বুকপকেটে নন্দিতা দাশ

বুকপকেটে নন্দিতা দাশ
অলংকরণ: অবিনাশ আচার্য

লেমন কালারেই জীবনটা আটকে আছে। তাই তো লেবুপাতা পেলেই ছিঁড়ে ঘ্রাণ নেই বুকভরে। আহ কী মিষ্টি ঘ্রাণ!

তাকে প্রথম দেখি ৯৩ সালের মাঝামাঝি কোনো এক সময়। সকালবেলা। তার ক্লাস ছিল সকাল আটটায়। আমারও। তবে ভিন্ন সাবজেক্ট। আমি মাস্টার্স, সে অনার্স। আটটার ক্লাসে ঠিক সময়ে আসার জন্যে বেশ তড়িঘড়ি করেই রিকশা থেকে নেমেছিল কলাভবনের নিচতলার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ফটকের সামনে। পরে নিচতলার করিডোর দিয়ে দ্রুতপায়ে হেঁটে ঢুকেছিল ক্লাসে। পরনে ছিল লেমন কালারের সেলোয়ার-কামিজ আর ওড়না। সকালে গোসল করে চুলগুলো ঠিকমতো শুকাতে পারেনি। পেছনের দিকের চুলের আগায় জমে থাকা বিন্দু বিন্দু পানিতে কামিজের পেছনে পিঠের কিছুটা অংশ ভেজা ছিল।

শ্যামলা বরণ। মুখখানিতে একরাশ মায়া। চোখ দুটিতে কি জাদু ছিল? নাকি চুম্বক। জাদুর কারণেই হয়তো কারো দিকে আর মু্গ্ধতা নিয়ে তাকানো হয়নি। আটকে আছি সেই একজোড়া চোখেই। কী সাংঘাতিক ক্ষমতা একজোড়া চোখের!

সেদিন ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। কিছুদিন পর জেনেছিলাম দু’অক্ষরের তার নামটি। জেনেছিলাম ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করবে অনার্সে। আরো জেনেছিলাম একই বিভাগের এক সিনিয়রের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা। কলাভবনটা সেই মুহূর্তে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে কি নড়েচড়ে উঠেছিল? কেউ টের না পেলেও পেয়েছিলাম আমি।

পাক্কা দু’বছর দূর থেকে তাকে দেখেছি, আর মুগ্ধ হয়েছি। কখনো দোতলা থেকে দেখতে না পেলে নিচে নেমে দাঁড়িয়ে থেকেছি তার বিভাগের সামনে। এখনো ঐ বিভাগের একজনের সঙ্গে দেখা হলেই বলে, আপনি কেন আমাদের বিভাগের সামনে গিয়ে মাঝেমাঝে দাঁড়াতেন, প্লিজ বলেন না?

ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল একই বিভাগের সেই সিনিয়রকে। তারপর কেটে গেছে বিশ বছর।

কাজ করি মিডিয়ায়। সম্পাদনার কাজ। একদিন একটা সংবাদ এলো আমার হাতে, ঢাকার বাইরের। আত্মহত্যার খবর। পুরো সংবাদটা পড়ে সহকর্মীকে সেটা দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে যাই। শরীর খারাপ লাগছে বলে। পরদিন সব কাগজেই আত্মহত্যার খবরটা প্রকাশিত হয়েছিল। কারণ আগেই বলেছি, সে খুব ব্রিলিয়ান্ট ছিল। তার পেশার ক্ষেত্রেও ছিল খুব জনপ্রিয়।

তার ছবি আমার কাছে থাকার কোনো কারণ নেই। কোনোদিন কথাও হয়নি। ভালো লাগার বিষয়টি জানানো তো দূরের কথা। তারপরও কেন জানি তার মুখখানি মনে রাখার জন্যে ভারতের নামকরা অভিনেত্রী নন্দিতা দাশের ছোটবেলার একটি ছবি দেখি। এত মিল দুজনের! হঠাত্ মনে পড়ে গেলে সেই মুখখানি গুগলে গিয়ে দেখি নন্দিতা দাশের হাসিমুখটা। বুকের মধ্যে নন্দিতা দাশকে নিয়ে ঘুরি। ভালোবাসার কথা উঠলে তাচ্ছিল্য করেই বলি ভালোবাসিনি, ভালো লাগত একজনকে। সে হচ্ছে নন্দিতা দাশ।

বুকপকেটে নন্দিতা দাশকে রাখি, আকাশের তারা হয়ে যাওয়া যে মানুষটি কখনো জানেনি কেউ একজন কলাভবনের দোতলা থেকে নিচতলায় দাঁড়িয়ে থাকা তাকে দেখত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজো যাওয়া পড়ে। নিজের বিভাগের সামনে যাই। একবার হলেও দোতলার মাঝামাঝি গিয়ে নিচতলার সেই বিভাগের করিডোর দেখি। যেখানে নন্দিতা দাশ দাঁড়িয়ে থাকত ২৬/২৭ বছর আগে। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই লেমন কালারের সেলোয়ার-কামিজ আর ওড়নার সেই নন্দিতা দাশকে। চুলের আগার বিন্দু বিন্দু পানিতে পিঠের কাছে কামিজের কিছু্টা অংশ ছিল ভেজা।

ইত্তেফাক/এসসিএস

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x