অত্যধিক আত্মহত্যা, বছরে জাপানের ক্ষতি ৩২ বিলিয়ন ডলার

অত্যধিক আত্মহত্যা, বছরে জাপানের ক্ষতি ৩২ বিলিয়ন ডলার
প্রতীকী ছবি

উন্নত রাষ্ট্র; মাথাপিছু আয় (ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে) ৪০ হাজার মার্কিন ডলারেরও (৩৪ লাখ টাকা) বেশি। কাজেই মোটের ওপর বলা যায়, অর্থবিত্তের অভাব নেই। মুক্ত-বাজার অর্থনীতির এ দেশটিকে শুধুমাত্র উন্নত বললে অবশ্য অবিচারই করা হয়; উন্নত শব্দটির আগে বিশেষায়িত বিশেষণ ‘অত্যন্ত’ যোগ করাটা বাধ্যতার পর্যায়েই পড়ে। নামিক জিডিপির ভিত্তিতে পৃথিবীর তৃতীয়-বৃহত্ অর্থনীতি (দ্বিতীয় স্থানটি চীনের কাছে হারিয়েছে মাত্র কয়েক বছর আগে) আর ক্রয়ক্ষমতা সমতার (পিপিপি) বিচারে রয়েছে চার নম্বরে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুসারে গত বছর জি সেভেন ও জি টুয়েন্টির সদস্য জাপানের মাথাপিছু জিডিপি (পিপিপি) ছিল ৪১,৬৩৭ মার্কিন ডলার। এর পাশাপাশি দেশটি ধরার তৃতীয়-বৃহৎ ভোক্তা বাজারও। সেই জাপানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো ভালো থাকতে পারত, যদি না তাদেরকে অত্যাধিক আত্মহত্যার হার ও মহামারীস্বরূপ বিষন্নতাকে মোকাবিলা করতে হতো। বিস্মিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে চোখ দুটি প্রায় কপালে গিয়ে ঠেকে, যখন জানা যায় যে, এ দুটি অস্বাভাবিকতার দায়ে জাপানের অর্থনৈতিক ক্ষতি ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ইয়েন সমপরিমাণ ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা)। এর উল্লেখযোগ্য একটা অংশ ব্যয় হয় বিষণ্নতা দূর করার পেছনে।

সর্বোচ্চ আত্মহত্যার হারের দেশগুলোর একটি হচ্ছে জাপান। ভাবা যায়, সেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৮ জন জীবনের মায়া ত্যাগ করে স্বেছায়। গত বিশ বছর ধরে প্রতিবছরের আত্মহত্যাকারীর সংখ্যাটা ঘুরপাক খায় ৩২ হাজারের আশেপাশে। জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই বিশাল সংখ্যাটাকে অর্থনৈতিক ও আবেগগত মন্দার প্রমাণ হিসেবে অবশ্য মানতে নারাজ। আত্মহত্যার হার কমানোর চেষ্টায় সরকার কার্যনির্বাহী দল গঠন করেও কোনো কুলকিনারা পাচ্ছে না। ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর জে লীগের নামিদামি তারকাসহ বিভিন্ন অঙ্গনের সেলিব্রেটিদের কাজে লাগিয়ে জনগণকে আত্মহত্যার পরিণাম সম্পর্কে বুঝিয়ে নিরুত্সাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এতেও তেমন একটা ফল আসছে না। টানা ২১ বছর ধরে আত্মহত্যার সংখ্যাটা ৩০ হাজারের ওপরেই থেকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অভিমত, এটি এমন একটি সমস্যা, যা গোটা জাতির অনুধাবন করা প্রয়োজন। আর এটি প্রতিরোধে গবেষণাই হতে পারে সবচে’ বড় মাধ্যম।

সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে, গত বছর নিজের জীবন-প্রদীপ নিজেই নিভিয়ে দেওয়া ২৬ হাজার ৫০০ জনেরই বয়স ছিল ১৫ থেকে ৬৯ বছরের মধ্যে। অবসরের আগ পর্যন্ত কাজ করতে পারলে তারা আয় করতে পারত ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ইয়েন।

সমস্যা লাঘবের জন্যে আত্মহত্যার পাশাপাশি বিষণ্নতার বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শুরুতেই বিষণ্নতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে পালটাতে হবে। কেননা মন খারাপ থাকা বা বিষণ্নতা থেকেই শুরু হয় হয় আত্মহত্যার বিষয়ে চিন্তাভাবনা। হুট করেই এই জঘন্য কাজ করে বসা লোকের সংখ্যা একেবারে নগণ্য। অসংখ্যবার ভাবার পরই কোনো ব্যক্তির দ্বারা আত্মহনন সংঘটিত হয়।

জাপান হচ্ছে এমন এক দেশ, যেখানে নিস্পৃহতা ও ঐকমত্য দুটিই উচ্চ মূল্যায়িত। অনেক বয়স্ক লোকই মনে করে, মানসিক অসুস্থতা কলঙ্কের ব্যাপার। কঠোর চেষ্টা করলে এ সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যায়। মনঃসমীক্ষণের মাধ্যমে রোগ নিরাময়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর চেয়ে জাপান অনেক পিছিয়ে। জাপানি ডাক্তাররা প্রায়ই পরামর্শ দিয়ে থাকেন, কেবলমাত্র ধ্যানই বিষণ্নতা দূর করার একমাত্র উপায়।

উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি আত্মহত্যা করে। নারীদের মধ্যে আবার চল্লিশের বেশি বয়স্ক একা থাকা নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, এই কাজ করে বসা এমন নারীদের বেশির ভাগই আর্থিক সমস্যায় ছিলেন, বিশেষত এখন পর্যন্ত পুরোপুরি নিজের না হওয়া আবাসস্থলটি নিয়ে।

— বিবিসির তথ্যানুসারে

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x