বাড়ছে ডিজিটাল লেনদেন

বাড়ছে ডিজিটাল লেনদেন
ফাইল ছবি

গত দুই দশকে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সাধারণ ব্যাংকিং পরিবর্তিত হয়েছে ডিজিটাল ব্যাংকিং-এ। আর ইন্টারনেট সেবা ও প্রযুক্তিনির্ভরতায় ব্যাংকিং সেবা প্রকৃত অর্থেই গ্রাহকের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। বাংলাদেশ এগোচ্ছে। সমানতালে উন্নত হচ্ছে আর্থিক সেবাদান প্রক্রিয়াও। গত দুই দশকে এ দেশের ব্যাংক খাতে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। এর পরও দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে ব্যাংকিং সেবার বাইরে। ফলে তারা উন্নয়নস্রোতের বাইরে থেকে যাচ্ছে। আর্থিক সুবিধাবঞ্চিতদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুবিধা পৌঁছে গেছে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রসারিত হওয়ায় এ দেশে গ্রামীণ বাস্তবতায় নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে স্বাধীনতার পর পরই কিন্তু উদ্ভাবনী আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচিগুলোর কারণে গ্রামবাংলার ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছিল। দরিদ্র মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার বাইরে ছিল, তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুরু হয়েছিল, বেড়ে উঠেছিল গ্রামীণ অকৃষি খাত এবং খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। তবে নতুন শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে সরকারের যথাযথ নীতি সহায়তা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা এ খাতের বিকাশকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একটি অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বের ১৫ বছরের অধিক বয়সি ৩১ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো আর্থিক সেবার আওতার বাইরে রয়েছেন। আর বাংলাদেশের ১৬ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবার বাইরে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০২৪ সালের মধ্যে শতভাগ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে এরই মধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষকসহ বিভিন্ন নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব এবং ওই হিসাবধারীদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ও টেকসই করার লক্ষ্যে বিনা জামানতে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান, স্কুল ব্যাংকিং ও পথশিশুদের জন্য ব্যাংক সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ব্যাংকের উপশাখার মাধ্যমে আর্থিক সেবা প্রসারের কাজ চলছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক সেবাপ্রত্যাশী মানুষের জন্য স্বল্পতম সময়ে সহজে ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা, আর্থিক শিক্ষাসহ গ্রাহক স্বার্থরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

সর্বশেষ, গত জানুয়ারি ২০২১-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানেই এই আর্থিক সেবার গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি। তবে সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটির কাছাকাছি। ১২ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের দেশে এ সংখ্যা কোনোভাবেই কম বলার উপায় নেই। ব্যাংকে না গিয়ে দৈনন্দিন ছোট ছোট নানা প্রয়োজনে মানুষ এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আশ্রয় নিচ্ছে। ছোটখাটো লেনদেনে ব্যবহার হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং। বিশেষ করে নানা ধরনের পরিষেবা বিল (বিদ্যু, ওয়াসা, গ্যাস, টেলিফোন) পরিশোধ, স্কুল-কলেজের বেতন, অনলাইনে কেনাকাটা, সরকারি ভাতা, পেনশন, বাস ট্রেন থেকে শুরু করে প্লেনের টিকিট ক্রয়, বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, বিভিন্ন অনুদান, সাহায্য ইত্যাদি প্রদানে আজকাল চট করেই মোবাইল আর্থিক সেবার কথা ভাবছে সবাই। বর্তমানে খুব সহজেই ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা আনা সম্ভব হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে। আবার মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব থেকেও ব্যাংকে টাকা জমা করা যাচ্ছে।

ক্রেডিট কার্ড কিংবা ব্যাংকঋণের কিস্তির টাকাও জমা দেওয়া যাচ্ছে এর মাধ্যমে। এভাবেই শহর, বন্দর এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে থাকা মোবাইল ফোনটি যেন নিজের জন্য একটি ব্যাংক হয়ে উঠছে। আগে ব্যাংক শাখায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণে যে সময় ও শ্রম ব্যয় হতো তা এখন পুরোটাই লাঘব হয়েছে মোবাইল আর্থিক সেবার দ্রুত বিকাশ এবং চমৎকার গতিশীলতার কারণে।

আর্থিক খাতের গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ই-কেওয়াইসি নীতিমালা জারি করেছে। এর আওতায় এখন থেকে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে যে কোনো ব্যক্তি ঘরে বসে মাত্র পাঁচ মিনিটেই ব্যাংক হিসাব, পুঁজিবাজারের বিও হিসাব ও বীমা পলিসি খুলতে পারবেন। দ্রুততম সময়ে এই সেবা নিশ্চিত করার জন্য গ্রাহকের ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য অটোমেটিক পদ্ধতিতে যাচাই-বাছাই করে দেবে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সফটওয়্যার ‘পরিচয়’। এই সফটওয়্যার গ্রাহকের যে কোনো তথ্য (কেওয়াইসি) নিমিষেই বাংলাদেশ জাতীয় ডিজিটাল আর্কিটেকচারের (বিএনডিএ) সঙ্গে অটোমেটিক মিলিয়ে নিতে পারবে। এতে গ্রাহকপ্রতি হিসাব খোলা ও কেওয়াইসি সংরক্ষণের খরচ প্রায় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আর্থিক সেবার বাইরে থাকা মানুষকে ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে এজেন্ট ও উপশাখা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমেও মানুষের দোরগোড়ায় যাচ্ছে ব্যাংকিং সেবা। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত হচ্ছে। এই খাতে কর্মসংস্থানও বাড়ছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে। যে ব্যাংক যত সহজ করছে গ্রাহকরা সেই ব্যাংকের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোও মানুষের আরো দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা নিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানও বাড়ছে।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x