এবারের বুকারজয়ী ডগলাস স্টুয়ার্টের সাদাকালো পথে চলা উপন্যাস ‘শাগি বেইন’

এবারের বুকারজয়ী ডগলাস স্টুয়ার্টের সাদাকালো পথে চলা উপন্যাস ‘শাগি বেইন’
ডগলাস স্টুয়ার্ট ও তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘শাগি বেইন’। ছবি: সংগৃহীত

রূপকথার যুগ আর নেই, পোস্ট মডার্ন সাহিত্যের যুগে মানবজন্মের না বলা সংগ্রামের গল্পরাই ঘুরে ফিরে আসে প্রেক্ষাপটে। সেই প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন ঘটে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির সাথে, লেখকের কালির স্রোতে, এবং গণমানুষের চিন্তাভাবনার আদলে। স্কটিশ-আমেরিকান ফ্যাশন ডিজাইনার এবং লেখক ডগলাস স্টুয়ার্ট তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘শাগি বেইন’-এ মানব মানচিত্রের এমনই সুপ্ত গল্পকে ব্যক্ত করেছেন পাঠকের কাছে। ২০২০ সালের ম্যানবুকার পুরস্কার জিতে নিয়েছে উপন্যাসটি।

উপন্যাসের প্রেক্ষাপট আশির দশকের গ্লাসগো শহর, সেই শহরের চরিত্র এবং গল্পটি পাঠক দেখতে পান শাগি বেইনের দৃষ্টি থেকে। উপন্যাসের মূল চরিত্র শাগির জীবন আবর্তিত হয় তার মা অ্যাগনিস এবং তার নিজস্ব ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষ নিয়ে। অ্যাগনিস তার পুরো পরিবার নিয়ে বসবাস করে তার বাবা-মায়ের সাথে। পরিবার বলতে তার স্বামী শাগ, মেয়ে ক্যাথরিন এবং দুই ছেলে লিক ও শাগি। উপন্যাসের পুরো সময় জুড়েই মানুষ অ্যাগনিসের বড়ো পরিচয় হয়ে ওঠে তার পানাসক্তি। সেই পানাসক্তির কারণে জীবনের লাগাম নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়েও আনতে পারে না প্রতিবার। আর সেই অনিয়ন্ত্রিত জীবনের ভার ভীষণভাবে জেঁকে ধরে তার অস্তিত্বকে, তার সন্তানদের জীবনকে। পানাসক্তি তার জীবনকে এমন এক অদ্ভুত ঘোরের মাঝে ঘিরে রাখে, যেখানে সত্যতার কাছে বেশ অলীক বস্তু বলে মনে হয়। সে কারণেই স্বামী শাগ অন্য মেয়ের সাথে রাত্রিযাপন করে জেনেও বোবাদৃষ্টি ছাড়া খুব বেশি কিছু করা তার হয়ে ওঠে না। একপর্যায়ে অ্যাগনিসের মনে হয় জীবনে মোড় ঘোরানো অতীব জরুরি, তাই বাবা-মায়ের ওপর বোঝা হয়ে না থেকে নিজের সন্তান এবং স্বামী নিয়ে আলাদা থাকার বন্দোবস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু সেখানেও প্রকৃতি সদয় হয় না তার প্রতি। স্বামী শাগ নিয়ে আসে তাদের পিটহেডে যেখানের অর্থনীতির চাকা নির্ভর করে কয়লাখনির ওপর, তাও সেই সময়ে অচলাবস্থায়। সেখানের অধিকাংশ মানুষই পানাসক্তি এবং বেকারত্বের কারণে হতাশায় ডুবে থাকে। পানাসক্ত স্ত্রীর জন্য এমন শহর কতটুকু ভালো সেই প্রশ্ন পাঠকের মনে থেকেই যায়। সেখানেই শেষ নয়, শাগ সেই শহরে তাদের রেখে চলে যায় অন্য জায়গায়, সন্তান এবং স্ত্রীর সাথে জীবনযাপন করাটা তার উদ্দেশ্য ছিল না। যে জীবনের লাগাম ধরার আশায় ছিল সেই জীবন পৌঁছে যায় অন্য বাঁকে। স্বামীর প্রতারণা, প্রেমিকদের প্রস্থান, বন্ধুবান্ধবদের তীক্ষ দৃষ্টি—সবকিছুই অ্যাগনিসকে এক ঘেরাটোপে বন্দি করে ফেলে।

অন্যদিকে শাগির জীবন চলে আশা-নিরাশার দোলাচালে। একপর্যায়ে মনে হয়, তার মা হয়তো নিজের আসক্তি থেকে বের হয়ে জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিতে পারবে, কিন্তু পরক্ষণেই সেই আশা ভেঙে চুরমার। আর দশটা সাধারণ মানুষের সাথে শাগির পার্থক্যটা এখানেই যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে তার মাকে মায়ের চেয়েও মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা চালিয়েছে। পেটে ক্ষুধা কিংবা মনে অশান্তি, স্বামীর প্রস্থানের বেদনা কিংবা প্রেমিকদের চক্ষুশূলতা— কোনোটাই তার মায়ের বেঁচে থাকার তাগিদকে ক্ষুদ্র করতে পারেনি। সন্তান হিসেবে বাবা-মায়ের জীবনটা আমরা মানবিক চোখ দিয়ে কতটা দেখতে পারি তার এক উদাহরণ শাগি বেইন। উপন্যাসের একটা বড়ো সময় জুড়ে এসেছে পুরুষ হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তার অবস্থান নিয়ে। শাগি ছেলে হলেও খেলতে পছন্দ করত পুতুল নিয়ে, চুল বাঁধা তার অন্যতম পছন্দের কাজ এবং নাচ তার ভালোবাসার জায়গা। এই সমাজ পুরুষ হওয়ার যেই সংজ্ঞা তৈরি করে দিয়েছে তার কোনো ছাঁচেই সে নিজেকে ফেলতে পারে না। এমনকি তার মাও তাকে আদর্শ পুরুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়ে যায়, কিন্তু শাগি নিজের শান্তি খুঁজে পায় মেয়েলি কর্মকাণ্ডে। শাগির বড়ো দুই ভাইবোনই একসময় ঘর ছাড়ে, শাগিকেও ঘরছাড়ার উপদেশ দেয়। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে শাগি তার আশাকে সম্বল করে মাকে ছেড়ে যায় না। হয়তো মনের গহিন কোণে কোথাও শাগির আশা ছিল—তার মা একদিন আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে।

পুরো উপন্যাস জুড়েই মনে হতে পারে শাগির সাথে তার মায়ের সম্পর্কের যোগসূত্রটা কোথায়। কেনই বা তিন সন্তান থাকার পরেও উপন্যাসের নাম শাগি বেইন, কেনই বা শাগির দৃষ্টিতেই আমরা উপন্যাসটি অবলোকন করি। উপন্যাসটির আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে ব্রিটেনের এমন একটি সময়ে যখন বেকারত্ব প্রকট। এ কারণে এ উপন্যাসকে রাজনৈতিক উপন্যাস বলেও আখ্যা দিয়েছেন অনেকে। উপন্যাসটি থ্যাচারিজমের একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে উপন্যাসের নামকরণের এবং গল্পের কাঠামোর সার্থকতা অন্য জায়গায়। শাগি এবং তার মায়ের বিশেষ সম্পর্কের পেছনে জড়িয়ে আছে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতি আকাশসমান ক্ষোভ এবং প্রশ্ন।

যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার থেকে এই ক্ষোভের উৎপত্তি, কিন্তু দিনশেষে অনুভূতির রাস্তায় অধিকাংশ মানুষই একই পথের পথিক, যেমনটা শাগি এবং তার মা। দুই চরিত্রকে যে তথাকথিত সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতার মধ্যে দিয়ে এক করেছেন, সেটি স্বীকার করেছেন লেখক নিজেই তাঁর এক সাক্ষাত্কারে। যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে প্রথমেই, সাহিত্যের সময়টা এখন আর ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যে আটকে নেই, পোস্টমডার্ন যুগে গল্পগুলো শাখা-প্রশাখা ছড়ায় জাগতিক হাহাকার এবং অজাগতিক শূন্যতাকে ঘিরে। উপন্যাসটি প্রতি মুহূর্তেই একটি করুণ পরিণতির বয়ান করে, প্রশ্ন জাগায় সমাজের স্বার্থপর মানসিকতার দিকে—যেখানে নিজের চিন্তা করাই মুখ্য, সমালোচনার উত্তর ছুড়ে দেয় আসক্তির সাথে লড়তে থাকা মানুষগুলোর। শাগি বেইন প্রচণ্ড সুন্দর একটি দুঃখভারাক্রান্ত সামাজিক কাব্য। যে কাব্যের রসদ আশার বিরুদ্ধে নিরাশা, ভাঙনের বিপরীতে গড়ন, কিন্তু তবুও নিরন্তর সাদাকালো পথচলা।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত