কোন দিকে এগোচ্ছে দেশের পর্যটন খাত?

কোন দিকে এগোচ্ছে দেশের পর্যটন খাত?
ছবি: সংগৃহীত

করোনা মহামারিতে দীর্ঘদিন জনবিচ্ছিন্ন ছিল বাংলাদেশের পর্যটন স্পটগুলো। গত ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ হওয়া পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষামূলক খুলে দেওয়া হয় গত ১৭ আগস্ট। স্বাস্থ্যবিধি মানা সাপেক্ষে সীমিত আকারে চালু হওয়া পর্যটনে এখন সরগরম। তবে আগত পর্যটকরা স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদাসীন।

আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্রমণ শুরু হওয়ার আগেই ভ্রমণ ও পর্যটনের জন্য করোনাকালীন নির্দেশিকা তৈরি করেছে বাংলাদেশ টুরিজম বোর্ড। সংশ্লিষ্ট পক্ষের জন্য অনুসরণীয় নির্দেশিকাটি ‘আবশ্যিক’ করা হয়েছে। নির্দেশিকাটির ১৩টি অধ্যায়ের মধ্যে প্রথম অধ্যায়েই বলা হয়েছে পর্যটকদের করণীয় সম্পর্কে। বাংলাদেশে ভ্রমণ করতে হলে দেশ ও বিদেশের পর্যটকদের এ অধ্যায়ের ২৩টি ধারা অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ টুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের পর্যটন বিষয়ক সংস্থা ইউএনডব্লিউটিও এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ১২ দফা স্বাস্থ্যবিধি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতামত, গবেষণা ও পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে নির্দেশনাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। সবগুলো নির্দেশনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কোভিড-১৯ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার ব্যাপারে।

প্রচলিত স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি সংক্রমণ রোধে পর্যটকদের উত্সাহিত করা হয়েছে অনলাইনে বুকিং এবং অনলাইনে অর্থ পরিশোধে। আবার যেসব দেশের নাগরিকেরা বন্দরে নেমে ভিসা (ভিসা অন-অ্যারাইভাল) সুবিধা পেতেন, তাদের ক্ষেত্রে লাইনে দাঁড়িয়ে আগমনী ভিসা নেওয়ার ঝামেলা এড়াতে দেশ থেকেই ভিসা নিয়ে আসার ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। ট্যুর অপারেটরদের কাছে বাংলাদেশে আসার আগের ভ্রমণ ইতিহাস এবং পরবর্তী ভ্রমণ পরিকল্পনা জমা দিতে হবে বিদেশি পর্যটকদের। ভ্রমণসেবা পেতে বুকিংয়ের আগেই ভ্রমণসূচি এবং স্বাস্থ্যবিমা নিশ্চিত করার তাগিদও রয়েছে বিদেশ থেকে আগতদের। চিকিত্সা প্রতিবেদন বা স্বাস্থ্য সনদ বা পিসিআর রিপোর্ট বা কোভিড-১৯ নেই মর্মে প্রমাণপত্র সঙ্গে রাখার কাজটিও দায়িত্ব নিয়ে করতে হবে তাদের।

দেশের পর্যটকদেরও ভ্রমণ করার আগে সাধারণ স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং যেখানে বেড়াতে যাচ্ছেন সেখানে স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপকরণের প্রাপ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে টুরিজম বোর্ড। ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সেবা নেওয়ার আগেই নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন, গাইড, স্যুভেনির শপ, পর্যটন আকর্ষণীয় স্থানে করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেবা দিচ্ছে কি না। ভ্রমণে গিয়ে ভিড়, জনসমাগম ও জটিলতা এড়াতে ভ্রমণের সময়সূচি, কোনো পর্যটনকেন্দ্রে প্রবেশের টিকিট, আসন, বিনোদন কেন্দ্রের রাইডের টিকিট আগেই নিশ্চিত করে রাখা। ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে গিয়ে সময়সূচির বাইরে আয়োজন পরিহার করার কথা বলা হয়েছে।

দেশবিদেশের পর্যটকদের দলগত ভ্রমণের পরিবর্তে ছোট বা পারিবারিক ভ্রমণকে উত্সাহ দেওয়া হয়েছে। ভ্রমণের আগে অথবা ভ্রমণের সময় ট্রাভেল এজেন্ট এবং অন্যান্য সেবা সরবরাহকারীকে জরুরি যোগাযোগের নম্বর বা অবস্থানের ঠিকানা এবং অ্যালার্জি বা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কোনো সমস্যা থাকলে জানানোর নির্দেশনা আছে। ভ্রমণ নির্ঝঞ্ঝাট ও আনন্দময় করতে জরুরি ওষুধ, ব্যবস্থাপত্র, পর্যাপ্ত নগদ অর্থ, ক্রেডিট কার্ড, পোশাক, পড়ার উপকরণ, ইনডোর গেমসের উপকরণ, ছাতা, রেইনকোট, ক্যাপ সঙ্গে রাখতেও বলা হয়েছে। আবার ভ্রমণের সময় সেবা প্রদানকারী এবং কর্মীদের মাস্ক, ক্যাপ, ব্যক্তিগত হ্যান্ড স্যানিটাইজার, লেগ পুশ ওয়েস্ট বিন ইত্যাদি ব্যবহার করার বিষয়ে অনুরোধ করতে বলা হয়েছে পর্যটকদের। ভ্রমণ শেষে বিদেশি পর্যটকদের আবশ্যিকভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং প্রমাণপত্র সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করার কথা নির্দেশনায় বলা হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে এখন কিছুটা হলেও পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। বিভিন্ন স্থানে পর্যটকরা যেতে শুরু করেছেন। ভিড়ও বেশ। সমস্যা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। সব মিলে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত বছরের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোভিডে এ খাতে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ২ হাজার ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তদের অনেকেই চাকরিগত ক্ষতির শিকার হয়েছেন। অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইন্সে এখন ফ্লাইট ভালো। যাত্রী পরিবহন যথেষ্ট। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে ততবেশি সচেতন নয়। তবে আন্তর্জাতিক সেক্টরে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক দেশে তো চালুই হয়নি। ফ্লাইট পরিচালনায় সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে দেশীয় এয়ারলাইন্সের তুলনায় বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো বেশি ফ্লাইট অপারেট করছে।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন এবং নানা দিবসের ছুটিতে পর্যটকের ভিড় থাকে পর্যটন স্পটগুলোতে। সম্প্রতি পূর্ণ হয়ে গেছে সব সৈকত তীরের হোটেল-মোটেল-কটেজ ও গেস্ট হাউজগুলো। অসময়েও মাসে শত কোটি টাকার বাণিজ্য করছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ধারা অব্যাহত থাকলে করোনার প্রথম ধাক্কার ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখছেন ব্যবসায়ীরা। ছুটির দিন শুক্রবার ও শনিবার ভোর থেকে সৈকতে ভিড় করেছেন নানা বয়সি পর্যটক। তবে সিংহভাগ পর্যটকই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না বলে জানিয়েছেন সৈকতে দায়িত্বরত লাইফগার্ড কর্মীরা। এরপরও বেড়াতে আসা পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। আর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সার্বক্ষণিক কাজ করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ এবং জেলা প্রশাসন। আগত পর্যটকরা সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি দরিয়ানগর, হিমছড়ি ঝরনা, ইনানীর পাথুরে সৈকত, রামু বৌদ্ধ বিহার, মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরসহ জেলার পর্যটন স্পটগুলো দেখতে যাচ্ছেন।

কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজারের প্রায় সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। যেখানে লক্ষাধিক পর্যটক অবস্থান করতে পারেন। সাপ্তাহিক ছুটিতেও প্রায় লাখো পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। শতভাগ বুকিংয়ে জমজমাট ব্যবসা করছে তারকা হোটেলগুলো।

কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি সূত্র জানায়, আগত পর্যটকদের সেবা নিশ্চিতে সতর্ক অবস্থায় দায়িত্বপালন করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ। প্রকৃতপক্ষে, তাদের নির্দেশনা মানছে না পর্যটকরা। সাপ্তাহিক ছুটিতে পর্যটক সমাগম বাড়ার কারণে মোতায়েন রাখা হয় অতিরিক্ত পুলিশও। পর্যটক হয়রানি রোধে পর্যটন স্পটগুলোকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রতিনিয়ত মাইকিং করা হলেও ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকদের অধিকাংশই মাস্ক পরে না। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় অব্যাহত রাখলেও পর্যটকরা সচেতন হচ্ছেন না।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, পর্যটক হয়রানি বন্ধে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় মূল্য তালিকা টাঙানোর নির্দেশনা আগেই দেওয়া ছিল। সমুদ্রসৈকতের লাবণি, সুগন্ধা, কলাতলীসহ ১১টি পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে তথ্য কেন্দ্র (ইনবক্স)। জরিমানা করা হয়েছে কয়েকটি রেস্তোরাঁ ও হোটেলকে। এখন করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে সর্বদা সচেতনতামূলক মাইকিং ও প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় সবসময় সতর্কাবস্থায় রয়েছে পুলিশ। পর্যটকরা যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার না হন, পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে এবং পর্যটক বেশে পুরুষ-মহিলা পুলিশের সংখ্যাও সৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সৈকত এলাকায় পোশাকধারী পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের বিশেষ রেসকিউ টিম, ইভটিজিং কন্ট্রোল টিম, ড্রিংকিং জোন, দ্রুত চিকিত্সাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তায়। সৈকতে বিচ বাইক নিয়ে টহল অব্যাহত রেখেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। রয়েছে তিনটি বেসরকারি লাইফগার্ড সংস্থার অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড কর্মী। কন্ট্রোল রুম, পর্যবেক্ষণ টাওয়ারসহ পুরো সৈকতে পুলিশের নজরদারির আওতায় রয়েছে। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করছে পর্যটকরা। কোনো কিছুতেই তাদের বোঝানো যাচ্ছে না করোনার মহামারির ভয়াবহতা।

বিশ্বের বেশ কিছু দেশে পর্যটনের জন্য সৈকত বা বিনোদন কেন্দ্র খুলে দেওয়ার পর সংক্রমণের বৃদ্ধি পেয়েছে। পরে আবার সৈকত বা বিনোদন কেন্দ্র বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে।

সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন। যদিও আক্রান্তের হার ৫ শতাংশের নিচে, তথাপি পর্যটন স্পটগুলোতে অব্যবস্থাপনা সহজেই দৃশ্যমান। যেমন—লোকে বিচে নামলে মাস্ক ভিজে গেলে সেটা খুলে ফেলবে এবং রেস্টুরেন্টে মাস্ক খুলেই খেতে হবে। অতএব একটা ঝুঁকি রয়েই যায়। সৈকত যেহেতু খোলা জায়গা তার থেকে ঝুঁকি বেশি রেস্টুরেন্ট বা কেনাকাটার জায়গাগুলোতে। সেক্ষেত্রে এসব জায়গায় কতজন আসতে পারবেন সেটা নিশ্চিত করা হয়নি। রেস্টুরেন্টে ওয়েটারদের মাস্ক পরতে হবে, খাবার টেবিলগুলোতে টেবিলের দূরত্ব ছয় ফিট রেখে বসানোর কথা বলা হলেও তা মানা হচ্ছে না।

স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না সেটি দেখার জন্য পুলিশ বা কর্তৃপক্ষ যতই থাকুক না কেন মূল দায়িত্ব কিন্তু শেষ পর্যন্ত পর্যটকের নিজের। কিন্তু পর্যটকরা তা মানতে উদাসীন।

লেখক: চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x