পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম স্থবির

প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ ও কার্যক্রম বিস্তৃত করা জরুরি, বলছেন বিশেষজ্ঞরা পরিকল্পনার অভাব, লোকবল স্বল্পতায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না
পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম স্থবির
ছবি: সংগৃহীত

করোনাকালে শিশু জন্মের হার বেড়েছে, জন্মনিয়ন্ত্রণের হার কমেছে, বাড়ছে জনসংখ্যা। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কার্যকর দিকনির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে। পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য ও নারীস্বাস্থ্য পরিচর্যা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর পরিবার পরিকল্পনা খাতে বাজেট বাড়লেও তা বাস্তবায়নে কোনো পরিকল্পনা নেই।

গত এক যুগে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে আছে। করোনাকাল সেই স্থবিরতাকে আরো বাড়িয়েছে। এর কারণে দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫১ সালে দেশের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২১ কোটি ৮৪ লাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাড়তি জনসংখ্যা কর্মসংস্থান, ভূমি, কৃষি, আবাসন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

এ পরিস্থিতিতে দেশের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে তৃণমূলে টেকসই ও সর্বাত্মক কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাজেট বৃদ্ধি যেমন জরুরি, একই সঙ্গে তৃণমূলে প্রতিটি বাড়ির দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারা জন্মনিয়ন্ত্রণ ও নারী স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পৌঁছাতে হবে। এর জন্য লোকবল বৃদ্ধিসহ সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ না করলে দেশের জনসংখ্যা যেমন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না, তেমনি নারী ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমও মুখ থুবড়ে পড়বে।

এদিকে করোনাকালে দেশে জনসংখ্যার হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে বেড়ে গেছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় গত বছর প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার অতিরিক্ত শিশু জন্ম নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘ শিশু তহবিলও দেশে জন্মহার বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে। আবার এ সময় নারীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যাও নাজুক হয়ে ওঠে।

সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বর্তমানে সমালোচনার সম্মুখীন। কারণ স্বাধীনতার পর মোট প্রজনন হার ৬ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৩-এ নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এরপর গত এক যুগ ধরে সূচক একই জায়গায় স্থির। স্বাস্থ্য জরিপ বলছে, দেশের মোট প্রজনন হার এবং পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক দশকে আমাদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসূচক অনেকাংশে ঊর্ধ্বমুখী এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু আশঙ্কার কথা হলো, পৃথিবীর অষ্টম জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০১৯-২০২০ সালে বাজেটের পরিমাণ মোট জাতীয় বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো দেশের তুলনায় কম। বিগত ১০ বছরে এ বরাদ্দ মোট জাতীয় বাজেটের ৪ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো আমাদের মতো দেশে স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের বরাদ্দ হওয়া উচিত জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশের মতো। অন্যদিকে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বার্ষিক ব্যয় মোট জিডিপির শতকরা ১ শতাংশের নিচে (০.৯%)। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের বণ্টন নিয়ে যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন এবং আগামী বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে প্রস্তাবিত মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাত্ ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ হাজার কোটি টাকার মতো বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে জড়িত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রতি বছর বরাদ্দ বাড়লেও পরিবার পরিকল্পনা খাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী যথোপযুক্ত ব্যয় হচ্ছে না। এ কারণে অধিদপ্তরের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক কাজী মহিউল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তার কিছু কিছু সূচকে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। এ পরিস্থিতিতে আরো কঠিন করে তুলেছে করোনা মহামারি। ফলে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক। তাই করোনা মহামারির পরিস্থিতি মাথায় রেখে আমাদের সামনের পরিকল্পনা নিতে হবে। এজন্য প্রথমেই তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মহামারীকালে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার উপযোগী প্রশিক্ষণ দিতে হবে, তাদের সচেতন করতে হবে। জনসংখ্যা কার্যক্রম এত দিন সরাসরি করা হয়েছে। এখন অনলাইন ও ডিজিটাল কার্যক্রম চালানোর পন্থা বের করতে হবে।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তার উপলব্ধির কথা তুলে ধরে মহিউল ইসলাম বলেন, মহামারির কারণে মানুষ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখন পরিবার পরিকল্পনার পাশাপাশি তাদের আয় বাড়ানোর কোনো পন্থা খুঁজে বের করতে হবে।

জন্মনিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করছে মেরি স্টোপস বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে মেরি স্টোপসের অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন মনজুন নাহার ইত্তেফাককে বলেন, গত ১০ বছর ধরে পরিবার পরিকল্পনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থমকে আছে। করোনা মহামারির কারণে সেই ক্ষতির পরিমাণ আরো বেড়েছে। এ অবস্থায় আমাদের ভাবতে হবে কোন কোন খাতে বাজেট বরাদ্দ হতে হবে। অনলাইন প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল অ্যাপ তৈরি করে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে পৌঁছানো যেতে পারে। কেবল বাজেট বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। বরং বরাদ্দকৃত বাজেট পরিকল্পনা মাফিক ব্যয় করা এবং মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএন উইমেনের গত বছরের জুন মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ নারী তাদের স্বাস্থ্য পরিচর্যার সামগ্রীর অপ্রতুলতার কথা বলেছেন। বিশেষ করে নারীপ্রধান পরিবারের কাছে এ সমস্যা প্রকট। ‘কোভিড-১৯ বাংলাদেশ :র?্যাপিড জেন্ডার অ্যানালাইসিস’ শিরোনামে ঐ গবেষণা ছিল জেন্ডার ইন হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ নামের একটি জোটের উদ্যোগ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা খাতে ব্যয় বাড়ালেই হবে না, তা কতটা কার্যকর- এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে মিডিয়া অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনা করছে টিম অ্যাসোসিয়েটস। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পুলক রাহা বলেন, পরিবার পরিকল্পনায় সরকারের সাফল্য অনেক। তবে করোনাকাল সেই অর্জন ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে আরো কঠিন করে তুলেছে। সে কারণে পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন গতিশীল করার জন্যই সরকার, বেসরকারি এনজিও, গণমাধ্যম ও তৃণমূল পর্যায়ের স্থানীয় নেতৃত্ব সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। পুলক রাহা বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিটি স্থানে প্রয়োজন ও সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে কার্যক্রম হাতে নেওয়া প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এসজেড

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x