পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ছাদবাগান

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ছাদবাগান
ছাদবাগান। ছবি: ইত্তেফাক

প্রাকৃতিক অরণ্য বিনষ্ট হওয়ায় প্রতিনিয়ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে মানুষের জীবন। শহরে গাছপালা কম থাকায় অক্সিজেন উৎপাদন কম এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে রাজধানীর ঢাকায় অধিক জনসংখ্যা, যানবাহন ও গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে ঢাকার পরিবেশ দূষণ অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেক বেশি। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে ছাদবাগান।

পরিবেশবিদরা বলছেন, শহর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছাদবাগান প্রকল্প সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে তা কার্বন-ডাই-অক্সাইডসহ বেশকিছু ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা কমিয়ে দূষণ কমাবে এবং পরিবেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবে।

তারা মনে করছেন, ছাদবাগান শুধু শখ থেকে নয়, পরিবেশের প্রয়োজনে বাগান করতে হবে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ নির্মল থাকবে অন্যদিকে পারিবারিক ফুল, ফল ও শাকসবজির চাহিদা মিটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখারও সুযোগ রয়েছে।

রাজধানীর ফার্মগেটের তেজগাঁও স্টেশন রোডের বাসিন্দা প্রকৃতিপ্রেমী জাহাঙ্গীর আলম ইট পাথর আর কংক্রিটের শহরে একটু প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিতে নিজের ছাদে গড়ে তুলেছেন ছাদবাগান। কী নেই তার বাগানে, আম গাছ, জামরুল গাছ, সফেদা, মেহেন্দি গাছসহ আরও অনেক গাছ আছে তার বাগানে। অবসরে বাগানে সময় কাটানো, নিজ হাতে বাগানে পানি দেওয়াসহ সকল পরিচর্যা নিজেই করে থাকে।

বাগান প্রসঙ্গে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘বাড়ি করার আগে নিচে যে ছোট ছোট গাছগুলো ছিলো আমি সেগুলো নষ্ট করিনি। তুলে এনে ছাদে মাটি দিয়ে পুনরায় রোপণ করি। দীর্ঘদিন ধরে আমি ছাদবাগান করে আসছি। যখন আমি বিকেলে ছাদের ওপরে উঠি বাগানের গাছগুলো আমার ভেতরে অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয়। আমার ছাদ বাগান দেখে এ এলাকার অনেকেই এখন ছাদ বাগান করছে এবং করতে উৎসাহী হচ্ছে। আমি মনে করি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করতে প্রতিটি ছাদে বাগান করা উচিত।’

ঘনবসতি শহরে পাশাপাশি ঘনবসতি গ্রামেও অনেকেই এখন ছাদবাগান করতে আগ্রহ হয়ে উঠছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলার সদর থানার বুধল গ্রামের এমন একজন বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বাজারের কাছে বাড়ি হওয়ায় আশপাশে গাছপালা না থাকায় নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ছাদবাগান।

গাছের পরিচর্যা ছাদবাগান উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম।

বাগান নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত ৮ বছর যাবত আমি ছাদবাগান করে আসছি। প্রথম প্রথম দুই একটা গাছ রোপণ করলেও কিছুদিন পরেই এর সম্প্রসারণ করি। এখন পুরো ছাদ জুড়েই বিভিন্ন রকম গাছ। বিশেষ করে বিদেশি ফল ড্রাগন আমার পুরো ছাদজুড়ে রয়েছে। এ গাছের ফল আমার পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি। বাগানে আর রয়েছে আম গাছ, লেবু গাছ ও বিভিন্ন রকম মরিচ গাছ। এছাড়া আছে ফুলের গাছও। বাগান করে আনন্দ পাচ্ছি, সেটা কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না।’

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট এন্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘ছাদবাগান অবশ্যই পরিবেশের সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। প্রকৃতির দূষণরোধে ব্যাপকভাবে ছাদবাগান গড়ে তুলতে হবে। ইতিমধ্যে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ঘোষণা করে হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন এলাকার ভবনগুলোতে ছাদ বাগান করলে হোল্ডিং কর থেকে ১০ শতাংশ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। এরকম উদ্যোগ যারা ছাদবাগান করতে চাই তাদেরকে অনুপ্রাণিত করবে। এছাড়াও আমরাও প্রকল্প জিরো ওয়ের মাধ্যমে ছাদবাগানে আগ্রহীদের উৎসাহিত করছি।’

সিদ্দিকা সুলতানা আর বলেন, ‘একটা পজিটিভ বিষয় হলো এখন যেসব নতুন নতুন আবাসন তৈরি করছে সবাই সামনে পেছনে গাছ রোপণ করার জন্য আলদাভাবে জায়গা রাখছে। যারা শহরে নতুন করে বাড়ি বানানোর চিন্তা করছেন তারা অবশ্যই ছাদবাগানের বিষয়টি মাথায় রেখেই বাড়ি তৈরি করবেন বলে আশা করি। ভালো ও সুস্থ পরিবেশ ফিরে পেতে ছাদবাগানের বিকল্প নেই। শুধু তাই নয় এতে একদিকে যেমন পরিবেশ নির্মল থাকবে অন্যদিকে পারিবারিক ফুল, ফল ও শাকসবজির চাহিদা মিটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাখারও সুযোগ রয়েছে।’

একই বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রিন সেভার্সের প্রতিষ্ঠাতা আহসান রুনি দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘কোনভাবেই অপরিকল্পিতভাবে ছাদবাগান করা যাবে না। যারা করবেন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে করবেন, না হলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। যারা ছাদবাগান করতে চাচ্ছেন তাদের সরকারিভাবে আরও সহায়তা বাড়িয়ে দেওয়া উচিত, কারণ যত প্রচার-প্রসার হবে তত দেশে ছাদবাগান সম্প্রসারিত হবে। এজন্য সরকার প্রণোদনা দিতে পারে, অনলাইনে প্রচারের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।’

একইসঙ্গে যারা ছাদবাগান নিয়ে কাজ করছে ছোট ছোট উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে তাদেরকে ক্ষুদ্রঋণের আওতায় এনে আর্থিকভাবে সহায়তা করা। ফলে এসব কাজে উদ্যোক্তারা আরও বেশি উৎসাহী হবে জানান তিনি।

আমাদের পরিবেশকে সুস্থ রাখতে ছাদবাগান অনেকে বড় ভূমিকা পালন করছে। সামনে যদি এর পরিধি আরও বাড়ানো যায় তাহলে আমাদের পরিবেশকে অনেকটা দূষণ মুক্ত রাখা সম্ভব বলে জানান আহসান রুনি।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x