অনুজ-অগ্রজদের সম্মিলিত কীর্তি: উদ্ভাবনকে পণ্যে রুপান্তরের নতুন পদ্ধতির আত্মপ্রকাশ

অনুজ-অগ্রজদের সম্মিলিত কীর্তি: উদ্ভাবনকে পণ্যে রুপান্তরের নতুন পদ্ধতির আত্মপ্রকাশ
ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিজনেস ইনোভেশন এসোসিয়েশনের খসড়া হিসেব মতে, সারা বিশ্বে প্রায় ৯০০০ এরও বেশি বিজনেস ইনকিউবেটর রয়েছে। এদের বেশিরভাগই করোনা মহামারীর কারণে কার্যক্রম চালাতে পারছে না। ভার্চুয়াল ইনকিউবেশন প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা অতীত ও বর্তমান মিলিয়ে ৮০ এরও কম। তন্মধ্যে গ্লোবাল মার্কেটের শত শত মিলিয়ন আইডিয়া স্টেজ স্টার্টআপদের ফ্যাসিলিটেট করার জন্য চালু রয়েছে ৪৫টি।

বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বে ৩০৫ মিলিয়নেরও বেশি স্টার্টআপ টিকে রয়েছে যেগুলো প্রায় ৪৭২ মিলিয়ন অন্ট্রাপ্রেনর দ্বারা পরিচালনা করা হচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় গত এক যুগে বাংলাদেশে প্রায় ২০-২৫টি ইনকিউবেটর ও এক্সেলেটর উঠে এসেছে কিন্তু সঠিক ফ্রেমওয়ার্কের অভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের উদ্ভাবনী এবং সৃজনশীল মেধাভিত্তিক তরুণ সমাজ বিভ্রান্তিতে ভুগে থাকে। কোনো প্ল্যাটফর্মে মেন্টরিং কিংবা গাইডেন্স নেবার ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই বুঝতে পারে না যে তারা আসলে কোন স্টেজে রয়েছে এবং কখন তাদের কোন বিষয়ের ওপর পরামর্শ বা দিক-নির্দেশনা প্রয়োজন।

এরই প্রেক্ষিতে "Theoretical Strategy Based Framework of Business Incubation Process for Disruptive Innovations -

The Double Staircase Model" শিরোনামের একটি গবেষণাপত্র উত্থাপন করেছেন আইইবির কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনের সাবেক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার রনক আহসান এবং সরকারের আইডিয়া প্রকল্পের অধীনে আয়োজিত স্টুডেন্ট টু স্টার্টআপ প্রোগ্রামের কোর্ডিনেটর আশিকুর রহমান রুপক।

পুরো বিশ্বের বিভিন্ন গবেষক এবং বিশেষজ্ঞদের ১৯৮২ সাল হতে অদ্যাবধি প্রস্তাবিত সব ইনকিউবেশন ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণসহ ইনোভেশন কিংবা স্টার্টআপদের প্রয়োজনীয় সব এনপিডি (নিউ প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট) পদ্ধতিগুলোর ব্যাখ্যা এই জার্নালটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণ এর ভিত্তিতে "দ্যা ডাবল স্টেয়ারকেস মডেল" নামক একটি কৌশলগত বিজনেস ইনকিউবেশন ফ্রেমওয়ার্ক জার্নালটিতে প্রস্তাব করা হয়েছে যা দক্ষ উদ্যোক্তাদের অনুসরণে যে কোনো উদ্ভাবনী আইডিয়াকে কিংবা ডিজরাপ্টিভ চিন্তাকে ব্যবসায়ীক পণ্যে রুপান্তর করা সম্ভব বলে ধারণা করছেন এই দুই তরুণ গবেষক।

বর্তমান বিশ্বের জন্য সময়োপযোগী এই ফ্রেমওয়ার্কভিত্তিক গবেষণাপত্রটি Journal of Applied Computer Science & Technology Vol: CSE 2, No. 2, August 2020 এ প্রকাশিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রকৌশলী রনক আহসান ও আশিকুর রহমান রুপক দুজনই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাক্রমে ২০০৪ এবং ২০১৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত প্রকৌশলী রনক আহসান বর্তমানে আইইবির সহকারী সাধারণ সম্পাদক (একাডেমিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল) এবং বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ টেলিটক বাংলাদেশ শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, "ডিজিটাল বাংলাদেশ রুপকল্পের বাস্তবায়ন আমাদেরকে উন্নত দেশের যে নতুন স্বপ্ন এনে দিয়েছে তা পূরণ করতে হলে তারুণ্যের সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। অনেকে মনে করেন, রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে কিভাবে আসলে এসব নিয়ে কাজ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যে, রাজনীতি আমাদেরকে যে কোনো একটি বিষয়কে একাধিক দিক থেকে এনালাইসিস করবার সক্ষমতা প্রদান করে যা অভিজ্ঞতা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে শেখা যায় না।"

প্রকৌশলী রনক আহসান বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ এর সাবেক উপ- তথ্য প্রযুক্তি সম্পাদক যে পদে বর্তমান কমিটিতে রয়েছেন আশিকুর রহমান রুপক। ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি আশিকুর রহমান রুপক মাইক্রোসফট, এশিয়ান নেটওয়ার্ক অফ ইয়ুথ ভলান্টিয়ার সোসাইটিসহ বেশ কিছু সরকারী এবং বেসরকারী প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল চিন্তাধারার তরুণ-তরুণী ও তাদের স্টার্টআপ উদ্যোগগুলোর ফ্যাসিলিটেশনে কাজ করেছেন। এটি তার দ্বিতীয় গবেষণাপত্র এবং এর আগে গত বছর একই জার্নালে তিনি সিস্টেমেটিক মডেলভিত্তিক ইনোভেশন ইকোসিস্টেম এর উপর একটি গবেষণাপত্র উত্থাপন করেছেন।

সাধারণত সঠিক ইনকিউবেশন প্রসেসের অভাবে প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ স্টার্টআপই আইডিয়া স্টেজে বন্ধ হয়ে যায়। অথচ বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সবাই না জেনে না বুঝেই প্রয়োজনীয় ফান্ডের অভাব, সুযোগ-সুবিধার অভাব, ইকোসিস্টেমের ব্যর্থতা, ইত্যাদিকে দায়ি করে থাকেন।

এ সম্পর্কে আশিকুর রহমান রুপক বলেন, "ইফেক্টিভ ও ইফিসিয়েন্ট কোনো একটা প্রোসেস ডিজাইন করতে হলে সেটা সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতাভিত্তিক ফলাফল নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন। আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সকল ক্ষেত্রেই এটা অনুসরণ করি ঠিকই কিন্তু লার্নিং কিংবা ফ্যাসিলিটেশন যেটাকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের লার্নিং বলা হয়, এসবে আমরা অন্যান্য দেশের মডেলগুলো অনুকরণেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এর ফলে একটু যদি ভালভাবে লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন যে আমাদের দেশের ইকোসিস্টেমে সবকিছু থাকার পরেও আমরা একটি ইউনিকর্ণ বের করতে পারি নি। যেখানে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে ভারতে প্রায় ৬১টি ইউনিকর্ণ বের হয়েছে। ইউনিকর্ন বলতে সে সকল স্টার্টআপ কিংবা কোম্পানিগুলোকে বুঝানো হয় যাদের প্রত্যেকের ভ্যালুয়েশন ১ বিলিয়ন ডলারের উপরে। এই সমস্যার মূলে রয়েছে ছোট ছোট কিছু ফ্যাক্টর। এই যেমন, ২০১৮ সালের একটি পরিসংখ্যান এর মতে, ভারতের প্রায় ৫০শতাংশ তরুণ-তরুণীদের নিজস্ব ব্যবসা কিংবা উদ্ভাবনের একটি আইডিয়া রয়েছে। এখন যত বেশি আইডিয়া তত বেশি পণ্য, যত বেশি পণ্য ততবেশি বাজার, ততবেশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ততবেশি বিজনেস গ্রোথ অপরচুনিটি আর যতবেশি বিজনেস গ্রোথ অপরচুনিটি ততবেশি ইউনিকর্ণ। তাই আমাদের প্রস্তাবিত এই মডেলটি স্পেসিফিকভাবে উদ্যোগতাদের আইডিয়াগুলোকে সফল পণ্যে রুপান্তরের সক্ষমতা প্রদান করবার উদ্দেশ্যে ডিজাইন করা হয়েছে।"

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত