একাত্তরের এই দিনে

ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তান

ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তান
ফিরে যাই একাত্তরের মার্চ মাসে। ছবি: ইত্তেফাক

একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর ভিন্নমাত্রা পায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। চোরাগোপ্তা আক্রমণ থেকে সরে এসে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে এক সারিতে সম্মুখযুদ্ধে এগিয়ে যায় বীর বাঙালি। মনোবল বাড়ে বাংলার দামাল ছেলেদের, পরাজয়ের সময় ঘনিয়ে আসতে শুরু করে এই মাটি আর বাংলার স্বাধীনতার শত্রুদের।

এদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতা সফরকালে ব্রিগেড প্যারেড ময়দানের সভা সংক্ষেপ করে সন্ধ্যায় হঠাত্ দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। রাতে জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে তিনি বলেন, পাকিস্তান আজ ভারতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক হামলা চালিয়েছে। ভারতকে এ যুদ্ধ মোকাবিলা করতে হবে। পাকিস্তানের আক্রমণ ঐক্যবদ্ধভাবেই প্রতিহত করতে হবে। তিনি দেশবাসীকে চরম ত্যাগ স্বীকারের জন্য তৈরি হওয়ার আহ্বান জানান।

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত করার মতো শেষ অস্ত্র বেছে নেয় পাকিস্তানি বাহিনী। তারা আকস্মিকভাবে স্থল ও আকাশপথে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল আক্রমণ করার কারণে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। ভারতের অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, অবন্তীপুর, যোধপুর, আম্বালা ও আগ্রা বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায় পাকিস্তান। মধ্যরাতে ভারতও সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের ভারত আক্রমণের জের ধরে এই দিনে গঠিত হয় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড। ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনী সম্মিলিতভাবে পূর্ব সীমান্তে অভিযান শুরু করে। ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের পাকিস্তানি অবস্থানকে ঘিরে ফেলার প্রচেষ্টায় সীমান্তের সাতটি এলাকা দিয়ে প্রচণ্ড আক্রমণ পরিচালনা করে। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের চার ডিভিশন সৈন্য ভারতের সাত ডিভিশন সৈন্য ও মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি হয়।

একাত্তরের এই দিনেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সার্থক হামলায় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও চট্টগ্রামের ফুয়েল পাম্প মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ সময় একের পর এক যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করে পাকিস্তানি সেনাদের ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো কোণঠাসা করে তোলে। পাশাপাশি যথাযথ সমর পরিকল্পনা নিয়ে ভারতীয় সেনা সাহায্য, বিশেষ করে ছত্রীসেনাদের অবতরণের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস ও সুচতুর পরিকল্পনার প্রশংসা করেছেন।

এদিন কুমিল্লায় মেজর আইনউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী মিয়াবাজারে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর হামলা চালায়। ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা মিয়াবাজার দখল করে নেন। আখাউড়ার আজমপুর স্টেশনে দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দিনভর যুদ্ধ চালিয়ে যায়। সিলেটের ভানুগাছায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন। নোয়াখালীতে সুবেদার মেজর লুত্ফর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল সোনাইমুড়ি মুক্ত করে। এরপর তারা চৌমুহনীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়।

মেজর জাফর ইমামের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী মাইজদীতে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। রংপুরের পলাশবাড়ীতে ১২ জন পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে। সাতক্ষীরা থেকে পিছু হটে দৌলতপুরের দিকে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। সব সেতু ভেঙে দেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পিছু নিলেও বাধাগ্রস্ত হন।

মার্কিন সিনেটর উইলিয়াম স্যাক্সবি রাওয়ালপিন্ডিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে বলেন, তিনি বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত্ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সাক্ষাত্ করতে পারেননি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার আলোচনাকালে শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গ নিয়ে তার কথা হয়। তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য পুনরায় পাকিস্তানে আসতে রাজি হন।

এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা উচিত বলে লাহোরে মত প্রকাশ করেন। পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভোররাতে আগরতলা শহরের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত