লুইস গ্লুক

কাব্যভাষ্য ও দার্শনিক সৌন্দর্যবোধের কবি

কাব্যভাষ্য ও দার্শনিক সৌন্দর্যবোধের কবি
লুইস গ্লুক। ছবি: সংগৃহীত

প্রথমেই একটা সত্যকে অপকটভাবে স্বীকার করে নিতে চাই। প্রতি বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করার পর অনেক সাহিত্যবোদ্ধাই নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিককে নিয়ে এমন সব বিশ্লেষণধর্মী, সমালোচনামূলক এবং অতিউচ্ছ্বসিত লেখা উপস্থাপন করে থাকেন যেন তিনি আজন্ম সেই সাহিত্যিকের ভক্ত পাঠক ছিলেন। কিন্তু এ বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে এমন অনেক নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক রয়েছেন—যারা আমাদের দেশের সাহিত্য, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে খুব বেশি পরিচিত নন। তবে বিচ্ছিন্নভাবে যে কেউ কেউ পড়েননি তা হয়তো নয়।

২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী মার্কিন কবি লুইস গ্লুক কেবল মাত্র বাংলা ভাষাভাষীদের কাছেই নয়, আফ্রো-এশিয়ার অনেক দেশের সাহিত্যনুরাগীদের কাছেই অপরিচিত নাম। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে আমাদের খুব বেশি জানাশোনা নেই একথা মেনে নিতে দোষ নেই। তবে বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির এই বিশ্বে অন্তর্জালের সাহায্যে কবি লুইস গ্লুকের জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কিত যে সব বিশ্লেষণধর্মী তথ্য পাওয়া যায় তার আলোকে আলোচনা করা যেতেই পারে।

লুইস গ্লুক সম্পর্কে সুইডিশ একাডেমির বিবৃতি, ‘লুইস গ্লুকের অসামান্য কাব্যভাষ্য ও দার্শনিক সৌন্দর্যবোধ ব্যক্তিসত্তাকে সর্বজনীন করে তোলে।’ একাডেমির নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ডার্স অলসন বলেন, ‘গ্লুকের ভাষ্য একইসঙ্গে মধুর এবং আপোসহীন। তার লেখনীতে পাওয়া যায় হাস্যরস এবং তীক্ষ কৌতুকের সংমিশ্রণ।’

কবি লুইস গ্লুকের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ এপ্রিল নিউ ইয়র্কে। কিন্তু তিনি বেড়ে ওঠেন লং আইল্যান্ডে। পারিবারিকভাবে লেখালেখির একটা আবহ থাকার কারণে লুইস গ্লুক ছোটবেলা থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। কিশোরী বয়সে গ্লুক অ্যানোক্সিরিয়া নার্ভোসা রোগে ভুগেছিলেন প্রায় সাত বছর। এসময় তাঁকে নিয়মিত মনোবিদের সাহায্য নিতে হয়। গ্লুক পড়াশোনা করেছেন লরেন্স কলেজ এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, যদিও তিনি কোনো ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি। ১৯৭২ সালে তিনি ভার্মন্টের গডার্ড কলেজে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সালে যোগ দেন ম্যাসাচুসেটসের উইলিয়াম কলেজে ইংরেজির লেকচারার হিসেবে। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি।

লুইস গ্লুকের কবিতার বুনন অনন্য এবং ভিন্ন শিল্পশৈলীর। তিনি কখনো নিজের তৈরিকৃত নিয়ম আঁকড়ে ধরে বসে থাকেননি। ছন্দ, উপমা, অন্ত্যমিল, আর ধ্বনিমাধুর্যের সংমিশ্রণে যে কবিতা আমরা পড়ে থাকি তার থেকে গ্লুকের কবিতা একেবারেই ভিন্ন। তাঁর লেখনী সংক্ষিপ্ত এবং সরল, গ্রিক-রোমান মিথলজি, ইতিহাস আর প্রকৃতি মিলে তাঁর রচনা। অ্যাকাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস-এর চেয়ারম্যান মাইকেল জ্যাকবস-এর মতে, ‘গ্লুকের কবিতা, তাঁর সামগ্রিক কাজ এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কণ্ঠস্বর মানব পরিস্থিতিকে স্মরণীয় ও শৈল্পিক ভাষায় উপস্থাপন করে।’ নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাহিত্য-সমালোচক উইলিয়াম লগ্যান বলেন, ‘গ্লুক তাঁর কবিতায় তুলে ধরেন মানবাত্মার অন্ধকার দিক। মানুষের চোখ যা এড়িয়ে যায় তাতেই আলো ফেলেন তিনি।’

গ্লুকের কবিতায় স্থান পেয়েছে হূদয়ের সপর্শকাতরতা, একাকীত্ব, পারিবারিক বন্ধন, বিচ্ছেদ, কাম, ক্রোধ, বেদনা আর হতাশা। নিঃসঙ্গতা আর বিষণ্নতা তাঁর কবিতার অন্যতম লক্ষণ। সাহিত্য-সমালোচকদের মতে, তাঁর কবিতায় রয়েছে আত্মজৈবনিকতার সাথে ধ্রুপদি মিথের গূঢ় আন্তসম্পর্ক।

লুইস গ্লুকের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ফার্স্টবর্ন’ (১৯৬৮)। প্রথম কাব্যগ্রন্থ দিয়েই তিনি সাহিত্যবোদ্ধা এবং সাহিত্য -সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। এরপর ক্রমেই তিনি মার্কিন সাহিত্য-সমাজে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় এবং পরিচিত মুখ। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটিতে ছিল তাঁর চিরায়ত শিল্পশৈলী—মানবাত্মার বিশ্বাস ও বিশ্বাসহীনতা, মানবিকতা ও অমানবিকতা, নৈতিকতা ও অনৈতিকতা, স্বপ্ন, মিথ আর বাস্তবতা।

‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিশ’ লুইস গ্লুকের আরেকটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৯২ সালে পুলিত্জার পুরস্কারে ভূষিত হন। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে কবিতার ব্যতিক্রমী অথচ সাবলীল ভাষাশৈলী দিয়ে নিজেকে এমনভাবে প্রকাশ করেন—যেখানে তিনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে বিশ্বজনীনতায় রূপ দিতে সক্ষম হন।

১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘মেডোল্যান্ডস’ কাব্যগ্রন্থটি কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের। গ্রিক ও রোমান মিথ ব্যবহার করে তিনি তুলে ধরেছেন ওডেনিস আর পেনোলপের আর্তনাদ। ‘ভিটানুভা’ (১৯৯৯) কাব্যগ্রন্থটিতে তিনি যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষা, অনুভব আর প্রকৃতি দিয়ে নিজ জীবন আর স্বপ্নহীনতার ছবি এঁকেছেন। কাব্যগ্রন্থটির জন্য তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বোলিনজিন’ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

চিরায়ত মিথ আর পৌরাণিক গল্পকে উপজীব্য করে লেখা গ্লুকের আরেকটি গ্রন্থ ‘দ্য সেভেন এজেস’ (২০০১)। কাব্যগ্রন্থটিতে তিনি নিজস্ব চিন্তাভাবনা আর স্মৃতিচারণার সাথে মিথলজির অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন। মিথ নিয়ে তাঁর আরেকটি কাব্যগ্রন্থ ‘আভের্নো’। বইটির চিত্রকর্ম এবং রূপকের ব্যবহার তাঁর অসামান্য কাব্যশক্তির পরিচয় বহন করে।

সাহিত্য-সমালোচকদের মতে, লুইস গ্লুকের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘আ ভিলেজ লাইফ’। কবি এই কাব্যগ্রন্থে সময় ও সভ্যতার বিমূর্ত চিত্র অঙ্কন করেছেন তাঁর নিজ জীবনের প্রতিচ্ছবিতে। গ্লুকের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে—‘দ্য হাউজ অব মারসল্যান্ড’, ‘দ্য গার্ডেন’, ‘ডিসেন্ডিং ফিগার’ এবং ‘আরারাত’। তাঁর মোট প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১২টি। কাব্য সম্পর্কিত তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে ‘প্রুফস অ্যান্ড থিউরিজ’ (১৯৪০) এবং ‘আমেরিকান অরিজিনালিটি’ (২০১৭) বিখ্যাত। গ্লুকের সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ফেইথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট’ (২০১৪)। তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকার পোয়েট লরিয়েট ছিলেন। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আগে থেকেই লুইস গ্লুক সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত মনোভাব ছিল আমেরিকার সাহিত্য সমাজে। নোবেল এবং পুলিত্জার ছাড়াও তিনি ন্যাশনাল হিউম্যানিটিজ মেডেল, ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন।

লুইস গ্লুক নিজেকে বিশেষ কোনো অভিধায় দেখতে চাননি কখনোই। নিজেকে নারীবাদী বলতেও আপত্তি তাঁর। বরং জীবন-মৃত্যুর শাশ্বত রহস্য আর প্রকৃতিকেই খুঁজে বেড়িয়েছেন তাঁর কাব্য এবং দর্শনে। বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন ম্যাসাচুসেটসের ক্যামব্রিজ শহরে এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

লুইস গ্লুক, জন্ম : ২২ এপ্রিল ১৯৪৩

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত