অনলাইন পাঠদানে কতিপয় বিবেচ্য বিষয়

অনলাইন পাঠদানে কতিপয় বিবেচ্য বিষয়
প্রতীকী ছবি

বিগত মার্চ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত মোট ১০ মাস কোভিড-১৯ সংক্রমণের আশঙ্কায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে এই কারণে যে, ছাত্রদের টিউশনি ফির ওপর নির্ভর করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক খরচ, শিক্ষকদের বেতন ইত্যাদি, যা বর্তমানে স্থবির হয়ে আছে। এই বাস্তবতায় এটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে, উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা অনির্দিষ্টকালের জন্য থমকে যাবে কি না।

এই পরিস্থিতির আলোকে উচ্চশিক্ষা চলমান রাখার স্বার্থে গত বছরের ৭ মে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি নির্দেশনা জারি করে। আবার সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম চালানোসংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগও গ্রহণ করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরও অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার জন্য নির্দেশনা জারি করে, তারও আগে ইউজিসি প্রতিষ্ঠান থেকে একটি জরিপ চালানো হয়েছিল অনলাইন পদ্ধতির ওপর সর্বমহলের মতামত গ্রহণ করার জন্য।

এই প্রক্রিয়ায় দেশের চলমান ১৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতি আগ্রহের সঙ্গে তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম যেমন ছাত্র ভর্তি, ফি জমা এবং একাডেমকি কার্যক্রম গত মে মাস থেকে শুরু করে, যার মধ্যে আছে বিভিন্ন পদ্ধতির ব্যবহার, যেমন—যান্ত্রিক উপকরণ, ফেসবুক, জুম, গুগল ক্লাস রুম, মাইক্রোসফট টিম ইত্যাদি। সার্বিক অনলাইন পদ্ধতি একটি যন্ত্রনির্ভর নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি। যদিও এর আগে ক্লাস রুম পরিবেশে ল্যাপটপ দিয়ে পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রচলিত ছিল এবং এখনো চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে দূরশিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে ক্লাস পরিচালনা করত বিশেষত, যাদের রুটিন মাফিক ক্লাসে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হতো না। অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতি বিশ্বের উন্নত দেশে আগে থেকেই পরিচালিত ছিল এবং বর্তমান বাংলাদেশ সরকার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় সারা বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বক্ষেত্রে তার ব্যবহার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

কিন্তু দেশে সক্রিয় ৪৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ ব্যাপারে ধীরগতি চলার নীতি অনুসরণ করায় ছাত্রছাত্রীরা তাদের নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায়। অধিক প্রতীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশে শর্তসাপেক্ষে জুলাই ২০২০-এর ১ তারিখ থেকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাস চালু করছে, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬০-৬৫টি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। এরমধ্যে ৫৭টি বেসরকারি ও বাকি আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার ৬০-৭০ শতাংশ। দেশে মোট ১০৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বর্তমানে ৯৫টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। পরবর্তীকালে গত ৭ মে ২০২০, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শর্তসাপেক্ষে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষার অনুমতি দিয়ে একটি গাইডলাইন প্রকাশ করে ইউজিসি। নকল ঠ্যাকানোসহ কয়েকটি শর্তে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা ও ভর্তির অনুমতি পায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ইউজিসি বলেছে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় নকল বা অসদুপায় অবলম্বন করতে না পারে—সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলমান সেমিস্টারের শিক্ষাকার্যক্রম অনলাইনে সন্তোষজনকভাবে পরিচালনা করেছে, তাদের দুটি বিকল্প নির্দেশনা দিয়েছে ইউজিসি।

প্রথম : কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী যারা চলমান সেমিস্টারের কোর্সসমূহের অসমাপ্ত পাঠ্যসূচির অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং ল্যাবরেটরিভিত্তিক সব কোর্সের ব্যাবহারিক ক্লাস করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শ্রেণিকক্ষে সম্পন্ন করতে হবে। অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের উপযোগী ডিজিটাল পদ্ধতিতে যে কোনো অনলাইন প্ল্যাটফরমের সহায়তা নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

দ্বিতীয় : যারা চলমান সেমিস্টারের কোর্সসমূহের অসমাপ্ত পাঠ্যসূচির অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করছে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের উপযোগী ডিজিটাল পদ্ধতিতে যে কোনো অনলাইন প্ল্যাটফরমের সহায়তা নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। চলমান সেমিস্টারে তত্ত্বীয় কোর্সের বিভিন্ন বিষয়ে রেজিস্ট্রিকৃত শিক্ষার্থীদের অনলাইনের মাধ্যমে ঐ সব বিষয়ের অসমাপ্ত পাঠ্যসূচি (যা ৩০ শতাংশের মতো) সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হয়ে গেলে অনলাইনের কার্যক্রম শুরুর আগে চলমান সেমিস্টারের বিভিন্ন বিষয়ে ইতিপূর্বে ক্লাসে উপস্থিতি, পারফরম্যান্স, ক্লাস টেস্ট, মিডটার্ম পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে যে মূল্যায়ন করা হয়েছে তার নম্বর এবং অনলাইনের পঠিত অংশের ওপর অ্যাসাইনমেন্ট, কেস স্টাডি, ভাইবা (ভিডিও ডিভাইস অন থাকা অবস্থায়), ভার্চুয়াল প্রেজেন্টেশন নিয়ে যথাযথ স্বচ্ছতা ও মান নিশ্চিত করে মূল্যায়ন সম্পন্ন করে ফলাফল প্রকাশ করা যাবে।

অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বেশ কিছু সমস্যা দেখা দেয় বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ডিভাইসের স্বল্পতা, কম গতির ইন্টারনেট এবং ডাটা ক্রয়ে অক্ষমতা। এখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। করোনাকালীন এ সময়ে অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চমূল্যে মোবাইল ডাটা ক্রয়ের আর্থিক সামর্থ্য নেই, যাদের বেশির ভাগই দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে উঠে আসা যার। ফলে তারা লোডশেডিং, ইন্টারনেটের ধীরগতি ইত্যাদি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে; যা শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণে বিমুখ করে তুলছে। সম্প্রতি অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে টেলিটক ইউজিসির প্ল্যাটফরম বিডিরেনের মাধ্যমে জুম ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ফোরজি নেটওয়ার্ক প্রদান পরিষেবা শুরু করে। আমরা ফোরজি যুগে প্রবেশ করলেও আক্ষরিক অর্থে ফোরজি ইন্টারনেটের সুবিধা কোনোভাবেই পাচ্ছি না। অনলাইন পরীক্ষা নকলমুক্ত করার জন্য সুরক্ষিত ব্রাউজার ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়, যখন অনলাইন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে তখন একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্রাউজারে অন্য উইন্ডোজ বা ট্যাপে যাতে পরীক্ষার্থী খুলতে না পারে, সে জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিকল্প প্রস্তাব দুটির যে কোনো একটি গ্রহণ করতে হলে চলমান সেমিস্টারে অনলাইনে নেওয়া ক্লাসে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকতে হবে। অনলাইন তথা ভার্চুয়াল ক্লাস পরিচালনার ব্যাপারে শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি অনেক ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয় এবং প্রথাগত শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক ক্লাস পরিচালনায় অভ্যস্ত শিক্ষকগণ অনেক ক্ষেত্রে ফেসবুক পদ্ধতি ছাড়া আরো পদ্ধতি যেমন গুগল ক্লাস রুম, জুম ইত্যাদিতে অভ্যস্ত নয়। একই অবস্থায় শিক্ষার্থীরাও স্মার্ট ফোন ছাড়া অন্য কিছুতে তেমন পারদর্শী নয়। এখন অনলাইন যেহেতু একটি দূরশিক্ষণ পদ্ধতি—তাই শিক্ষার্থী বিশেষত বিজ্ঞান- গাণিতিক-অর্থনীতি বিষয়গুলো যেখানে গ্রাফ/লেখচিত্র ইত্যাদির প্রয়োগের বিষয় রয়েছে, যেগুলো কতটুকু ধারণ করতে পারছে ছাত্ররা, তা বলা দুরূহ, যা মূল্যায়নের দাবি রাখে।

অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিনটি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি, যেমন—১. পাঠের ধরন ও বিষয়, ২. ছাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ ও এর ব্যাপ্তি বা প্রক্রিয়া, ৩. শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ও পরিবীক্ষণ পদ্ধতি। এ ছাড়াও ব্যাবহারিক ক্লাস নেওয়ার জন্য ব্যবহার উপযোগী সফটওয়্যার জোগাড় করা দুরূহ ব্যাপার এবং পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। পরীক্ষায় নকল দমন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা বলে চিহ্নিত। এখানে উল্লেখ্য যে, অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ায় এবং সময় সাশ্রয় করে যদিও বুঝে-না-বুঝে অনেকে এর বিরোধিতা করে থাকে, বিভিন্ন ফোরামে যা সঠিক নয়। মফসসেলর কত জন শিক্ষক এই প্রযুক্তি সম্পর্কে অবগত—তা গবেষণার বিষয়। সরকার এসব জায়গাতে কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা করেনি, যা সময়ের দাবি।

সবশেষে বলা যায়, কোভিড-১৯ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান হবে—তা এই মুহূর্তে বলা যায় না। অর্থনীতিসহ জীবনজীবিকার ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে সরকারের উদ্যোগের কোনো ঘাটতি নেই। এ পর্যায়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নীতিনির্ধারকবৃন্দ সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে নেবেন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে যে আর্থিক দুর্বলতা করোনার কারণে সৃষ্টি হয়েছে, সে ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউজিসি কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আবার শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে ক্যাম্পাস মুখরিত হোক—সেই প্রত্যাশা রইল।

লেখক: সিন্ডিকেট সদস্য, ডিন ও অধ্যাপক,

সিটি ইউনিভার্সিটি

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x