নজরুল ও বঙ্গবন্ধু

নজরুল ও বঙ্গবন্ধু
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯—১৯৭৬ খ্রি.) ও জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০—১৯৭৫ খ্রি.)—এই মহান দুই পুরুষ স্বাধীনতাকামী বাঙালির অগ্রদূত। মুক্তিকামী বাঙালি এই অগ্নিপুরুষদ্বয়ের অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে স্বাধীনতার আস্বাদ লাভ করেছেন। আর কৃতজ্ঞ বাঙালি তাদের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে নজরুলকে ডেকেছেন ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং মুজিবকে ডেকেছেন ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে। মূলত দুজনই কবি, সাহিত্যের কবি কাজী নজরুল আর রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু।

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ৯০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ-ভারত যৌথ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির ভাষণে বলেন, “বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল এবং বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানসিকতার দিক থেকে সমান্তরাল অবস্থানে রয়েছেন। তিনি অনুষ্ঠানে আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছা ছিল শোষণহীন বাংলাদেশ গড়া। নজরুলও চেয়েছেন বঞ্চনাহীন, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়তে। দুজনের স্বপ্ন ছিল এক ও অভিন্ন। দুজনই ছিলেন বিদ্রোহী। একজন সাহিত্যে, অন্যজন রাজনীতিতে। এজন্য একজনকে বলা হয় ‘পোয়েট অব লিটারেচার’, অন্যজনকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’।”

চিত্র:Nazrul.jpg - উইকিপিডিয়া

নজরুল ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আরো একটি বক্তব্য পাওয়া যায় অন্য অনুষ্ঠানে—

পশ্চিমবঙ্গের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮ সালের বিশেষ সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন দেশের শোষণপীড়িত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম-আন্দোলন করেছেন, কারাবরণ করেছেন, আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, ঠিক তেমনি নজরুলও শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কথা লেখনীর মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছেন। আর এ কারণেই কারাবরণ করতে হয়েছে। তাই একদিকে বাংলা সাহিত্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম, তেমনি অন্যদিকে রাজনীতির কবি শেখ মুজিবুর রহমান।’

বাংলা-বাঙালির সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রশ্নে যে দুটি মহাপ্রাণের নাম অপরিহার্যভাবে চলে আসে, তাঁরা হলেন কাজী নজরুল ইসলাম ও শেখ মুজিবুর রহমান। দুজনই স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, একজন ভারতবর্ষের অন্যজন বাংলাদেশের। দুজনই কারাবরণ করেছেন, একজন গণমানুষের কথা কবিতা আকারে বলে, আরেকজন গণমানুষের কথা ভাষণে বলে। একজন মহান কবি অন্যজন মহান নেতা। দুজনই অগ্নিঝরা কথা বলেছেন, গানে-ভাষণে।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম | বাঙালীয়ানা

বঙ্গবন্ধু নজরুলের চেয়ে ২০ বছর ৯ মাস ২৩ দিনের ছোট। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন নজরুল তখন সৈনিক কবি। সেখান থেকেই নিয়মিত লেখা পাঠাতেন ‘মোহাম্মদী’ ও ‘সত্তগাত’ পত্রিকায়। এ দুটি পত্রিকাই বঙ্গবন্ধুর পিতা তাঁদের বাড়িতে রাখতেন। কাজেই পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকেই বঙ্গবন্ধু নজরুলকে জেনেছেন-চিনেছেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম ব্রিটিশ আমলে ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। এই বৃহত্তর ফরিদপুর শহরে নজরুল ৭ বার আগমন করেন। তাঁর এই আগমন ছিল কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগদান, মত্স্যজীবী সম্মেলনে যোগদান, নিজের নির্বাচনী প্রচারের কাজে, কৃষি-শিল্প সংস্কৃতি সম্মেলনের অতিথি হিসেবে, জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে যোগদান, ফরিদপুর সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের ছাত্র সম্মেলনে যোগদান উপলক্ষে। এই শেষ সফরে বঙ্গবন্ধু প্রত্যক্ষভাবে নজরুলের সংস্পর্শে আসেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ তিনি লিখেছেন—

‘একটা ঘটনার দিন-তারিখ আমার মনে নাই, ১৯৪১ সালের মধ্যেই হবে। (আসল তারিখ ১২ আগস্ট ১৯৪১ খ্রি.) ফরিদপুর ছাত্রলীগের জেলা কনফারেন্সে শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁরা হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ূন কবীর, ইব্রাহীম খাঁ সাহেব। সে সভা আমাদের করতে দিল না। ১৪৪ ধারা জারি করল। কনফারেন্স করলাম হুমায়ূন কবীর সাহেবের বাড়িতে। কাজী নজরুল ইসলাম সাহেব গান শোনালেন।...’

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি: বিবিসি বাংলার জরিপে তৃতীয় স্থানে কাজী নজরুল  ইসলাম-অসাম্প্রদায়িক মানবতার কবি - BBC News বাংলা

বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের শেষাংশে যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহার করেন, তা আক্ষরিক অর্থে নজরুলই প্রথম ব্যবহার করেন তাঁর ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায়। আগস্ট ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ভাঙার গান’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়। মাত্র কয়েক মাস পরে ১১ নভেম্বর গ্রন্থটি সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। কারণ কবিতাটির পরতে-পরতে ছিল বাঙালির মুক্তির ইঙ্গিত-বিজয়ের ইঙ্গিত। অন্যদিকে ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার কয়েকদিন পর ২৬ মার্চ তাঁকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গ্রেফতার করে ফেলে।

এক অভিন্ন চিন্তা-চেতনা ও স্বপ্নের নায়ক ছিলেন নজরুল ও বঙ্গবন্ধু। জাতি-ধর্ম ভেদাভেদের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন এই দুই মহান নেতা।

বিদ্রোহী কবি উচ্চারণ করেন—‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান/মুসলিম তার নয়ন-মণি হিন্দু তাহার প্রাণ। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ বাঙ্গালি-অবাঙ্গালি হিন্দু-মুসলমান সবাই আমাদের ভাই, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।’

জাতীয় কবি নজরুলের ১২১তম জন্মবার্ষিকী পালিত

বিদ্রোহী কবি ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির রজত-জুবিলি অনুষ্ঠানের ভাষণে বলেন, ‘বিশ্বাস করুন আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি।’ বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ভাষণে বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, মানুষের অধিকার চাই।’

বিদ্রোহী কবি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শেষাংশে বলেন, ‘যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না/বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/আমি সেইদিন হব শান্ত।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে লড়াইয়ের ডাক দিয়ে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাংলা-বাঙালি নিয়ে দুই মানবতাবাদীর সমউচ্চারণ— বঙ্গবন্ধু বলেন ‘জয় বাংলা।’ বিদ্রোহী কবি বলেন, ‘বাঙলার জয় হোক।’

কাজী নজরুল ইসলামকে শেখ মুজিবুর রহমান অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। তাইতো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কবিকে ঢাকায় আনার ব্যপারে জোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কাজী নজরুলের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী ঢাকায় উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই মোতাবেক বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগত প্রতিনিধির মাধ্যমে পত্র প্রেরণ করে কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এজন্য বঙ্গবন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।

বাংলাদেশ ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম

১৯৭২ সালের ২৪ মে কবি নজরুলকে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকা আনেন। সেদিনই তিনি তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছাসহ কবিকে দেখতে যান। বঙ্গবন্ধু গভীর শ্রদ্ধাভরে কবিকে পুষ্পমালা পরিয়ে দেন এবং পরম মমতায় বারবার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধু কবির জন্য ধানমন্ডির একটি বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করেন, মাসিক এক হাজার টাকা ভাতা প্রদানসহ চিকিত্সার জন্য মেডিকেল টিম গঠন করে দেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে বিদ্রোহী কবির ৭৩তম জন্মবার্ষিকী ঢাকাসহ সারাদেশে বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। নজরুল একাডেমি আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কবিকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘বাণী’ পাঠিয়ে দেন। বাণীর একটি বাক্যে লেখেন—‘নজরুল বাংলার বিদ্রোহী আত্মা ও বাঙালির স্বাধীন ঐতিহাসিক সত্তার রূপকার।’

সদ্য স্বাধীন দেশের প্রথম মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বঙ্গবন্ধু নজরুলের ‘চল্ চল্ চল্’ গানটিকে বাংলাদেশের রণসংগীতের মর্যাদা দেন। এ সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।

ঢাকায় নজরুলচর্চা ও উত্তর ঔপনিবেশিক তত্ত্বালোচনা

২০২১ সাল নজরুল ও বঙ্গবন্ধুর জীবনের এক বড় মাইলফলক। কারণ এ বছর ৬ জানুয়ারি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্মশতবর্ষ এবং ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ।

অন্যদিকে ‘আগস্ট’ মাস সমগ্র বাঙালি জাাতির জন্য হারানোর মাস, কষ্টের মাস, শোকের মাস, কারণ এ মাসেই বঙ্গবন্ধু ও বিদ্রোহী কবি—দুই মহাপ্রাণের মহাপ্রয়াণ ঘটে। একজন ১৫ আগস্ট ও আরেকজন ২৯ আগস্ট।

নজরুল ও বঙ্গবন্ধুর নাম ‘বাংলা’ নামক ভুখণ্ডে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। প্রতিটি বাঙালির হূদয়ে চির জাগরুক থাকবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x