বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭
২৮ °সে

তালায় করোনা মোকাবেলায় গ্রামবাসী গড়ে তুলেছে খাদ্যভাণ্ডার

তালায় করোনা মোকাবেলায় গ্রামবাসী গড়ে তুলেছে খাদ্যভাণ্ডার
তালায় করোনা মোকাবেলায় গ্রামবাসী গড়ে তুলেছে খাদ্যভাণ্ডার [ছবি: ইত্তেফাক]

“দেশজুড়ে যখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় তখন প্রথমে বাঁশ দিয়ে আমরা আমাদের গ্রামটি লকডাউনের চেষ্টা করি। বাইরের মানুষ যাতে হরহামেশা গ্রামে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য নিরুৎসাহিত করি। কেউ ঢাকা থেকে আসলে তার জন্য হোম কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করি।

কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ মানুষের কাজ-কর্ম এক প্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টেনশানে পড়ি খাদ্য নিয়ে। শুরু থেকে বুঝতে পারতাম আমাদের সাহায্যে সহজে মানুষ এগিয়ে আসবেনা। যা করতে হবে নিজেদের করতে হবে। আমরা জানতাম যদি সবাই মিলে একসাথে কাজ করি তাহলে এই মহামারী থেকে বেঁচে যেতে পারবো। এ জন্য আমরা বে-সরকারী সংস্থা উত্তরণ এর কাছে পরামর্শ নিতে গেলে সংস্থাটি আমাদেরকে সহায়তা ও পরামর্শ দিতে পাশে দাড়ায়। তাদের পরামর্শে সমাজের দুর্বল অংশের মানুষের দুর্দিনে যেনো খাদ্য ঘাটতি না পড়ে সেই লক্ষ্যে গ্রামবাসীরা গড়ে তোলে খাদ্যভাণ্ডার।

খাদ্যভাণ্ডারে আমাদের গ্রামের লোকজন ৫০/৬০ মন ধান এবং নগদ প্রায় ৪০ হাজার টাকা প্রদান করে। উত্তরণ অনুদান দেয় নগদ ৫০ হাজার টাকা। উক্ত টাকা দিয়ে আমরা চাল, ডাল, তেল ক্রয় করে হতদরিদ্র, দুঃস্থ কর্মহীন মানুষের মধ্যে বিতরণ শুরু করি। আর ধানগুলো একটি খাদ্য ভাণ্ডারে জমা রাখি। বর্তমানে যে খাদ্য সামগ্রী মজুদ রয়েছে তা দিয়ে আগামী ৩/৪ মাস দরিদ্র মানুষের খাদ্য সরবরাহ করা যাবে।” এমন লড়াইয়ের গল্পটা শোনালেন তালা উপজেলার গোপালপুর গ্রামের অধীর কুমার দে’র পুত্র তীর্থ কুমার দে।

তিনি বলেন, এ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো আপদকালীন সময়ের জন্য খাদ্য সংগ্রহ, মজুদ করা ও খাদ্য সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্য সরবরাহ করা। গ্রামের শতাধিক মানুষ মার্চ মাসের শুরু থেকেই এ খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। গোপালপুর গ্রাম ছাড়াও এ সহায়তা পাচ্ছেন জাতপুর, কিসমতঘোনা, খানপুর, ডাঙ্গানলতা, সন্যাসগাছাসহ কয়েকটি গ্রামের শত শত মানুষ। চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া উক্ত কার্যক্রমে এ পর্যন্ত ৭টি গ্রামে প্রায় ৮৭৫০ জনগণকে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আওতায় আসে। এই খাদ্যভাণ্ডারগুলো থেকে ইতিমধ্যে হতদরিদ্র ও কর্মহীন ২৭৭টি পরিবারের মধ্যে পরিবার প্রতি ১০-২০ কেজি চাল, ২-৪ কেজি ডালসহ কিছু কিছু গ্রামে ১ লিটার সয়াবিন তেলও বিতরণ করা হয়েছে।

করোনা ও দুর্যোগ প্রতিরোধ কমিটির উপদেষ্টা শেখ শফিকুল ইসলাম জানান, করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় গ্রামবাসী নিজেদের উপলব্ধি থেকে সংগঠিত হয়ে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই লক্ষ্যে প্রতি গ্রামের সাহসী যুব সমাজকে নিয়ে যুব কমিটি এবং অভিজ্ঞ-প্রজ্ঞাবান বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়ে উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়। এই উভয় কমিটির সদস্যবৃন্দ উত্তরণের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে স্ব-স্ব গ্রামের জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং গ্রামের হতদরিদ্র ও কর্মহীন প্রতিবেশীরা যাতে খাদ্য সংকটের সম্মুখীন না হয় তার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করে। এই নীতিমালার আলোকে প্রতি গ্রাম কমিটি স্ব-স্ব গ্রামের জনগণকে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং তা নিয়মিত কার্যকরীভাবে অনুশীলন করা হয়।

এ কার্যক্রমে উপকারভোগি জাতপুর গ্রামের স্বামীহারা মাছুরা বেগম বলেন, “আমি একজন দুঃস্থ মানুষ। গ্রাম কমিটি থেকে খাবার পেয়ে আমি খুব খুশী। আমি জানি পর পর ৩/৪ মাস আমাকে খাবার দেয়া হবে। কমিটি যদি খাবার না দিত তাহলে মাঝে মাঝে আমাদের না খেয়ে থাকতে হতো এবং পরিবার পরিজন নিয়ে বিপদে থাকতাম।”

উত্তরণের পক্ষে এই কার্যক্রমের সমন্বয়ক জাহিদ আমিন বলেন, “আমাদের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। পূর্বে গ্রামীণ সমাজ যখন বিভিন্ন ধরণের সংকটের সম্মুখীন হয়েছে তা পরম্পরায় গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। করোনাকালীন এই মহাদুর্যোগের সময়ে প্রতি গ্রামের জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে তাহলে বাংলাদেশের সকল গ্রাম তথা আমাদের প্রিয় দেশ একদিন অবশ্যই করোনা মুক্ত হবে।”

স্থানীয় জনগণের মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন, সরকারের একার পক্ষে সকলকে সহযোগিতা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। গ্রাম ভিত্তিক গড়ে তোলা এ উদ্যোগে স্থানীয় মানুষ অবশ্যই উপকৃত হচ্ছে বলে জানান তিনি।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত