বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭
২৯ °সে

অপার সৌন্দর্যের আইল্যান্ড দীউ

নীল সাগরের বুকে সুপার মুন
অপার সৌন্দর্যের আইল্যান্ড দীউ
সীবিচে শ্বেত পাথরে নির্মিত রাধিকার স্ট্যাচু

ছবির মতো ঝকঝকে তকতকে। যেন দরদী শিল্পীর মনোরম পেইন্টিং। নীল জলের ছন্দতোলা ঢেউ আছড়ে পড়ছে। হাজারো পাখি ডানা মেলে নিঃসীম আকাশে বিচরণ করছে। পুরো জমিন সবুজ শ্যামলীমায় আচ্ছাদিত। যেন এক স্বপ্নের শহর। নাম দীউ। এটি ভারতের গুজরাটের সন্নিকটে কেন্দ্র শাসিত দ্বীপ রাজ্য। আরব সাগরের নীল জল ফুঁড়ে যার সগৌরব উত্থান।

গত নভেম্বরে ভারত ভ্রমণের প্রাক্কালে কদিন কাটিয়েছি এ স্বপ্নের দ্বীপে। গুজরাটের সোমনাথ থেকে দুরত্ব প্রায় একশো কিলো। চব্বিশ শত রুপীর ভাড়ার ট্যাক্সিতে দুই ঘণ্টার জার্নির পর দ্বীপে পদযুগল রাখার সৌভাগ্য হয়।

প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দীউ ভারতের ইউনিয়ন টেরীটরীর মর্যাদার। অপর দ্বীপ দামন ও এর সাথে যুক্ত। দ্বীপের আয়তন মাত্র ২০ কিলো।লোকসংখ্যা ৫২ হাজার। খৃস্টান ও হিন্দু অধ্যুষিত দ্বীপে স্বল্পসংখ্যক মুসলিম ও রয়েছে। ইন্ডিয়ান সরকার দীউ এর সাথে সরাসরি সড়ক যোগযোগে গুজরাট সীমান্তে দীর্ঘ ব্রিজ নির্মাণ করেছেন। সোমনাথ থেকে সড়ক পথে ট্যাক্সি ভাড়া করে দীউ দ্বীপে আসা-যাওয়া করা যায়। সেখানে ভাড়া পড়ে কমপক্ষে আড়াই হাজার টাকা। এজন্য দুই তিনজনে মিলে বেড়াতে গেলে সুবিধা। বিমানেও যাওয়া যায়। কোলকাতার হাওড়া স্টেশন থেকে মোম্বাইগামী ট্রেনে মোম্বাই এবং পরে সেখান থেকে জেট এয়ারওয়েজ এর বিমানে দীউ যাওয়া যায়। আবার কোলকাতার হাওড়া থেকে থেকে গুজরাটগামী ট্রেনে পোর বন্দর নামতে হবে। সেখানে থেকে পরদিন সকাল দশটার বাসে আডাই ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে দীউ দ্বীপে যাওয়া যায়।

দীউ এর প্রবেশ পথে পাঁচ কিলো আইল্যান্ড জুড়ে বর্ণিল ফুল ও লতাপাতায় সজ্জিত। শহরে প্রবেশকালে মনে হবে, যেন টুরিস্ট মর্যাদায় ফুলেল শুভেচ্ছায় আপনি সিক্ত হচ্ছেন। পুরো দ্বীপ জুড়ে নারকেল আর ওক গাছের দাপট। পরিকল্পিতভাবে সাঁজানো সড়ক, পরিচ্ছন্নভাবে গোছানো দোকানপাট, বাড়িঘর, অফিসআদালত, হোটেলমোটেল ও রিসোর্ট। প্রত্যেক ভবনের সামনের লনে সবুজ চত্বর। তাতে শোভা পাচ্ছে বাহারী ফুল।

শহরের অভ্যন্তরে কোন রিকশা, সিএনজি বা ইজিবাইক নেই। দ্বীপ ঘুরে বেড়াতে হয় প্রাইভেট কার, পর্যটনের গাড়ি, নয়তো পদযুগলে। পুরো দ্বীপ প্রাগৈতিহাসিক শৈল শ্রেণীর উপর অবস্থিত। পাথর কুঁচিতে ভরা সমতলের ভূত্বক। জুতো পায়ে হাটতে খচ খচ শব্দ উঠে। তবে অধিকাংশ স্থান উঁচুনিচু। ভঙ্গুরতা দৃশ্যমান।

পর্যটন নগরী বিধায় অনেক হোটেলমোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। থাকা খাওয়া খুবই ব্যয়বহুল। বাঙালি খাবার মেলে না। গুজরাটী আর পাঞ্জাবী খানার দাপট। সারা বছরই বসন্তকাল। তাই অভিজাত শ্রেণির মানুষ এখানে আরাম-আয়েশ, বিনোদন আর ফূর্তিফার্তার জন্য আসেন। দ্বীপে রয়েছে দুটো ক্যাসিনো সেন্টার। গুজরাটে এ্যালকোহল নিষিদ্ধ হলেও এখানে জায়েজ। নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকায় সাদা চামড়ার আনাগোনা বেশি। অনেকেই দীউকে বলে থাকেন ফুলের শহর, বৃক্ষলতার শহর, শ্বেতাঙ্গীনির শহর।

বলা অনাবশ্যক, ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে পর্তুগীজরাই প্রথম ভারতে বাণিজ্য করতে আসেন। গুজরাট সেই সময় বিখ্যাত ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে। এখানকার বস্ত্র শিল্প ছিল খুবই বিখ্যাত। পর্তুগীজরা দীউ দ্বীপে জাহাজ ভিড়িয়ে গুজরাটের পণ্য কিনতেন। দীউ দ্বীপে কুঠির স্থাপন করে পণ্য গুদামজাত করতেন। পরে তা ইউরোপে রফতানি হতো। ইউরোপ থেকে আনা পণ্য এ দ্বীপে খালাস হতো। কাজেই দীউ ছিল পর্তুগীজদের বানিজ্য ট্রানজিট। এক সময়ে বাণিজ্যের অন্তরালে তারা দ্বীপে সামরিক শক্তি বাড়াতে থাকে। দীউ দখলের পায়তারা শুরু করে। সফল ও হন তারা। বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে পরিণত হয়। যেমনটি পলাশী যুদ্ধের পর বাংলায় হয়েছিল ইংরেজ বণিকদের দ্বারা।

পর্তুগীজদের সামরিক শক্তির মূল উৎস ছিল কামান আর বন্দুক। তার চেয়েও বড় অস্ত্র ছিল শঠতা। নিষ্ঠুরতার সাথে তার প্রয়োগ হতো। এ জন্য পর্তুগীজ উপনিবেশ ছিল সবচেয়ে নিকৃষ্ঠ শাসনের দৃষ্টান্ত। যাই হোক, কামান আর বন্দুকের জোরে পর্তুগীজরা জলে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্ধি। আর সমুদ্র বা জলে গুজরাটের মুসলিম সুলতানের পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী ছিল অসহায়। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দীউ দখল করে নেয় পর্তুগীজরা। প্রায় সাড়ে চারশ বছর দাপটের সাথেই দীউ শাসন করেন তারা।

পর্তুগীজ শাসনামলে ১৫৩৫ সালে দ্বীপে নির্মাণ করা হয় বিশাল দুর্গ। যেটি দ্বীপের বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত। দুর্গের প্রসঙ্গ পরে আসি। এ দুর্গকে বামে রেখে এক কিলো সামনে আগালে পিঁচঢালা পথ একেবেকে মিশেছে প্রাগৈতিহাসিক শৈল গূহায়। নাম নাদিয়া। বিশাল পর্বতকে পরিকল্পিতভাবে খাঁজ কেটে ফাঁপা বানানো হয়েছে। সেই খাঁজের ভাজে ভাজে ঘটে সূর্যালোকের অনুপ্রবেশ । যেখানে সুউচ্চ শৈল শ্রেণির স্তম্ব খাড়া থেকে ঈষৎ বাঁক নিয়ে নুয়ে পড়েছে সেখানে প্রলম্বিত ছাঁয়া বিরাজমান। মূলত সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এ গুহায় দিনমান চলে আলো-আঁধারীর খেলা।

ইতিহাস বলে, পর্তুগীজরা দ্বীপ দখলের পর সুদৃঢ় দুর্গ নির্মাণের প্রস্তুতি নেন। আর দুর্গের জন্য পর্বতের খাঁজকাটা পাথর ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। আজ থেকে প্রায় চারশ বছর আগে অভিনব প্রযুক্তি ও কলাকৌশলে দীউয়ের সব চেয়ে বড় পর্বত খন্ডবিখন্ড করে ফাঁপা অংশকে কৃত্তিম গূহায় পরিণত করেন। আর এখানকার মসৃণ পাথর পর্তুগীজ দুর্গে ব্যবহার করেন। মহারাষ্ট্রের অজন্তা ও ইলোরা গূহার মতো নাদিয়ার দেয়াল গাত্রে ফ্রেস্কো বা বৈচিত্র্যময় অলঙ্করণ না থাকলেও গাছ, পাথর আর নুড়ির মিতালী মনোহর দৃশ্যের সূচনা করে।

শেষ টানেলের উন্মুখ মুখ দিয়ে প্রবেশ করা আরব সাগরের দুর্দমনীয় লোনা বাতাস কঠিন শৈল শ্রেণিকে চুম্বন করে আছড়ে পড়ে গূহার প্রশ্বস্থ দেয়ালে। তাই হাজারো পর্যটক গূহায় প্রবেশ করলেও শীতলতার পরশ অনুভব করেন। আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে অপক্ষো করলেও গরম অনুভব করবেননা। গূহার ভেতরের সুবিন্যস্ত ওয়াকওয়ে আর বিদ্যুতের মৃদূ আলোয় পাতালপুরিতে ঘুরে বেড়ানো যায় স্বাচ্ছন্দেই। বাতাসের ছন্দময় দাবড়ানির হু হু শব্দের এ ক্যাসলপুরি আপনাকে মুগ্ধ করবেই । এ নাদিয়া গূহা প্রায় দেড় কিলো দীর্ঘ। ভেতরে বসার বেঞ্চি রয়েছে।

অপর দিকে দীউ দ্বীপের বিশাল পর্তুগীজ দুর্গের প্রতœতাত্বিক ছাঁচ অনেকটা ইউরোপীয় স্টাইল বিদ্যমান। এ দ্বীপের ভিন্নতর বৈশিষ্ট্য হলো এর অবস্থান সমুদ্র তটের সামন্তরালে। অবাক বিষয়, সমুদ্রের ঢেউ এতে সরাসরি আছড়ে পড়ছে। এ যেন সমুদ্র আর দুর্গের পাথর খন্ডের অবিরাম খেলা। যা চলছে সাড়ে চারশ বছর ধরে বিরামহীনভাবে। দুর্গের কাষ্ঠ নির্মিত মূল ফটকটি এখনো অক্ষত। প্রবেশ পথের পর পরই হাতের বাঁয়ে সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। যেটি থেকে সমুদ্রে গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যেতো। দুর্গের মূল অংশে সুউচ্চ লাইটহাউজ। দুর্গের এক অংশ জুড়ে ছিল কারাগার। সমুদ্রে বিরাজমান প্রতিপক্ষ অথবা স্থানীয়দের বন্দী করে কারাগারে আটকে রাখতেন পর্তুগীজরা। ক্রীতদাসের মতো দুর্গের যাবতীয় কঠিন কাজ তাদের দিয়ে করিয়ে নিতেন। দুর্গেও ছাদ কোথাও বেশ অসমান। পর্তুগীজদের ব্যবহৃত শতাধিক কামান এখনো ছাদের গান পয়েন্টে বিন্যস্ত করা রয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য দর্শক এ দুর্গ দেখতে আসেন।

দুর্গ থেকে বেরিয়ে ডানে আগালে পড়বে সেন্টপল গীর্জা। যেটি নির্মিত হয়েছে ১৬১০ সালে। প্রাচীন থমাস চার্চকে যাদুঘর এবং সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চকে হাসপাতলে পরিণত করা হয়েছে। আর সর্বশেষ চমক পাখির অভয়ারণ্য। পাখি রাজ্যের এক ভিনতরœ অনুভূতির আনন্দ পাওয়া যায়। দীউ দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ সীবিচ। সূর্যাস্ত দেখার জন্য রয়েছে সামার হাউজ। উল্লেখযোগ্য সীবীচ হচ্ছে নেগোয়া, চন্দ্রতীর্থ, এঙ্গসোয়ার, টেম্পল, ডাইনোসর এবং জলান্ধ । এখানকার সীবীচের প্রধান আকর্ষণ হলো প্রাচীন শৈবালের ছড়াছড়ি। পাহাড়ের কোল জুড়ে অবস্থিত নেগোয়া সীবীচ আমাকে বিমোহিত করে। সীবীচের প্রবেশ পথে সুউচ্চ আইল্যান্ডে শ্বেতশুভ্র পাথরের নৃত্যরত রাধা ভাস্কর্য চোখ জুড়িয়ে দেয়।

৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও দীউ পর্তুগীজদের দখলেই থেকে যায়। পরে ৬১ সালে ভারত সরকার সামরিক অভিযান চালিয়ে দীউ, দামন ও গোয়া দখল করেন। আর পর্তুগীজরা মাথা নিচু করে দীউ ছাড়েন।

দীউ আইল্যান্ডে আজ পর্তুগীজরা নেই। তবে তাদের অত্যাচার, নির্যাতন এবং নানা ক্রিয়াকর্মের প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন রয়ে গেছে। রয়ে গেছে নানা উপাখ্যান। বলতেই হয়, আধুনিক দীউ নগরীর প্রতিষ্ঠাতা সমুদ্রের দস্যু পর্তুগীজরাই। দীউ সমাজে এখনো পর্তুগীজ সংস্কৃতির সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষনীয়। সুনীল জলরাশির হাতছানিতে সাড়া দিয়ে আপনিও পাড়ি জমাতে পারেন দীউ দ্বীপে।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত