মানবতার ফেরিওয়ালা শিক্ষক আমিনুর

মানবতার ফেরিওয়ালা শিক্ষক আমিনুর
স্বেচ্ছাশ্রমে তৈরি সাঁকো। ইনসেটে শিক্ষক আমিনুর রহমান [ছবি: ইত্তেফাক]

চারদিকে নদী বেষ্টিত কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার বিচ্ছিন্ন একটি ইউনিয়ন কোদালকাটি। ব্রহ্মপুত্র নদ ও সোনাভরি নদীর ভাঙ্গা-গড়ার মধ্যদিয়েই জন্ম জন্মান্তর ধরে তছনছ দ্বীপচর এটি। এ ইউনিয়নে প্রায় ৩০ হাজার লোকের বসবাস। বর্ষা মৌসুমে ভরা বন্যার সময় তাদের চলাচলের বাহন নৌকা বা কলা গাছের ভেলা। বাকী সময় ধূধূ বালু চর আর মেঠো পথে পায়ে হেটে চলা তাদের নিত্য সঙ্গী। এমনই জীবন বৈচিত্রে মানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন অত্র ইউনিয়নের শিক্ষক আমিনুর রহমান। প্রায় এক যুগ ধরে মানব সেবায় স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়োজিত রেখেছেন নিজেকে। তিনি কাজের মাধ্যমেই ব্যাপক পরিচিত ও ভালবাসা অর্জন করেছেন চরাঞ্চলের মানুষের। আমিনুর রহমান স্থানীয় চর সাজাই দাখিল মাদ্রাসায় শরীরচর্চা শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এলাকাবাসীর সার্বিক সহযোগিতায় সরকারী বরাদ্দ ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশের সাঁকো, মাটির কাঁচা রাস্তা, নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় বাঁশের বান্ডাল নির্মাণসহ কোদালকাটি ইউনিয়নবাসীর জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কাজ করেন তিনি।

উত্তর কোদালকাটি তের রশি গ্রামের সোনাভরি নদীর নালার উপর ৩০ফিট, শংকর মাধ্যবপুর বাজারের উত্তর পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের নালার উপর ৫০ফিট, রাজিবপুর উপজেলা পরিষদের তিনশত গঞ্জ পশ্চিম পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের নালার উপর ৩০ফিট, কর্তিমারী বাজারের পশ্চিম পাশে হলহলিয়া নদীর ৪৫ফিট ও কোদালকাটিন বাজারের পূর্বদিকে পাখিউড়া গ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদের নালার উপর ৫০ফিট বাঁশের বাঁশ দিয়ে সাঁকোগুলো নির্মাণ করেছেন।

কোদালকাটি বাজারের পশ্চিম পাশ হতে ২৫০ফিট বাজারে যাওয়ার সংযোগ রাস্তা তৈরি, পাইকপাড়া হতে বল্লব পাড়া যাওয়ার সংযোগ কারার জন্য ১কিরোমিটার নতুন রাস্তা তৈরি। রাজিবপুর মুন্সিপাড়া খেয়াঘাট হতে শংকর মাধ্যবপুর পর্যন্ত ২কিলোমিটার ও চরসাজাই হতে কর্তিমারী রাস্তা পর্যন্ত ৩কিলোমিটার বালুর উপর কাশিয়ার বিছিয়ে রাস্তা তৈরি করেছেন।

উত্তর কোদালকাটি হতে ডাটিয়ারচর বাজারের উত্তর পাশ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গন রোধে প্রায় ২কিলোমিটার জুড়ে ৩৭টি বাঁশের বান্ডাল নির্মাণ, মধ্যেরচর সাজাই গ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গন রোধে ৮টি বাঁশের পাইলিং করে বান্ডাল নির্মাণ করেছে।

এছাড়াও চরাঞ্চলের বসবাসরত মানুষের গরু, ছাগল, হাঁস মুরগির ভ্যাকসিন প্রদানসহ সরকারী হাসপাতালের মাধ্যমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, বন্যা সময় নিজস্ব অর্থে বন্যা কবলিত মানুষের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করেন তিনি।

শংকর মাধ্যবপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম, ইনছান আলী, আরশাফুল ইসলাম বলেন, আমিনুর মাস্টার নিজ উদ্যোগে এলাকাবাসী জন্য কাজ করেন। আমরা গ্রামবাসী তাকে সহযোগিতা করি, আমরা চরের মানুষ রাস্তা ঘাট নাই, চারপাশে শুধু নদী আর নদী তার জন্যই হাট বাজারে যাতায়াত ও মালামাল আনা নেওয়া করতে পারি।

যাদুরচর আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক এরশাদুল হক বলেন, উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন কোদালকাটি ইউনিয়নটি। চতুর দিকে নদী থাকায় বন্যার সময় পানিবন্দি হয়ে পরি এবং শুষ্ক মৌসুমে বালুর চর জেগে উঠায় যাতায়াতের অনেক কষ্ট হয়। শিক্ষক আমিনুর রহমান এলাকাবাসীদের সাথে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা, ছোট ছোট বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই চরাঞ্চলের দিকে সু-নজর দিলে অনেক উন্নতি হবে।

কোদালকাটি ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগ সভাপতি সোহেল সরকার বলেন, আমিনুর মাষ্টারকে চরবাসীর আশীর্বাদ মনে করেন অনেকেই। স্থানীয় লোকজন তার কাজ দেখে অভিভূত।

শিক্ষক আমিনুর রহমান বলেন, মানুষ মানুষের জন্য, দুনিয়াটা স্বল্প সময়ের জন্য। মানুষের কষ্ট দুর হলে আমি শান্তি পাই। মানুষের ভালবাসা পাই এটাই আমার শান্তনা।

কোদালকাটি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমিনুর রহমান চেয়ারম্যান মেম্বর না হয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা, ঘাট, বাঁশের সাঁকো, নদী ভাঙ্গন রোধে বাঁশে বান্ডাল নির্মাণ করেছে। তার একান্ত প্রচেষ্টায় এ ইউনিয়নের মানুষের কিছুটা হলেও কষ্ট লাগব হয়েছে।

কোদালকাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন কবীর ছক্কু বলেন, শিক্ষক আমিনুর রহমান গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশে সাঁকো, রাস্তা ঘাট মেরামতের কাজ করে। তার কাজে আমরা খুশি, সে এলাকার উন্নয়নের সবসময় চেষ্টা করে।

ইত্তেফাক/এমআর

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত