মোবাইল কোম্পানিকে বিশেষ ছাড় দিল এনবিআর

ভ্যাট কমিয়ে অর্ধেক, এটি ভ্যাট আইনের পরিপন্থি, দাবি বিশেষজ্ঞদের
মোবাইল কোম্পানিকে বিশেষ ছাড় দিল এনবিআর
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ছবি: সংগৃহীত

দেশের মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর জন্য চতুর্থ প্রজন্মের (ফোরজি) লাইসেন্স ও তরঙ্গ বরাদ্দের বিপরীতে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) বিদ্যমান ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে অর্ধেক করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। মঙ্গলবার এ বিষয়ে একটি বিশেষ আদেশ জারি করা হয়েছে।

এই আদেশের ফলে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বিটিআরসির (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) কাছ থেকে এ সংক্রান্ত লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে যে ফি বা চার্জ পরিশোধ করবে, তার ওপর ভ্যাট অর্ধেক কমে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে। মূলত ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করতে হলে বিটিআরসিকে ভ্যাট নিবন্ধন দিতে হয়। আবার বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন থাকলে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো প্রদেয় ভ্যাটের বিপরীতে রেয়াত দাবি করতে পারত। ফলে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কায় বিটিআরসিকে নিবন্ধন দিচ্ছিল না এনবিআর। এ নিয়ে এনবিআর, বিটিআরসি ও মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর মধ্যে বছরের পর বছর ধরে মতবিরোধ চলে আসছিল। ইস্যুটি এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

অন্যদিকে একই কারণে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় ২০১৯ সাল থেকে আটকে রয়েছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত মামলার ঝামেলা এড়িয়ে কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও রাজস্ব আদায় করার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, উপকরণ কর রেয়াত সংক্রান্ত ঝামেলার কারণে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ কর আদায় হচ্ছিল না। এখন হ্রাসকৃত হার হওয়ায় আইন অনুযায়ী তারা আর রেয়াত চাইতে পারবে না। ফলে ভ্যাটের অর্থ তারা আর আটকে রাখতে পারবে না। জানা গেছে, গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট নির্ধারণের জন্য আবেদন করেছিল।

অবশ্য ভ্যাট আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাট আইনের মূল উদ্দেশ্যই হলো সংযোজিত মূল্যের ওপর কর এবং উপকরণ কর রেয়াতের সুযোগ। এনবিআরের নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, কারো যদি আইন মেনে উপকরণ কর রেয়াত নেওয়ার সুযোগ থাকে, তাকে অবশ্যই সে সুযোগ দিতে হবে। রাজস্ব কমে যাওয়ার ভয়ে (উপকরণ কর রেয়াত না দেওয়া) যদি ভ্যাট নিবন্ধন না দেওয়া হয়, তা আইনের ব্যত্যয়। এমনকি প্রমিত হারের বদলে (১৫ শতাংশ) রেয়াতের সুযোগ আটকে দিতে যে ভ্যাট কমিয়ে দেওয়া হলো, তাও ভ্যাট আইনের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সুযোগ মোবাইল ফোন কোম্পানি বা বিটিআরসির ক্ষেত্রে হলেও সরকারের অন্যান্য সংস্থার সেবাগ্রহীতাদেরও একই সুযোগ পাওয়া উচিত। যেমন বিআরটিসি বা ওয়াসার মতো সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও তারা ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করে আসছে। অথচ একই আইনের মধ্যে থেকে বিটিআরসি আদায় করছে না। তারা বলছেন, যদি বিটিআরসি সঠিক হয়, তাহলে অন্য সংস্থাগুলো যে ভ্যাট নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করছে, তা যৌক্তিক নয়। এতে বরং ভ্যাট আদায় ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা আরো বাড়বে।

সূত্র জানায়, এনবিআরের নতুন আদেশের ফলে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব সাশ্রয় হলেও এতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ভোক্তার আর্থিকভাবে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কেননা বরাদ্দকৃত তরঙ্গের সরাসরি ভোক্তা হলো মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো। ভোক্তার সেবার সঙ্গে এটি সরাসরি সম্পৃক্ত নয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মোবাইল ফোনের এ ধরনের ফির ওপর ভ্যাট ছিল ১৫ শতাংশ। তবে ১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। এর পরবর্তী অর্থাত্ ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ফের তা ১৫ শতাংশ করা হয়। ভ্যাট নিবন্ধন দেওয়া না দেওয়া সংক্রান্ত ঝামেলা তৈরি হওয়ায় মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো আইনি পথে হাঁটায় ভ্যাটের অর্থ আদায় আটকে যায়। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে রবির তরঙ্গ নবায়ন ফির ওপর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ভ্যাট আদায়ও আটকে যায়।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x