সাগরে চলছে মাছের ‘লকডাউন’! 

সাগরে চলছে মাছের ‘লকডাউন’! 
কক্সবাজারের জেলেদের জেটিঘাট। ছবি: ইত্তেফাক

করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে বাংলাদেশসহ পৃথিবী জুড়ে আবারো মৃত্যুর মিছিল চলছে। করোনার ভয়াবহতা রোধে সারাদেশে চলছে কঠোর লকডাউন। অকারণে ঘর থেকে বের হওয়া মানা। সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠে কঠোরতা দেখাচ্ছে শৃঙ্খলা বাহিনী। এরপরও কারণে-অকারণে বাসা থেকে বের হচ্ছেন অতি উৎসাহী মানুষ।

করোনাকালে স্থলে এ পরিস্থিতি হলেও সাগরে যেনো মাছের কঠোর লকডাউন চলছে! লাখ টাকা খরচ করে জেলেরা সাগরে গেলেও জালে ধরা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত মাছ। এখানে-সেখানে সপ্তাহ খানেক জাল ফেলেও মাছের দেখা না পেয়ে খালি ট্রলার নিয়েও তীরে ফিরছেন অনেকে। এতে রমজানের কারণে বাড়তি চাহিদা থাকলেও বাজারে মাছের দেখা নেই। কোনো কোনো ট্রলারের ভাগ্যে জুটা যতোসামান্য মাছ বিক্রি হচ্ছে আগুন লাগা দামে। ফলে, সুষ্ঠুভাবে সেহেরি খাওয়া নিয়ে ভুগছে মানুষ।

জেলেদের দাবি, গত কয়েক মাস ধরে সাগরে মাছের আকাল চলছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাছ সংকটে বাড়তি দামে লোক হয়রানি যেমন হচ্ছে তেমনি লোকসানও গুনতে হচ্ছে তাদের।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাগরে যাওয়া ট্রলার গুলো বাঁকখালী নদীর তীরে ফিরছে। কিছু কিছু ট্রলারে মাছ নামলেও পরিমাণ একেবারেই কম। আবার অনেকে ফিরেছেন খালি ট্রলার নিয়েই।

জেলেরা বলছেন, সাগরে মাছের আকাল চলছে। জাল ফেলেও মিলছে না মাছের দেখা। ফলে ট্রলারে খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় যা পেয়েছি তা নিয়ে বা খালি ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন ঘাটে।

এফবি আল্লাহর দান ট্রলারের মাঝি ইমরান বলেন, গত বছর এই সময় সাগরে মাছ শিকারে গিয়ে ৫ হাজার ইলিশ পেয়েছিলাম। কিন্তু গত ১২ দিন সাগরে মাছ শিকার করে পেয়েছি মাত্র ৩০০টি ইলিশ। অবশেষে খাদ্য শেষ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে ফিরতে হয়েছে ফিশারি ঘাটে।

মো. নয়ন নামে আরেক জেলে বলেন, ট্রলার মালিক ২ লাখ টাকার রসদে ১৫ জন জেলে দিয়ে সাগরে মাছ শিকারে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ দিন সাগরে জাল ফেলে আশানুরূপ মাছ ভাগ্যে জুটলো না। অল্প পরিমাণ মাছ পেয়েছিলাম, যা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এনে বিক্রি করে মাত্র ৪০ হাজার টাকা পেয়েছি। এতে ট্রলার মালিকের লোকসান হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এখন আর ট্রলার মালিক সাগরে পাঠাচ্ছেন না।

নুনিয়ারছড়া এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী নাঈম উদ্দিন বলেন, কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র প্রায় প্রতিদিন সকাল-বিকাল ভরা থাকে সামুদ্রিক মাছে। কিন্তু এখন অবতরণ কেন্দ্রে মাছের আকাল।

মৎস্য ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন হাজারী বলেন, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মাছের অবতরণ কম হলে দাম বেড়ে যায়। ট্রলার গুলো যেভাবে খালি ফিরে আসছে তাতে মনে হচ্ছে সাগরে মাছের লকডাউন চলছে। যতোসামান্য যা মাছ মিলছে তা হয়তো লকডাউনের কঠোরতা না মেনে বের হয়ে জালে আটকা পড়ছে। স্থল ও জলে একই পরিস্থিতি বিরাজ করায় সাধারণ মানুষ ভুগছে আর লোকসান গুনছেন ট্রলার মালিক এবং আগাম দাদন দেয়া ব্যবসায়ীরা। আয় বন্ধ হওয়ায় ভুগছেন শ্রমিকসহ অবতরণ কেন্দ্র কেন্দ্রীয় কর্মজীবীরা।

আরেক ব্যবসায়ী শামসুল আলম বলেন, একে তো মাছের পরিমাণ কম, তার উপর কঠোর লকডাউন। সব মিলিয়ে মহাবিপদে রয়েছি।

ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, এক কেজি ইলিশের দাম পড়ছে এক হাজার টাকা, রিটা (গুইজ্জা মাছ) বিক্রি হচ্ছে ৪‘শ টাকা, সুরমা সাড়ে ৫‘শ টাকা, চাপা ৩‘শ টাকা ও টুনা ২‘শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সব ধরণের মাছে ৫০ থেকে ১০০-১৫০ টাকা দাম বাড়তি।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মার্কেটিং কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, সাগরে মাছের আকাল চলায় জেলেদের মাছ শিকারে পাঠাচ্ছেন না অনেক ট্রলার মালিক। ফলে রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। গত বছর কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মাছ অবতরণ হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ। সে হিসাবে গত বছরের এ সময়ে সরকারি রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৪ লাখ টাকা।

কিন্তু এ বছর একই সময়ে গত রবিবার (১৮ এপ্রিল) পর্যন্ত মাছ অবতরণ হয়েছে ১ হাজার ৬০১ মেট্রিক টন। আর রাজস্ব আয় হয়েছে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। এতে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি পড়েছে।

ইত্তেফাক/এমএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x