ঢামেকে প্রোটোকল মেনে আইসিইউ করা হয়নি, রক্ষণাবেক্ষণের জনবল নেই

ঢামেকে প্রোটোকল মেনে আইসিইউ করা হয়নি, রক্ষণাবেক্ষণের জনবল নেই
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের করোনা ইউনিটের আইসিইউতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে —আব্দুল গনি

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২-এর কোভিড আইসিইউ ইউনিটে হঠাত্ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ গেল তিন রোগীর। গতকাল বুধবার সকালে আইসিইউর ১২ নম্বর বেডে হাই-ফ্লো অক্সিজেন নেজাল ক্যানোলা থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও রোগীর অভিভাবকেরা বিষয়টি জানিয়েছেন।

তারা বলেন, বিকট শব্দে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তে আগুন পুরো আইসিইউতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের আতঙ্কে হাসপাতালে রোগী ও তাদের স্বজন, ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবাই ছোটাছুটি শুরু করেন। হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডের চিকিত্সাধীন অনেক রোগী জীবন রক্ষার্থে নিচে নেমে যান। চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে পুরো হাসপাতালে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করে। জীবন বাজি রেখে ডাক্তার-নার্স, কর্মচারী ও রোগীর স্বজনেরা রোগীদের আইসিইউ থেকে বের করে নিয়ে আসেন। তাদের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। পরে দমকলবাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। রোগীদের স্থানান্তর করার সময় অক্সিজেনের অভাবে লাইফ সাপোর্টে থাকা তিন জন রোগী মারা যান।

গতকাল বুধবার সকাল ৮টা ১০ মিনিটে ঢামেক-২-এর তৃতীয় তলার কোভিড আইসিইউ ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে কেউ হতাহত হয়নি। তবে স্থানান্তরের সময় অক্সিজেনের অভাবে ঐ তিন জন মারা যান। নিহতরা হলেন :কাজী গোলাম মোস্তফা (৬৬), আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৮) ও কিশোর চন্দ্র রায় (৭০)। আইসিইউতে তাদের কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়া হচ্ছিল। অক্সিজেন হলো দাহ্য পদার্থ। আইসিইউতে ইলেকট্রিক লাইন থাকে। অগ্নিকাণ্ডের পর ১৪ জন রোগীকে নিরাপদে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে।

যেখান থেকে আগুনের সূত্রপাত, সেই ১২ নম্বর বেডের রোগীর নাম আব্দুর রশীদ। তার কিছু হয়নি। আগুনে আইসিইউ ইউনিটের ফ্যানসহ অন্যান্য সামগ্রী মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক ভস্মীভূত হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধারে গাফিলতির ঘটনা ঘটেছে বলে রোগীর স্বজনেরা অভিযোগ করেন। ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ঢামেক কর্তৃপক্ষের অ্যানেসথেসিয়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোজাফফর হোসেনের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি পাঁচ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে বলে জানান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আলাউদ্দিন আল আজাদ।

তিনি বলেন, আগুনে পুড়ে কারো মৃত্যু হয়নি। তিনি বলেন, আইসিইউতে থাকা রোগীদের স্থানান্তরের সময় ঐ তিন রোগীর মৃত্যু হয়। আইসিইউতে তাদের লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নান ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম।

এদিকে আইসিইউ ইউনিট তৈরি করার জন্য যে প্রোটোকল নির্ধারণ করা হয়েছে, দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সেই প্রোটোকল মানা হয়নি। যত্রতত্র গড়ে উঠেছে আইসিইউ। অথচ আইসিইউতে ভর্তি হয় সংকটাপন্ন রোগী। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তাদের লাইফ সাপোর্টে রাখতে হয়। কী পরিমাণ জায়গা লাগবে, দক্ষ জনবল, কোন রোগীদের আইসিইউতে রাখতে হবে—এসব প্রোটোকলে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে এক জন বায়োটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও এক জন টেকনিশয়ানকে ২৪ ঘণ্টা শিফট করে আইসিইউতে থাকতে হবে। তাদেরই যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করার কথা। দুই-একটি হাসপাতাল ছাড়া কোনো হাসপাতালের আইসিইউতে এই জনবল নেই। আইসিইউয়ে সবই ইলেকট্রিক্যাল কাজ। ২৪ ঘণ্টা যন্ত্র চলে। প্রতিটি যন্ত্র অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সেখানে রক্ষণাবেক্ষণের লোক রাখা অতীব জরুরি।

আইসিইউ প্রোটোকল নিশ্চিত করার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স উইংয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তা বাস্তবায়নে আলোর মুখ দেখেনি। বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, প্রোটোকল না মেনে আইসিইউ তৈরি করার কারণে এর আগে বেসরকারি একটি হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিন জন রোগী মারা গেছেন। এর দায়ভার কে নেবে? টাকা দিয়ে মানুষের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। আইসিইউ প্রোটোকল সব হাসপাতালে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, স্বাস্থ্য খাতের রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট ও অপচয় হয়, কিন্তু আইসিইউর মতো জীবন রক্ষাকারী ইউনিটে প্রোটোকল অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x