বাংলার ভাঁটফুলে মিশে গেছেন কবি কামরুজ্জামান চৌধুরী

বাংলার ভাঁটফুলে মিশে গেছেন কবি কামরুজ্জামান চৌধুরী
[ছবি: সংগৃহীত]

চলে গেছ তুমি কামরুল ভাই

কবরের মাটি দু’হাতে মাখাই।

মগরার এই লোকালয় ছেড়ে

দূরে যেতে নেই।

আমের মুকুলে প্রাণের বকুলে

তুমি ফিরবেই।

মা-বাবার পাশে এক বিছানায়

বসন্তে গেলে নিজ নিরালায়।

তোমাকে রেখেছি মাটির শয্যায়

পুকুর পাড়ের বরই তলায়।

কবরের ঘুমে কী থাকে কালার!

মন মাওলার প্রেম দরবার।

সুফিদের চোখ খুব নিষ্পাপ

প্রিয় সাথিদের মায়ার প্রভাব।

চলে গেছ তুমি কামরুল ভাই

চোখের মণিতে তোমাকে মাখাই।

বাপ্-চাচার ব্যক্তিত্ব ও ঘরানাতেই সমর্পণ করেছিলেন আত্মজীবন। সংস্কৃতিকর্মী ও ক্রীড়া সংগঠক পিতা মুসলেহ উদ্দিন চৌধুরী (রঙ্গু চৌধুরী) এবং সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরীর উত্তরাধিকারেই নিজেকে বড়ো করেছেন; অনাথের সাথে নাথ হয়ে গড়েছেন মানুষ ও সাহিত্যের সংগঠন। সময়কে, সহচরকে সমৃদ্ধ করার ভেতর দিয়েই মানুষ বেঁচে থাকেন। খুব শান্ত, ধীমান এবং বিনয়ী চোখে সহজ ও সহজাত ছিলেন কামরুজ্জামান চৌধুরীর বিচরণকাল। সকলের প্রতিনিধি হয়ে, সকলের কণ্ঠস্বর হয়ে স্নিগ্ধ ও ঝলমলে মুখের হাসিতে সময়কে রাঙিয়ে গেছেন তিনি। তিনি কাউকে ছোট বা বড়ো করেন না। মানুষের কাজ হলো মানুষে সমাহিত হওয়া। সবার পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে মানুষ ভাবা। মানুষের মহিমাই হলো মানুষকে ধারণ করা। ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাসে, রাষ্ট্র-সমাজের বিচূর্ণ অন্ধকারে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষকেই মুছে দিতে হয় মানুষের চোখ। কবি কামরুজ্জামান চৌধুরী সংগঠন ও সাংগঠনিকতায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহমর্মিতার আশ্চর্য এক বিকিরণ দিয়ে গেছেন। আমাদের এই প্রয়াত স্বজনের কাছে অনেক কিছুই শিখবো। কী শিখবো? বিনয়, মিতবাক থাকার ধৈর্য, উচ্চ স্বরে কথা না বলার সৌন্দর্য আর সংগঠন ও সাংগঠনিকতায় মানুষের পাশে থাকার সহজতা।

এক.

কবি কামরুজ্জামান চৌধুরী ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ (জাতীয় নিবন্ধন সূত্রমতে কবির জন্ম তারিখ- ৮ এপ্রিল ১৯৬৩) সালে নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়ায় সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আটপাড়ার সোনাজোড় গ্রামের চৌধুরী পরিবার হিসেবে পৈতৃকভাবেই তাঁরা বিখ্যাত ছিলেন। পিতা মুসলেহ উদ্দিন চৌধুরী (রঙ্গু চৌধুরী) এবং মাতা আশ্রাফুন্নেসা চৌধুরীর তিন কন্যা এবং এক পুত্র হয়ে তিনি অত্যন্ত আদর-যত্নে বড়ো হয়েছেন।

কবিরা পৈতৃকভাবে চট্টগ্রামের দরবারে গাউছে হাওলার মুরিদ। সেই দরবারের পীরজাদা হযরত শাহ সুফি মৌলানা সৈয়দ নাইমুল কুদ্দুস আগবরীর সরাসরি তত্বাবধানে ময়মনসিংহের মেয়ে নূসরাত আরা হাসিনার সাথে ১৯৯৮ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কবি। কবির দুই সন্তান। বড়ো ছেলে মুশফিকুজ্জামান চৌধুরী দাইয়ান শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র; ছোট ছেলে ফতেহ মুবিন চৌধুরী দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

একটা ছোট্ট ও শান্তির ছায়াতলে ভালোই ছিলেন কবিদম্পতি। বছর কয়েক আগে কবি লিভার সমস্যায় অক্রান্ত হয়ে ভারতে চিকিৎসার জন্য যান। সেখানে ডাক্তারদের পরামর্শে কবিকে বাঁচাতে কবির স্ত্রী নিজের লিভারের একটা অংশ কবিকে দান করেন। স্ত্রীর ত্যাগ ও নিবিড় পরিচর্যায় সফল সার্জারিতে ভালোই ছিলেন কবি। করোনাকালে আবারও শরীর খারাপ হলে ভারতের আগের ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা গ্রহণ করে পরিপূর্ণ সুস্থ ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রকৃতি তাঁকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন; ডাক্তার কিংবা প্রিয়জনের সাধ্য কি, তাঁকে আটকে রাখার। মাটির নরম বিছানায় কবিকে শুইয়ে দিতে হলো। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ রাত ২:১৫ মিনিটে তিনি চলে গেলেন।

দুই.

কী এমন বয়স হয়েছিল কামরুজ্জামান চেীধুরীর! অথচ আল্লাহ তাঁকে তুলে নিলেন! কবি সৈয়দ নাজমুল করিমের ভাষায় ‘পেশায় কলেজ শিক্ষক হলেও ছিল স্বল্পকথা বলা মানুষ, তবে বুদ্ধিমান। গত শতকের পঁচাশি-ছিয়াশি সালে নেত্রকোনা সিদ্দিক প্রেসে ছেপে নিজের লেখা কবিতার ফোল্ডিং হাতে তুলে দিয়ে মুহূর্তও দাঁড়াত না । তার জ্যেষ্ঠ পিতৃব্য-সর্বজন শ্রদ্ধেয় খালেকদাদ চৌধুরীর জীবদ্দশায় তাঁরই সম্পাদনায় প্রকাশিত সৃজনী সাহিত্য পত্রিকার নতুনের পাতায় কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়েই সাহিত্যের আবাদি ভূমিতে তার কৃষির শুরু’। বলতে পারি চাচা খালেকদাদ চৌধুরীই ছিলেন তাঁর সাহিত্যিক আদর্শিক প্রেরণা ও গুরু। সুনেত্র প্রকাশনী থেকে কবির লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথিবী খণ্ড খণ্ড রূপের হাট’প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। বিভিন্ন দৈনিক, ছোটকাগজে নিয়মিত ছড়া ও কবিতা লিখেছেন তিনি। তাঁর অধিকাংশ লেখা অক্ষর এবং আগমনীতে প্রকাশিত হয়।

কবিতা এবং ছড়া ছাড়াও প্রচুর ছোটগল্প লিখেছেন তিনি। ত্রেকোনার লোকসাহিত্য বিষয়ে গদ্য লিখেছেন। ‘নেত্রকোনায় রবীন্দ্রচর্চা’ এবং ‘নেত্রকোনায় নজরুলচর্চা’ গবেষণা গ্রন্থদুটো সুনেত্র প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ২০১১ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই গবেষণায় উঠে এসেছে নেত্রকোনার সারস্বত সমাজের রবীন্দ্র এবং নজরুলচর্চা।

এছাড়া তিনি চট্টগ্রামের দরবারে গাউছে হাওলার মুরিদ হয়ে দরবারে গাউছে হাওলার বার্তা ‘ত্বরিকত শিখা’ সম্পাদনা করেছেন। পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে নিয়মিত সেই পত্রিকায় সম্পাদকীয় লিখেছেন।

তিন.

বাড়ির পাশেই আঞ্জুমান আদর্শ প্রাইমারি স্কুলে কবির লেখাপড়ার শুরু। প্রাইমারি পাশ করে এই আঞ্জুমান সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই এসএসসি পাশ করে সম্ভবত আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। তারপরে সরকারি সাদাত কলেজ, টাঙ্গাইল থেকে ইতিহাসে সম্মানসহ এমএ পাশ করেন। এমএ পাশ করার পরপরই মদনপুর শাহ সুলতান ডিগ্রি কলেজে ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। পৃথিবী ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত কলেজের বিভাগেই কর্মরত ছিলেন।

চার.

শহরের সর্বত্র কর্মী মানুষ হয়ে বিচরণ করেছেন তিনি। একা একা স্বার্থপর-নাগরিক হয়ে চুপ করে থাকেননি। মানুষের পাশে থেকে সবার কামরুল হয়ে সজীব-বকুল হয়েছেন। একটা সুন্দর হাসিতে সবাইকে আপন করে নিয়েছেন। তিনি যে সংগঠনটির জন্য পুরো দেশে পরিচিত সেই সাহিত্য সমাজের মাঝি হয়ে ২৫ বছর ধরে একটি উৎসব আয়োজন করে বিখ্যাত লেখকদের ‘খালেকদাদ চেীধুরী সাহিত্য পুরস্কার’ দিয়ে গেছেন। নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজ ও কবি কামরুজ্জামান চেীধুরী সম্পর্কে কবি সৈয়দ নাজমুল করিম বলেন, ‘শুরুর দিকে আনুষ্ঠানিক সভ্য না থাকলেও নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সব অনুষ্ঠানেই একেবারে পেছনের সারিতে তার নিশ্চুপ উপস্থিতির স্মৃতিও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। উনিশশো ছিয়ানব্বই থেকে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিরলস কর্মতৎপরতা জারি রেখে হাল ধরে, গত কয়েক বছর ধরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করছিল। শুধু এটিরই নয়, নেত্রকোনা শহরের আরো কয়েকটি সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছিল কামরুল’। মূলত কাচারী রোডে কবির স্পার্ক নামে একটি কম্পিউটারের দোকান ছিল। সেই দোকানে আড্ডা হতো। সাহিত্যের আড্ডা; তারুণ্যের আড্ডা। সেই আড্ডার কর্ণধার কথা বলতেন কম; কিন্তু অন্যকে কথা বলতে উৎসাহিত করতেন। মূলত ‘স্পার্ক’প্রত্যেকের মধ্যে একটা স্পার্ক তৈরি করেছিল। সেই শক্তিতেই নবীনে-প্রবীণে মিলে শুরু হলো বসন্তকালীন সাহিত্য উৎসব।

শহরের কোন কাজে ছিলেন না কবি। সর্বত্রই মিতবাক; কর্মী, উদ্যোক্তা কিংবা সহযোগী। নেত্রকোনা জেলা স্কাউটের সম্পাদক হয়ে, রেডক্রিসেন্টের সদস্য হয়ে, রাইফেলস ক্লাবের সদস্য হয়ে, দুর্বার গোষ্ঠীর সভাপতি হয়ে জন উদ্যোগের আহ্বায়ক হয়ে তিনি মূলত সাম্য ও সেবায় একটা তারুণিক সমাজই তৈরি করে গেছেন। জনবিচ্ছিন্নতা নয়; অবিচ্ছিন্ন জনসংস্কৃতিতে আস্থা রেখে অবিরাম কাজ করে গেছেন। মূলত মানুষের সাথে মানুষের একটা সম্পর্ক ও মানবিক মনের সেতু তৈরিতে অবিরাম কাজ করে গেছেন তিনি। পাখি চলে গেলেও পাখির গানটুকু থাকে। থাকে ভোরের পবিত্র সংকীর্তন। সেই সংকীর্তনেই তৈরি হয় নতুন দিনের মানুষ।

কামরুজ্জামান চেীধুরীর ছোটখাটো চেহারায় ভাঁটফুলের স্নিগ্ধতা ছিল; ছিল অহংকারহীন দীপ্তিমাখা আহ্বান। একটা নরম কণ্ঠস্বরে আদর মাখিয়ে তিনি সবাইকে আপন করে নিয়েছেন। সবাইতো চেয়ার দখল করে নিতে চায়; স্বার্থ নিমগ্ন পৃথিবীতে কে আর কাকে আপন করে নিতে চায়। কবি হয়ে, ভাই হয়ে, সাহিত্য সমাজের অভিভাবক হয়ে, স্কাউটের সেবক হয়ে, ক্রীড়া সংস্থার দূত হয়ে তিনি সবাইকে আপন করে নিয়েছিলেন। তাই উনাকে বিদায় দেবার আয়োজনে পুরো শহরটা কান্নায় ভারী হয়েছে। সব জীবনই মূল্যবান, সব মৃত্যুই শোকাবহ! মৃত্যুর চিরায়ত সত্যে নিকটজনের মৃত্যু আমাদের মনকে থমকে দেয়; অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দেয়। অশ্রু কিংবা ভালোবাসা; কোনো কিছু দিয়েই প্রিয়জনকে তখন ধরে রাখতে পারি না। নিজেদের কষ্ট, আত্মশিহরণকে থামাতে পারি না। কবি কামরুজ্জামান চেীধুরীর এই চলে যাওয়াকে কীভাবে মেনে নেব আমরা! মাও সে তুং-এর নামে চলে আসা সেই বহুল পরচিত উদ্ধৃতিটি মনে পড়ছে খুব ‘কোনো কোনো মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা, আবার কোনো কোনো মৃত্যু তাই পাহাড়ের মতো ভারী’। মৃত্যুর এই ভারী বিষাদ বহন করতে করতে আমরা হয়তো হালকা হয়ে যাব; নিজেদের খাতায় লিখতে থাকব নিজেদের নাম। কিন্তু চৈতন্যের অনেক গভীরে; বকুলতলার সবুজ মঞ্চটায় তিনি আমাদের সুন্দরের উৎসধারা হয়ে বসবাস করবেন। লিভারের একটা কর্তিত অংশের চিহ্ন হয়ে বসবাস করবেন স্ত্রী নূসরাত আরা হাসিনার চোখের মণিতে। যারা সুফিবাদে বিশ্বাস করেন, তাদের চোখের মণিতে আলো থাকে; সুফিবাদের সেই আলো নিয়ে সামান্য হাসির কামরুজ্জামান চৌধুরী সাহিত্য সমাজের সাইফুল্লাহ এমরানকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘কি রে বেডা; উৎসবডার কী খবর?’

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x