দূরে হঠাও রবির আলো

দূরে হঠাও রবির আলো
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ আমার ভালো লাগে না। তার অনেক কারণ আছে। সব কথা বলা যাবে না। সব কথা বলা যায়ও না। আজ ২৫শে বৈশাখ, তাঁর জন্মদিন। এই দিনে তিনি ডাক দিয়েছিলেন চির নূতনরে। আমি তো নূতন নই। চির নূতন তো কোনোদিনই নই। আমি সবুজও নই, কাঁচাও নই। আমি আমার অহম নিয়ে থাকি। আমি আমার আকাশ নিয়ে থাকি। সেখানে অনেক আকাশ থাকলেও সেখানকার কোনো আকাশে ‘রবি’ নেই। এজন্য রবির আলো আমার ভালো লাগে না।

রবীন্দ্রনাথ নাকি একইসঙ্গে অনেক কিছু ছিলেন! ভাবারে ভাবা (বাবা রে বাবা)! তিনি নাকি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতকার, চিত্রশিল্পী, নাট্যকার, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক! সেদিন আমার ফেসবুকের বন্ধুবৃত্তে খুঁজে দেখলাম দশজনের মধ্যেই পাঁচজনেরই কবিতার বই আছে, গল্প-উপন্যাসের বই আছে। তারা নিয়মিত কলাম লেখেন। মানে তারা প্রাবন্ধিক। ফেসবুকে তারা অত্যন্ত জ্ঞানের কথা বলেন, দার্শনিকও নিশ্চয়ই। সুতরাং এক রবিকে নিয়ে মাথা ঘামানোর কী আছে? রবির চেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র আমাদের চারিদিকেই কোটি কোটি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাহিত্য নাকি ভাবগভীরতায় পূর্ণ! তাঁর সাহিত্যে নাকি বিশ্বপ্রেম ও মানবপ্রেমের পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেম, রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা আর প্রগতিবোধ প্রকাশ পেয়েছে! কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি নাকি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্বন্ধে তাত্পর্যপূর্ণ কথা বলেছেন। আমি পড়িনি। এক লাইনও কখনো পড়িনি। এসব পড়ে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়? ওসব পড়ার চেয়ে ফেসবুকে জ্ঞান ছড়ানো অনেক বড় কাজের কাজ। সেখানে আমার মতোই অনেক জ্ঞানী আছেন, যারা রবিকে পাত্তাই দেয় না। তারা তো আর না বুঝে এসব বলেন না। নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথ অনেক খারাপ! সেদিন দেখলাম একজন রবিভক্ত ফেসবুকে লিখেছে—সমাজকল্যাণ, গ্রাম উন্নয়ন ও গ্রামের দরিদ্র মানুষের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে রবীন্দ্রনাথ সোচ্চার ছিলেন। শান্তিনিকেতনের কাছে সুরুল গ্রামে আমেরিকান কৃষি অর্থনীতিবিদ লেনার্ড এলমহার্স্ট এবং শান্তিনিকেতনের শিক্ষক ও ছাত্রদের সহযোগিতায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন শ্রীনিকেতন নামে পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্র।

হে হে! এরকম প্রশংসা নির্বাচনের সময় আমাদের এলাকার চান্দুমিয়াকে (স’মিলের মালিক) নিয়েও বলা হয়। আরেকদিন ফেসবুকে পড়লাম, পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশদের নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদে ইংরেজ সরকারের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি নাকি ত্যাগ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো জানতেন তেয়াগিলেই আসে হাতে। খুব চালাক! কেউ একজন কমেন্টে লিখেছে—রবীন্দ্রনাথ নাকি ছবিও আঁকতেন। নিজের লেখাকে সংশোধন-কাটাকুটি করতে করতেই নাকি তিনি ছবি আঁকা শেখেন। প্রায় ৭০ বছর বয়সে তিনি ছবি আঁকতে শুরু করেন। তারপরেও তিনি প্রায় দু’হাজার ছবি এঁকেছিলেন।

হে হে! ছবিগুলো আমি দেখেছি। ওরকম বিমূর্ত ছবি প্রতিদিন গণ্ডায় গণ্ডায় আঁকতে পারি। আমারে কেউ চেনে না বলে পাত্তা দেয় না। আমি রবীন্দ্রসংগীতও লিখতে পারি। রবীন্দ্রনাথের মতো করে কবিতাও লিখতে পারি। পরীক্ষা খাতায়—‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন’ লেখার পর তার নামে কবিতা বানিয়ে বানিয়ে লিখে দিয়েছি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি এর চেয়ে ভালো লিখতেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি পাঁচটি মহাদেশের তিরিশটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন! আমার টাকা থাকলে আমিও দেশভ্রমণ করতাম। ফাইভ স্টার হোটেলে থাকতাম আর...। তখন তেমন বড় কেউ ছিল না বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জনপ্রিয়তা নাকি বিংশ শতকের শুরুতে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়ায় বিশাল বেড়ে গিয়েছিল। সেদিন ফেসবুকে দেখলাম (ফেসবুকই তো সব, আমি তো ঐ একটাই বুক পড়ি) ভারতের বিখ্যাত গায়ক মান্না দে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান একদম পছন্দ করতেন না তাঁর প্রিয় সুরকার শঙ্কর জয়কিষেণ। (পাবলিকের মুখ কী করে বন্ধ করবে তোমরা! হে হে!)।

এরপর অবশ্য দেখলাম একজন কমেন্ট করেছে— রবীন্দ্রনাথের গান জয়কিষেণ পছন্দ করেন না জেনে মান্না দের মাথা গরম হয়ে যায়। তিনি নাকি একদিন শঙ্করকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শোনান রবীন্দ্রনাথের গান। কথার মানে বোঝান, দেখান তালের বৈচিত্র্য। রাগ-রাগিণীর ব্যবহার, প্রতিটি সুরের মধ্যে বিস্ময়কর সংযম। এসব জেনে অবশ্য খুব লজ্জা পেলেন জয়কিষেণ। এই ঘটনাতেও বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বুঝতে হলে তালগাছে উঠতে হয়। আমরা হলাম দূর্বাঘাস, তালগাছে ওঠার শক্তি সাহস কোথায়? আমরা হলাম উইপোকা। জন্মান্ধ হয়ে থাকতেই ভালোবাসি। রবির আলো আমাদের সহ্য হয় না। দূরে হঠাও এই আলো। আমি আলোকিত হতে চাই না। চির নূতন হওয়ার প্রশ্নই নেই। আমি চিরকাল কুয়োর অন্ধকারেই পড়ে থাকতে চাই।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x