ধরুন, কল থেকে বা নদী-পুকুর থেকে আপনি জল নিয়ে এসে ফিল্টারে দিলেন, তারপর যে জল আসে সেই জল তো নদী-পুকুর বা কলের জল, কিন্তু তার মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটেছে। এখন ধরুন, আমি নরসিংদীর অ লের ভাষায় লিখছি, এমনকি নিজেও নরসিংদীর অধিবাসী, কিন্তু আমি কি সেই মানুষটি কখনো হবো যে মানুষটি শিক্ষিত হয়নি, নিরেট আ লিক ভাষায় কথা বলে। আমি যতোই নরসিংদীর অধিবাসী হই না কেন, আমার ভেতরটা তো শিক্ষিত; সেখানে পরিশীলিত ভাষার চর্চা চলে নিয়মিত। ফলে আমি আর কখনোই নরসিংদীর আ লিক ভাষায় লিখতে পারব না। মাঠের কৃষক, জেলে বা অন্যরা যে অকৃত্রিমভাবে আ লিক ভাষায় কথা বলে সেই ভাষায় কখনোই বলতে পারব না, সেই ভাষা হুবহু লিখতেও পারব না। আমার আ লিক ভাষা ফিল্টার করা পানির মতো। এজন্যই আমি বলি, সকল লেখকের আ লিক ভাষাই তার স্বনির্মিত ভাষা। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ অথবা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ কিংবা ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের ভাষা কী পরিপূর্ণভাবে সেই অ লের মানুষের মুখে ভাষা? নিপুণভাবে লক্ষ্য করলে পার্থক্য অবশ্যই বের হয়ে আসবে।

বি.ভূ.ম: একজন লেখক এক রকম ভাবনা থেকে গল্পটি লেখেন। পাঠক হয়তো আরেক রকম ভাবনা নিয়ে গল্পটি পড়েন। লেখক-পাঠকের ভাবনাটি সমান্তরাল না হয়েও কি পারস্পরিক কমিউনিকেশনটি যথার্থভাবে সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

চ. আ : পাঠকের ভাবনা আর লেখকের ভাবনার ঐক্যসূত্র কোনোদিন ঘটানো সম্ভব না। আমি যখন লিখছি তখন সম্পূর্ণ এক ও নিঃসঙ্গ একজন মানুষ, আর রয়েছে আমার চরিত্ররা। আমি দেখেছি, আমি যা ভেবে চরিত্র নির্মাণ করেছি বা আখ্যানটি লিখেছি, পাঠকের কাছে তা সম্পূর্ণ নতুন একটি ব্যাখ্যা দাঁড়িয়েছে। কেউ যখন বলেন, এখানে এই ব্যাখ্যা দাঁড়ায়। আমি তখন বিস্মিত হই, এই ব্যাখ্যাটাও তো হতে পারে। লেখার সময় কিন্তু মোটেও ভাবিনি। পাঠক যদি ভুল পাঠ গ্রহণ করে, লেখকের কিছুই করার থাকে না। কারণ লেখক তো আর পাঠকের কাছে ব্যাখ্যা দিতে পারে না বা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারে না। এছাড়া প্রত্যেকটি মানুষের বাস্তবতা আলাদা, মনোজগৎ স্বতন্ত্র। আমি ‘পদ্মানদীর মাঝি’র কপিলা-কুবেরের প্রেমকে যেভাবে গ্রহণ করব, আপনি হয়তো সেভাবে করছেন না। আবার মানিক নিজে কুবের-কপিলার সম্পর্ককে যেভাবে ভেবেছে আমি হয়তো সেভাবে ভাবছি না। অর্থাৎ প্রত্যেক পাঠকই প্রতিটি চরিত্রের বা আখ্যানের পুনর্নির্মাতা। এ কারণে, কেউ যদি আপনার ওমুক লেখাটি কিছুই হয়নি বলে আমি রুষ্ট হই না; কারণ, তার পাঠককেই আমি চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করব কেন? সব লেখা সকলের কাছে সমান শক্তি ও বাস্তবতা নিয়ে যায় না।

বি.ভূ.ম : গল্প-উপন্যাস রচনার পাশাপাশি আপনি বহুসংখ্যক প্রবন্ধ লিখেছেন, যেগুলো বিভিন্ন নামে বই হয়েও বেরিয়েছে। এই দু’টো মাধ্যমকে কি আপনার সাংঘর্ষিক মনে হয়? কোন মাধ্যমে আপনি বেশি আনন্দ এবং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন- রসসাহিত্যে নাকি প্রবন্ধে? কেন?

চ. আ : গল্প-উপন্যাস নিয়েই মেতে থাকি। অবশ্যই প্রবন্ধও লিখি। প্রবন্ধ লেখাটা অনেকক্ষেত্রে অনুরোধের প্রেক্ষিতে ঘটে থাকে। এই করে বেশ কিছু প্রবন্ধই লেখা হয়েছে।

বি.ভূ.ম: এমন একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সময় দেবার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

চ. আ : আপনাকেও ধন্যবাদ জানাই।

[চন্দন আনোয়ার,গল্পকার,ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক,গবেষক ও সম্পাদক। জন্ম ১৯৭৮ সালে নাটোরে। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার কর্মজীবন শুরু হয় সরকারি কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে। পরে তিনি ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (আইবিএস), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি আর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত। গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ মিলিয়ে এ পর্যন্ত চন্দন আনোয়ারের ১৫ মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ সম্মাদনা করেছেন। তাঁর গল্পগ্রন্থ : প্রথম পাপ দ্বিতীয় জীবন; ২. অসংখ্য চিৎকার ; ৩. পোড়োবাড়ি ও মৃত্যুচিহ্নিত কণ্ঠস্বর, ৪. ইচ্ছামৃত্যু ইশতেহার; ৫. ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ; ৬. নির্বাচিত ৩০। উপন্যাস : ১. শাপিতপুরুষ; ২. অর্পিত জীবন। প্রবন্ধগ্রন্থ : ১. বাংলা ছোটগল্প ও তিন গোত্রজ গল্পকার : মানিক-হাসান-ইলিয়াস; ২. উজানের চিন্তক হাসান আজিজুল হক; ৩. হাসান আজিজুল হকের কথাসাহিত্য : বিষয়বিন্যাস ও নির্মাণকৌশল; ৪. নজরুলের জীবন ও কর্মে প্রেম; ৫. বাঙালির চিন্তাবিভূতি : সংস্কৃতি, সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধ; ৬. কথাসাহিত্যের সোজাকথা; ৭. হাসান আজিজুল হক : আলাপন ও মূল্যায়ন। সম্পাদিত গ্রন্থ : ১. শূন্যদশকের গল্প : গল্প; ২. হাসান আজিজুল হক : নিবিড় অবলোকন; ৩. এই সময়ের কথাসাহিত্য ১ম খ- ও ২য় খণ্ড; ৪ হাসান আজিজুল হক সমীপেষু। তাঁর সম্পাদনায় রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হয় গল্প-বিষয়ক পত্রিকা ‘গল্পকথা’।]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত