ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট: বাংলাদেশে প্রস্তুতি

ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট: বাংলাদেশে প্রস্তুতি
করোনা আক্রান্তদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ছবি: আব্দুল গনি

বাংলাদেশে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের আধিক্যের কারণে করোনা পরিস্থিতির দ্বিতীয় ধাক্কা সামলে উঠতে উঠতে প্রবেশ করেছে ভাইরাসটির ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট। যেটি যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে অধিক সংক্রমণশীল। যে কোনো সময় এটি আক্রমণ করে বসতে পারে, সৃষ্টি হতে পারে সংকটময় মৃত্যুর পরিবেশ। বেশ কিছু দিন সুপ্ত অবস্থায় থাকার পর ভারতে নতুন করে আক্রমণ বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা রয়েছি সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে।

No description available.

করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: ফোকাস বাংলা

বাংলাদেশে সরকার করোনা সংক্রমণকে ঘিরে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে ১৭ মার্চ ২০২০ তারিখে। বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ৮ মার্চ দুইজন পুরুষ ও একজন নারী—মোট তিন জনকে সর্বপ্রথম করোনা শনাক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২ জুলাই ২০২০, সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১৯ জনের মধ্যে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। নভেম্বর মাসে সংক্রমণের হার কিছুটা বেড়ে গেলেও ডিসেম্বরে কমে যায়, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেটি ৩ শতাংশের নিচে নেমে যায়। তবে মার্চ ২০২১ এসে সংক্রমণ ও মৃত্যু সংখ্যা আবার বেড়ে গেলে শিথিল লকডাউনকে আরো কড়াকড়ি করা হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ জুড়ে অবরুদ্ধকরণ না হলেও সারা দেশেই জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মুক্তভাবে চলাচলের ওপর বাধা আরোপ করা হয়েছিল। বর্তমানে এর এক বছরের বেশি অতিবাহিত হয়েছে। মধ্যে করোনা মহামারির উত্থানপতন দেখা গিয়েছে। কখনো বেড়েছে, কখনো তুলনামূলকভাবে কমেছে; কিন্তু নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বের স্বাভাবিক গতি আজ শিথিল হয়ে পড়েছে।

গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের নাম ‘বি.১.১৬৭’। ভারতে করোনার সংক্রমণ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এটিই মূলত দায়ী বলছেন গবেষকরা। মার্চে ভারতে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ অনেক বেশি ভয়াবহ হওয়ার কারণ মনে করা হয় এই নতুন ভ্যারিয়েন্টের একটি ধরন ‘ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট’।

No description available.

বাংলাদেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের আগেও যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়। ৬ জানুয়ারি প্রথম যুক্তরাজ্য ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয় যেটি মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, তবে তৃতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যার কারণে সংক্রমের হারে তৃতীয় ঢেউয়ে বৃদ্ধির চিত্র দেখা যায়।

৮ মে ২০২১ তারিখে বাংলাদেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ‘বি.১.১৬৭’ পাওয়া গেছে এমনটি জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশকারী আটজনের মধ্যে চারজনের সম্পূর্ণ ও বাকিদের আংশিকভাবে সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ছয়জন করোনা আক্রান্ত। ১৪ মে ঢাকার ডিএনসিসি ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে দুই জনের শরীরে এ ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায়। এ তথ্য প্রকাশ করেছে জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা (জিএসআইডি) ডাটাতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ভ্যারিয়েন্টটি বিশ্বের ১৭টি দেশে শনাক্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি এর নামকরণ করেছে ডেলটা।

No description available.

ভারতের তাণ্ডব শুরুর পর ৮ মে পর্যন্ত সরকারিভাবে ২ লাখ ২২ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করেছে; কিন্তু সমালোচকরা এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে মন্তব্য করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন মনে করে, ভারত শুধু এসব ঘটনার ৩-৪ শতাংশ তুলে ধরেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন মুম্বাইয়ের মতো শহরে সরকার যে সংখ্যা বলেছে তার চেয়ে ৬০-৭০ শতাংশ বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ভারতের অবস্থা যদি এমন হয় তাহলে আমাদের অবস্থা কেমন হবে? অনুমেয়, ভয়ানক অবস্থা এদেশেও যে কোনো সময় সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটির মধ্যে টিকার আওতায় এসেছে মাত্র ৬০ লাখের মতো। অর্থাত্ ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে টিকা পৌঁছাতে আরো অনেক দেরি আছে। ভারতের সরবরাহকৃত অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার মজুত শেষ। চীন থেকে ১২ মে নতুন ৫ লাখ টিকা এসে পৌঁছেছে যেটা মোটামুটি পরিস্থিতি ঠিক রাখার জন্য কিছুটা সাহায্য করবে; কিন্তু নতুন করে মহামারি শুরু হলে তা যথেষ্ট হবে না।

৬ মে অনুষ্ঠিত ‘কোভিডের ২য় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি প্রস্তুতি ও জরুরি অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, দেশে বর্তমানে সাধারণ ও কোভিড রোগী মিলিয়ে ৭০-৮০ টন অক্সিজেন প্রয়োজন। এই মুহূর্তে দেশে অক্সিজেন উত্পাদনসক্ষমতা রয়েছে ২২০-২৩০ টন। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় দেশে সর্বোচ্চ অক্সিজেন চাহিদা ছিল ২১০ টন। আর একটি আশার বিষয় হলো—দেশে এই মুহূর্তে অক্সিজেনের সংকট নেই। সরকারিভাবেও প্রায় ৯০০ টন মজুত রয়েছে। এ ছাড়াও সরকারি হাসপাতালে ৪৫০ টন অক্সিজেন মজুত রয়েছে।

No description available.

আপৎকালীন অক্সিজেন মজুত রাখার ক্ষেত্রে তথ্যগুলো খুবই আশাজনক। পার্শ্ববর্তী দেশে অক্সিজেনের অভাবে যে ভয়াবহ আপদ সৃষ্টি হয়েছিল তার অভিজ্ঞতায় অক্সিজেন মজুত আসন্ন বিপদ প্রতিরোধী ব্যবস্থায় অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে। ফলে তৃতীয় টেউয়ের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলে তা মোকাবিলায় কোনো সমস্যা হবে না। তবে সংক্রমণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণহীন হলে ও ভারতের মতো আঘাত হানলে এই অক্সিজেন যথেষ্ট হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা মোকাবিলায় সরকার ১৮ দফা জারি করে লকডাউন ঘোষাণা করেছে কিন্তু জনসাধারণ সে অনুপাতে সচেতন হতে পারেনি। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ১৪ মে তারিখে ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হয়েছে। দিনটিকে ঘিরে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। ঈদ শেষে তারাই আবার ঢাকায় ফেরত আসছে। চলছে না স্বাভাবিক সড়কপথ। তবুও মানুষ গাদাগাদি করে বাড়িতে গিয়েছে, আবার এসেছে। এরপরও করোনা পরিস্থিতি তেমন একটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। তবে ভাইরাসটির সুপ্ততা ১৪ দিন বা এর বেশি হওয়ায় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে। বিশেষজ্ঞ মহল থেকে স্বাভাবিক চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হলেও রাজধানীর মধ্যে সাধারণ পরিবহন চালু আছে। অর্থাৎ বিপদ খুব সন্নিকটে।

লেখক: জনস্বাস্থ্য গবেষক

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x