স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান থেকে যেভাবে তৈরি হলো পেগাসাস!

স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান থেকে যেভাবে তৈরি হলো পেগাসাস!
ছবি: ফরবিডেন স্টোরিজ

মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন আসার সাথে সাথেই এই ফোনে থাকা তথ্যকে নিরাপদ রাখতে মাথা ঘামানো শুরু করে বিশ্বের বড় বড় সব প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

ফেসবুক-গুগলের পাশাপাশি আরো অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা দিন-রাত ২৪ ঘন্টা কাজ করে যাচ্ছে স্মার্টফোনের তথ্য নিরাপদ রাখতে। কোন অ্যাপের মাধ্যমে যদি ডাটা প্রাইভেসি লঙ্ঘনও করে সেই বিষয়েও বিশ্ববাসীকে যত দ্রুত সম্ভব অবগত করতেও কাজ করছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

এতসব কিছুর মধ্যদিয়েও বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির হাজার হাজার কর্মীর চোখকে ফাকি দিয়ে বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে স্মার্টফোনের মাধ্যমে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছিলো ইজরায়েলের এনএসও নামের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নির্মিত স্পাইওয়ার পেগাসাস। এই স্পাইওয়্যার ফোনে প্রবেশ করলে একদিকে যেমন ব্যবহারকারী তা বুঝতে পারবেন না, একই ভাবে এই ফোনে এই স্পাইওয়্যারের উপস্থিতি টের পাবেন না সফ্টওয়্যার ডেভেলপাররাও।

বিশ্বব্যাপী রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, সমাজকর্মী-সহ বিভিন্ন পেশার মানুষদের স্মার্টফোনে নজরদারির জন্য ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবথেকে সংবেদনশীল স্পাইওয়্যারের খেতাব পেয়ে গেছে পেগাসাস। ইজরায়েলের একটা প্রযুক্তি স্টার্ট-আপ থেকে কি করে তৈরি হলো এই বিপদজনক স্পাইওয়ার! ইজরায়েলের এনএসও গ্রুপ সম্পর্কে ফরাসি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফরবিডেন স্টোরিজ এ প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত করেছে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। সেই প্রতিবেদনটি দৈনিক ইত্তেফাক এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

পেগাসাস: শুরু হল যে ভাবে?

শ্যালেভ হুলিও ও ওমরি লাভি নামের দুই বন্ধু মিডিয়াএন্ড (MediaAnd) নামে একটি স্টার্ট-আপ শুরু করেন ২০০০ সালে। ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দায় এই সংস্থা প্রায় বন্ধ হতে চলেছিল। কিন্তু, ২০০৭ সালে আইফোন লঞ্চ হওয়ার পরে নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পান শ্যালেভ হুলিও ও ওমরি লাভি। সেই সময় মানুষ ফোন ও টেক্সট মেসেজ ছাড়াও অন্যান্য কাজ করার জন্য ফোন কিনতে শুরু করেন।

এই সময় শ্যালেভ হুলিও ও ওমরি লাভি কমিউনিটেকের (Communitake) নামে একটি অ্যাপ নিয়ে আসেন, যা ব্যবহার করে দূর থেকে যে কোনও স্মার্টফোন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রথমে টেক সাপোর্টের জন্য এই সার্ভিস তৈরি হয়েছিল। কিন্তু, দিন দিন স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়তে থাকার কারণে বিভিন্ন স্মার্টফোন মেসেজিং অ্যাপে এনক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হয়, যা নানা দেশের সরকারকে ফোন ট্যাপ করার কাজ কঠিন করে দেয়। এতদিন পর্যন্ত টেলিকম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কোনও কল অথবা মেসেজ আদান প্রদানের সময় ফোনে আড়ি পাতার কাজটি অত্যন্ত সন্তর্পণে সেরে ফেলত বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। কিন্তু, এনক্রিপশন পদ্ধতি চালু হওয়ার কারণে তা সম্ভব হচ্ছিল না। যে কোনও মেসেজ ডিক্রিপ্ট করার জন্য প্রয়োজন বিশেষ কি, যা শুধুমাত্র প্রেরক ও প্রাপকের ফোনেই থাকে।

নিজেরা না জেনেই এই সমস্যার সমাধান করেন ওমরি লাভি ও শ্যালেভ হুলিও। এই সমাধানের ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলি যে কোনও ফোনে আড়ি পাততে পারবে। শুধু তাই নয়, এনক্রিপশনের বাধা টপকে যে কোনও মেসেজ পড়া যাবে। এর পরেই এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগ্রহ দেখাতে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। তখনই মোসাদের প্রাক্তন সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ নিভ কারমিকে শুরু হয় এনএসও গ্রুপ।

নিভ, শ্যালেভ ও ওমরির নাম থেকেই কোম্পানির নাম হয় এনএসও দাবি করেছে ফরবিডেন স্টোরিজ।

স্পাই টেক ও জিরো ক্লিক

এরপর থেকে বিশ্বব্যাপী গোয়েন্দাদের জন্য নজরদারির সরঞ্জাম পেগাসাস তৈরির কাজ শুরু করে এনএসও। সরকারি সংস্থাগুলি সন্ত্রাসবাদ দমন ও মাদক পাচারের মতো বেআইনি কাজ রুখতে এই স্পাইওয়্যার ব্যবহার করবে বলে দাবি করে এনএসও। কিন্তু, একাধিক মিডিয়া রিপোর্টে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এই স্পাইওয়্যারের প্রথম ক্রেতা মাদক পাচারকারীদের ধরা ছাড়াও অন্য কাজে পেগ্যাসাস ব্যবহার শুরু করে। ফরবিডেন স্টোরিজে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৫ হাজার নম্বরে নজরদারি জানিয়েছিল মেক্সিকো সরকার। সেই তালিকায় নাম ছিল মেক্সিকোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাডোরের। এছাড়াও, একাধিক সাংবাদিক, সরকার বিরোধী মানুষ, তাঁদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নামও ছিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হচ্ছে, 'মেক্সিকো সরকার পেগাসাস এতটাই পছন্দ করেছিল, যে শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা বিভাগের নজরদারির টুলে পরিণত হয় এই স্পাইওয়্যার। এছাড়াও, দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, সেনা অফিসারদের এই স্পাইওয়্যার ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল মেক্সিকো। এর পরেই মেক্সিকোকে আরও আকর্ষণীয় অফার দিতে শুরু করেন এনএসও গ্রুপ। প্রত্যেকবার প্রযুক্তি আগের থেকে উন্নত হতে শুরু করে।'

ঠিক তারপরেই স্পাই-প্রযুক্তিতে শীর্ষস্থান দখল করতে শুরু করে ইজরায়েলের কোম্পানিটি। এর আগে এই কাজে দক্ষ ছিল ইউরোপের ফিনফিশার হ্যাকিং টিম। এই সময় পর্যন্ত টার্গেটের ফোনে ইমেল অথবা এসএমএস এর মাধ্যমে লিঙ্ক পাঠিয়ে ফোনে পেগাসাস ইনস্টল করার কাজ চলত। লিঙ্কে ক্লিক করলেই ফোনে ইনস্টল হয়ে যেত এই স্পাইওয়্যার, যা ঘুণাক্ষরেও টের পেতেন না ফোন ব্যবহারকারী। পরবর্তীতে শুরু হয় 'জিরো-ক্লিক' ইনফেকশন। যা থেকে আই ম্যাসেজ ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো এনক্রিপটেড মেসেজেও নজরদারি করা সম্ভব হয়।

এনএসও গ্রুপের বিস্তৃতি

২০১৪ সালে ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম ফ্র্যান্সিস্কো পার্টনার্সকে কিনে নেয় এনএসও গ্রুপ। এরপরে স্মার্টফোনে ব্যবহার হওয়া বিভিন্ন অ্যাপের সুরক্ষার গাফিলতি খোঁজার কাজ শুরু হয়। ফলে, আরও বেশি গ্রাহকের কাছে পৌঁছতে শুরু করে এই কোম্পানি। ২০১৮ সালে কানাডার সিটিজেন ল্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ৩৩ থেকে ৩৬টি পেগাসাস অপারেটরের সন্ধান মিলেছে। মোট ৪৫ দেশে ব্যবহার হয়েছে এই স্পাইওয়্যার।

ফাঁস হলো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্মার্টফোনে আড়িপাতার ঘটনা

সেই বছরই অর্থাৎ ২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি খুব মামলায় পেগাসাস এর নাম সামনে আসে। সেই সময় প্রথম জানানো হয় যে, সমাজকর্মী, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপরে পেগাসাস ব্যবহার করে নজরদারি করছে বিভিন্ন দেশের সরকার। এক বছর পরে ১৭টি মিডিয়া কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে ফরবিডেন স্টোরিজ। সেখানে জানানো হয়, বিশ্বব্যাপী ৫০ হাজার সাংবাদিক, বিরোধী নেতা, সমাজকর্মী, এমনকি সরকারি কর্মীদের উপরেও পেগাসাস এর মাধ্যমে নজরদারি করে হয়েছে।

কী বলছে এনএসও?

নিজেদের প্রতিক্রিয়া স্বরুপ এনএসও গ্রুপ বলছে, 'এই তদন্ত প্রথম থেকেই যুক্তিহীন।' রিপোর্টে প্রকাশিত তালিকার সত্যতা অস্বীকার করে কোম্পানির মুখপাত্র আরও বলেন, 'এই রিপোর্ট কিছু সাদা কাগজ খুলে দেখার সমান। যেমন খুশি ৫০ হাজার নম্বর বাছাই করে, তা থেকে শিরোনাম তৈরি করা হয়েছে।' ওয়াশিংটন পোষ্টের সম্পাদক নিজে বলেছিলেন, 'তালিকার উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট করে নির্ধারণ করা যায়নি।'

যদিও প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি অপব্যবহার করার 'সব ধরনের দাবি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।' কোনও ধরনের অপব্যবহার করে তাঁর বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি গ্রাহকের সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে এনএসও। 'এনএসও গ্রুপ সব ধরনের দাবির তদন্ত করবে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে', বলছে এনএসও।

ইত্তেফাক/আরকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x