এক যাযাবর পুরুষের চোখ

এক যাযাবর পুরুষের চোখ
বুদ্ধদেব গুহ [২৯ জুন ১৯৩৬—২৯ আগস্ট ২০২১]

‘এখন শেষবিকেল। বৈশাখের বিকেল। কালবৈশাখী আসতে পারে আজ। পশ্চিমের আকাশ সাজছে। যদি আসে, তবে কিছু আমগাছের মুকুল আর কিছু গুটি আম ঝরে যাবে। গেলে যাবে। এসব তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপারে আর কোনো ঔত্সুক্য নেই কিরণশশীর। কিরণশশী, কুলোতে করে কিশমিশ বাছছিলেন। হাঁসগুলো প্যাঁ-অ্যাক, প্যাঁ-অ্যাক করে হরিসভার পুকুর থেকে দিনভর গুগুলি আর কুচোমাছ খেয়ে পেট ফুলিয়ে হেলতে-দুলতে উঠোন পেরিয়ে খোপের দিকে ফিরছিল। ওরা এখুনি খোপে ঢুকবে না। কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে গা শুকিয়ে নেবে পড়ন্ত রোদে। ওদের গায়ে জল দাঁড়ায় না। যদিও তলপেট ও ভেতরের দিকে ভেজা থাকে। তা ছাড়া, সারাদিন জলে থাকায় হিম হয়ে যায় শরীর’।

— অংশটি ‘আলোকঝারির দিনগুলি’ উপন্যাসের চতুর্থ পর্বের সূচনা অংশ, এর পরেই কিরণশশীর কাছে এসে বসে শিলি, সেই কালো সবুজ ডুরে শাড়ি মেয়ে, যার মা নেই আর বাবা এ সময়ে যান নগেন জ্যাঠার কাছে। দেরাজ ভরা কাপড় ফেলে রেখে এ জীবনের বাইরে চলে যাওয়া মায়ের কথা কিছুটা ভুলে শিলি নিজের নতুন শরীরের প্রতি কেমন লালচি হয়। মায়ের মতো নয়, ওর নিজের দেহের আদ্যন্ত ঘরটি ঘিরে ধরে বিকেলবেলার চাতক পাখিরা, যারা ফটিকজল বলে ডাকে আর হারিয়ে যায়। গল্পকার বুদ্ধদেব গুহ সময়ের টুকরো মুহূর্তকে ঋতু পর্যায়ে নারী ও পুরুষের আবহের স্পন্দনে প্রবিষ্ট করেছিলেন। মননের গুপ্তপ্রাণ কক্ষে তিনি ঘাতক হয়ে মেয়েদের কথোপকথন ও তাদের আনাগোনার স্তরগুলি অনুশীলন করেছিলেন, তাই সংলাপের নিজস্ব ক্ষেত্রে দুটি মেয়ের দেহভঙ্গি কখনো বিশেষ বয়ানের চেহারা পেয়েছে। এ অপরের চোখ পড়তে সজাগ, ভুল হয়নি বুঝতে। যেমন শিলি ও কিরণশশী। নিজের মধ্যে এই duality-কে বহনের স্পর্ধা লেখকের এক বিশেষ প্রতিভার দস্তখত।

সেকালে স্বপ্ন দেখতাম অর্যমাকে। স্বপ্ন বোনার পশমকাঁটায় তখনো রাত্রির রক্ত লাগেনি। দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশ পেত বুদ্ধদেব গুহ-র ‘অবরোহী’ পত্রোপন্যাসের এক-একটি কিস্তি; আর তার সম্বোধন, কাহিনির আখ্যানভাগ ছিল ঠিকের পড়া বাতাসের গায়ে বৃষ্টির ছাটের মতো স্পন্দমান। এর আগে লেখকের ‘মাধুকরী’ পড়ে যেমন শিউরে উঠেছি, বলা যায় ফুকো যে ‘হেটেরোটোপিয়া’র কথা বলেন—অর্থাত্ এমন একটা পরম্পরাহীন স্পেস যেটা আমরা কল্পনা করতে পারি, কিন্তু সম্পূর্ণ নাগালের মধ্যে পাই না; ‘মাধুকরী’র কুর্চি আর পৃথুর বাউণ্ডুলে প্রেমের গতি ছিল সেরকম। অন্তত লেখক তাদের শ্রীকান্ত ও রাজলক্ষ্মীর মতো বাঁধনের নিগড়ে বাঁধতে চাননি মোটে, পুরুষের স্ত্রী হিসেবে সম্পর্ককে নানা দিক থেকে আনুগত্যে বা প্রথার শাসনে বিশেষ নির্দিষ্ট পরিচয়ে নামাঙ্কিত করেননি। তাই রুষার খরতার পাশে কুর্চির রমণীয় শরীরের টানে আমিও মশগুল হয়ে পাতার পর পাতা কাহিনিতে ডুবে গেছি। বুদ্ধদেব গুহ সেই আশির শেষের বছরগুলির মসনদে একক বাদশাহ।

সুনীলের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ পড়ুক বা না পড়ুক, ‘মাধুকরী’ পড়তেই হবে। কারণ, পৃথুর বোহেমিয়ান সত্তার ম্যাসকুলিনিটি এ আখ্যানের ভিন্ন একটা স্বগতোক্তিমূলক প্রবাহ নির্মাণ করতে পেরেছে; বা এটাও বলা যায়, শরত্চন্দ্রের দ্বিচারিতার পর এক অক্ষয় তৃষিত পাঠক ক্রমে বুদ্ধদেব গুহকে নিজের মতো করে গ্রহণ করেছিল এই ডিসকোর্সের মাধ্যমে। বাঙালি যুবক তার বাল্যপ্রেমের অভিশাপ যেন পূরণ করে নিয়েছে এরকম পরিণতমনস্ক নরনারীর সম্পর্কের বৃত্তায়নকে নস্যাত্ করে। অথচ রুষাকে পৃথুর খারাপ লাগে না, রুষা এখনো যথেষ্ট আকর্ষণীয়, ব্যক্তিত্বময়ী। কিন্তু কুর্চি? সে ক্যামেলিয়া, কানে গোঁজা যাযাবর পলাশ, তার বাজুতে ঘাসবীজের মালা, নিরাভরণে সে শস্যময়ী। কালো মাটির দাওয়া, তার শ্যামলা বরণ দেখিয়ে দেয়। জঙ্গলের ভেজা বনজ মাটির ঘ্রাণ এসে লাগে। আমার তখন মনে হয়, পৃথুর অনুভবনের মিড় ধরে আমি নিজেও পুরুষের রসনা টের পাচ্ছি। আর এভাবেই একদিন লেখকের সৃজনে পৃথু হয়ে উঠেছি, তেমন মাতাল, তেমন বুনো। নগরজীবনের আদিখ্যেতাময় সাজানো ওয়ালপেপার আর টানছে না আমায়। মেয়ে হবার আগে তাই পৃথুর ক্লোন গজিয়ে আমি নিজেকে মেশিনে ফেলে ছাপ নেবার চেষ্টা করেছিলাম একদিন।

প্রথমে লুকিয়ে পত্রিকা পড়ার যুগে, নিজের কিশোরবেলার অপরিচয়ের তাঁত থেকে আখ্যানের মধ্যবিন্দুতে যখন ঢুকেছি, বুঝিনি তার বক্রতার মূল চাবি কোথায় লুকোনো। কিন্তু আমার মুগ্ধতায় তখন দরজা দেবার উপায় নেই। কিন্তু কাহিনির ধারাবাহিকতা ছিঁড়ে যেত, মুখে বলা যেত না ঐ সংখ্যাটা দরকার, ওটা কে সরালো? অনেক পরে বুঝেছি, বাবা পুরনো দেশ সিঁড়ির তলায় রাখতেন আর এমতাবস্থায় যখন কুর্চিকে আমার চাই, চাই... সামান্য এক ধাপ উঠে এক চোয়াড়ে বন্ধুর সাহায্যে পুরো বই হাতে পেলাম। তা হলো ‘সন্ধের পরে’। অস্তরাগের আকাশের মতো গল্প। দুই প্রৌঢ় নর-নারীর জীবনের মখমলের ভেতরে আমি সেই অন্তর্লীন পুরুষিক অহম্ নিয়ে নিজেকে লুকোচ্ছি।

No description available.

বল্লরী সেন, কবি ও কথাসাহিত্যিক

মেয়েদের মুখের লাবণ্যে, তাদের গ্রীষ্মস্নানের ধূপের গন্ধ, রান্নার আঁচে আমি বিভিন্ন বয়সী নারীর রূপ লাভ করি আর কখনো ঋতি, কখনো অর্যমা হই। হয়তো এরকমে না জেনে না বুঝে আমি নাট্যামোদীর মতো একবার মেয়ের একবার পুরুষের পোশাক পরি। হুলুক পাহাড়ের গায়ে জেগে ওঠে পাইন আর ওকের পাতার জোনাকি। আমার কৈশোর শহরতলির লাল মাটির সুবাসে আমি যখন নিজেকে ভাবছি যোজনগন্ধা জোয়ারদার, তখনই স্কুলফেরত কষ্টের ঝাঁঝ এসে লাগছে আর আমার চিরুনিতে তার মৃত চুম্বনের মতো ক্রমশ, এক জটিল অরণ্যপ্রান্তর ঘিরে ফেলছে, যা আজও সেই সৃষ্টির ঐক্যে নিয়ে যায়।

মণীন্দ্র গুপ্ত বলেছেন, মৃত্যুর পরেই লেখকের প্রথম জয়তিলক আঁকা হয়, তার আগে নয়। কালান্তরে বুদ্ধদেব গুহ-কে উত্তরকালের রথে এবার চড়িয়ে দেওয়া হলো।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x