বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২০, ২১ আষাঢ় ১৪২৭
৩১ °সে

গারো নারী উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেকের গল্প

গারো নারী উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেকের গল্প
গারো নারী উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেক। ছবি: ইত্তেফাক

বন থেকে রাস্তার শুরু, বনে গিয়েই শেষ। মাঝখানে গ্রাম ভেদুরিয়া। মধুপুর বনাঞ্চলের এ গ্রামে শুধুই গারোদের বসবাস। সবাই বিত্তহীন, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। এ গ্রামের মেয়ে মুনমুন নকরেক। উচ্চশিক্ষা নেয়ার পর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি গারোদের বিলুপ্তপ্রায় কারু ও চারুশিল্প পুনরুজ্জীবনের কঠিন লড়াইয়ে নেমেছেন। তাকে নিয়েই আজকের গল্প।

মুনমুনের মা রোজী নকরেক। বাবা অনন্ত সিমসাং। হত দরিদ্র পরিবারের চার ভাইবোন পেটের তাগিদে বাবামার সাথে কলা ও আনারস বাগানে দিনমজুরি করতেন। স্কুলকলেজের পড়ালেখার খরচ জোগানো ছিল সত্যিই কঠিন। মেধাবী মুনমুন বহু কষ্টে বছর তিনেক আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে মুনমুনের কোন মোহ ছিলনা। সব সময় ভাবনা ছিল শেকড়ে। অনটনে মানুষ হওয়ায় বনাঞ্চলের গারো রমণীদের দুর্দশা তাকে ভাবিয়ে তুলতো। সে ভাবনা সব সময় মাথায় ঘুরপাক খেতো। এসব থেকেই নিজ পায়ে দাঁড়ানোর চিন্তা পোক্ত হয়।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসাবে সামনে জোর কদম ফেলার অনুপ্রেরণা দেয়। মুনমুন খেয়াল করেন, সামাজিক বনায়নের নামে মধুপুরের প্রাকৃতিক বন উজাড়ের প্রেক্ষিতে গারোদের চিরায়ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা সংকটাপন্ন। ঐতিহ্যবাহী কারু ও চারু শিল্প, যার মাধ্যমে আয় রোজগার ছাড়াও আদি সংস্কৃতির বিমূর্ত ধারা প্রবহমান ছিল সেটি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। গারোদের এ সুপ্রাচীন নন্দনতাত্তিক শিল্পকে নতুন মোড়কে ক্ষুদ্র অর্থনীতির ভঙ্গিমায় পুনরুজ্জীবনের লড়াইয়ে নামেন। পরিবার এ কাজে সাপোর্ট দেয়। এরপর শুরু হয় পথচলা। সে গল্পটা মুনমুনের মুখেই শোনা যাক। বছর তিনেক আগে এক নারী নির্যাতনের ঘটনায় (গারো সমাজে অনেক অপরাধের বিচার নিজস্ব আচারে সম্পন্ন হয়) সমাজপতিদের দ্বারস্থ হয়ে হতাশ হয়েছিলাম।

গারো নারী উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেকের গল্প

তখনই উপলব্ধি করলাম, গারো রমণীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করা গেলে নির্যাতনের ঘটনা কমবে। আর সেই কাজটি করতে হবে নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে মিল রেখে। ২০১৮ সালে নকরেক আইটি থেকে অনলাইনে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কোর্স শিখে নেই। এরপর গারো এলাকায় ঘুরে বিলুপ্তপ্রায় কারু ও চারু শিল্পে ব্যাপক ধারনা অর্জন করি।

গারো নারী উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেকের গল্পছোট বোন নিঝুমকে নকরেককে পাঠানো হয় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার আসকি পাড়ায়। যেখানে আদিবাসীদের বিলুপ্তপ্রায় একমাত্র তাত কারখানাটি রয়েছে। সেখানে চার মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ি ফিরেন নিঝুম ।

ঢাকা ক্রেডিট ব্যাংকের ঋণে বাড়িতে টিনের তাত ঘর নির্মাণ ও সরঞ্জাম বসান। চালু হয় খুন্তা টান বা গারো তাত। এরপর মুনমুন আপসান নামে একটি অনলাইন গ্রুপ খোলেন। গারো সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী চিত্রকে স্কীনশটে ফুটিয়ে তুলে দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনের পোশাক গ্রুপে পোস্ট করেন। এতে ব্যাপক সাড়া মেলে। তারপর আপসানের যাত্রা। গারো রমণীরা সুপ্রাচীনকাল থেকেই দকমন্দা, গান্না-মারা, দক-সারি, বাটরেং ও খুটুপ নামক পোশাক পড়েন। এসব ঐতিহ্যবাহী গারো পোশাক দেশে মিলেনা। ভারত থেকে আমদানী করতে হয়। অথচ বিয়ে-সাদী, বড়দিন, নবান্ন উৎসব সহ সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসব পোশাক পছন্দ গারো রমণীদের। বাংলাদেশে লক্ষাধিক গারোর বাস। সুতরাং মার্কেটটা এক বারে নগণ্য নয়। তাছাড়া এসব ফ্যাসনেবল, আপডেটেড ও ইউনিক পোশাক ইউরোপ ও আমেরিকার সৌখিন মানুষরাও পছন্দ করেন।

ভারতের মেঘালয়ে বিপুল সংখ্যক গারো বসবাস করেন। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হলে সেখানেও রফতানি সম্ভব। আপসানের পাঞ্জাবী, ফতুয়া, গামছা সহ কিছু পণ্য বাঙ্গালীদেরও পছন্দ। কারণ দক্ষ ও নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় আপসান পণ্য যেমন টেকসই তেমনি হাতের কাজের অলঙ্করণে রয়েছে নতুনত্বের ছাপ।

নিঝুম ছাড়াও মামাতো বোন মিলন সিংসাম, মা রোজী নকরেক রাতদিন খেটে হাতেই তৈরি করছেন এসব বাহারি পোশাক। মুনমুন শুধু ডিজাইন ও অনলাইনে বিক্রির কাজ করেন। আর বাড়িতে বুনন কুশলের নিজস্ব স্টাইল, নকসা ও অলঙ্করণে গারো ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি হয় বৈচিত্র্যময় পোশাক।

গারো নারী উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেকের গল্প

কারু শিল্পের সাথে চারুর যোগসাজশে যে ঝলমলে পোশাক সেটি ফ্যাশন দুরস্ত গারো তরুণদের ফিউশনে পরিণত হয়েছে। নিজস্ব ডিজাইন ও আইডিয়ায় তৈরি জামা, কুর্তা, পাঞ্জাবী, ফতুয়া, কুটি, মাপলার, উত্তরীয়, ওড়না, কুশন কভার, কটি ব্যাগের চাহিদা বাড়ছে। আপসান নিজস্ব কৃষ্টিকে পেইন্টিং ও স্কীনশটের ছাপে টি-শাট তৈরি করছে। মগের সরা চিত্রে, ব্লাউজ টপসে, কাঠের গয়নায়, পুঁথি মালায়, গারো মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস, বাঁশ ও বেতের সৌখিন পণ্যে এবং বর্ণিল শোপিস কালেকশনে থাকছে এসব চিত্র ও অলঙ্করণ। বনবাসিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হারিয়ে যাওয়া গারো চিত্র শিল্পের আবহে ডেকোরেশনের কাজও করছে আপসান।

গারো নারী উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেকের গল্পদেশে অনলাইনে আর বিদেশে হাতে হাতে, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত জনের মাধ্যমে আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালী, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, লেবানন, হংকং ও তাজিকিস্তানে যাচ্ছে আপসানের ১১ পণ্য। মুনমুনের কনিষ্ঠ বোন নিঝুম নকরেক জানান, মা এক সময় দিন মজুরী ও সেলাইয়ের কাজ করতেন। বাবা ভ্যান চালাতেন। ছোটবেলা থেকেই সব ভাইবোন মায়ের সাথে আনারস ও কলাবাগানে কামলার কাজ করতাম। অভাব দারিদ্র্যতার সাথে লড়াই করেই আমাদের বেড়ে উঠা। আপসান পণ্যের মার্কেট দিন দিন বাড়ছে। আমরাও লাভের মুখ দেখছি।

মুনমুনের মা রোজী নকরেক জানান, অনটনের সংসারে মেয়েরা ছোটকাল থেকেই দিনমজুরী করতো। কঠিন দিন ছিল তখন। কোন কোন দিন সিদ্ধ বন আলু মুখে তুলে স্কুলে যেতো বাচ্চারা। ছোটকাল থেকেই মুনমুন ছিল মেধাবী। নিঝুম এখনো তাতের কাজে উদয়াস্ত শ্রম দেয়। রাতে পড়ালেখা করে। স্থানীয় কলেজ থেকে এবার গ্রাজুয়েশন করবে। বড় ছেলে গারো প্রথানুযায়ী বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি জামাই গেছে। ছোট ছেলে এখনো স্কুলে পড়ছে। বাবাকে মুনমুন কয়েকটি গরু কিনে দিয়েছে। পাহাড়ে সকাল-বিকাল গরু চরিয়ে সুখেই দিন কাটে তার। সংসারে খাওয়াপরার কোন সমস্যা নেই। এখন সচ্ছল তারা।

গারো নারী সংগঠন আচিকমিচিক সোসাইটির সভাপতি সুলেখা ম্রং জানান, গারোদের হারাতে বসা ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে মুনমুন নতুন ধারায় ফিরিয়ে এনেছে। এতে সুলভ মূল্যে গারো পোশাক ও চারু পণ্য যেমন মিলবে তেমনি দরিদ্র গারো রমণীদের নতুন কর্মসংস্থান হবে। দেশবিদেশে গারো কারু ও চারু পণ্য নতুন করে পরিচিতি পাবে। এক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

গারো নারী উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেকের গল্প

নকরেক আইটির গ্রাফিক ডিজাইনার ও চীপ এক্সিকিউটিব সুবীর নকরেক জানান, মেধাবী মুনমুন উচ্চশিক্ষার পর সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছেন। আপসান পণ্য গুণে মানে অনন্য। দেশবিদেশে চাহিদাও বেশ। গারো রমণীদের মধ্যে মুনমুন এখন আইকন। সাবেক কলেজ শিক্ষক এবং গারো নেতা বাবুল ডি নকরেক জানান, আদিবাসী গারোদের বিলুপ্তপ্রায় কারু ও চারু শিল্পকে স্ব মহিমায় প্রতিষ্ঠা করার কঠিন লড়াইয়ে নেমেছে মুনমুন।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত