বেদনার অনুকূলে প্রবাহিত জীবন

বেদনার অনুকূলে প্রবাহিত জীবন
প্রতিকৃতি অঙ্কন: সোহেল আশরাফ

আট বছর আগের একদিন জীবনের বিপুল সম্ভাবনা মরে যাওয়া বিপর্যস্ত এক তরুণ প্রেমে পড়েছিল এক কবির। যে কবির কবিতা পড়েই সে জেনেছিল, ‘মূলত ভালোবাসা মিলনে মলিন হয়, বিরহে উজ্জ্বল’। জেনেছিল, বেদনা মূলত বোনের মতো। রাজ্য, রাজা, সিংহাসন জয়ের পর, যাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়ানোর ইচ্ছে বয়ে বেড়ায় মানুষ, সে তখন অন্যঘরে; আটপৌরে গেরস্থালি জীবনের পৌনঃপুনিকতার ঘেরাটোপে বন্দি। এই কবিই তাকে জানিয়েছিলেন—নারী এক অনুপম প্রেমের নাম, সোনালি গৌরব। এই পালটানো পৃথিবীতে নিখুঁত স্ট্র্যাটেজির মতো কিশোরী হেলেনরাও পালটে যায়, যেমন পালটায় রাজনীতি, সিংহাসন, সড়কের নাম, কবিতার কারুকাজ। নারীর উদ্যান ছাড়া কোথাও দাঁড়ানো যায় না বলে, সব হারিয়েও নিঃস্ব পুরুষ একটু ব্যাকুল শুশ্রূষার প্রার্থনায়, বিশুদ্ধ পরিপূর্ণতায় দাঁড়াতে চায় আবারও। আরো জানিয়েছিলেন, মৌলিক প্রেমিক এবং কবি হলেই অধিক হারাতে হয়। মানুষকে চিনতে হলে তাকানোর মতো করেই তাকাতে হয়; নগ্ন-নির্জন বাম হাত তুলে দিয়ে গোপন গভীর দীর্ঘশ্বাস চেপে উপসংহারে বলতে হয়—‘আমার যতো শুভ্রতা সব দেবো, আমি নিপুণ ব্লটিং পেপার/ সব কালিমা, সকল ব্যথা ক্ষত শুষেই নেবো।’ অনুভব করতে শিখিয়েছিলেন দূরত্ব আর নৈকট্যের তফাত্। খুব বেশি নিকটে এলে মানুষ পুড়ে যায়। কিংবা কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণ প্রাপ্তি নয়, নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে যে মানুষ পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করে, সে নষ্ট হয়ে গেলে কারো কিচ্ছু আসে যায় না। একজন কবি তো সেই, জীবন যাকে উপহার দেয় হূষ্টপুষ্ট কষ্ট। মানুষ যাকে পুড়িয়ে করে তোলে খাঁটি সোনা। তবুও জীবনের সবক’টি শোক দ্বীপে সে পরিব্রাজকের মতো ঘুরে বেড়ায়। যার ফেরার পথে উদগ্রীব হয়ে থাকে নগরীর নিয়ন্ত্রিত আঁধারের বার, প্রণয়ের প্রাথমিক স্কুল, দীর্ঘ রজনী তারপর ভালোবাসা যাকে খায় এইভাবে সবটুকু খায়। কবিতার প্রয়োজনেই যিনি উপেক্ষার ডাস্টবিনে ফেলে দেন জীবনের বিবিধ প্রয়োজন, পিতার শরীর খেয়ে বেড়ে ওঠে কবিতা নামের আত্মঘাতী শিল্প। ক্রুশবিদ্ধ যিশুর যন্ত্রণা নিয়ে পৃথিবীর দিকে যে তাকায় শিশুর সারল্যে, ভালোবেসে বাড়ায় নিজের ক্ষতি। আর মাল্টিকালার কষ্ট ফেরি করে বেড়ায় এ পৃথিবীতে। ক্যালেন্ডারের মলিন পাতা যার দিকে তাকিয়ে থাকে ব্যথিত নয়নে। কেউ ডাকে না তবুও শুধু ‘ভালোবাসি’ বলার জন্য ফিরে আসে বারবার এই পৃথিবীর বুকে।

বিগত শতাব্দীর শেষ ভাগে জন্ম নেওয়া আমরা যারা তরুণ, তাদের কাছে হেলাল হাফিজ কেবলই এক মূর্তিমান মিথলজির চরিত্র হয়েই থেকেছেন দীর্ঘকাল। তারুণ্যের চোখ দিয়ে তাঁর দিকে তাকাই শুধু একজন কবি হিসেবে নয়; এক ঘোরলাগা বেদনাদগ্ধ অগ্রজ পুরুষ হিসেবেও। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে যাঁর কবিতা নিরুপম বেদনা হয়ে নিরবধি প্রবাহিত হয়, অন্য কোনো নিরবধির দিকে। একটি মাত্র কবিতাগ্রন্থ, এরপর দীর্ঘদিনের অনুপুস্থিতি, কবিতা পাড়ায় নিখোঁজ সংবাদ, আবার প্রত্যাবর্তন, নির্বাসিত সন্ন্যাস জীবন, আজন্ম চিরকুমার, গ্রিক মিথলজির মতো কবিতাচরিত্র হেলেন—এসবই তাঁর চারপাশে তৈরি করেছিল এক দুর্ভেদ্য রহস্যের দেয়াল। যে দেয়াল ডিঙিয়ে দীর্ঘদিন তেমন কেউই পৌঁছাতে পারেনি হেলাল হাফিজ নামক দুর্গম দ্বীপে। ক্রমশ হেলাল হাফিজকে ঘিরে জন্ম নিয়েছে বিবিধ ওরাল হিস্ট্রির; ‘তিনি জীবিত না মৃত’ এমন এক দ্বন্দ্বমুখর গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ। সুচিত্রা সেনের আড়াল হয়ে যাওয়া থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে হেলাল হাফিজের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি নির্মাণ করেছে বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের এক মিস্টিক পোয়েটিক প্রোফাইলের। সেই কৌতূহল থেকেই হয়তো কবিতার হেলাল হাফিজের বাইরেও ব্যক্তি হেলাল হাফিজের প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণ ও কবির নৈকট্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে পাঠকমনে। তবে সামগ্রিক হেলাল হাফিজকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে সেই কালপর্বকে, যার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে, বিবিধ ঘাত-প্রতিঘাত আর প্রতিকূলতায় একজন মানুষ পরিণত হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে অনুভব করা জরুরি স্থানিক অভিজ্ঞতাকেও, যা একজন মানুষকে কবি করে তোলে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী টালমাটাল এক সময়ে যখন হেলাল হাফিজের জন্ম, ১৯৪৮ সালের ০৭ অক্টোবর, তার মাত্র এক বছর আগে ভারত ভাগ হয়েছে। ওই একই বছর জন্ম নিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদও, তত্কালীন পূর্বপাকিস্তানের নেত্রকোনায়। পরবর্তী সময়ে একজন কবিতায়, আরেকজন কথাসাহিত্যে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সহজিয়া ঘরানার বহু মরমি বাউল-সাধক অধ্যুষিত এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি, মানুষ, সংস্কৃতি কবির মনন গঠনে শৈশব-কৈশোরেই কবিতার বীজ বপন করে দিয়েছিল। যে বীজ, বৃক্ষে পরিণত হয়ে উঠতে শুরু করে ষাটের দশকের শেষ ভাগে। মায়াবী মফস্বল ছেড়ে তারুণ্যের প্রথম পর্বে চলে আসেন ঢাকায়, ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে; ১৯৬৭ সালে। সহপাঠী হিসেবে পেলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, যাঁকে মজা করে ডাকতেন ওই সময়ের তুমুল জনপ্রিয় ব্রিটিশ নায়িকা ‘অড্রে হেপবার্ন’ নামে। বিদ্রোহ আর বিপ্লবের সময় তখন। নতুন এক দেশের স্বপ্নে বিভোর পূর্ববাংলার জনগণ। এল ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়। এক রিকশাচালকের কথাকে তিনি রূপ দিলেন কবিতায়, ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। আহমদ ছফার কল্যাণে সে লাইন ছড়িয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে। কবিতা হয়ে গেল বারুদগন্ধমাখা স্লোগান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘দ্বিতীয় জন্ম’ হিসেবে। লেখালেখির দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রকাশিত হলো প্রথম কবিতার বই, ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। নির্মিত হলো এক নতুন ইতিহাসের। এরপর হঠাত্ করেই উধাও হয়ে গেলেন বিপুল জনস্রোত থেকে। ফিরলেন ৩৪ বছর পর দ্বিতীয় কবিতার বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ দিয়ে আর ৭২ বছর পূর্ণ করে এই সময়ের কাছে তিনি যেন জীবন সায়াহ্নের এক শিশু। মোটামুটি এই হলো হেলাল হাফিজের ‘রিভার অফ লাইফ’; জীবন নদীর বাঁকবদল ও বয়ে চলার গল্প।

মা কোকিলা বেগমকে হারিয়েছিলেন শৈশবেই, তিন বছর বয়সে। কবির ভাষ্যমতে, এই বেদনাই তাঁকে ক্রমে কবি করে তুলেছে। কবির পিতা খোরশেদ আলী তালুকদারও ছিলেন একজন কবি ও শিক্ষক। গ্রামীণ উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে শৈশব-কৈশোরেই পেয়েছিলেন কবিতা চর্চার উপযুক্ত পরিবেশ। ক্রমশ নিয়তিই তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে জীবনের সুকঠিন কংক্রিট ছড়ানো পথে, নিজেকে তিনি বলেছেন কষ্টের সমার্থক শব্দ, মানুষ তাঁর নাম দিয়েছে ‘কষ্টের ফেরিঅলা’। কিশোর বয়সে দেখা পেয়েছিলেন, এক আশ্চর্য হিরণবালার। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মী, সেবিকা অপূর্ব রূপসী হিরণবালা একইসঙ্গে তাঁকে দেন মাতৃস্নেহ, বোনের আদর আর বয়ঃসন্ধির প্রথম ফ্রয়েডিক স্পর্শ। তাঁর প্রতি আজন্ম ঋণী থাকতে চান কবি। ‘শুধু কি কবিতা লিখে সে ঋণ কভু শোধ করা যায়?’ নিজেকে প্রশ্ন করেন। পিতা চাইতেন সুঠাম দেহের পুত্র সেনাবাহিনীতে যোগ দিক, কিন্তু নিয়তি তাঁকে নিয়ে এল অন্য কোথাও। ওই সময়ের অন্য অনেকের মতো তিনিও এ শহরে অভিবাসিত হয়েছিলেন। গ্রামীণ প্রলেপমাখা হূদয় নিয়ে নগরজীবনের বৃহত্ প্রেক্ষাপটে নিজেকে অভিযোজিত করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি নাগরিক হতে পারেননি কখনো। আর তাই নিজেকে বরাবরই একজন ‘আউটসাইডার’ বলেছেন। স্থানিকতা কবিকে আটকে রাখতে পারে না ঠিক, কিন্তু অস্তিত্বে আঘাত এলে কখনো শেকড়ের অনুসন্ধানে যেতে হয়। আর তাই তিনি লেখেন, ‘আমিও গ্রামের পোলা চুতমারানি গাইল দিতে জানি’। আবার শেকড়ের সঙ্গে নিজের দূরত্বও অনুভব করেন তিনি। ‘নেত্রকোনা’ কবিতায় বলেন, ‘...ছিলাম তোমার এক আদরের নাগরিক নিকট-আত্মীয়, আমাদের বড় বেশি মাখামাখি ছিলো’। যে কালপর্বে তিনি লিখছেন, ঢাকা তখনো সে অর্থে পুরোপুরি মেট্রোপলিটন না হলেও জনজীবনে আসছিল ব্যাপক পরিবর্তন। পরবর্তী সময়ে যার গভীর ছাপ পড়ে তাঁর লেখায়। নাগরিক দুঃখ, বিচ্ছিন্নতা, তত্কালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, মানুষের বিশ্বাসহীনতা, স্বার্থপরতা, বঞ্চনা, শোষণ আর বেদনার অভিঘাতে তিনি চুরমার হয়েছেন বারবার। প্লেটোনিক ও ফ্রয়েডিক প্রেমকে একত্রিত করে, সহজ ভাষায় নির্মাণ করেছেন কবিতার এক ‘পলিটো-রোমান্টিক’ জগত্। যেখানে, প্রেম-বিদ্রোহ-বিপ্লব ভাষার দেয়াল ভেঙে ফেলে।

নারীরা হেলাল হাফিজকে ভালোবাসতেন। আজও যেমন বাসেন। এক সুদর্শন-সুঠামদেহী রূপস যুবক, কবি ও বিপ্লবী, দুর্দান্ত সেন্স অফ হিউমার, রাজনীতিসচেতন। তত্কালীন সুরুচিসম্পন্ন নারীদের আকর্ষণ করার জন্য পুরুষের ম্যাসকিউলিনিটির যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তা হেলাল হাফিজের ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবীরা তাঁর খাবারের বিল দিতেন, শহরের অভিজাত নারীরা কবিকে পেতে চাইতেন একান্তে। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে নিজেকে সমর্পণ করলেন হেলেন নামের এক নারীর কাছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রেমিকা হেলেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হলো না। তাঁরও আর সংসার করা হলো না। কিন্তু কেন ভেঙে গেল সে প্রেম? সে গল্প বহুবার তিনি উল্লেখ করেছেন অন্যভাবে। হয়তো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় একজন নারী তার হাজব্যান্ডের কাছে যে সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা চান, হেলাল হাফিজ তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিংবা হয়তো, ব্যর্থতা আর গ্লানির পথে পদধূলি হয়েই কবিরা বুক পেতে দেয়, যেখানে কবিতা সম্রাজ্ঞী হেঁটে বেড়ায় নির্দ্বিধায়। ফলে, এ এক ধ্রুপদি অস্পষ্টতা—হেলেন-হাফিজ মূলত কে কাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে এ কথা সত্যি, হেলেনকে হারিয়ে কবির জীবন যেন সন্ন্যাসের দিকেই এগিয়ে গেল। হলেন একজন পেশাদার জুয়াড়ি। একসময় দেশ ছেড়ে পাড়ি জমালেন বিদেশে। নিজের ভেতরে লালন করা বেদনা আর আলস্যের কাছে পরাজিত হলেন। বাংলা সাহিত্যকে একপ্রকার বঞ্চিতই করলেন তিনি। আরো অনেক কিছুই দেওয়ার ছিল তাঁর। কিন্তু এও তো সত্যি, সাহিত্য জীবনের ঊর্ধ্বে কিছু নয়। ‘লিখতেই হবে’ কোথাও এমন বন্ড সিগনেচার দিয়েও কেউ লিখতে আসে না। ফলে, না লেখার এই সিদ্ধান্তও একান্তই কবির নিজের।

কিন্তু এই একটা বই আর ৫৬টি কবিতাই ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে মিশে গেল। প্রমাণ করলেন, কবির উপস্থিতি জরুরি নয় কিংবা অল্প লিখেও ফুলের গন্ধের মতো রয়ে যাওয়া যায় যদি কবিতা হয়ে ওঠে ধ্রুপদি শিল্প। আর তাই, হেলাল হাফিজের কবিতা ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয় আজও প্রেম কিংবা দ্রোহের ভাষায়, স্লোগানে-স্লোগানে ঢাকা দেয়ালে দেয়ালে আর নাগরিক ক্লান্তিভরা দিনে। এই মৃত্যু-মহামারি-অস্থির এলোমেলো সময়ে আজও নিউট্রন মানুষের হূদয় বোঝেনি, আজও অধঃপতনের দিকে সুপারসনিক গতি মানুষের, যেমনটা তিনি বলেন, ‘পশু-পাখিদের কিছু নিচে তুমুল উল্লাসে যেন বসবাস করে আজ কুলীন মানুষ’।

কবির তেহাত্তরতম জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা।

হেলাল হাফিজ [ জন্ম :০৭ অক্টোবর ১৯৪৮ ]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত