‘বঙ্গবন্ধু সমগ্র’ সাহিত্যের একটি ঐতিহাসিক অভিধান

‘বঙ্গবন্ধু সমগ্র’ সাহিত্যের একটি ঐতিহাসিক অভিধান
‘বঙ্গবন্ধু সমগ্র’ সাহিত্যের একটি ঐতিহাসিক অভিধান

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল সব্যসাচী লেখক এবং প্রচুর লেখেন। কবি হিসেবেই দুলাল বেশি সমাদৃত। একজন সমালোচকের ভাষায় বলতে হয়-দীর্ঘদিন তিনি কানাডার টরেন্টোতে বসবাস করছেন; কিন্তু বাংলাদেশ এবং কবিতা থেকে তাকে একদিনের জন্যেও বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। কবিতার পাশাপাশি সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান, গবেষণা, ছড়া, প্রবন্ধ, অনুবাদ, এমন কি সংবাদ প্রতিবেদন লিখছেন প্রতিদিন। গ্রন্থের সংখ্যাও একশ ছুঁই ছুঁই করছে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশত দিনে অর্থাৎ গত ১৭ মার্চে প্রকাশিত হয়েছে তার ‘বঙ্গবন্ধু সমগ্র’। গত তিন দশক ধরে জাতির পিতাকে নিয়ে তার লেখালেখি, গবেষণার অর্জন বলা চলে এই নিবেদিত সমগ্রকে। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ভাগ্যবান, কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর প্রথম লগ্নেই প্রকাশ করতে পেরেছেন সমগ্রটি। লেখকের কথা মতো, সমগ্রের ভূমিকায় তিনি যেমনটি লিখেছেন- এখন তো প্রকাশনা শিল্পে বঙ্গবন্ধু বাণিজ্য তুঙ্গে। ফলে মুজিবভক্তের সংখ্যা বিস্ময়কর মাত্রায় চক্রবৃদ্ধি হারে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে। তাই প্রতিদিন গড়ে ২-৩ টি করে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক নানা ধরনের বই বাজার সয়লাব করছে। এটা দুঃখজনক হলেও সত্যি, যার অধিকাংশই আবর্জনাতুল্য। পাঠক নিশ্চয়ই একমত হবেন লেখকের কথার সাথে। আজকাল বঙ্গবন্ধুর এমন কোন দিক বাদ নেই যা নিয়ে বই বেরুচ্ছে না। লেখক প্রকাশকেরও অভাব হচ্ছে না।

ছয়শো পৃষ্ঠার বিশাল এই গ্রন্থে সাইফুল্লাহ দুলাল যতটুকু পেরেছেন দেশের প্রতি তার ভালোবাসা আর বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বইটি নাড়াচাড়া করলেই পাঠক বুঝতে পারবেন এই পরিশ্রমী লেখক যদি পারতেন তার সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে আরও কিছু দিতে তাহলে সেটাও করতেন। কি নেই এই বইতে? গল্প, কবিতা, ছড়া, নাটক, গবেষণা, গদ্য, বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনের চিত্র, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান ও খুনিদের সম্পর্কে তথ্য দলিল ইতিহাস সব আছে এই দুই মলাটে। এমনকি শেষের দিকে কিছু অপ্রকাশিত অগ্রন্থিত রচনাও যুক্ত করেছেন। আরেক সমালোচকের কথায় বলা যায়-বঙ্গবন্ধুসমগ্র সব শ্রেণি পাঠকদের জন্য সমাহারে সমৃদ্ধ একটি উপযুক্ত উপহার।

মোট আটটি স্বরচিত বইয়ের সমাহার এই সমগ্র। পরবাসে জীবন যাপন করেও একজন দায়িত্ববান লেখক হিসেবে স্বদেশের প্রতি দেশপ্রেম সামর্থ্য উৎসাহে ঘাটতি নেই। দায়িত্ব ও কর্তব্য এর জায়গা থেকে নিজের ষোলআনা দিয়ে এই সমগ্রটি করার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখাগুলো জড়ো করেছেন একসাথে অনেকটা অভিধানে পরিণত হয়েছে সমগ্রটি। আলোচ্য সমগ্র লেখকের মৌলিক রচনাবলী। এখানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার চারটি সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ সংকলন গ্রন্থভুক্ত হয়নি।

সমগ্রটির প্রথম বই হচ্ছে ‘শিল্প সাহিত্যে শেখ মুজিব’। যার প্রথম প্রকাশকাল ১৯৯৩ অর্থাৎ তিন দশক আগে; দুঃসময়ে-দুর্দিনে। গ্রন্থে কবিদের কবিতায় বঙ্গবন্ধু, গল্পে বঙ্গবন্ধু, গানে গানে বঙ্গবন্ধু, ছড়ায় বঙ্গবন্ধু, চিত্রকলায় বঙ্গবন্ধু, প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধু, বিদেশি লেখকদের দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছেন। সেই সাথে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা তৎকালীন প্রায় সব গ্রন্থের তথ্য ও তালিকা এবং তার স্মরণে বা নামকরণে প্রতিষ্ঠান, সংগঠন,রাস্তা ইত্যাদির দীর্ঘ তালিকা। শুধু তা-ই নয়; এতে আরও ছিলো বঙ্গবন্ধুর কিছু অপ্রকাশিত চিঠিপত্র এবং দেশ বিদেশের লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিকদের সাথে দুর্লভ ছবি। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অসাধারণ মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে তথ্য সমৃদ্ধ বইটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি ভিন্ন ধারার অভিনব কাজ।

দ্বিতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বইটি হচ্ছে ‘ইনডেমনটি অধ্যাদেশঃ মুজিব হত্যা মামলা’। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের রক্ষায় একটি অধ্যাদেশ জারি করেন ‘স্বঘোষিত’ রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমেদ। পরে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নিয়ে সংবিধান সংশোধন করে খুনিদের রক্ষার পর পথটি স্থায়ী করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ওই ইনডেমনিটি অ্যাক্ট বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল করলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ খোলে। এই কুখ্যাত অধ্যাদেশের আদ্যপান্ত ও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিবরণ ও তথ্য নিয়ে এই বইটি।

এরপর আছে বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনের ঘটনাবলী নিয়ে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোজন। এখানে নতুন প্রজন্ম জানতে ও শিখতে পারবে অনেক কিছু।

‘কানাডার কাশিমপুরে খুনি নূর চৌধুরী’ সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘বঙ্গবন্ধু সমগ্র’ এর চতুর্থ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। কানাডাতে আশ্রয় নেওয়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি খুনি নূর চৌধুরীর যাবতীয় খবরাখবর তথ্য নিয়ে আলোচ্য বইটি। লেখক নিজেও কানাডায় বাস করার সুবিধাটুকু পুরোপুরি ব্যবহার করেছেন।

খুনি নূর সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য অনুসন্ধান থেকে শুরু করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সমস্ত কৌশল ও প্রক্রিয়া প্রচুর রেফারেন্স সবকিছুই আছে বইটিতে। প্রায় দশ বছর ধরে লেখক এই কাজটি করে গেছেন নিষ্ঠার সাথে। মুজিব হত্যা মামলার কোন আসামিকে নিয়েই এটাই সম্ভবত তথ্যবহুল প্রথম কোন বই। যার পাতায় পাতায় রয়েছে তথ্য প্রমাণ, রেফারেন্স এবং দলিলপত্র! যেমন, নূরের একাধিক পাসপোর্ট, ভিসা, ইমিগ্রেশনের কাগজপত্র, রিফুজি আবেদন পত্র বাতিল, কানাডা থেকে বের করে দেওয়ার আদেশ, আইনজীবীদের বক্তব্য, কানাডিয়ান মন্ত্রীদের মতামত, কানাডাস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতদের ভূমিকা, নূরের গ্রামের বাড়ি থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থানের পূর্ণাঙ্গ চালচিত্র এমন কিছু নেই, যা বাদ পড়েছে।

এরপর পাঠক যা পাবেন সেটি মূলত একটি নাটক ‘জাদুকর’। সম্পূর্ণ প্রতীকধর্মী একটি গল্প নিয়ে নাটকটি। গল্পে কোথাও বঙ্গবন্ধু নেই অথচ পুরো কাহিনী জুড়ে আছেন তিনি। ২০১৩ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘জাদুকর’ প্রচারিত হয়।

ষষ্ঠ গ্রন্থটি হচ্ছে ‘আমার সঙ্গে শেখ মুজিবের দেখা হবে আজ’ কবিতার বই। এখানে এসে পাঠক পাবেন লেখকের আসল মুন্সিয়ানা। বাস্তব-পরাস্তবের আর কল্পনার রথে চড়ে পাঠক চলে যাবেন অন্য এক ভুবনে। বঙ্গবন্ধুকে ভিন্ন ভিন্নভাবে হাজির করেছেন কবি এই বইয়ের প্রতিটি কবিতায়। সৃষ্টি করেছেন ধূম্রজাল যা কিছু সময়ের জন্য হলেও পাঠককে একটা ঘোরের মধ্যে নিয়ে যাবে। এ গ্রন্থে কবির স্বরচিত কবিতা ছাড়াও রয়েছে বিদেশি কবিদের ভিন্ন ভাষা থেকে ছয়টি অনূদিত কবিতা।

এরপর ‘এক যে ছিলো শেখ মুজিব’। রূপকথার মতো একটি ছড়ার বই। ছড়াগুলো শিশুতোষ হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অতীত ও বর্তমানের বাস্তব চিত্র, আছে বেশ কিছু মেসেজ। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বড়দেরও ছড়াগুলো ভালো লাগবে।

বঙ্গবন্ধুর সমগ্রের শেষ সংযোজন হচ্ছে 'রেসকোর্সের অশ্বারোহী' ছোটগল্পের সংকলন। গল্পগুলোতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি লেখকের ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে বার বার। আমার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত শত গল্প লেখা হয়েছে, তার মধ্যে ‘তিন পুরুষ’ গল্পটি একেবারেই ব্যতিক্রম এবং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে ‘জাদুকর’ নাটকের গল্প রূপটি দেওয়া আছে। যা কোন কোন পাঠকের কাছে একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি মনে হতে পারে। তবে দুটোকে পাঠক যদি নাট্যরূপ ও গল্প হিসেবে আলাদাভাবে দেখেন তাহলে আর পুনরাবৃত্তি মনে হবে না। বরং ভিন্ন স্বাদ পাবেন।

বাড়তি পাওনা হিসেবে পাঠকের জন্য থাকছে কবি শামসুর রাহমান ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার লেখা দুটি শুভেচ্ছা বাণী যা সমগ্রটির ফ্ল্যাপে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বাঙালি, বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিকভাবেই অনস্বীকার্য। বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে জানা, তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া মূল্যায়ন করার জন্য বই পুস্তক ও প্রকাশনা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেই জায়গা থেকে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল উতরে গেছেন নিঃসন্দেহে এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার দু’একটি অসাধারণ কাজ কেউ অতিক্রম করতে পারবে না বলে আমার বিশ্বাস। যদিও সমগ্রটিতে অনেক রাজনৈতিক ঘটনা বা লেখার পুনরাবৃত্তি আছে। কিছু টাইপিং মিসটেক পাঠকের চোখে পড়বে। অনেক ক্ষেত্রে লেখক বঙ্গবন্ধুর প্রতি একটু বেশি বায়াসনেস/আবেগ প্রদর্শন করে ফেলেছেন। তবে একজন অভিবাসী লেখক হিসেবে দেশপ্রেম ও জাতির পিতার প্রতি গভীর মায়া বা নাড়ির টান দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে বিবেচনা করে দেখলে উক্ত বিষয়গুলো উপেক্ষা করা যায়। ভিন্ন ভিন্ন বিষয় ও আঙ্গিক থাকায় বইটি সকল শ্রেণির পাঠকের খোরাক দেবে।

বইয়ের নাম: বঙ্গবন্ধু সমগ্র

লেখক: সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল।

প্রকাশ কাল: ১৭ মার্চ ২০২০।

প্রকাশক: স্বরব্যঞ্জন।

প্রচ্ছদশিল্পী: আল নোমান।

মূল্য: ৮০০ টাকা।

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৬০৮।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত