দেশীয় খেলাধুলা এখন ভিডিও গেমসের দখলে

দেশীয় খেলাধুলা এখন ভিডিও গেমসের দখলে
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। তথ্যপ্রযুক্তি সবকিছু এনে দিয়েছে আমাদের হাতের মুঠোয়। মানুষের বিকল্প এখন এসব প্রযুক্তি। একসময় মানুষ দিয়ে যা যা করতে হতো, এখন তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে সেসব সহজেই করা সম্ভব। যেন মানুষের বিকল্প প্রযুক্তির উদ্ভাবিত বিভিন্ন সামগ্রী। প্রযুক্তি একদিকে যেমন আমাদের জীবনযাপন সহজ করেছে, অন্যদিকে আমাদের আবেগ-অনুভূতিকেও নষ্ট করেছে।

তথ্যপ্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় সবার হাতে হাতে নানা ধরনের ডিভাইস রয়েছে। এতে মানুষ ধীরে ধীরে সব কাজে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। স্মার্টফোন বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির এক অনন্য ‘উপহার’। বর্তমান সময়ে এমন মানুষ কমই খুঁজে পাওয়া যাবে, যার কাছে স্মার্টফোন নেই। এটি আমাদের যেমন উপকারী করছে, তেমনি কেড়ে নিচ্ছেও আমাদের অনেক কিছু।

স্মার্টফোন সহজলভ্য হওয়ায় দেশীয় খেলাধুলা দিনে দিনে বিলীন হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম মাঠে গিয়ে খেলার চেয়ে মোবাইল ফোনেই বিভিন্ন গেম খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তারা সারাক্ষণ পাবজি, ফ্রি ফায়ারের মতো হিংস্র সব ভিডিও গেমস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। ফলে তারা ঝুঁকে পড়ছে অশ্লীলতার দিকে। জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপকর্মেও। তরুণ প্রজন্মকে মুখ ফেরাচ্ছে সেই পুরোনো অতীতের নানা বিনোদন থেকে। লাটিম, মার্বেল, কানামাছি, গোল্লাছুট, হাঁড়িপাতিলসহ সেই সব মজার খেলা আজ আর চোখে পড়ে না। নতুন প্রজন্ম সেসব খেলা সম্পর্কে জানেও না।

মিস্ত্রিদের সুতা দিয়ে বানানো সেই লাটিম এখন আর নেই। লাটিমের সেই বেল্লাপার, ঘরকোপ আর ধুরতি কোপের মতো আনন্দঘন খেলাও নেই।

স্কুল ছুটি হলেই লাটিম নিয়ে মেতে উঠত শিশু-কিশোরেরা। এক লাটিমেরই যে কত কসরত! লাটিম মাটিতে ঘুরিয়ে হাতের ওপর ঘোরানো। হাতের ওপর কে কতক্ষণ ঘোরাতে পারে—চলত সেই প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা মাঝেমধ্যেই চরম আকার ধারণ করত। কে কার লাটিমে কত ক্ষত করতে পারে, সে নিয়ে চলত পালটাপালটি আঘাত। এতে লাটিমের মাথায় লোহার যে পেরেক থাকে, সেটা আরো ধারালো হতো। সেসব গল্প এখনকার কিশোর-তরুণদের কাছে রূপকথার গল্পের মতোই অজানা!

ভিডিও গেমসের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। তবে এই আসক্তিকে সম্প্রতি মানসিক রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাই স্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, শিশুদের এসব ভার্চুয়াল গেম থেকে দূরে রেখে আবার মাঠের খেলায় ফেরাতে হবে। না হলে তরুণ প্রজন্ম মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

একজন মা বলেন, ‘মিজান সারা দিন গেম নিয়ে ব্যস্ত, আমাদের সঙ্গে কোনো দাওয়াতে যেতে চায় না, বন্ধুদের সঙ্গে মেশে না, গল্পের বই পড়ে না। ক্রিকেট বা অন্য কোনো খেলাও খেলে না। ডিজিটাল পর্দার গেম ছাড়া তার আর কোনো কিছুতে আগ্রহ নেই। বাসায় কিছুক্ষণের জন্য ওয়াইফাই বন্ধ থাকলে তার উত্কণ্ঠা বেড়ে যায়। আমরা রাগ করে তার মুঠোফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই আমাদের কটুবাক্য বলে, চিত্কার করে আবার তার মুঠোফোনটি নিজের কবজায় নিয়ে আসে। সারা দিন ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকে, ইদানীং স্কুলেও যেতে চায় না।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আদনান আল মামুন বলেন, ‘খুব বেশি দিন আগের কথাও নয়, একবিংশ শতকের শুরুর দিকে শিশু-কিশোর ছিলাম আমরা। তখনো মোবাইল ফোন সহজলভ্য ছিল না। অভিজাত দু-এক জনের হাতে মোবাইল ফোন দেখা যেত। থ্রিজি, ফোরজি সে তো কল্পনার বাইরে। আমাদের সারা দিন কাটত কানামাছি, গোল্লাছুট, লুকোচুরি, গুলতি—এসব খেলে। সাঁতার কাটতে গিয়ে কতবার পানি খেয়েছি তার হিসাব নেই। রবিবারে পঠাগারে যেতাম। ভূতের গল্প, ইশপের গল্প, ঠাকুমার ঝুলি—এসব নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করতাম।

আর এখনকার ছেলেমেয়েরা তো অনেক এগিয়ে গেছে। অল্প বয়সেই বড় বড় ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা। সারা দিনরাত মোবাইলে কী খেলা খেলে!! পাগলের মতো একা একাই কথা বলে। এই বয়সে তারা ধর্ষণ, মাদকের মতো সব ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এসব দেখে শুধু একটা কথাই উপলব্ধি হয়—ভালো ছিল মোর সেই কৈশোর, আম কুড়ানোর দিনগুলি। রজব আলী মেমোরিয়াল বিজ্ঞান কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক হজরত আলী বলেন, ‘প্রতিনিয়ত এসব ভিডিও গেম খেললে শরীরে একধরনের হরমোন নিঃসারণ হয়। এতে শিশু সবকিছু নিয়েই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়ে যায়। মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়।’ এছাড়া কারো সঙ্গে মিশতে না পারা, ঘুম ও খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম তো রয়েছেই।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x