ই-কমার্সের পুঁজি হচ্ছে মানুষের আস্থা অর্জন

ই-কমার্সের পুঁজি হচ্ছে মানুষের আস্থা অর্জন
ছবি - সংগৃহীত

শুধু মানুষকে সেবা দেওয়ার মানসিকতাই আমাজন, আলিবাবা, ফ্লিপকার্ট প্রতিষ্ঠানটিগুলোকে আজ বিশ্বের সেরা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। নিয়ে এসেছে অনুকরণীয় অবস্থানে। সারা বিশ্বে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যখন ই-কমার্স বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই সময় বাংলাদেশে একের পর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। গ্রাহকরা টাকা তো ফেরত পাচ্ছেনই না, প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের কোনো বিচারও হচ্ছে না।

অথচ এই করোনাকালে বাংলাদেশে ই-কমার্স বিশাল সম্ভাবনা নিয়েই উপস্থিত হয়েছিল। আলু, পেঁয়াজ, ডিমও যে অনলাইনে কেনা যায় তা কে জানত। শুধু আলু ডিম কেন, কোরবানির পশুও বিক্রি হয়েছে অনলাইনে। যাত্রাটা খুব সুন্দর হলেও নজরদারির অভাবেই ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, নিরাপদ ডটকমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষকে ঠকানোর সুযোগ পেয়েছে। অথচ এর বিপরীতে দারাজ, চালডালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছে। বিশ্বের অন্যতম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলিবাবা যখন যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট এমন ছিল যে বিপণন বিভাগে স্নাতক পাশ কাউকে চাকরি দেওয়া সম্ভব হতো না। এর প্রতিষ্ঠাতা বর্তমানে বিশ্বের সেরা উদ্যোক্তা জ্যাক মা কাজ চালাতে গ্রামের যুবক কৃষকদের এ পদে চাকরি দিতেন। তিনি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করেন হ্যাংঝুতে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে। কর্মীরা সেখানে কাজ করতেন, সেখানে খেতেন এবং সেখানেই ঘুমাতেন। ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১৮ জন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এখন আলিবাবার কর্মীর সংখ্যা ৬৬ হাজার। অনলাইনে সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার হিসেবে আলিবাবার যাত্রা শুরু হলেও খুচরা বাজারেও এখন প্রতিষ্ঠানটির দাপট। আলিবাবার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি মানুষ কেনাকাটা করে। ২০১৯ সালে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এ প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ১৫২ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজনের কথাই ধরুন না। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে একটি গাড়ির গ্যারেজে ১৯৯৪ সালে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজন প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী জেফ বেজস; যা এখন রাজস্বের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচরা কোম্পানি। আমাজনের ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে অডিও, ভিডিও, সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিকস থেকে বিচিত্র্য সব পণ্যে। প্রতিষ্ঠানটি ক্লাউড কমপিউটিং নিয়েও কাজ করছে। বাজার ছড়িয়েছে পুরো বিশ্বে। ২০১৭ সালে পণ্য বিক্রিতে কোম্পানিটির রাজস্ব আসে ১৭৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০১৮ সালে রাজস্ব আসে ২৩২ দশমিক ৮৮৭ বিলিয়ন ডলার। আমাজনের একটি মজার ঘটনা হচ্ছে, প্রথম দিনগুলোতে প্রত্যেক বিক্রির পর একটি ঘণ্টা বাজানো হতো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঐ ঘণ্টা বাজানো বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন কর্মীরা। কারণ বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় ঘন ঘন ঘণ্টাটি বাজাতে হতো।

ই-কমার্স ওয়েবসাইট বা স্টোর নিঃসন্দেহে আমাদের শপিংয়ের ভবিষ্যৎ। অনলাইন শপিং সাইটগুলোর এই বৃদ্ধির কারণেই লোকেরা দোকানগুলোর চেয়েও অনলাইন শপিংয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। এদিকে, বিশ্বের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফার চাইতে গ্রাহকসেবার মানকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে, ক্রেতারা বাজারে কিংবা শপিং মলে গিয়ে কেনাকাটার চাইতে অনলাইনে কেনাকাটা করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। সেই সঙ্গে তাদের অর্থ এবং সময়ও সাশ্রয় হচ্ছে। বাংলাদেশে ই-কমার্সকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দিতে হলে মানুষের আস্থা অর্জন এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।

ফ্রান্সের এক জরিপে দেখা গেছে, ই-কমার্সের ব্যবসা পরিচালনার প্রকৃতির কারণে একটি চাকরি হারালে ২ দশমিক ৪টি নতুন চাকরি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আঙ্কটাড ১৩০টি দেশের ই-কমার্স খাতসমূহ নিরীক্ষা করে বলেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা একটি দেশের ই-কমার্স খাতের অবস্থান নির্ণয়ের প্রধান সূচক হিসেবে কাজ করে। এখন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা তৃণমূলের ঘরে ঘরে ছড়িয়েছে। এই করোনাকালের আগেও ই-কমার্সের ক্রেতারা ছিলেন মূলত শহরকেন্দ্রিক। যা ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো ডাক বিভাগ ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সারা দেশে একটা ক্রেতা শ্রেণি তৈরি করছে যা ই-কমার্সের বাজারকে আকার দিচ্ছে, সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে।

বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত গতি পেতে শুরু করে ২০১৩ সাল থেকে। প্রথমত, ক্রেডিট কার্ড দিয়ে আন্তর্জাতিক কেনাকাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই বছর দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো দ্রুতগতির থ্রিজি সেবা চালু করে। পরে ফোরজি সেবাও চালু হয়। মানুষের স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে শুরু করে। এর পাশাপাশি ই-কমার্স খাতে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে আলিবাবা তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। এর পাশাপাশি আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা পরিচালনার আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এ খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, অনলাইনে কেনা ও লেনদেনের যে অভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে, তার একটি অংশ ভবিষ্যতেও থাকবে এবং বাড়বে। ক্রেতাদের একটা বড় অংশের অনলাইনে কেনাকাটার অভিজ্ঞতা ছিল না। করোনাকালে তারা অনলাইনে পণ্য কিনেছেন। ফলে অভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে তাদের একটা অংশ অনলাইনের ক্রেতা হিসেবে থাকবেন। সবার ক্রেডিট কার্ড নেই। তবে অনেকেরই মোবাইলফোন ভিত্তিক আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ফলে বিকাশ, নগদ, উপায় প্রভৃতি দিয়েও ই-কমার্সে কোনাকাটা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ই-কমার্সের সুসময় দেখছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তবে এ সবকিছুই সম্ভব হবে, যদি সাধারণ মানুষের টাকা মার না যায় তখন। সেজন্য সরকারের কঠোর নজরদারির বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের টাকা যাতে মেরে দিতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, যারা প্রতারণা করেছে, তাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এই ধরনের প্রতারণা সামনের দিনে ঘটতেই থাকবে। এর ফলে ই কমার্স খাত মানুষের মানুষের আস্থা হারাবে।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x