ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
৩১ °সে

বিএনপি সদিচ্ছার প্রমাণ রাখুক

বিএনপি সদিচ্ছার প্রমাণ রাখুক
মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্পর্ক সাপে-নেউলের। করোনা মোকাবেলার কৌশল নিয়েও তাদের মধ্যে সহমত খুব একটা নেই। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি করোনা মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৫ লাখ রুপি অনুদান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি বেতন নেন না। এ কারণে অর্থের পরিমাণ সীমিত রাখতে হচ্ছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে অর্থ দিয়েছেন।

ভারতে করোনা মোকাবেলায় রতন টাটা ১৫০০ কোটি রূপি দেবেন, আজিম প্রেমজি দেবেন ১১২৫ কোটি রুপি। আরও অনেকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে এগিয়ে এসেছেন জাতীয় ও বিশ্ব দুর্যোগে। নরেন্দ্র মোদি সার্ককে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছেন। সার্ক নেতাদের নিয়ে ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। এ জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশ তাতে সাড়া দিয়েছে। ব্যতিক্রম পাকিস্তান। সার্কের ভিডিও কনফারেন্স-এ প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান অংশ নেননি। সার্ক তহবিলেও সহায়তাদানে আপত্তি। অথচ এতদিন তারা সার্ক কেন নিষ্ক্রিয়, সেজন্য ভারতকে দোষারোপ করছিল।

দক্ষিণ এশিয়ার দুর্ভাগ্য বৈকি। এ অঞ্চলে করোনার প্রকোপ এখন পর্যন্ত ব্যাপক নয়। তবে প্রায় দু’শ কোটি লোক অধ্যুষিত এ অঞ্চলে অতি সহজে সংক্রমণ হয় এমন রোগ ছড়িয়ে পড়লে কাউকে কিন্তু ছাড়বে না।

বাংলাদেশে চার দশকের পুরানোর রাজনৈতিক দল বিএনপি। সামরিক শাসনের আমলে গোয়েন্দাদের মাধ্যমে প্রলোভন-হুমকিতে নানা দল থেকে লোক ভাগিয়ে এ দলের জন্ম। রাজনৈতিকভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি কী করে সামলাতে হয়, সেটা জিয়াউর রহমানের পরিবারের অজানা। দলে বিভিন্ন সময়ে যে সব মধুলোভী যুক্ত হয়েছেন, তাদের অনেকে ক্ষমতায় থাকার সময় অঢেল অর্থ কামিয়েছেন। কিন্তু বিপদের সময় দলকে সহায়তা দানে উৎসাহ নেই। সরকারের পাশে দাঁড়ানোর তো প্রশ্নই আসে না। দল হিসেবে বিএনপিরও এমন নির্দেশনা নেই। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক যে বিএনপিকে ‘কোয়ারেন্টাইনে থাকা’ দল হিসেবে অভিহিত করছেন, সেটা অমূলক বলা যাবে না।

এ দলটি শেখ হাসিনার সরকারকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করার একাধিকবার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু জনতার সাড়া মেলেনি। আমরা স্মরণ করতে পারি ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের ব্যর্থ আন্দোলনের কথা। বেগম খালেদা জিয়া ২০১৩ সালের ২৯ আগস্ট মার্চ ফর ডেমোক্রেসির কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন জোটের লাখ লাখ নেতা-কর্মী রাজপথে নামবে। বাস্তবে কেবল তিনি ও তাঁর গৃহকর্মী ফাতেমা গুলশানের ‘ফিরোজা’ বাসভবনের গেট পর্যন্ত এসেছিলেন। রাজপথে মার্চ করার জন্য কাউকে না দেখে পুলিশের অনুরোধে ঘরে ফিরে যান কিছুক্ষণ পর। পরিহাসের বিষয়, এই ফাতেমাই তাঁর সঙ্গে দু’বছরের বেশি কারাগারে কাটিয়েছেন বিনাদোষে। তার জন্য এটা ছিল প্রকৃত কোয়ারেন্টাইন। এখন বেগম খালেদা জিয়া রয়েছেন দল ঘোষিত কোয়ারেন্টাইনে। তাঁর দণ্ড ৬ মাসের জন্য স্থগিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সম্পূর্ণ মানবিক বিবেচনা থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিএনপি কি তার যথাযথ প্রতিদান দিচ্ছে? তিনি যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান, তখন রাজধানী ঢাকায় লকডাউন। বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী সেটা ভেঙে বাহাদুরি দেখিয়েছেন। তাদের কারণে খালেদা জিয়ার হাসপাতাল থেকে বের হতে বিলম্ব ঘটেছে। একইসঙ্গে তারা করোনার ঝুঁকিতে ফেলেছে অনেক লোককে। এটা দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের পরিচয় হতে পারে না।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম করোনা মোকাবেলায় যে জাতীয় কমিটি গঠনের কথা বলেছেন, তাতেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় আছে বলে মনে হয় না। কথাটি মুখরোচক, সন্দেহ নেই। কিন্তু যে দলের চার-পাঁচ হাজার নেতা ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে এমপি পদে মনোনয়ন পেতে টাকার বস্তা নিয়ে লন্ডনের নেতার দরবারেও হাজির হয়েছিলেন বলে দলের ভেতর থেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করা হয়েছিল, তাদের কত জন করোনার মহাদুর্যোগ মোকাবেলায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন? বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিন্তু একটি সর্বজন স্বীকৃত মত রয়েছেÑ বিএনপিতে ধনি লোকের সংখ্যা আওয়ামী লীগের তুলনায় ঢের বেশি। আওয়ামী লীগের অনেকে টানা এক যুগ ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নিজেদের কপাল ফিরিয়েছেন। তবে বিএনপিকে ছুতে পারা মোটেই সহজ হবে না। বিএনপির এই ধনবানদের কেউ কেউ পেট্রল বোমার অপরাজনীতির সময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ যুগিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। কিন্তু ডেঙ্গু বা করোনার মতো বিপদে তাদের কাউকে জনগণের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় না। কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় বিএনপির সমর্থক এক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বলেছেন, যাদের প্রার্থী করা হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের কেউ জনকল্যাণের কথা ভাবে না। তিনি কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গেই বলেন, দলটি ডেঙ্গু মোকাবেলায় সরকার কিছু করে না বলে অভিযোগ করেছে। কিন্তু মেয়র বা কমিশনার প্রার্থীদের কেউই পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনায় সক্রিয় হয়নি। মশারি নিয়ে কেউ বস্তিতে যায়নি।

এখন দরিদ্র মানুষের অনেক ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। হাসপাতালগুলোর চাই চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ। কৃষকদের চাই উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনা। অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। বস্তির লোকদের বেশিরভাগের উপার্জন বন্ধ। মির্জা ফখরুল ইসলাম দিন আনি দিন খাই লোকদের জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন। সরকার কি সেটা করছে না? সেই ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তার যে সব কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল, এখন তা বহু গুণ স¤প্রসারিত হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, সকল মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের উত্তরাধিকারদের ভাতা- এ সব কর্মসূচি শেখ হাসিনাই প্রথম চালু করেছেন। এ ধরনের জনকল্যাণমুখী কর্মসূচিতে অর্থনীতিবিদদের কারও কারও দ্বিমত ছিল। তারা মনে করেছেন, এর পরিবর্তে উৎপাদন মুখী শিল্প খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত। উৎপাদন মুখী খাতকে সচল রাখার কাজের পাশাপাশি কিন্তু তিনি সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে ক্রমে স¤প্রসারিত করেছেন।

বাংলাদেশের ধনবানদের একটি অংশ ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেরত দিতে চায় না। যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দিলেই ধনবানদের একটি অংশ ‘নিজেদের জন্য প্যাকেজ’ দাবি করে। তারা ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফের আবদার করে। ঋণ আদায় স্থগিত রাখতে বলে। করোনার সময়েও তারা দাবির তালিকা নিয়ে হাজির। কিন্তু কারখানার শ্রমিক কীভাবে বাঁচবে, সে চিন্তা করতে রাজী নয় অনেকেই।

ব্যবসায়ীদের এমন মনোভাব থাকতেই পারে। কিন্তু বিএনপি কি করছে? তাদের ২০ দলীয় জোটের শরিকরা কি করছে? তারা স্কুল-কলেজ বন্ধ রাকার দাবি তুলেছিল। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা কীভাবে অব্যাহত রাখা যায়, সে চিন্তা নেই। এ ধরনের ইস্যুতে তারা একেবারে চুপ। কেউ বা বদ মতলব হাসিল করার জন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। লকডাউন যেন ব্যর্থ হয়, সে দুরভিসন্ধিও রয়েছে বলে জানা যায়। এদের নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠন করে কী লাভ? মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘আমরা সবাই এক’-এর প্রমাণ রাখতে হবে। এটা মুখরোচক কথা। কিন্তু সবাই যে এক, তার প্রমাণ কি ২০ দলীয় জোট রাখছে? সরকার যে চরম বিপদের মুখে চুপচাপ বসে নেই, সেটা স্পষ্ট। ঘোর দুঃসময়েও পদ্মা সেতুতে সব পিলার মাথা তুলেছে প্রমত্ত পদ্মার বুকে, নতুন স্প্যান বসছে। শহর-গ্রাম, সর্বত্র লকডাউন সহজ নয়। দরিদ্রদের কাছে খাবার পৌঁছানো খুব কঠিন। এ সব তো করা হচ্ছে। বিএনপি বা তাদের জোটের কোনো নেতা জেলে নেই। কাউকে পুলিশ খুঁজছে বলেও জান নেই। তাহলে দলটি কেন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না? বছরের পর বছর তারা ইতিবাচক রাজনীতি করেনি। বেগম খালেদা জিয়াকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দিয়ে শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার নিদর্শন রেখেছেন। বিএনপি বিনিময়ে কিছু করে দেখাক, যা থেকে প্রমাণ মিলতে পারে যে তারা নিজেদের বদলাতে চাইছে। তারা যে নতুন কোনো দুরভিসন্ধি নিয়ে কাজ করছে না, সেটা দেখানোর কিন্তু এখনই সময়। কারাগার থেকে মুক্ত নেত্রী দলের ঘোষিত কোয়ারেন্টাইনে, আর দল স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে, এ যুক্তি দেখিয়ে কি পার পাওয়া যাবে?

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক

ইত্তেফাক/আরএ

ঘটনা পরিক্রমা : করোনা ভাইরাস,নরেন্দ্র মোদি

আরও
এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০৪ জুন, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন