বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, আড়ালেই রয়ে গেছে পর্যটন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, আড়ালেই রয়ে গেছে পর্যটন সম্ভাবনা
[ছবি: সংগৃহীত]

বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিয়মিত আসা যাওয়া রয়েছে উভয় দেশের নাগরিকদের। গড়ে প্রায় ১ লাখ চীনের নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করেন। ভারতের পরেই বাংলাদেশে চীনের নাগরিক সবচেয়ে বেশি। এদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের তালিকায়ও দেশটি শীর্ষে। অথচ এত অগ্রগতির মধ্যেও একরকম আড়ালেই রয়ে গেছে পর্যটন সম্ভাবনা। ১ লাখের মতো চীনের নাগরিক অবস্থান করলেও পর্যটন অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তাদের টানতে পারে না। বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যায় চীনের নাগরিক শীর্ষে। অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও চীনের পর্যটন সৌন্দর্যও বাংলাদেশি পর্যটকদের বেশির ভাগেই কাছেই এখনো অধরা।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের দেশ চীনের জনসংখ্যা ১৫০ কোটির ওপরে। স্ট্যাটিসটিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১৬ কোটি ৯২ লাখ চীনা নাগরিক বাইরের দেশে ভ্রমণে গেছে। এক জরিপে দেখা গেছে, চীনের পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-এশিয়ার দেশগুলো। চীনের ৫৫ শতাংশ নাগরিক এই অঞ্চলের দেশগুলো ভ্রমণ করে। চীনের পর্যটক আকর্ষণে শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় না থাকা মালয়েশিয়াও ২০১৮ সালে ২৯ লাখ চীনের পর্যটক পেয়েছে। আর ২০১৯ সালে থাইল্যান্ডে গেছে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ চীনা নাগরিক। অথচ এই সংখ্যা ১ লাখের ঘরে। তাও খুব সামান্যই পর্যটক হিসেবে আসেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ দেশে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে পর্যটক এসেছে মাত্র ২ লাখের মতো।

এ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী চীনের পর্যটকের যে অংশ, তার একটি ভালো অংশ বাংলাদেশেও আসার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দেশে যেসব চীনের নাগরিক রয়েছেন, তাদেরকেও পর্যটন এলাকামুখী করা যেত। বিশেষত, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সুন্দরবন ছাড়াও দেশের পাহাড়ি এলাকাগুলোকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করা যায়। একই সঙ্গে রিলিজিয়াস টুরিজমের অংশ হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন স্থাপনা ও এলাকাকেও পর্যটন স্পট হিসেবে তৈরি করা যায়। কিন্তু এ খাতে যে ধরনের প্রস্তুতি তথা সুবিধা দেওয়া দরকার, তা বাংলাদেশ দিতে পারছে না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম কাউন্সিলের সর্বশেষ ২০২০ সালের গবেষণা প্রতিবেদনেও। বৈশ্বিক জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ১০ দশমিক ৩ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের জিডিপিতে এর অবদান মাত্র তিন শতাংশ। অন্যদিকে চীনের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান ১১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ হারে বাড়ছে।

২০১৯ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রকাশিত ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম কম্পিটিটিভনেস প্রতিবেদনেও এ সংক্রান্ত র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বলতে গেলে তলানিতে, ১৪০টি দেশের মধ্যে ১২০তম। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, পর্যটন খাতের উন্নয়নে যেসব মানদণ্ড রয়েছে, সেসব জায়গায় বাংলাদেশ প্রত্যাশিত উন্নয়ন করতে পারেনি। পর্যটন খাতের উন্নয়নে অন্যতম সূচক ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম পলিসি অ্যান্ড এনাবলিং কন্ডিশন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম, আর টুরিস্ট সার্ভিস অবকাঠামোয় ১৩৩তম। এ দুটি মানদণ্ডে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সবার পেছনে বাংলাদেশ।

অন্য দিকে, ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া মানুষের মধ্যে শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় নেই চীন। চীনের সঙ্গে ব্যবসা রয়েছে, এমন অন্তত পাঁচ জন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলোচ্য সমস্যাগুলোর পাশাপাশি পর্যটন সুবিধাগুলোত সঠিকভাবে প্রচার করতে না পারাও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পেছনে দায়ী। একইভাবে ভাষাগত সমস্যা, এ খাতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না আসা, সঠিক পর্যটন নীতিমালার অভাব, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিনোদন ও পর্যটনের সুবিধা বাড়াতে না পারা, নিরাপত্তা ও যোগাযোগ অবকাঠামোতে প্রত্যাশিত উন্নতি করতে না পারা, এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়াতে আয়করসহ সহায়ক নীতিমালার অভাব, অর্থায়নের ঘাটতি অন্যতম কারণ। তারা বলেন, পর্যটন সবচেয়ে বেশি হয় ব্যবসায়ের মাধ্যমে। চীনের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা রয়েছে, কিন্তু পর্যটন খাত আড়ালে রয়ে গেছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া পেরেছে, কিন্তু আমরা পারিনি।

বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) সূত্র জানিয়েছে, করোনা ভাইরাসের প্রকোপের আগে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখের বেশি চীনা নাগরিক অবস্থান করতেন। এর বেশির ভাগই আসেন ভিজিট ভিসায়। অন্যদিকে কী পরিমাণ বাংলাদেশি চীনে পর্যটক হিসেবে যান, তার তথ্য আলাদাভাবে তাদের কাছে নেই।

বাংলাদেশে পর্যটন খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। বিসিসিসিআইর যুগ্মমহাসচিব আল মামুন মৃধা ইত্তেফাককে বলেন, আমরা উন্নয়নশীল দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হতে হলে সব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। এ ক্ষেত্রে পর্যটন বিপুল সম্ভাবনা হতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সুবিধাজনক, জলবায়ু নাতিশিতোষ্ণ, যা পর্যটকদের জন্য উপযোগী। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, রয়েছে পাহাড়ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যের বান্দরবান এবং এসব এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। কিন্তু এগুলোকে পর্যটকদের জন্য উপযোগী করে তুলতে পারছি না। ‘বিচ টুরিজমকে’ কাজে লাগাতে পারছি না। বিদেশিদের টানতে পারছি না। অনেক মুসলিম দেশও এখন এগিয়ে এসেছে। বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, বিনোদনের ক্ষেত্রগুলো অবারিত করছে। এজন্য প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে বিশেষায়িত টুরিস্ট স্পট হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে পর্যটকদের জন্য বিনোদনসহ সব ধরনের ব্যবস্থা করা দরকার। মালয়েশিয়ার লঙ্কাউই কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের মতো সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশেও চীনসহ অন্যান্য দেশের বহু পর্যটক আসবে বলে আশাবাদী তিনি।

তবে আশার কথা হচ্ছে, দেশের পর্যটন খাত নিয়ে সরকার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। এ খাতে সরকারি বেসরকারি বিনিয়োগে গুরুত্ব বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের পর্যটক স্পট হিসেবে টেকনাফের সাবরাংকে তৈরি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্র জানিয়েছে, পর্যটন খাতে সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের কিছু বিনিয়োগ রয়েছে। চীনের এখনো বিনিয়োগ নেই, তবে আলোচনা চলছে।

জানা গেছে, চীনের কুনমিংয়ের দুই তিনটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে আলোচনা করেছে। এছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের একাধিক সংগঠনের সঙ্গে সম্প্রতি আলাপকালে যুক্তরাজ্য, তুরস্কসহ আরও কিছু দেশ পর্যটন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান মুনশী ফয়েজ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এ খাতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ নেই। অন্যদিকে যতটুকু রয়েছে, তারও যথাযথ প্রচার নেই। যেসব সুবিধা দিতে পারলে পর্যটক আকর্ষণ হবে, সেই সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আবার উভয় দেশের পর্যটনের অগ্রগতিতে ভাষাও একটি বড় সমস্যা।

অর্থনীতিবিদরাও চীন বাংলাদেশ পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, পর্যটকের সংখ্যায় চীন নাম্বার ওয়ান। চীন অবশ্যই আমাদের আমাদের টার্গেট মার্কেট হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে ১ লাখের মতো চীনা নাগরিক থাকে, তাদের মাধ্যমে শুরু করা যায়। চীনা পর্যটক টানার ক্ষেত্রে তারাই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত।

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x