পুরাকীর্তি

তাজহাট জমিদার বাড়ি

তাজহাট জমিদার বাড়ি
[ছবি: সংগৃহীত]

‘রংপুর শহর ঘুরে যাবেন, অথচ তাজহাট জমিদার বাড়ি দেখবেন না, তাহলে বড় কিছু মিস করবেন।’ পায়রাবন্দে বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার বাড়ি দেখার পর রংপুরে আর কী দেখার আছে তা জানতে চাইলে আমাকে মুঠোফোনে বলেছিলেন রংপুরের বন্ধু শ্যামল কুমার রায়। সত্যিই শ্যামলদার সঙ্গে কথা না হলে মিস করতাম।

রংপুর শহর থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে তাজহাট জমিদার বাড়ি। নান্দনিক এই রাজপ্রাসাদ যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। পূর্বমুখী দ্বিতল প্রাসাদটির দৈর্ঘ্য ৭৬.২০ মিটার (২৩০ ফুট)। প্রায় চার তলা ভবনের সমান উঁচু। বিদেশ থেকে আনা সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি ১৫.২৪ মিটার (৪৫ ফুট) প্রশস্ত কেন্দ্রীয় সিঁড়িটি সরাসরি ভূমি থেকে দোতলায় চলে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলেই রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী কক্ষ, যাতে শোভা পাচ্ছে দশম ও একাদশ শতকের টেরাকোটা। এখানে রয়েছে সংস্কৃত এবং আরবি ভাষায় লেখা বেশ কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি।

এর মধ্যে সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়কার কোরআনসহ মহাভারত ও রামায়ণ। পেছনের ঘরে রয়েছে বেশ কয়েকটি কষ্টি পাথরের বিষ্ণু মূর্তি। সেমি করিন্থীয় স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত আট কোণ বিশিষ্ট ড্রামের ওপর স্থাপিত গম্বুজটি প্রাসাদের মাঝ বরাবর ছাদের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। সিঁড়ির উভয় পাশের দোতলা পর্যন্ত ইতালীয় মার্বেলের ধ্রুপদী রোমান দেব-দেবীর মূর্তি দ্বারা সজ্জিত ছিল। তবে এখন আর নেই। প্রাসাদের সামনের দিকে দু’প্রান্তে সেমি আট কোণা বিশিষ্ট উদ্যত (সেমি অকটেজনাল প্রজেকশন) ও মধ্যভাগে ৯.৪ মিটার (২৭ ফুট) একটি বারান্দা আছে। এই বারান্দার ছাদের ওপরে চারটি সুসজ্জিত করিন্থীয় স্তম্ভ ও চাল বিশিষ্ট দুটি কক্ষ আছে। প্রাসাদটির ভূমিনব ইংরেজি অক্ষর ‘ইউ’-এর মতো, যার পশ্চিম দিক উন্মুক্ত।

প্রাসাদের নিচ তলার প্রবেশপথের পেছনে ১৮.২৯ মিটার (৫৪ ফুট) বাই ১৩.৭২ মিটার (৩৯ ফুট) মাপের একটি হলঘর। প্রাসাদ অভ্যন্তরের পুরোভাগ জুড়েই তিন মিটার (৯ ফুট) প্রশস্ত বারান্দা আছে। ভেতর দিয়ে জরুরি প্রয়োজনে ওঠানামার জন্য কাঠের দুটি গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়ি দুটির একটি উত্তর বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে এবং অপরটি পূর্ব বাহুর দক্ষিণ প্রান্তে। সব মিলিয়ে এই প্রাসাদে আছে ২২টি কক্ষ। ভবনটি লাল ইট, শ্বেত পাথর ও চুনা পাথর দ্বারা নির্মিত। প্রাসাদ চত্বরে রয়েছে বিশাল মাঠ, ফুলের বাগান, গাছের সারি। প্রাসাদের সম্মুখে দুই পাশে দুটি পুকুর। শ্বেতশুভ্র মার্বেল পাথরে তৈরি ফোয়ারাটি বিবর্ণ হয়ে গেছে।

১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর প্রাসাদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ২০০২ সালে এখানে রংপুর জাদুঘর স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয় এবং ২০০৫ সাল থেকে এই প্রাসাদের অংশবিশেষ জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x