বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭
২৯ °সে

বন্যার অবনতি

কয়েক লাখ লোক পানিবন্দি, তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট-ফসল

বিভিন্ন স্থানে বাঁধে ভাঙন
কয়েক লাখ লোক পানিবন্দি, তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট-ফসল
ফেনী : ভারী বর্ষণ ও উজানের পানির ঢলে মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৯ স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হওয়ায় ১৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কে যান চলাচল          —ইত্তেফাক

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন নদীর পানি বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে বন্যা। কুড়িগ্রামে অন্তত দুই লাখ এবং রংপুরে প্রায় ১ লাখ লোকসহ বিভিন্ন জেলায় বিপুল সংখ্যক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন বাঁধে দেখা দিয়েছে ভাঙন। রংপুরের গঙ্গাচড়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গিয়ে আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রাস্তাঘাট, ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে কয়েকশ পুকুরের মাছ।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, তিস্তাসহ সবকটি নদনদীর পানি বিপত্সীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। দ্বিতীয় দফা বন্যার কবলে পড়ে কুড়িগ্রাম জেলার ৯টি উপজেলার ৫ শতাধিক গ্রামের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সোমবার বিকালে ধরলার পানি বিপত্সীমার ৯৪ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার ৬২ সেন্টিমিটার ও তিস্তার পানি ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ধরলা ও দুধকুমার অববাহিকার কুড়িগ্রাম সদর, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী উপজেলার অধিকাংশ কাঁচা-পাকা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াতে সমস্যায় পড়েছে মানুষজন।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধারে নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া জেলায় ৪৩৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৪০০ মেট্রিক টন চাল, ১১ লাখ টাকা ও ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ফুলবাড়ীর শিমুলবাড়ী এলাকায় শেখ হাসিনা ধরলা সেতু পয়েন্টে গতকাল ধরলা নদীর পানি বিপত্সীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে পাট, ভুট্টা, আউশ ধান, সবজি খেত ও বীজতলা।

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টায় ৩৯ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বিপত্সীমার ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, তিস্তা তীরবর্তী এলাকার ও তিস্তার চরাঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। পাট, ভুট্টা ও আমন বীজ তলাসহ অন্যান্য ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন। ১৪০টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।

স্টাফ রিপোর্টার রংপুর জানান, বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে রংপুরের প্রায় এক লাখ মানুষ। গত ২৪ ঘণ্টায় গঙ্গাচড়ার বৈরাতিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ রক্ষা বাঁধের ২০ মিটারের বেশি অংশ পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। আলমবিদিতর ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা বাঁধটিতেও ভাঙন ধরেছে। গঙ্গাচড়ায় তিস্তার ডানতীর রক্ষা বাঁধটি (মূল বাঁধ) ভাঙনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদি কোনোভাবে ডানতীর রক্ষা বাঁধটি ভেঙে যায়, তাহলে বাঁধসংলগ্ন ঘাঘট নদী তলিয়ে যাবে। এতে ঘাঘট তীরবর্তী এলাকাসহ শহরও প্লাবিত হবে। রংপুর নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, গঙ্গাচড়ায় নতুন করে তিস্তার পানি বৃদ্ধির কারণে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উপজেলার গজঘণ্টা, জয়দেব মর্নেয়া, নোহালী, আলমবিদিতর, কোলকন্দ, গঙ্গাচড়া সদর ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। গজঘণ্টা ইউনিয়নের ছালাপাক এলাকায় সদ্যনির্মিত একটি বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় সেখানে বন্যার প্রাবল্য আরো বেড়ে গেছে। পানিবন্দি এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসলীমা বেগম জানান, পানিবন্দি লোকজনের জন্য জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, গতকাল সোমবার বিকাল ৩টায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপত্সীমার (৫২.৬০) ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

পীরগাছা (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, তিস্তার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় কাউনিয়া পয়েন্টে বিপত্সীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। বহু নলকূপ সম্পূর্ণ পানির নিচে ডুবে গেছে। তাই বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নৌকার সংকট থাকায় বন্যায় আটকে পড়া লোকজন নিরাপদ স্থানে যেতে পারছে না। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ জানান, বন্যার্তদের জন্য এখন পর্যন্ত ২৫ মেট্রিক টন চাল ও ৫০০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরে দ্বিতীয় দফা বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ৫৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল সোমবার বিকালে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ৭১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, পাউবো জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সাঈদ। এদিকে জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ ও সরিষাবাড়ী, উপজেলার যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়ে আবারও লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে ভারি বর্ষণ ও ভারত থেকে আসা উজানের পানির ঢলে মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৯টি স্থান ভেঙে গিয়ে অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে দুই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট। বন্ধ হয়ে গেছে ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কের যান চলাচল। ভেসে গেছে কয়েকশ পুকুরের মাছ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১৫টি গ্রামের হাজারো মানুষ।

পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন আক্তার জানান, মুহুরী নদীর বাঁধের ভাঙনকবলিত অংশগুলো মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন জানান, মুহুরী নদীর বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশে পানি কিছুটা কমলে বাঁধ মেরামতে কাজ করা হবে। এছাড়া নতুন করে বাঁধের কোনো অংশ যেন না ভাঙে, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৪০ হাজার মানুষ। পাউবো, ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, সোমবার সকাল ৯টায় তিস্তার পানি বিপত্সীমার ৫৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের সবকটি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙন ঠেকাতে ডিমলা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নে ১ হাজার ৯০০ ও খালিশা চাপানী ইউনিয়নে ১০০ জিও ব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড়ে প্রবল বর্ষণে করতোয়াসহ অন্যান্য নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। করতোয়া নদীর মিরগড় ঘাটের ৪০০ মিটার কাঠের সেতু পানিতে তলিয়ে গেছে।

পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে তিস্তা চরাঞ্চলসহ মুন্সিপাড়া, ক্লিনিকপাড়া, চরপাড়া, কাতিপাড়া, সৈয়দপাড়া এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আমন ধান ও সবজিখেত। গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা।

শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, বগুড়ার শেরপুরে বাঙালি ও করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পৌরশহরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডসহ উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েকশ’ পরিবার।

সিলেট অফিস জানায়, সিলেট ও সুনামগঞ্জের আড়াইলাখ লোক এখনো পানিবন্দি। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সোমবার বিকালে সিলেটে সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ৭২ সেন্টিমিটার ও সুনামগঞ্জে ২৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, কুশিয়ারা নদীর পানি ফেঞ্জুগঞ্জে ৯৭ সেন্টিমিটার, শেরপুরে ৩৬ সেন্টিমিটার এবং সারি নদীর পানি বিপত্সীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত