নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘রেসলিং উইথ দ্য ডেভিল :অ্যা প্রিজন মেমোয়ার’

বন্দিশালা থেকে মুক্তির বারতা

বন্দিশালা থেকে মুক্তির বারতা
নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো

কেনিয়ার খ্যাতনামা মার্কসবাদী ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সমাজ ও রাজনৈতিক কর্মী নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো’র সর্বশেষ গ্রন্থ ‘রেসলিং উইথ দ্য ডেভিল :অ্যা প্রিজন মেমোয়ার’ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই দুনিয়া জুড়ে বনেদি পত্রিকাগুলো এর আলোচনা, সমালোচনা, পর্যালোচনা, গ্রন্থ পরিচিতি ইত্যাদি ছাপতে থাকে। ফলে গ্রন্থটি সহজেই সবার নজরে আসে। শুরুতেই জেনে নিই বইটির আলোচিত হবার নানান বিষয়-আশয়। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ‘দি নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত এক লেখায় বোদ্ধা সমালোচক অ্যারিয়েল ডর্ফম্যান বলেন, ‘বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ক্ষোভের একটা অনুরণন আছে। আর পাঠক সেই অনুনাদে ভেসে যায়। এর কথাগুলো মানুষকে আহ্বান করছে কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত না করতে। ফলে একটা আস্থার জায়গা খুঁজে পায় মানুষ।’

কিন্তু অনলাইনভিত্তিক পোর্টাল ‘ফ্রম দ্য ইনসাইড’-এ ডগলাস নর্থ বইটির আলোচনায় আসার পেছনে খানিকটা ভিন্ন মত দাঁড় করান। তাঁর মতে, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী যে নিপীড়নমূলক ও স্বৈরাচারমূলক তাণ্ডব চালিয়েছে তার বিরুদ্ধে নগুগির প্রতিবাদ নিপীড়িত মানুষকে নতুনভাবে বাঁচার প্রেরণা জুগিয়েছে। ফলে গ্রন্থটি পাঠককে কাছে টেনেছে।’ তবে ‘দি নিউ ইয়র্কার’-এ প্রকশিত এক প্রতিবেদনে বইটির সাড়া জাগানোর কারণকে একটু অন্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে, ‘বিগত শতক থেকে এ যাবত্ জেলের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বইগুলোর মধ্যে ‘রেসলিং উইথ দ্য ডেভিল’ একটি। কারণ এতে লেখক যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছেন তা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সুপ্ত থাকা মানবিক স্পৃহাকে জাগ্রত করেছে।’

এ পর্যায়ে দেখা যাক, আলোচিত এ গ্রন্থে নগুগি তাঁর গ্রেফতার বিষয়ে কী লিখেছেন সে বিষয়টি। তিনি লেখেন, ‘পশ্চিমা ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা সরকারব্যবস্থা প্রগতিমনা বুদ্ধিজীবী ও নাগরিকদের রক্ষা করার পরিবর্তে নানাভাবে কোণঠাসা করতে চায়; আমার গ্রেফতার তারই প্রমাণ বহন করে। তবে আমি বিশ্বাস করি, সরকার বা রাষ্ট্রের এমনতর বৈরিতার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমেই একজন শিল্পী তথা শিল্প বেঁচে থাকে।’ এ প্রসঙ্গে ২৮ এপ্রিল, ২০১৮ সালের ‘দ্য স্টার ট্রিবিউন’-এ প্রকাশিত মাইকেল ম্যাগরাসের একটি লেখাকে বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, ঐ সময়কার কেনিয়ার সরকারের উদ্দেশ্যই ছিল নগুগির মতো অপ্রথাগত ও প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবীকে জেলে আটকে রাখা—যাতে তাদেরকে তাঁর তীব্র সমালোচনার শিকার না হতে হয়। তবে বইটির মধ্যভাগে এসে নগুগি তাঁকে গ্রেফতারের আরো কিছু সম্ভাব্য ও যৌক্তিক কারণ তুলে ধরেন। তাঁর ধারণাকে ব্যাখ্যা করলে পাওয়া যায়, ‘আই উইল ম্যারি হোয়েন আই ওয়ান্ট’ (১৯৭৭) নাটকটি লেখা ও মঞ্চস্থ করার জন্য তত্কালীন সমগ্রতাবাদী সরকার তাঁর পেছনে লাগে। কারণ এ নাটকে তিনি মার্কসবাদী চিন্তার আলোকে সেসময়ে কেনিয়াতে কৃষক ও অভিজাত শ্রেণির মধ্যে যেসব টানাপড়েন ও আদর্শগত বৈষম্য বিদ্যমান ছিল তার একটি পূর্ণ চিত্র তুলে ধরেন, যা সরাসরি সরকারের বিপক্ষে যায়। মূলত সে সময়কার অনাচারী, আদর্শচ্যুত সরকার দেশের জনগণকে স্পষ্টত দুটি দলে—একদিকে, নিরীহ, নিরস্ত্র জনগণের দল, অন্যদিকে কিছু চতুর, সুবিধাভোগী মানুষ—ভাগ করতে চেয়েছিল। আর এ অপকর্মের বিরুদ্ধে নগুগির ছিল দৃঢ় অবস্থান। ফলে তাঁকে জেলে বন্দি করে রাখা ছাড়া অন্য কোনো নিরাপদ উপায় খুঁজে পায়নি সরকার।

পাঠক, নিশ্চয় আপনাদের জানতে ইচ্ছে হচ্ছে—কেমন ছিল নগুগির জেলের সে দিনগুলো। নগুগিকে জেলের যে খুপরি বা সেলে রাখা হয়েছিল তাতে আরো আঠারো জন কয়েদি ছিল। প্রথম অবস্থায় একটু খারাপ লাগলেও একদিন তাঁর পাশের এক বয়োবৃদ্ধ কয়েদির কথায়—‘কখনো রাষ্ট্রপক্ষের কাছে মাথা নত কোরো না, কখনো তাদের সামনে দুর্বলতা প্রকাশ কেরো না’—তিনি খুব অনুপ্রাণিত হলেন। আর নগুগি ঠিক তা-ই করেছিলেন। তাঁকে কোনোভাবেই বশে আনতে পারছিল না কারা কর্তৃপক্ষ। অবস্থা বেগতিক দেখে সেলের মধ্যে বই, খাতা প্রভৃতি সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তারা। খাবারের সময় বাদ দিলে দিনের মধ্যে প্রায় ২৩ ঘণ্টা তাঁকে সেলের ভেতর থাকতে হতো। নগুগি এমন নিপীড়নকে তুলনা করেছেন পরাধীন কেনিয়ার জীবনের সাথে। কেনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের আগে ব্রিটিশরা সবকিছু অধিগ্রহণ করে নেয়। তখন জোর করে কেনীয়দের পাঠিয়ে দেওয়া হয় বন্দিশালায়। তাদেরকে বাধ্য করা হয় নিজ সংস্কৃতি ও ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে। একইভাবে, স্বাধীন কেনিয়াতে পশ্চিমা মদদপুষ্ট সরকারও প্রগতিবাদী বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে উপনিবেশি আচরণ করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আশার কথা এই যে, এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে মুক্ত ভাবার স্বীয় কৌশল আবিষ্কার করেন নগুগি। রাষ্ট্রপক্ষ শারীরিকভাবে বন্দি করে রেখেছিল তাঁকে, কিন্তু মনকে তো আর বন্দি করে রাখা যায় না। তিনি জানতেন, মনকে বিউপনিবেশি করা ছাড়া নিজেকে স্বাধীন ভাবার দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। তাই জেল কর্তৃপক্ষ খাতা সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় টয়লেট টিস্যুতে লিখতে শুরু করেন তিনি। আর সেসব টিস্যুতেই জন্ম নেয় তাঁর বিখ্যাত, জননন্দিত উপন্যাস ‘ডেভিল অন দ্য ক্রস’-এর বেশিরভাগ ধারণা।

ভুলে গেলে চলবে না একজন আফ্রিকীয় লেখক হওয়ার যন্ত্রণা সবসময় বয়ে বেড়াতে হয়েছে নগুগিকে। তাই নানা জায়গায় বহুবার বলেছেন—এমন একটি খেদের কথা তিনি এ গ্রন্থেও যুক্ত করেছেন। তাঁর কথায়—‘আমার যদি একজন ইংরেজ লেখকের সঙ্গে দেখা হয় আমি কখনোই জিজ্ঞেস করি না কেন আপনি ইংরেজিতে লেখেন? আবার যদি একজন ফরাসি লেখকের সঙ্গে দেখা হয় তখনো জানতে চাই না কেন তিনি ভিয়েতনামীয় ভাষায় লেখেন না? কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি, পৃথিবীর নানা প্রান্তে আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন আপনি গিকুয়ু ভাষায় লেখেন? এমনকি গড়পড়তা আফ্রিকীয়রাও মনে করে আফ্রিকার কোনো একটি ভাষায় লেখালেখি করা বোধ হয় দোষের।’ তাঁর এ কষ্টের সারার্থ দাঁড়ায় এমন—মানুষ বোঝার চেষ্টা করে না একটি ভাষা কীভাবে তার সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

গ্রন্থটির শেষভাগের একটি অধ্যায়ে দেখা যায়, নগুগি সকল আফ্রিকীয়, লাতিন আমেরিকান ও এশীয়দের আহ্বান করছেন নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভর করতে। তাঁর ভাষায়—‘ভুলে গেলে চলবে না আদান-প্রদান হওয়া উচিত সমপরিমাণ দেওয়া নেওয়ার ভিত্তিতে। পশ্চিমাদের সব দিয়ে দিতে হবে, বিনিময়ে পাওয়া যাবে যৎসামান্য—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির ভিতটাকে নড়বড়ে করে তুলবেন না। কারণ এ ভিতটা শক্ত না হলে নিজেদের পৃথিবীর বুকে মেলে ধরতে পারবেন না।’

যা হোক, এমনতর বৈরী পরিস্থিতেও নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো নিজের চিন্তাকে মুক্ত রাখার কথা ব্যক্ত করেন। এ নিয়ে ‘রেসলিং উইথ দ্য ডেভিল’-এ তিনি বলেন—‘নিজেকে জীবন্ত রাখার একমাত্র উপায় প্রতিরক্ষা। কারণ এটিই যেকোনো অন্যায়কে না বলার সাহস জোগায়। আপনি যদি সত্যিই মনে করেন আপনার চিন্তা ও বিশ্বাস ঠিক আছে তবে সেসবে অনড় থাকবেন এবং এ অবস্থানই আপনাকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, কল্পনার অবারিত শক্তি যেকোনো বন্দিত্বকে ভেঙে দেয় আর তা-ই শিল্পের মূল কথা।’

নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো [জন্ম :৫ জানুয়ারি ১৯৩৮]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত