যে বাজারের সব দোকানি নারী

যে বাজারের সব দোকানি নারী
বউবাজারের এক নারী দোকানি। ছবি: ইত্তেফাক

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার দুর্গম চরমোন্তাজ ইউনিয়নে দুই যুগ আগে বুড়াগৌরাঙ্গ নদের বাঁকে ‘বউবাজার’ নামে একটি বাজার মিলেছে। সেখানকার বেশির ভাগ দোকানি (দোকানদার) নারী। এ কারণেই এটি ‘বউবাজার’ নামে পরিচিত। তবে কেউ সখের বসে নয়, দোকানে বসেছে পেটের তাগিদে।

জানা গেছে, বউবাজার ঘেঁষে বয়ে গেছে বুড়াগৌরাঙ্গ নদ। ঐ নদে-ই জেলে ট্রলার ঘাট। সাগরে মাছ ধরার ফিশিং ট্রলারগুলো সেখানে নোঙর করা হয়। তাই ইলিশ মৌসুমে জেলেদের পদচারণায় ঐ বাজারটি জমজমাট হয়ে ওঠে। দিনের চেয়ে রাতেই বেশি জমে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় ২৫ বছর আগে হুসোন বেগম নামের এক নারী বুড়াগৌরাঙ্গ নদের তীরের বেড়িবাঁধের ওপর একটি চায়ের দোকান দিয়ে বসে। পরে একে একে নারীদের সেই দোকানের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক পর্যায় ঐ স্থানটির নাম ‘বউবাজার’ নামেই পরিচিতি পায়। তথ্য সংগ্রহের সময় জানা যায়, বেড়িবাঁধের ওপর গড়ে ওঠা বাজারটি বুড়াগৌরঙ্গ নদের ভাঙনের মধ্যে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বউবাজার রক্ষায় প্রশাসন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করুক।

বউবাজার গিয়ে দেখা গেছে, বেড়িবাঁধের দুই সারিতে হরেক রকম পণ্যের অর্ধশত দোকান। নিত্যপ্রয়োজনীয় সবই পাওয়া যায় দোকানগুলোতে। প্রায় সব দোকানেই নারী বিক্রেতা। তবে ক্রেতা নারী-পুরুষ সবাই। নারী দোকানিরা জানায়, শুরুতে অনেকে তাদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছিল। তবুও তারা থেমে থাকেনি।

নারী দোকানিদের প্রত্যেকেরই রয়েছে জীবন-সংগ্রামের পৃথক পৃথক গল্প। তাদের কারো স্বামী, কারো ছেলে, কারো বাবা নদী বা সাগরের জেলে। অর্থাত্ সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষ মত্স্য পেশার ওপর নির্ভরশীল। একসময় মাছ পেলে ঐ জেলে পরিবারগুলোর সংসারে রসাই (রান্নাবান্না) চলতো, আর না পেলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটত। কিন্তু এভাবে আর কত কাল? পুরুষের পাশাপাশি সংসারের খরচ জোগান দিতে অবশেষে গৃহিণীরা দোকান দিয়ে বসেছেন।

তাদেরই একজন বকুলী (৪৫)। বউবাজারের চায়ের দোকানি। সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। বকুলী বেগম বলেন, ‘স্বামী নদীতে মাছ ধরে। আমিও আগে মাছ ধরতাম। কিন্তু এখন মাছ ধরে সংসার চলে না। এ জন্য দোকান দিছি। নদীতে মাছ না পাওয়া গেলেও আমাগো পেটে দুইটা ভাত জোটে।’ বকুলীর সঙ্গে কথা শেষে ঐ বাজারের আরেক দোকানি ছালমা আক্তারের (৩০) সঙ্গে দেখা। চায়ের চুমুকে চুমুকে তার জীবনের গল্প শোনা। এ সময় ছালমা বলেন, ‘জামাই (স্বামী) সাগরে মাছ ধরে। হের (তার) একার আয়ে (রোজগার) সংসার চলে না। এইহারে (এখানকার) মহিলাদের দেখে আমিও দোকান দিছি। মাছের সিজনে (মৌসুমে) বেচাকেনা ভালোই হয়। আর মাছ না থাকলে বেচাকেনা খারাপ (মন্দা)।’ নারী দোকানিরা বলছেন, এসব নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করলে কাজে উত্সাহ বাড়বে।

অত্র এলাকার সমাজকর্মী সমীর কর্মকার বলেন, ‘এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মত্স্য আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে চরমোন্তাজের মানুষ মত্স্যকেন্দ্রিক বেশি। তবে আগের মতো বর্তমানে নদী ও সাগরে মাছ নেই। তাই বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে জেলে পরিবারের নারীদের এই উদ্যোগ অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়েছে, এটা বলা যায়।’ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে) তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘চরাঞ্চলের নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। তারাও পারে সংসারের রোজগারের সদস্য হতে। চরমোন্তাজের বউবাজারের গল্প শুনে আমার কাছে এমনটাই মনে হয়েছে। সংগ্রামী এই নারীদের জন্য আমাদের সেবার দরজা খোলা।’ এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান বলেন, ‘নারীদের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। বউবাজারের ভাঙন রোধের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদেরকে অবহিত করব। তাদের জন্য কিছু করতে পারলে আমাদের কাছেও ভালো লাগবে।’

ইত্তেফাক/এসসিএস

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x