ঢাকা সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
২১ °সে

অপমৃত্যু নয়, প্রেমিকার কারণেই খুন হন শরিফ

অপমৃত্যু নয়, প্রেমিকার কারণেই খুন হন শরিফ
নিহত শরিফুল ইসলাম শরিফ। ছবি: সংগৃহীত

রেলওয়ে থানা পুলিশের ধারণা ছিল ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে শরিফুল ইসলাম শরিফের। থানায় এমন অভিযোগে অপমৃত্যুর মামলাও হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে মামলা তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য বের করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দুর্ঘটনা নয় প্রেমের কারণেই হত্যা করা হয়েছিল কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার গোলাচৌ গ্রামের সিরাজুল হকের ছেলে শরিফুল ইসলাম শরিফকে।

এ ঘটনায় শরীফের প্রেমিকা রহিমা আক্তারকে গ্রেফতারের পর সে গত শুক্রবার কুমিল্লার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার অপর আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। শনিবার সন্ধ্যায় পিবিআই কুমিল্লার পুলিশ পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

মামলার অভিযোগ ও পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর শরিফুল ইসলাম শরিফের (২২) লাশ উদ্ধার করে লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশ। লাশটি উদ্ধারের পর ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে এমন ধারণা নিয়ে রেলওয়ে থানা পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। তবে লাশের শরীরে অসংখ্য আঘাতের দাগ আর হাত ভাঙ্গা দেখে কিছুতেই বিষয়টি দুর্ঘটনা বলে মেনে নিতে পারেননি শরীফের বাবা সিরাজুল হক। তিনি ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর কুমিল্লার আদালতে ছেলে শরীকে হত্যা করা হয়েছে, এমন অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ফের লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্তের পর শরিফ ট্রেনের ধাক্কায় অর্থাৎ দুর্ঘটনায় মারা গেছে বলে রেলওয়ে থানা পুলিশ আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে।

এরপর রেলওয়ে পুলিশের ওই রিপোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী সিরাজ। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআই কুমিল্লাকে নির্দেশ দেয় আদালত।

অবশেষে পিবিআইয়ের তদন্তে বের হয়ে আসে ট্রেনের ধাক্কায় নয়, এক মেয়েকে ভালোবাসার কারণে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছিল শরীফকে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। এদের মধ্যে এক আসামি জিজ্ঞাসাবাদে ওই খুনের নেপথ্য কাহিনী স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে। গত শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই কুমিল্লার পুলিশ পরিদর্শক মো. মতিউর রহমান জানান, গত প্রায় ২০ দিন আগে আমি মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করি। এরপর ওই যুবকের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উৎঘাটনে কাজ শুরু করি। মামলাটির তদন্ত শুরুর পর প্রথমেই জানতে পারি সদর দক্ষিণ উপজেলার উৎসব পদুয়া গ্রামের মোরশেদ আলমের মেয়ে রহিমা আক্তার শিপার (২১) সাথে নিহত শরিফের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এরপর আমাদের ধারণা হয় প্রেম সংক্রান্ত ঘটনার জেরে ওই যুবককে খুন করা হতে পারে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) ওই যুবকের প্রেমিকা রহিমা আক্তার শিপাকে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানাধীন টাকিয়াকদমা গ্রামে তার বর্তমান শ্বশুর বাড়ি থেকে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করি। তিনি বলেন, এরপর তাকে কুমিল্লায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি।

একপর্যায়ে সে পুরো ঘটনা স্বীকার করে জানায়, ভিকটিম শরিফের সঙ্গে তার মামা আবু তাহেরের মাধ্যমে পরিচয় ঘটে। এরপর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু কোন ক্রমেই তাদের প্রেমের বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি তার মামা আবু তাহের। এজন্য বিভিন্নভাবে শরিফকে হুমকিও দেয় তাহের। ঘটনার কয়েকদিন পূর্বে শরিফ প্রেমিকা রহিমার বাড়িতে দেখা করার জন্য গেলে তার আরেক মামা বিষয়টি দেখে ফেলে। এ সময় ওই মামাও শরিফকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এরপর বেশ কয়েকদিন পর রহিমা শরিফকে দেখা করার জন্য উৎসব পদুয়া গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেল লাইনের পাশে আসতে বলে। ঘটনার দিন ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর শরীফ প্রেমিকার কথানুযায়ী সন্ধ্যা ৬টার দিকে ওই রেল লাইনের ধারে আসে। এরপর পূর্ব থেকে সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা রহিমার মামা আবু তাহেরসহ আরো কয়েকজন শরিফকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। তার ডান হাতও ভেঙ্গে ফেলা হয়। এরপর শরিফকে তারা মুমূর্ষু অবস্থায় রাস্তায় নিয়ে আসে এবং ট্রেনের ধাক্কায় আহত হয়েছে বলে চিৎকার শুরু করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আসামি রহিমা আক্তারকে শুক্রবার কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। এ ঘটনায় জড়িত রহিমা আক্তারের মামা আবু তাহেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপর আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন