পুরাকীর্তি পার্থেনন মন্দির

পুরাকীর্তি পার্থেনন মন্দির
ছবি: সংগৃহীত

মানব সভ্যতার এক অনন্য নিদর্শন পার্থেনন মন্দির। মন্দিরটি গ্রীক সভ্যতার হেলেনিস্টিক সংস্কৃতির চিহ্ন বহন করে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালে পার্থেনন মন্দির নির্মাণ পরিকল্পনা শুরু হয়। এই মন্দিরটি নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেবী এথেনাকে উৎসর্গ করা। সেদিক থেকে নামকরণেও ছিল যথেষ্ট সার্থকতা। কেননা গ্রীক পার্থেনন শব্দের অর্থ- "দেবীর ঘর"। প্রাচীন গ্রিক পুরাণ অনুসারে এথেনা ছিলেন এক বহুমাত্রিক দেবী। তিনি ছিলেন যুদ্ধের দেবী, নিজে দেশকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতেই তার এই যুদ্ধের রূপ। এছাড়াও তিনি ছিলেন সৃষ্টিরও দেবী। গ্রীকদের ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, কৃষিকাজ ও কারিগরির দেবী ছিলেন এথেনা। অর্থাত্ একই সঙ্গে তিনি সৃষ্টি ও বিনাশের মূর্ত প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। পাশাপাশি এথেনা ছিলেন অনুপ্রেরণা, সভ্যতা, আইন, ন্যায়বিচার, যুদ্ধকৌশল, গণিত, শক্তি, কৌশল, চারু ও কারু শিল্পের এবং দক্ষতার দেবী ও গ্রীকদের রক্ষাকর্তা।

পার্থেনন মন্দির

পার্থেনন মন্দিরটি গড়ে উঠেছিল এথেন্সের ইলিসিস উপত্যকার ধ্বংসাবশেষে। ঐতিহাসিকদের মতে, এই উপত্যকাটি ছিল গ্রীকদের নিকট সবচেয়ে পবিত্র জায়গা। কারণ, তারা বিশ্বাস করতো দেবী এথেনা এখান থেকেই তাদের পর্যবেক্ষণ করছেন। এমনই ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই ইলিসিস উপত্যকায় একটু একটু করে দৃশ্যমান হতে থাকে চমত্কার পার্থেনন মন্দিরটি। ডোরিও রীতিতে গড়ে ওঠা এই পার্থেনন মন্দিরদের ভিতরে ১৯টি এবং বাইরে ৪৬টি কলাম তৈরি হয়। এই রীতির স্থাপত্যগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এর থামগুলো মোটা আকৃতির হবে এবং কেন্দ্র হবে চতুষ্কোণ। যার ফলে স্থাপত্যগুলো হয় আঘাত সহিষ্ণু। তাইতো এই মন্দির নির্মাণের এক যুগ পরেই পুরো এথেন্স নগরী ভূমিকমেপ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মন্দিরের একটি স্তম্ভ মাত্র ১ ইঞ্চি সরেছিল। এছাড়াও ১৩.৭ মিটার উচ্চতার এই মন্দিরটি দুটি সেলে বিভক্ত ছিল এবং এর ছাদ ছিল মার্বেল খচিত। অপরূপ এ মন্দির তৈরিতে ব্যয়ের পরিমাণও কম নয়। ইতিহাস বলে, পার্থেনন নির্মাণে প্রায় ১৩,৪০০টি বড় বড় পাথরের খন্ড ব্যবহার করেন নির্মাতারা। শুধুমাত্র এই পাথরগুলোর পেছনেই গ্রীকরা প্রায় ৪৭০টি রৌপ্যমুদ্রা ব্যয় করেন, যা বর্তমান বাজারমূল্যে প্রায় ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

পার্থেনন মন্দিরে ভাস্কর ফিদিয়াসের অপূর্ব সৃষ্টি দেবী এথেনার দেবমূর্তিটি শোভা পাচ্ছিল। গ্রীকবাসীরা দেবতাদেরকে মানুষের মতোই কল্পনা করতো এবং তারা বিশ্বাস করতো দেবতাদের জীবনও মানুষদের মতো, সেখানেও হাসি-আনন্দ, দুঃখ-কষ্ট আছে। তাই মূর্তিটি ছিল নারীরূপী। কিন্তু এই অপরুপ মূর্তিটি অনন্তকাল দেখার সৌভাগ্য পরবর্তী প্রজন্মের হয়নি। এমনকি মন্দিরটিরও পূর্ণাঙ্গ নির্মাণ সম্ভব হয় নি। পার্থেননের নিমার্ণকাজ শুরু করার পর টানা ১০ বছর এটি সুন্দরভাবেই নির্মিত হচ্ছিল, কিন্তু এসময় গ্রীকদের সঙ্গে পার্সিয়ানদের মতনৈক্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং ৩৩ বছর ধরে এ যুদ্ধে গ্রীকরা জয়ী হলেও মন্দিরের বেশ কিছু ক্ষতি হয়ে যায়। পরবর্তীতে গ্রীকরা আবারও মন্দিরটি নির্মাণে মনোনিবেশ করে কিন্তু বিভিন্ন কারণে এর দখল রোমানদের হাতে চলে যায়। জানা যায় তখনো এথেনার মূর্তিটি বিশেষভাবেই সমাদৃত ছিল। তার পরবর্তী সময়ে মূর্তিটির আর কোনো খোঁজ ইতিহাসে পাওয়া যায় নি। যদিও বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিল টেনেসিতে দেবী এথেনার একটি নকল মূর্তি রয়েছে, যা তৈরি হয়েছিল ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল সময়কালে। এরপর ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরটি অটোম্যানদের দখলে চলে এলে তা মসজিদ হিসেবে ব্যবহূত হয়। এভাবেই প্রবল যত্নে গড়ে ওঠা পার্থেনন মন্দিরটির ক্ষয় হয়ে থাকে।

তবুও এর স্থাপত্যকলার নিদর্শনে এতো বেশি আধুনিকায়ন ছিল যে তা বর্তমান প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং ইতিহাসবিদদেরকেও অবাক করে দেয়। জানা যায়, পার্থেনন এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে টিকে থাকা একমাত্র নিখুঁত প্রাচীন গ্রীক ডরিক মন্দির। এবং এখানে দেবী এথেনার মূর্তি ছাড়াও আরো অনেক মূল্যবান ভাস্কর্য ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন গবেষণাতেও প্রমাণ মেলে যে মন্দিরটির গঠন কাঠামো বেশ দৃঢ় ও ভুমিকমপ সহনশীল ছিল। বর্তমান আধুনিক সভ্যতাতেও এর গঠন প্রকৃতির আদলে অনুলিপি তৈরি হয়েছে। জার্মান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ নানা দেশেগুলোতে পার্থেনন মন্দিরের গঠন ছাপের প্রমাণ মেলে। মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে সমৃদ্ধশালী গ্রীক সভ্যতার অবদান অনস্বীকার্য। তাই তো আজো পর্যটকদের কাছে পার্থেনন মন্দির এক অনন্য বিস্ময়।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x