বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭
৩১ °সে

ধনবাড়িতে নতুন জাতের ধান চাষে ৫৪ কৃষকের মাথায় হাত

ধনবাড়িতে নতুন জাতের ধান চাষে ৫৪ কৃষকের মাথায় হাত
ব্লাস্ট আক্রান্ত ধান দেখাচ্ছেন এক কৃষক। ছবি : ইত্তেফাক

‘মেশিন দিয়ে নতুন জাতের বোরো বীজতলা তৈরি হবে। মেশিন দিয়েই সেই চারা জমিতে রোপিত হবে। ধান পাকলে মেশিনেই কাটা হবে। তোমরা বিনামূল্যে বীজ, সার ও বালাইনাশক পাবে। সকাল-বিকাল আমরা খোঁজ নেবো। ৩০ শতাংশের এক বিঘা জমিতে ধান পাবে ৩০ মণ। কৃষিতে একশ ভাগ যন্ত্রের ব্যবহার শিখবে তোমরা। প্রকল্প তোমাদের বদলে দেবে। তোমরাও বদলে যাবে।’

এমন বদলে দেয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ৫৪ জন কৃষককে প্রকল্পের মাধ্যমে এবার বোরো আবাদ করানো হয়েছিল। সেই ৫৪ কৃষকের বাড়িতে এখন কান্নার রোল। আবাদ করা জমির বোরো ধান ব্লাস্ট রোগে চিটা হয়ে গেছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের যৌথ উদ্যোগে চলতি মৌসুমে প্রান্তিক চাষিদের নিয়ে খামার পদ্ধতিতে বোরো আবাদে ‘সিনক্রোনাইজড ফার্মিং প্রজেক্ট’ গ্রহণ করা হয়। ধনবাড়ি উপজেলার পাইস্কা ইউনিয়নের ভাতকুড়া গ্রামের ৫৪ জন কৃষকের ৬০ বিঘা জমিতে বোরো চাষে কোটি টাকার এ প্রকল্প পরীক্ষামূলক গ্রহণ করা হয়। ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের এ ফার্মিংয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাইসট্রান্সপ্লান্টার দিয়ে ধানের চারা রোপণ এবং কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কর্তন। দাবি করা হয়, এতে জমির সদ্ব্যবহার হবে। উৎপাদন দ্বিগুণ হবে। লোকবল কম লাগবে। নতুন জাতের ধানে ব্লাস্ট রোগ হবে না। কৃষকরা আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতির সঙ্গে পরিচিত হবেন। চুক্তি মোতাবেক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট প্রকল্পের কৃষকদের নতুন ব্রি ধান-৮৮ ও ৮৯ জাতের বীজ ও সার দেন। আর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন। গত ডিসেম্বরে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বীজতলা করা হয়। আর জানুয়ারিতে রাইস প্লান্টারের মাধ্যমে জমিতে চারা রোপণের উদ্বোধন করেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। প্রকল্পের কৃষকদের নিয়ে একটি সমিতি গঠন করা হয়।

প্রকল্পের সদস্য বেলাল হোসেন অভিযোগ করেন, বিনামূল্যে সার দেয়ার কথা থাকলেও তিনি তা পাননি। কৃষি বিভাগের কথা বলে কৃষক সমিতির কয়েক তার নিকট থেকে ৭২০ টাকা আদায় করেন। জমিতে বালাই দেখা দিলে মাঠ পর্যায়ের কৃষি অফিসারদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোনও পরামর্শ ও মেলেনি। নতুন জাতের ধান হওয়ায় জমিতে কখন, কিভাবে, কতটুকু সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ করা দরকার তা নিয়ে চাষিরা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন। ফলে ধান পাকার আগেই জমিতে দেখা দেয় ব্লাস্ট রোগ। এতে তার এক বিঘা জমির ধান পুরোটাই চিটা হয়ে গেছে।

