সুফিয়া কামাল: স্বজাত্যবোধ যাঁর আয়ুধ

সুফিয়া কামাল: স্বজাত্যবোধ যাঁর আয়ুধ
বেগম সুফিয়া কামাল [২০ জুন ১৯১১—২০ নভেম্বর ১৯৯৯]

যুগান্তকারী ব্যক্তি মাত্রই যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আর সে ব্যক্তির মানস গঠন ও পরিস্ফুটন ঘটতে পারে চরম প্রতিকূল অবস্থায়ও। প্রতিকূল অবস্থা নিজেই সৃষ্টি করে তার থেকে উত্তরণের নাবিক। এমনই একজন প্রতিকূল অবস্থার যুগান্তকারী কবি ও নারী মুক্তি মানস সুফিয়া কামাল (২০ জুন, ১৯১১—২০ নভেম্বর, ১৯৯৯)। রক্ষণশীল পরিবেশে জন্ম নিয়ে কী করে প্রাতিষ্ঠানিক নারী শিক্ষাহীন সময়ে স্ব ও সুশিক্ষিতা হয়েছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর! যিনি আগামী প্রজন্মকে আলোড়িত করবেন তিনি সাধারণত স্বশিক্ষিত ও প্রবল পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী হন। প্রতাপশালী বর্গী ব্রিটিশ ও শোষক পাকিস্তানের নানা অত্যাচার ও বৈষম্য দেখে কবি ও সমাজকর্মী সুফিয়া কামালের পীড়িত হৃদয়ে স্বাধীনতার সুবাতাস জাগিয়েছিল নতুন আশা।

সেই নতুন আশায় আমাদের এই পশ্চাদপদ দেশকে সময়োপযোগী শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, সুশৃঙ্খল মুক্তবুদ্ধি ইত্যাদির চর্চা ও প্রসারের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। নারী নেত্রী ও মহীয়সী হিসেবে বেগম রোকেয়ার (১৮৮০—১৯৩২) পরেই তাঁর অবস্থান সমুজ্জ্বল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেকটি জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আন্দোলনের মূল স্রোতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন তিনি।

মহৎপ্রাণ সমাজসেবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে জাতির কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১—১৯৪১)সাথে সাক্ষাৎ করে নিজেকে আরো ঋদ্ধ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯—১৯৭৬) ‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন—যেটি পাঠক সমাজসহ বোদ্ধামহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের (১৮৮৮—১৯৯৪) ‘সওগাত’ পত্রিকায় ‘বাসন্তী’ প্রকাশ হলে আরো খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানের পাকিস্তান সরকারের বিরূপ মনোভাবের বিরোধিতা করেন তিনি। বেগম রোকেয়ার ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’-এ একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ করেন। কেননা, মুসলিম মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার জন্য তাঁর প্রাণ ছটফট করত। আর সেটাই তিনি এ সংগঠনের মাধ্যমে করতে পেরেছিলেন। লীলা রায়ের(১৯০০—১৯৭০) প্রভাব তাঁর সমাজকর্মী জীবনের ওপর ব্যাপক। কেননা তাঁর আহ্বানেই অনেকটা সাহস পেয়েছিলেন সুফিয়া কামাল।

এছাড়াও তিনি ‘ভারতীয় মহিলা ফেডারেশন’-এর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৩-এর মন্বন্তর ও হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মানবসেবা প্রদান করেন। দেশ বিভাগের অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি ‘শান্তি কমিটি’-তে যোগ দেন। কেননা, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব তখন তুঙ্গে এবং অনেক মানবসন্তানকে হত্যা করা হয়। সেসময়ই তাঁকে সভানেত্রী করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’ গঠিত হয়। বর্তমান ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ -এর প্রতিষ্ঠাকালীন ‘মহিলা সংগ্রাম পরিষদ’ -এর প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ সংগঠনের সাথে আজীবন সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। এছাড়াও ‘বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড’, ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি’, ‘ছায়ানট’, ‘নারী কল্যাণ সংস্থা’ ইত্যাদির সভানেত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ পদে সম্মানের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি এসব সামাজিক সংগঠনের প্রধান ও অন্যান্য দায়িত্ব নিপীড়িত ও বঞ্চিত নারীদের প্রতি মমত্ববোধ ও সমাজের সার্বিক কল্যাণের জন্য পালন করেছিলেন। কেননা, সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। আর নারী ও পুরুষ সমাজের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত পুরুষ সারাদিন বাইরে থাকেন। সেখানে সম্পূর্ণ সংসারের কাজ সামলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্বও পালন করতে হয় নারীকে। আবার অনেক নারী সংসারের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ অংশকে মূলস্রোতের সাথে একীভূত করতে ও যোগ্য সহচর হিসেবে প্রমাণ করতে প্রয়োজন শিক্ষা ও কাজের সুযোগ।

এসব অপরিহার্য বিষয় গ্রহণ করে নিজেকে স্বাবলম্বী করে নারীরা যাতে সমাজকে এগিয়ে নিতে পারেন সে পরিবেশ তৈরিতে তিনি কাজ করেছেন অক্লান্ত।আবার নারী যেন কোনোভাবেই পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত না হন, সেদিকেও সোচ্চার ছিলেন তিনি। জরা, অজ্ঞতা, পরনির্ভরশীলতা ইত্যাদি থেকে মুক্তি আসে জ্ঞানার্জন ও উপার্জনের মাধ্যমে। সেটি যেন প্রত্যেক নারী মৌলিক অধিকার হিসেবে পান তার জন্য জোর আন্দোলনও করেছেন তিনি। তাই তাঁকে নারীমুক্তি আন্দোলনের স্বয়ম্ভূ ও মুক্তির দিগন্ত উন্মোচনকারীও বলা হয়।

ইরানের সিংহী নামে খ্যাত সিমিন বেহবাহানির (১৯২৭-২০১৪) সাথে সুফিয়া কামালের জীবনের অনেকাংশেই মিল। সিমিন একজন দুর্দান্ত মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী ও নারী নেত্রী। কত যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বিপ্লব পূর্বাপর সময়ে। তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করে বহির্বিশ্বে গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তিনি নানা সামাজিক ও নারী স্বাধীনতা আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। আবার বড়ো মাপের কবি ও সংগঠক ছিলেন তিনি। কবিতার বিষয়-আশয় দেশপ্রেম, প্রকৃতি, স্মৃতিকাতরতা, ব্যক্তিগত অনুভূতি ইত্যাদি।

সুফিয়া কামাল আবার হেলেন কেলারের (১৮৮০-১৯৬৮) মতো অন্যের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার ছিলেন। যা তাঁকে বিশ্বে আইকন নারীতে পরিণত করেছে। নারী-পুরুষের সম অধিকার আদায়ের জন্য ধারণ করেছিলেন আন্দোলনের আয়ুধ।

বেগম সুফিয়া কামাল যেমন ছিলেন সমাজ সংস্কারে অগ্রণী, তেমনি ছিলেন রাজসিক ও বিদগ্ধ আধুনিক কবি। কাব্য, উপন্যাস, গল্প, স্মৃতিকথা ইত্যাদিতে ফলপ্রসূ পদচারণা ছিল তাঁর। নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী ও কবি পরিচয়ের প্রবল প্রভাবই দেদীপ্যমান। শিল্প-সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সব পুরস্কার-সম্মাননায় অভিষিক্ত সুফিয়া কামাল কাব্যকলার ক্ষেত্রে জীবন, প্রকৃতি ও মানুষের সার্বিক প্রেরণায় বিশ্বাস করতেন।

তাঁর কবিতায় আমরা তাই দেখতে পাই প্রকৃতির দারুণ দোলা ও অতীতের স্মৃতিকাতরতা। এতটাই ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন যে, তাঁর অনুভবের জগৎকে বাস্তবরূপে বুনতেন। আবার মানুষের জীবন ও প্রকৃতি পাঠ একান্ত স্বতন্ত্র হিসেবে ধরা দিয়েছে তাঁর কাব্যজমিনে। প্রত্যেকটি ঋতু কী এক মনোহর সাজে উপস্থিত! তাঁর কাব্যে প্রোজ্জ্বল যে অনুষঙ্গ আমরা দেখতে পাই সেটি হচ্ছে স্বজাত্যবোধ। নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্যকে দারুণভাবে কাব্যিক আয়ুধ করে তুলেছেন তিনি।

শব্দচয়ন এবং ছন্দ সচেতনতা তাঁর কবিতাকে ছন্দ-নৃত্য-সৌকর্যে করেছে শ্লাঘ্য। এক গীতলতায় ভেসে যাই যেন ঢেউ আছড়েপড়া সৈকতে জ্যোৎস্নার মধুরতায়। চিত্রকল্প ও উপমা বালিহাঁসের ঝাঁক হয়ে যেন উড়ে যায় মনের উদার আকাশে। কাব্যের সৌষ্ঠবের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেশি ও বিদেশি উভয় ধারা পরিলক্ষিত হয়। জীবনানন্দের (১৮৯৯—১৯৫৪) যে দেশি শব্দ ও আবহের মধ্যে লুক্কায়িত দুঃখ রেশ তা খুঁজে পাই সুফিয়া কামালের ব্যক্তিগত অনুভূতি ও বেদনাময় স্মৃতিতে রচিত কবিতাগুলিতে। কিটসের (১৭৯৫—১৮২১) সৌন্দর্যপ্রীতি ও মুখরতা তাঁর কাব্যকে করেছে নান্দনিক।

রোমান্টিক কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের (১৭৭০—১৮৫০) কাব্যিক অলংকার প্যান্থেয়িজমে প্রভাবিত সুফিয়া কামালের কাব্যিক ভাষা ও বিষয়ের সারল্য অন্যতম। মূল্যবোধের প্রবহমানতা তাঁকে করেছে সর্বজনীন। কবিতাশরীর নির্মাণে দিয়েছেন রুচিশীল চারুশিল্পীর পরিচয়।

ইত্তেফাক/এএএম

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত