কোভিড-১৯ ফিকশন

এক অনিশ্চিত যাত্রার গল্প

এক অনিশ্চিত যাত্রার গল্প
ছবি: সংগৃহীত

অতিমারির প্রভাব নিয়ে সাহিত্য রচনা নতুন কিছু নয়। এবারে কোভিড-১৯ নামে যে অতিমারি পৃথিবীকে চোখ রাঙিয়ে গেছে কিংবা এখনো যাচ্ছে তার গভীর প্রভাব সাহিত্য রচনায় পড়বে তা স্বাভাবিক। শত বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লু নামে যে মহামারি ধরণীকে এফোঁড়-ওফোঁড় করেছিল সেটিও বিশ শতকের গোড়ার দিকের সাহিত্যকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল। সাম্প্রতিককালের অতিমারিও একইভাবে ফিকশন-স্রষ্টাদের ভাবিয়ে তুলছে। ফলে ‘কোভিড-১৯ ফিকশন’ নামে নতুন সাহিত্যশাখার অবয়ব কেমন হবে তা নিয়ে বোদ্ধামহলে নানা জল্পনা-কল্পনা-ভবিষ্যদ্বাণী চলছে। বলা জরুরি, এই ‘কোভিড-১৯ ফিকশন’কে ‘পোস্ট-পেন্ডামিক লিটারেচার’ বা ‘মারিউত্তর সাহিত্য’ বলেও অভিহিত করা হয়।

বিশ্বসাহিত্যে ঢুঁ মারলেই দেখা যায়, কীভাবে মারির বাস্তবতা মারিউত্তর সাহিত্যে গুরুত্ব পেয়েছে। একইভাবে মানুষের ওপর কোভিড-১৯-এর বিরূপ প্রভাব ‘কোভিড-১৯ ফিকশন’-এর মূল উপজীব্য হবে। এ প্রসঙ্গে অমিতাভ ঘোষের একটি পর্যবেক্ষণ উল্লেখযোগ্য। অতিমারি নিয়ে ‘স্ক্রল.ইন’-এ প্রকাশিত তাঁর একটি লেখার সারবত্তা এমন—যদি কোনো কথাসাহিত্যিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে অতিমারিনির্ভর উপন্যাস লিখতে যান তা প্রোপাগাণ্ডায় (প্রচারসর্বস্ব) পরিণত হবে। হ্যাঁ, যেসব কথাশিল্পী এ সময়ের বাস্তবতাকে ফিকশনে চিত্রায়িত করতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে মারির প্রভাবকে দেখাবেন তাঁরা ‘কোভিড-১৯ ফিকশন’ ধারাটির প্রতি সুবিচার করবেন। ঘোষের এমন নিরীক্ষার আলোকে মারিউত্তর কথাসাহিত্যের ভবিষ্যত্ যাত্রার সম্ভাব্য একটি গল্প বলি।

মারিউত্তর সাহিত্যে ব্যক্তি ও সমাজ

দি ইকনোমিস্ট-এর সংস্কৃতি-বিষয়ক সম্পাদক অ্যান্ড্রু মিলার মনে করেন, ব্যক্তির ভয়, আতঙ্ক, একাকীত্ব, মানসিক যন্ত্রণা, মৃত্যুভাবনা, জীবনের অন্তর্নিহিত অর্থ, অর্থনৈতিক সংগ্রাম, স্বপ্নভঙ্গ প্রভৃতি কোভিড-১৯ ফিকশনসমূহে প্রাধান্য পাবে। তাঁর ধারণা, ভাইরাস-আক্রান্ত ব্যক্তির বয়ানে ফিকশন লেখার সমূহ-প্রবণতা দেখা দিতে পারে লেখকদের মধ্যে। এবং আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক যন্ত্রণা সেসব লেখার মূল বিষয় হবে। সেই সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায়ের ধারণা কীভাবে ব্যক্তির মননে গভীর রেখাপাত করেছে তা-ও কোভিড-ফিকশনের অন্তর্ভুক্ত হবে বলে আমার বিশ্বাস। আবার দি গার্ডিয়ান-এর নিয়মিত কলামিস্ট ও লেখক লরা স্পিনের ধারণা, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ের কোভিড-ভীতি, এবং মহামারিকালে তাদের জীবন ও অর্থনৈতিক সংগ্রাম কথাসাহিত্যিকদের গল্পের রসদ জোগাবে। দি গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত ‘দ্য কোভিড নভেল্স আর অ্যারাইভিং’ নিবন্ধে লরা জানান, সমাজভেদে কোভিডের গল্পগুলো ভিন্ন হবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে ব্যক্তি মানুষের মানসিক টানাপড়েনের গল্প প্রাধান্য পাবে, আবার কোনো জায়গায় একটি গোষ্ঠীর কোভিড-মোকাবেলার গল্প মানুষকে কাছে টানবে। তবে এসব সম্ভবনাকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঔপন্যাসিক ক্রিস ফেনউইক বলেন, ‘মারিউত্তর সাহিত্যে মারির প্রভাবে ব্যক্তির মনোজগতে অবিরত চলমান ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার চিত্র আঁকবেন কথাশিল্পীরা।’

মারিপরবর্তী কথাসাহিত্যে বর্ণবাদ, ক্ষমতার রাজনীতি ও শ্রেণিবিভাজন

২০২০ সালের মে-তে দিল্লির মিন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত অমিতাভ ঘোষ এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘এ-অতিমারি আরেকবার আমাদের মুখোমুখি করেছে বর্ণবাদের; অনেক পশ্চিমা রাজনৈতিক নেতা শুরুতে ভেবেছিলেন এ রোগটির উত্পত্তি এশিয়াতে, অতএব, তাদের এটি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’ অন্যদিকে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব থিয়েটার-এর অধ্যাপক কায়না হ্যামিলের কথা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়—আমেরিকার মতো দেশেও রাজনৈতিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবানরা কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষা করাতে কোনো অসুবিধায় পড়েনি, অথচ সাধারণের জন্য এ সুবিধা ছিল একেবারেই অপ্রতুল। উক্ত অভিজ্ঞতাগুলো কি বর্ণবাদ, রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা শ্রেণিবিভাজনের মতো বিষয়সমূহকে আবার সামনে নিয়ে আসে না? বোধ করি, উক্ত বিষয়গুলো নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করাবে কোভিড-উত্তর কোনো না কোনো সাহিত্যকর্ম।

কোভিড-১৯ ফিকশনের মহাদেশভিত্তিক রূপ

এ বিষয়ে আমার সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন যে, মহাদেশকেন্দ্রিক বাস্তবতা কোভিড-১৯ ফিকশনের সবচেয়ে বড়ো বৈচিত্র্যের জায়গা। এটি স্বাভাবিক, অতিমারি-প্রভাবিত ইউরোপীয় গল্প দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মারিকেন্দ্রিক ফিকশন থেকে আলাদা হবে। এর কারণ বহুবিধ—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং কিছুটা ভৌগোলিকও। তবে মহাদেশভেদে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার তারতম্যই কোভিড ফিকশনে মূল বৈচিত্র্য আনবে। যেমন—দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ কোভিড পরিস্থিতির ভয়াবহতা জেনেও কাজে যায়, রোজগারের চেষ্টা চালায় এবং নিরন্তর বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। অন্যদিকে, ইউরোপের অবস্থা ঠিক উল্টো। ঐ ভূগোলের মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছন্দ্যের কারণে তাদের গল্প অপরাপর অঞ্চলের গল্প থেকে ভিন্ন হবে। তাই কেবল অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে মহাদেশভেদে কোভিড-১৯ ফিকশন আপন আপন রূপ নিতে বাধ্য।

মারিউত্তর সাহিত্যে প্রতিবেশ-সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা

অতিমারির এই সময়কালে ক্লাইমেট ফিকশন (ক্লাই-ফাই) কিংবা ইকোক্রিটিসিজম (প্রতিবেশ-সমালোচনা) প্রভৃতি তত্ত্বের আলোকে রচিত কথাসাহিত্য আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন কথাসাহিত্যিক অমিতাভ ঘোষ। তাঁর ধারণা অনুযায়ী, পরিবেশ, জলবায়ু—মোটের ওপর প্রকৃতির প্রতি মানুষের বিরূপ আচরণনির্ভর সাহিত্যকর্ম যে পৃথিবীব্যাপী ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে তা আরো গতি পাবে বর্তমান বাস্তবতায়। করোনার শুরুর সময়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা হ্রাস, বাতাসের মানের উন্নয়ন কিংবা ওজোনস্তরের ফুটো মিলিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা আমাদের অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এবং এ বাস্তবতা পৃথিবীর নানা প্রান্তে কমবেশি একইরকম ছিল। ফলে যেসকল ইকোক্রিটিক বা প্রতিবেশ-বিশ্লেষক প্রায়ই বলেন যে, মানবসৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ডই পরিবেশ ও প্রকৃতির ক্রমবিনাশে দায়ী, এবং মানুষের বৈরী আচরণই পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টের মূলে তারা কোভিড-১৯ পরিস্থিতিকে একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে বলবেন, মাসকয়েক মানুষ প্রকৃতির প্রতি বৈরীভাব দেখায়নি বলেই এর প্রাণস্পন্দন আমরা অনুভব করতে পেরেছি।

এসকেপিস্ট সাহিত্য’-এর পুনর্জন্ম

অতিমারি-উত্তরকালে মানুষের সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশা কিংবা মৃত্যু-যন্ত্রণার মতো অভিজ্ঞতা ভুলতে ‘এসকেপিস্ট লিটারেচার’ বা বাস্তবকে এড়িয়ে যাওয়া সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হতে পারে। এ প্রসঙ্গে ইতালীয় ইতিহাসবিদ ও গবেষক ড. রেভা’র বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, এ জাতীয় সাহিত্য আগেও সৃষ্টি হয়েছে, ইংরেজি রোমান্টিক কবিদের অনেকেই এসকেপিজমকে পুঁজি করে কবিতা লিখেছেন। কিন্তু এ যাত্রায় এর ধরনটা একটু ভিন্ন হতে পারে। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পর্যুদস্ত মানুষকে হতাশার গল্প না শুনিয়ে তাদেরকে ইউটোপিয়ান কোনো জগতে নিয়ে যেতে সচেষ্ট থাকবেন কোনো কোনো কথাশিল্পী। রোগ, শোক, জরা, মৃত্যুভাবনা প্রভৃতিকে অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই হয়তো এড়িয়ে যাবে তাঁদের রচিত সাহিত্য।

কোভিড-১৯ ফিকশনে সময়

এ কথা জোর দিয়ে বলতে চাই, কোভিড-১৯ কথাসাহিত্যে বড়ো ভূমিকা পালন করবে সময়। অতিমারিকালে একজন ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির সময়ের ধারণা আর ঘরে বন্দি থাকা কোনো মানুষের সময় নিয়ে ভাবনা নিশ্চয় এক হবে না। সময়কে নানাভাবে দেখার কিংবা বিশ্লেষণ করার প্রবণতা বাড়বে। সব মিলিয়ে, কোভিড ফিকশনে সময়কে গল্পবলার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করবেন কথাসাহিত্যিকেরা—এ ধারণা একান্ত নিজের।

প্রতিটি মারির পর মানুষ নতুনভাবে জীবনের অর্থ খুঁজে ফিরেছে, এর ব্যত্যয় হবে না এবারেও, কেউ হয়তো খুঁজে পাবে, কেউ হয়তো না। মার্কস্বাদের মূলকথা—অর্থনৈতিক অবস্থাই মানুষের অন্য সকল অবস্থার নিয়ন্ত্রক—এ চরম সত্যকে মারিউত্তর সাহিত্যিকরা উপেক্ষা করতে পারবেন না বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এবং এটিই বহুলাংশে পথ দেখাবে সদ্য সৃষ্ট এই সাহিত্যশাখার অনিশ্চিত যাত্রাকে।

(সূত্র : দি গার্ডিয়ান, দি ইকনোমিস্ট, মিন্ট এবং স্ক্রল.ইন)

প্রকাশিত মারিভিত্তিক গ্রন্থ

কোভিড-উত্তর নানা সাহিত্যকর্মের মধ্যে ‘টুগেদার, অ্যাপার্ট’ নামের গ্রন্থটি পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছে। এ ছোটগল্প সংকলনটি লেখকদের লকডাউন-অভিজ্ঞতানির্ভর। একইভাবে ‘টুগেদার ইন আ সাডেন স্ট্রান্জনেস: আমেরিকা’স পোয়েটস্ রেসপন্ড টু দ্য পেন্ডামিক’ কাব্যগ্রন্থে কোভিড-১৯ কেন্দ্রিক একশ’ কবিতা স্থান পেয়েছে। অন্যদিকে, জেডি স্মিথের লেখা ‘ইনটিমেশানস্’ শিরোনামের প্রবন্ধগ্রন্থে অতিমারির সময়ে ফুঁসে ওঠা বর্ণবাদকে নানা আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাছাড়া ফটোগ্রাফার বিল হেইস লকডাউনের সময়ে তোলা বিভিন্ন আলোকচিত্র দিয়ে প্রকাশ করেছেন ‘হাউ উই লিভ নাউ সিন্স ফ্রম দ্য পেন্ডামিক’ শিরোনামের একটি বই।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x