অবাক পৃথিবী

সুইসাইড ফরেস্ট আওকিগাহারা

সুইসাইড ফরেস্ট আওকিগাহারা
ছবি: সংগৃহীত

জাপানের টোকিও শহর থেকে ১০০ মাইল পশ্চিমে মাউন্ট ফুজির উত্তর-পশ্চিমে ৩৫ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত আওকিগাহারা জঙ্গল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিংবা পর্যটনের জন্য নয়, জঙ্গলটি কুখ্যাত ‘সুইসাইড ফরেস্ট’ হিসেবে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, এই জঙ্গল থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০০ জন মানুষের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। বনের সর্বত্রই ছড়িয়ে থাকে মৃত মানুষের কঙ্কাল, হাড়গোড়। পর্যটক বা ভ্রমণকারী হিসেবে নয়, বরং আত্মহত্যার উদ্দেশেই আওকিগাহারা ফরেস্টের পথে পা বাড়ান জাপানের অসংখ্য মানুষ!

আওকিগাহারা বন সম্পর্কে জাপানিদের মধ্যে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে; তারা বিশ্বাস করে, এ বনের মধ্যে কেউ গেলে আর ফিরে আসে না। জাপানি পুরাণ মতে, এ বনে প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায় এবং তারা মানুষকে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত করে ডেকে নিয়ে আসে। ঘন গাছপালা, গুমোট নিস্তব্ধতা, আবছা আলোতে গা ছমছমে জনমানবশূন্য গোলকধাঁধাময় আওকিগাহারা জঙ্গল এতটাই বিভ্রান্তিকর যে অনেক সময় মৃতদেহের সন্ধানই পাওয়া যায় না!

গভীর ও সুবিশাল জঙ্গলে একবার ঢুকলে বের হওয়ার রাস্তা পাওয়া কঠিন। অদ্ভুত বাঁকানো আকৃতির গাছপালা বনের রহস্য আরো বাড়িয়ে দেয়। গাছের শিকড়গুলো জালের মতো আঁকড়ে রেখেছে পুরো অঞ্চলের মাটি। পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় এর ভূমি অমসৃণ ও প্রস্তরাকীর্ণ। আরো রয়েছে শত শত গর্ত ও অন্ধকার গুহা। আওকিগাহারা ফরেস্টে বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বও বিরল। এখানকার মাটিতে ম্যাগনেটিক আয়রনের পরিমাণ এতই বেশি যে সেলফোন সার্ভিস, জিপিএস সিস্টেম এমনকি কম্পাসও কাজ করে না। রহস্যময়তা আর অতিপ্রাকৃত সম্মোহনী শক্তির কারণেই প্রতি বছর প্রায় শখানেক জাপানি এই জঙ্গলে আত্মহত্যা করতে অনুপ্রাণিত হয়।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আত্মহত্যাকে অপরাধ হিসেবে মনে করা হলেও জাপানে ঐতিহ্যগতভাবে আত্মহত্যার প্রচলন ছিল। সামন্ত যুগে জাপানে সামুরাই নীতিতে বিশ্বাসীরা মনে করত ‘সেপুকু’ (আত্মহত্যায় মুক্তি)-র মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে যাওয়া যায়। আধুনিক যুগেও অনেক জাপানি আত্মহত্যার নীতিতে বিশ্বাস করেন। ১৯৬০ সালে জাপানি লেখক সাইকো মাটসুমোটোর ‘টাওয়ার অফ ওয়েবস’ উপন্যাস প্রকাশের পর থেকেই আওকিগাহারা জঙ্গলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। উপন্যাসের দুটি চরিত্র এই জঙ্গলে এসে আত্মহত্যা করেছিল।

১৯৭০ সালে পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও সাংবাদিকদের নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়েছিল যাদের কাজ ছিল মৃতদেহ খুঁজে বের করা এবং লোকজনকে আত্মহত্যায় অনুত্সাহিত করা। আত্মহত্যার হার কমানোর জন্য জাপান সরকার একটি আইনও পাস করে। সুইসাইড ফরেস্টের প্রবেশপথে লাগানো হয় সিকিউরিটি ক্যামেরা, বাড়ানো হয় সতর্ক প্রহরা। বনে ভ্রমণের অনুমতি থাকলেও যে সব ভ্রমণকারী তাঁবু নিয়ে আসেন তাদের ওপর রাখা হয় বিশেষ নজর।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x