একই ধরনের অভিযোগ করেন বোরো চাষি কদ্দুছ আলী, টুক্কু মিয়া, শাহজাহান আলী, রেহানা বেগম ও শফিকুল ইসলাম। তাদের প্রত্যেকের জমির ধান ব্লাস্ট রোগে চিটা হয়ে গেছে। প্রান্তিক চাষি গুটু মিয়া জানান, এক বিঘা জমি তার সম্বল। বীজ, সার ও কীটনাশক বিনামূল্যে দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে তিনি নতুন এ জাতের বোরো আবাদ করেন। কিন্তু বীজ ছাড়া আর কিছুই তিনি পাননি। জমির সব ধান চিটা হওয়ায় তাকে এ বছর চাল কিনে খেতে হবে। চাষি আশরাফ আলী জানান, চাষিরা বরাবর ব্রি-২৮ ও ২৯ জাদের ধান চাষে অভ্যস্ত। কিন্তু আমাদের বোঝানো হয়, এসব পুরনো জাতে ব্লাস্ট রোগ হয়। তাই আমাদের দিয়ে প্রকল্পে এবার নতুন ব্রি-৮৮ ও ৮৯ জাতের ধান আবাদ করানো হবে। এ জাতে ব্লাস্ট রোগ হবে না। উৎপাদন বেশি হবে। খরচও কম হবে। কিন্তু চারা রোপণের পর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাঠকর্মীরা নতুন জাতের ধান চাষ, পরিচর্যা ও বালাই দমনে কোনও পরামর্শ দেননি। তারা গ্রামে এসে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে চলে যেতেন। ক্ষেতের ধান চিটা হওয়া শুরু হলে তারা কৃষকের সঙ্গে জমিতে যাননি।

ধনবাড়ি উপজেলা কৃষক সমবায় সমিতির সভাপতি সোহরাব আলী জানান, ব্লাস্ট রোগে অনেক কৃষকের বোরো ধান চিটা হয়ে গেছে। সরকারের এমন একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব এবং ধান চিটা হওয়ার অভিযোগ দুঃখজনক।

ধনবাড়ি উপজেলা উপসহকারী কৃষি অফিসার দেলোয়ার হোসেন ও শফিকুল ইসলাম জানান, পরামর্শ দেয়া সত্যেও কিছু কিছু চাষি আক্রান্ত জমিতে সময়মতো বালাইনাশক প্রয়োগ না করায় ব্লাস্টরোগে ধান চিটা হয়ে গেছে।

ধনবাড়ি উপজেলা কৃষি অফিসার মাহবুবুর রহমান জানান, তিনিসহ অফিসের ২৩ জন উপসহকারী কৃষি অফিসার পর্যায়ক্রমে প্রকল্পের দেখাশোনা করেছেন। কাজেই প্রকল্প তত্বাবধানে কৃষি বিভাগের বিন্দুমাত্র গাফিলতি ছিল না। তাহলে প্রকল্পের এক তৃতীয়াংশ চাষির বোরো ধান ব্লাস্ট রোগে পুরোটাই চিটা হলো কেন এ প্রশ্নে জানান, এরা ছিল অসচেতন চাষি। এরা কৃষি বিভাগের পরামর্শ শোনেনি। সময়মতো বালাইনাশক প্রয়োগ করেনি। সার ও বীজের কথা বলে কৃষকদের নিকট থেকে টাকা নেয়া হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ করেনি।

অপরদিকে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের কৃষি প্রকৌশলী এবং প্রকল্পের ট্যাগ অফিসার আশরাফ হোসেন জানান, প্রকল্পভুক্ত কৃষকরা সবাই বিনামূল্যে বীজ ও সার পেয়েছেন। তাদেরকে বালাইনাশক দেয়ার কথা ছিল না। তিনচার জন অসচেতন কৃষক বাদে আর সবাই বিঘা প্রতি ২৪-২৫ মণ ধান পেয়েছেন। সঠিকভাবে বালাইনাশক না দেয়ায় কারো কারো জমির ধান ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকলে এজন্য কৃষিবিদরা দায়ী নন। একটি স্বার্থান্বেষী মহল ব্লাস্ট রোগের জন্য কৃষিকর্মীদের দায়ী করে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত