বিশ্ব বাঘ দিবস আজ

বাঘ বাড়ছে সুন্দরবনে

বাঘ বাড়ছে সুন্দরবনে
ছবি- সংগৃহীত

আজ বিশ্ব বাঘ দিবস। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে গত ৪ বছরে বাঘের সংখ্যা ১০৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১৪টি। সুন্দরবেন সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাকিং বাঘ জরিপে ১১৪ বাঘের তথ্য মিলেছে। সুন্দরবনে বনদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ও চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্য কম হওয়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাঘের সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

বিশেজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনই হচ্ছে এশিয়ার মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বৃহত্তম আবাসভূমি। বন বিভাগ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমিকে তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে পারেনি। সুন্দরবনকে বন্য প্রাণীদের জন্য নিরাপদ করা গেলে বাঘের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বাঘের অবাধ বিচরণ ও প্রতিনিয়ত বাঘের শাবকের দেখা মিলছে বলে জানিয়েছে সুন্দরবনের জেলে-বাওয়ালিরা।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ড. আবু নাসের মোহসীন হোসেন বলেন, ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবনে বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা ও চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্য কম হওয়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাঘের সংখ্যা সর্বশেষ জরিপে বেড়েছে। ইতিমধ্যেই বাঘের প্রজনন, বংশ বৃদ্ধিসহ অবাধ চলাচলের জন্য গোটা সুন্দরবনের অর্ধেকেরও বেশি এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে টহল ফাঁড়ি। পাশাপাশি চোরাশিকারীদের তত্পরতা বন্ধে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পেট্রোলিং চালু করা হয়েছে। বাঘের প্রজনন মৌসুম জুন থেকে আগস্ট সুন্দরবনের সব পাস পারমিট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে করে প্রজনন, বংশ বৃদ্ধিসহ বাঘ অবাধ চলাচল করতে পারবে।

বন বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৩৫০টি এরপর ১৯৮২ সালে জরিপে ৪২৫টি ও এর দুই বছর পর ১৯৮৪ সালে সুন্দরবন দক্ষিণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ১১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালিয়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০টি বাঘ থাকার কথা জানানো হয়। ১৯৯২ সালে ৩৫৯টি বাঘ থাকার তথ্য জানায় বন বিভাগ। পরের বছর ১৯৯৩ সালে সুন্দরবনের ৩৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় প্যাগমার্ক পদ্ধতিতে জরিপ চালিয়ে ধন বাহাদুর তামাং ৩৬২টি বাঘ রয়েছে বলে জানান। ২০০৪ সালে জরিপে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। ১৯৯৬-৯৭ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৩৫০টি থেকে ৪০০টি। ঐ সময়ে বাঘের পায়ের ছাপ পদ্ধতিতে গণনা করা হয়। ২০১৫ সালের জরিপে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমে দাড়ায় ১০৬টিতে। হঠাৎ করে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ৪০০টি থেকে ১০৬টিতে এসে দাঁড়ালে সারা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে ১০৬ থেকে বেড়ে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৪টিতে। বর্তমানে সুন্দরবনের বাঘের আনাগোনা যেভাবে দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হয় বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সুন্দরবন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫০টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে মাত্র ১০টি। ১৪টি বাঘ পিটিয়ে মেরেছে স্থানীয় জনতা, একটি নিহত হয়েছে ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন সিডরে ও বাকি ২৫ বাঘ হত্যা করেছে চোরাশিকারিরা।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সুন্দরবনে চোরাশিকারি অবাধ বিচরণ ও বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে হুমকির মুখে রয়েছে রয়েলে বেঙ্গল টাইগার। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এ অবস্থায় হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ২০৭০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বাঘের জন্য কোনো উপযুক্ত জায়গা থাকবে না। কেননা, বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধিসহ নানামুখী চাপে প্রকৃতি বিপণ্ন হতে থাকায় সুন্দরবনে এখনো টিকে থাকা কয়েক শত বাঘ বিলীন হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. আবু সালেহ বলেন, বর্তমান সরকার বাঘের সংখ্যা বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সুন্দরবন দস্যুমুক্ত করা হয়েছে। যার সুফল কিন্তু দেখা যাচ্ছে। বিগত তিন বছরে অনেক বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। বন বিভাগ বাঘ সুরক্ষায় যেভাবে কাজ করছে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি মনে করেন।

সুন্দরবন সহ-ব্যবস্থপনা নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সাইফুল ইসলাম গাজী বলেন, লোকালয়ে আসা বাঘ নিরাপদে যাতে বনে ফিরতে পারে সে বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হয়েছে। যার ফলে এখন আর মানুষ বাঘ পিটিয়ে মারে না।

কয়রার সুন্দরবন মত্স্যজীবী সমিতির সভাপতি ইউপি সদস্য সরদার লুত্ফর রহমান বলেন, সুন্দরবনে বাঘ বেড়েছে এটা নিঃসন্দেহে খুশির বিষয়। বাঘের আবাসস্থল সুন্দরবনকে নিরাপদ করতে পারলে অবশ্যই বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

কয়রা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, চোরাশিকারিদের প্রধান টার্গেট হচ্ছে বাঘ। তারা বাঘ শিকার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করে। এই চক্র যাতে করে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে না পারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারিসহ টহল কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। এছাড়া বন্যপ্রাণী বাঘ যাতে তার স্বাভাবিক পরিবেশে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। সুন্দরবনের পাশে যে কোনো ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা গড়ে তুলতে না পারে সে বিষয়টি নজরে আনা প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x